এক সফল বাবা

প্রকাশ: ৪ মে, ২০১৭ ৬:২৩ : অপরাহ্ণ

ফারুক আজিজ::: মানুষটি আনপড়। সংগ্রাম করে সংসার চালায়। আল্লাহ খাওয়াবে বলে বসে থাকার মানুষ নন তিনি; মাটির বুক চিরে ফসল ফলায়।ফসলের শরীরে সন্তান-সন্ততির হাসি দেখতে ভালোবাসে। ফজরের নামাজ পড়ে রিযিকের তালাশে বের হয়ে এশরাক্বের নামাজ পড়তে পারে না; তবু সে সন্তান-সন্ততির জন্যে রিযিকের তালাশে খালে বিলে চলে যায়।

সন্তান-সন্ততির জন্যে রিযিকের তালাশে বের হওয়া যে এশরাক্বের নামাজের চেয়ে উত্তম তা তিনি জানেনা; তবে এইটুকু জানে এদের মুখে খাবার তোলে দেওয়ার দায়িত্ব আমার। রিযিকের তালাশে নদী-সমুদ্রে চলে যায় দিনের পর দিন। সাগরের বুকে সন্তান-সন্ততির জন্যে রিযিক খুঁজে।

মানুষটি আনপড়। দশ এগারোজন সন্তান-সন্ততি নিয়ে তার সংসার। ছেলেমেয়ে বেশি হওয়ায় তার কোন ক্লান্তি নেয়, আছে আল্লাহর দেওয়া বরকত ( ছেলেমেয়ে) নিয়ে বিপুল আশা ও তাদের মানুষ করার জন্যে কাঠপোড়া সংগ্রাম। সংসার চালাতে কখনো সখনো পাড়ি জমিয়েছে বিদেশ ; বিদেশের মাটিতে কাজ করে তুলে আনতো রিযিক। অবশেষে দোকান ও কৃষিতে নিজেকে সঁপে দিয়ে সংসারের হাল ধরে । সন্তান-সন্ততির পাশে থেকে সংসার চালায়।

মানুষটি আনপড়। ইসলামের মৌলিক ও মূল বিষয় পালনে কোন গড়িমসি নেই।খাল বিলে
কাঠপোড়া কষ্টে ফরজ নামাজ পড়ে শান্তি খুঁজে আর ক্লান্তি দূর করে। নফল মুস্তাহাব পালনে কোন নিয়মের পাল্লায় পড়তো না; খুব কম আদায় করতো তা। কারণ সংসার চালানো, তাদের মুখে খাবার তুলে দেওয়াকে প্রাধান্য দিতো। হালাল রিযিক বলতে শুধু বুঝত নিজে কামানো সম্পদের রিযিককে।

মানুষটি আনপড়। একদিন এশার পরে এলাকার এক মাহফিলে ওয়াজ শুনতে গেছে। এক আলেম ওয়াজ করছে। বক্তার একটি বাক্য মানুষটির মনে এক ধাক্কা দিলো। বক্তা বলে, “আমরা মাদরাসায় ঐ ছেলেকে পড়ায় যে ছেলেটি দেখতে বিশ্রী, ল্যং, তেঁড়া ইত্যাদি। ঐ ছেলেকে নিয়ে মান্নত করি মাদরাসায় পড়াবো বলে। সুন্দর ছেলেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও ওকিল বানায়”।
এই বাক্যটি মানুষটির তনুমনে নাড়া দিলো।

মানুষটি আনপড়। ওয়াজ শুনে বাড়িতে এসে নিজের সবচেয়ে সুন্দর, হৃষ্টবান ও সুগড়ন- গঠন
ছেলেকে মাদরাসায় পড়ানোর জন্যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে। ছেলেটিকে স্কুল থেকে মাদরাসায় ভর্তি করায় দিলো। ছেলেটি হাফেজ ও আলেম হলো। মানুষটি দাওয়াতে তাবলিগের কাজে নিজের বাকি হায়াত কাটাতে ভালোবাসে। দাওয়াতে-তাবলিগের কাজকে এখন সংসার চালানোর মতো করে দায়িত্ব মনে করে। কারণ এখন সংসার চালাতে হয় না। সব ছেলে শিক্ষিত না হলেও সব ছেলে মানুষ হয়েছে।

মানুষটি আনপড়। এই রকম আনপড়কে ভালোবাসি; ভীষন ভালোবাসি। নিজের জীবনের মতো ভালোবাসি। আনপড় দোষের কিছু না কিন্তু শিক্ষিত অমানুষ ভয়ংকর দোষের।
আজ এই আনপড় মানুষটির পাশে বসে আছি গাড়িতে। গাড়িতে বসে এই আনপড় মানুষকে আবিষ্কার করেছি একজন সফল মানুষ ও বাবা হিসেবে। গাড়িতে বসে আবিষ্কার করেছি সফল হওয়ার জন্যে টাকা, গাড়ি ও বাড়ীর তেমন প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন এক থোকা স্বচ্ছ স্বপ্ন ও কিছুটা সংগ্রামের মিশেল ও মৌলিকত্বে পচন না ধরা।

মানুষটি আনপড়। সকল পড়ুয়াদের নিকট এই আনপড়ের হায়াতে ত্বাইয়িবাহ ও দীর্ঘ হায়াতের জন্যে দোয়া কামনা করছি।

০৪-০৫-২০১৭


সর্বশেষ সংবাদ