‘চোখের জলে নক্ষত্রের বিদায়’

প্রকাশ: ১৫ মে, ২০১৩ ১০:৪৪ : অপরাহ্ণ

mamtaz Pic 13.05.2013আব্দুল কুদ্দুস রানা:
১৪ মে-২০১৩, মঙ্গলবার সকাল ৯টা। নাফনদের উপরে মেঘলা আকাশটায় হঠাৎ পরিবর্তন। রঙধনুর আদলে অল্পকিছু আলোকছটার বিচ্ছুরণ। মুহুর্তে থেমে গেল বৃষ্টি। বজ্রপাতও নেই। গাছে গাছে লাখো সবুজ পাতায় জমে থাকা একটু আগের বৃষ্টির ফোটা গুলো টিপটিপ করে নিচে ঝড়ে পড়ছেনা। পশ্চিমাকাশে দেখা দিল একফালী সোনালী রোদ। জামায়াতে ইসলামীর ডাকা সকাল-সন্ধ্যার হরতালও শিথিল করা হলো। হঠাৎ এই পরিবর্তনের কারণ কী ?
সম্ভবত এক নক্ষত্রের বিদায়। ভালো একজন মানুষের প্রস্থান। আদর্শবান একজন রাজনীতিকের পৃথিবীত্যাগ। সৎ ও নির্লোভ একজন ব্যক্তির স্বর্গপানে ছুটে চলা। আর এই নক্ষত্রটি হচ্ছেন সবার প্রিয় ডাক্তার সফিকুর রহমান। টেকনাফ উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্টাতা সভাপতি।
অথচ ওই সময় টুকুতে একটু দুরে টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, উখিয়া, কক্সবাজার, রামু, চকরিয়ায় প্রবল বর্ষন হচ্ছিল। বঙ্গোপসাগরটা ফুঁসে উঠছিল ঘুর্ণিঝড় মহাসেনের প্রভাবে। ভালো একজন মানুষের বিদায় অনুষ্টান ( নামাজে জানাজা) সম্পন্ন করতে প্রকৃতির এমন সাড়া উপস্থিত সকলের নজর কাড়ে।
আগের দিন ১৩ মে দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে নিলা ইউনিয়নের সিকদারপাড়ার নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন ডা. সফিকুর রহমান। (ইন্না লিল্লাহে—-রাজেউন)।
তিনি ১৯৩৮ সালের ২১ ডিসেম্বর নিলা ইউনিয়নের পুর্বসিকদারপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মরহুম ছিদ্দিক আহমদ দফাদার। মা মরহুমা জান্নাতুল ফেরদৌস ধলূ। জন্মের পর তিনি পৃথিবীতে বসবাসের সুযোগ পেয়েছেন ৭২ বছর ৪ মাস ২২দিন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, পাঁচ মেয়ে, এক ছেলেসহ অসংখ্য আত্বীয় স্বজন গুনগ্রাহি রেখে গেছেন।
১৯৬২ সালে তিনি টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম আলহাজ্ব নজির আহমদের প্রথমা কণ্যা সারা খাতুনকে বিয়ে করে সুখের সংসার রচনা করেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত স্বামী-স্ত্রী দুইজনের সম্পর্ক ছিল গর্ব করার মতো। এরপর তিনি নিলা উচ্চবিদ্যালয়ে শুরু করেন শিক্ষকতা। চিকিৎসক হিসাবেও এলাকায় তাঁর বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। রাজনৈতিক দলের নেতা হলেও লোকজন তাঁকে ডাক্তার সফিক বলে ডাকতে স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির টেকনাফ উপজেলা শাখার প্রতিষ্টাতা সভাপতি ছিলেন। তাছাড়া তিনি নিলা উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি, রঙ্গিখালী ইসলামিক সেন্টারের বোর্ড অব ট্রাষ্টির প্রতিষ্টাতা সদস্য, টেকনাফ ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্টাতা সদস্য, নিলা আল ফালাহ একাডেমির অন্যতম জমিদাতা ছিলেন। তাই টেকনাফের আদর্শবান একজন রাজনীতিবীদ, শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবকের মৃত্যুতে সবাই মুহ্যমান, হতবাক।
১৪ মে, সকাল ৯টায় নিলা শাহ মজিদিয়া মাদ্রাসা মাঠে মরহুমের জানাজায় গিয়ে এই অবস্থা প্রত্যক্ষ করলাম। হাজার হাজার মানুষ অন্যরকম এই মানুষটির গুণের কথাই বলে যাচ্ছিলেন। যে মানুষটি সারাটা জীবন সমাজ বা অন্যের উপকারের জন্য কাজ করে গেছেন, যে মানুষটি নিজের জন্য কিছু করার কথা ভাববার সময় পাননি, তাঁর মুত্যুতে একটু ভিন্ন পরিস্থিতি তো হবেই।
তাঁর বিদায় অনুষ্টানে ( জানাজায়) আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয়পার্টি, সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক, চিকিৎসক, ঠিকাদার, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছেন। মরহুমের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ও নির্লোভ চরিত্র নিয়ে সকল রাজনৈতিক দলের নেতারা বক্তব্যও দিলেন। সবাই বললেন-আদর্শের রাজনীতি করতে হলে ডাক্তার সফিকুর রহমানকে স্মরণে রাখতে হবে।
ব্যতিক্রমধর্মী বক্তব্য দিয়ে সবার মনে নাড়া দিয়েছেন, সাবেক সাংসদ ও টেকনাফ উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমার শিক্ষক ডা. সফিকুর রহমানের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে দুইজনের মধ্যে ছিল চরম শত্রুতা। ডাক্তার সফিক বিএনপির সভাপতি হলেও তিনি কোনদিন আমার মনে কষ্ট লাগার মত কাজ করেননি। কিন্তু নানা কারণে আমি তাঁর মনে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আজ তাঁর বিদায় অনুষ্টানে আমি মরহুমের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনি পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর এই বক্তব্য শুনে উপস্থিত অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।
অতিতে কোন জানাজার অনুষ্টানে মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে উল্টো ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার নজির দেখিনি। এই ঘটনা আমাকেও হতবাক করেছে।
তাছাড়া মুরহুমের বর্ণাঢ্য জীবন, রাজনৈতিক কর্মকান্ড আর সৎ জীবন যাপনের স্মৃতিকথা তুলে ধরে বক্তব্য দেন, জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সাংসদ শাহজাহান চৌধুরী, টেকনাফ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শফিক মিয়া, উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান ইউনুস বাঙ্গালী, টেকনাফ উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার কামাল, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল্লাহসহ অনেকে। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
আমি যখন শাহপরীর দ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র তখন থেকেই ডাক্তার সফিকুর রহমানকে চিনতাম। শান্ত ভদ্র স্বভাবের এই লোকটিকে সবসময় হাসিমুখ দেখতাম। সবার সাথে কথা বলতেন তিনি খোলা মন নিয়ে। ভালো খাবারের প্রতি তাঁর দুর্বলতা ছিল যেমন, তেমনি অন্যদের খাওয়াতে পারলে তিনি সুখ অনুভব করতেন। নিত্য নুতন পোষাকে সবসময় তিনি স্মার্ট থাকতেন। এক সময় আমি তাঁর পরিবারিব সদস্য হয়ে গেলাম। তখনও তাঁকে একই স্বভাবের দেখতে পেলাম। আপন-পর তাঁর কাছে পরখ ছিলনা।
একমাত্র ছেলে নেওয়াজ মোর্শেদ আর সবার ছোট মেয়ে জিন্নাত আরা জুবলীকে তিনি খুববেশি আদর করতেন। অন্যান্য মেয়েদের তিনি একই রকম ¯েœহ করলেও সেটা ধরা দিতেন না। বিয়ের পর ভাগ্যক্রমে আদরের সেই ছোট মেয়েটি যখন সুদুর মধ্যপ্রাচ্যের কাতার চলে গেলেন, তখন তাঁর কষ্ট বাড়তে থাকে।
প্রায় দুই বছর আগে হঠাৎ তিনি ব্রেইন ষ্ট্রোকে আক্রান্ত হলেন। এরপর রাজধানীর নামিদামী বিভিন্ন হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা করা হল। কিন্তু ভাগ্য খারাপ। তাঁকে মুমুর্ষাবস্থায় আনা হল জন্মভুমি নিলার সেই দুইতলা কাঠের বাড়িতে। যেখানে তিনি থাকতে বেশ স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। এই ঘরের একটি লৌহার খাটে তাঁর বাকি জীবন কাটে একেবারে নীরবে-নিভৃত্তে, চোখের জলে বুক ভাসিয়ে।
কেউ যখন তাঁকে একনজর দেখতে যেতেন, তিনি আবেগ ধরে রাখতে পারতেন না। হাত বাড়িয়ে হাতটি টেনে বুকের উপর রেখে চোখের দিকে চেয়ে থাকতেন। তারপর নিজের দুইচোখ দিয়ে বিসর্জন দিতেন কয়েক ফোটা অশ্রু। মনের ভাব আর ভালবাসার বর্হিঃপ্রকাশ ঘটাতে কতজন মানুষ এভাবে অশ্রুজল বিসর্জন দিতে পারেন-আন্দাজ করেও বলতে পারছিনা।
তিনি কথা বলতে পারতেন না। ষ্ট্রোকের পর তিনি বাকশক্তি হারান। কিন্তু স্মৃতিশক্তি মোটামুটি ঠিক ছিল। কেউ গেলে কথা বলার চেষ্টা করতেন, কিন্তু পারতেন না। যে মানুষটি সারাজীবন মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে জনগনকে কথা শুনিয়ে গেছেন, দেশ শাসনের বয়ান দিয়ে চলেছেন-আজ তাঁকে কথা বলতে হচ্ছে ইশারায়, চোখের জলে গা ভাসিয়ে। মানুষের এমন আঁকুতি নিষ্টুর মনকেও কাঁদিয়ে ছাড়ে।
প্রিয় বাবার অসুখের খবর শুনে সুদুর কাতার থেকে ঢাকায় ছুটে আসে ছোট মেয়ে জুবলী। সঙ্গে দেড় বছর বয়সি একমাত্র মেয়ে। ১৩ মার্চ সকালে চট্টগ্রাম এসে জানতে পারেন-তার প্রিয় বাবা আর এই দুনিয়ায় নেই। কান্নাকান্নি করতে করতে মেয়ে ঘরে এলো ঠিক, কিন্তু প্রিয় বাবার দোচোখ দিয়ে তাকিয়ে থাকার দুলর্ভ দৃশ্যটি আর দেখতে পেলনা। চোখের দিকে তাকিয়ে দোচোখ দিয়ে অনড়দৃষ্টির কয়েক ফোটা অশ্রু ফেলার দৃশ্য দেখতে পেল না। বাবার নিথর শরীরে মাথা রেখে শুধু সে কেঁদেই যাচ্ছিল।
জন্মিলে মরিয়ে হয়-এমন নিধান আমাদের আছে। আগে পরে সবাইকে একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তারপরও প্রিয়জনের করুন বিদায় কিছুতেই মেনে নিতে পারেননা স্বজনরা। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে।
আমরা মরহুমের রুহের আত্বার মাগফেরাত কামনা করছি। প্রার্থনা করছি-তিনি যেন জান্নাতবাসী হোন।
আর তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি জানাই সমবেদনা। প্রার্থনা করি-প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক সইবার শক্তি যেন আল্লাহ সবার মধ্যে জাগিয়ে তোলে। বাবার আদর্শকে ধারন করে যেন ছেলেমেয়েরা, পরিবার পরিজনরা অন্যের দুঃখ কষ্ট বুঝার তাগিদ অনুভব করেন।
@ আব্দুল কুদ্দুস রানা # স্টাফ রিপোর্টার–দৈনিক প্রথম আলো।


সর্বশেষ সংবাদ