সেন্টমার্টিন্সের অজানা রূপ ছেঁড়াদিয়া

প্রকাশ: ১৪ জুলাই, ২০১২ ৫:৪১ : অপরাহ্ণ

ফরিদুল মোস্তফা খান, কক্সবাজার :  চারদিকে নীল জলের অতলান্ত সমুদ্র। তার মধ্যে নির্জন এক দ্বীপের প্রবাল আর পাথরে সেই সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ে শুভ্র ফেনা তুলে গর্জে উঠছে সাপের মতো, আর সেই দ্বীপে কেয়া আর নিশিন্দার ঝোপ, বালুর মাঝখানে শ্যাওলা সবুজ এক ডোবা, ডোবার ধারে ঠেসমূলগুলো দাঁড়িয়ে আছে অনবদ্য ভাস্কর্যের মতো, বালুর ওপর ছোটাছুটি করছে লাল কাঁকড়া, গিরগিটি, পড়ে আছে রঙিন শামুক, মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে গাঙচিল। আর এই অপরূপ জনমানবহীন দ্বীপটি খুব বেশি দূরে নয়, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার এই একটুখানি বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের টেকনাফ উপজেলা থেকে মাত্র নয় কিলোমিটার দূরেই এই নিসর্গ।

শীতে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনায় ছেঁড়াদিয়া বা ছেঁড়াদ্বীপের নামটা পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রাখার মতোই। ছেঁড়াদ্বীপ মানে হচ্ছে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। আসলে নারিকেল জিনজিরা বা সেন্ট মার্টিন দ্বীপের আশপাশে এ রকম ছেঁড়াদ্বীপের সংখ্যা একটি নয়, বরং বেশ কয়েকটি। যদিও পর্যটকদের কাছে মূলত নিকটতমটিই ছেঁড়াদ্বীপ নামে পরিচিত। আর স্থানীয় বাসিন্দারা যেহেতু দ্বীপকে দিয়া বলে ডাকে, তাই এর স্থানীয় নাম সিরাদিয়া বা ছেঁড়াদিয়া। সেন্ট মার্টিনের মতোই ছেঁড়াদ্বীপ চুনাপাথর, ঝিনুক, শামুকের খোলস সৃষ্ট কোকুইনা স্তর এবং প্রবালগুচ্ছ দিয়ে তৈরি। সমুদ্রপথে ছেঁড়াদ্বীপে যাওয়ার মোক্ষম সময় হচ্ছে ভাটার সময়। কেননা ভাটায় ছোট ছোট খাঁড়ি ও চারপাশের অগভীর সমুদ্রে ভেসে ওঠে জীবিত ছোট ছোট প্রবাল গোষ্ঠী, যা জোয়ারের সময় আবার পানিতে তলিয়ে যায়। এগুলোর কোনোটা ভাটার সময় পানি স্তরের চেয়ে প্রায় তিন-চার মিটার ওপরেও দেখা যায়। দ্বীপে প্রায় ২০০-র মতো প্রজাতির জীবের উপস্থিতি দাবি করেন বিজ্ঞানীরা।

নারিকেল জিনজিরায় পাঁচ শতাধিক মৎস্যজীবী পরিবারের বসবাস হলেও ছেঁড়াদিয়া পুরোপুরি জনবসতিহীন। কারণ, সুপেয় পানির অভাব। সেন্ট মার্টিনের সমুদ্র কক্সবাজারের মতো শান্ত, বাধ্য আর একই ভঙ্গিতে বালুর ওপর বারবার ফিরে আসা জলরাশি নয়, এখানে সমুদ্র মুহূর্তে মুহূর্তে তার রূপ পাল্টায়। সকালে সেন্ট মার্টিনের অপরিসর পাথুরে সৈকতে পা ফেলে ফেলে হেঁটে আসার স্মৃতি রাতের অন্ধকারেই অবিশ্বাস্য মনে হবে। বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে দেখবেন সেই পাথুরে সৈকত আর কোথাও নেই, সমুদ্রের পানি সব কিছু ভেঙে-চুরে অসম্ভব রাগে গর্জে উঠতে উঠতে ততক্ষণে জনবসতির কাছে চলে এসেছে। রাতের অন্ধকারে ঢেউয়ের মাথায় লাফিয়ে ওঠা শুভ্র-সাদা ফেনা ধুন্দুমারের মতো এগিয়ে আসতে আসতে এমনকি অনেক ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা আপনার পা দুটো ভিজিয়ে দেবে সরোষে। নারিকেল জিনজিরায় সমুদ্রের গান শুনতে শুনতে প্রশান্ত এক ঘুম ঘুমিয়ে নিয়ে সকালে উঠেই তৈরি হয়ে নিন। ঘাটটি খুব দূরে নয়, আর ঘাটে নিয়ে যাওয়ার জন্য গদি-আটা ভ্যানগাড়িগুলো সব সময়ই তৈরি। ছেঁড়াদ্বীপে যেতে হবে ¯িপডবোটে বা ট্রলারে। দুটোই সমান উত্তেজক। ভাটার সময়টা আগেভাগে জেনে নেবেন, কেননা ছেঁড়াদ্বীপে যেতে হবে ভাটার সময়ই, নইলে ভেসে ওঠা প্রবালগুলো দেখা যাবে না। দরদাম করে নিয়ে ¯িপডবোটে উঠবেন, সমুদ্রের বুকের ওপর দিয়ে ছুটিয়ে নেবে মাত্র ১০-১৫ মিনিটেই। ¯িপডবোট বা ট্রলার যা-ই হোক না কেন, পাথুরে ছেঁড়াদ্বীপের একেবারে ধার পর্যন্ত যাবে না ওটা। পাথরে আঘাত লেগে ক্ষতি হতে পারে। তাই আপনাকে নেমে যেতে হবে খানিকটা দূরেই। ভাটা স¤পূর্ণ হলে বাকি পথটুকু হাঁটু অবধি ডুবিয়ে হেঁটেই চলে যেতে পারবেন, নইলে এবার ¯িপডবোট থেকে লাফিয়ে ছোট নৌকায় উঠতে হবে। নৌকা নিয়ে যাবে দ্বীপ অবধি। সেটাই বেশি ভালো হবে, কারণ ডুবন্ত পাথর আর প্রবালে হাঁটা বেশ বিপজ্জনক, পা পিছলে যেতে পারে। ছেঁড়াদ্বীপে নেমেই এক অদ্ভুত অনুভূতি হবে আপনার। নির্জনতা আর নৈঃশব্দে মাখামাখি এর অভাবনীয় সৌন্দর্য। সুপেয় পানির অভাব এখানে জনবসতি গড়ে উঠতে দেয়নি।

কেয়া, নিশিন্দা, সাগরলতা, ছোট ছোট খাঁড়িতে আটকে পড়া রঙিন মাছ, শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া আর জীবিত ও মৃত প্রবালই এই দ্বীপের একমাত্র বাসিন্দা। এই নির্জন প্রকৃতি সচরাচর মেলে না। গোটা দ্বীপ ঘুরে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতে আধঘণ্টাও লাগবে না। সমুদ্রের কিনার ঘেঁষে ঘুরতে ঘুরতে দ্বীপের মধ্যবর্তী অংশে একবার ঢুঁ-মারতে ভুলবেন না যেন। এখানে কেয়াঝোপের আড়ালে রয়েছে শ্যাওলা সবুজ এক জলাশয়, লতাগুল্ম আর বুনোঝোপের মধ্যে যাকে বিদেশি ছবিতে দেখা কোনো গা ছমছম করা জংলা চোরাবালির মতো দেখতে। জোয়ার-ভাটার খেলায় আপনার চোখের সামনে ভেসে আর ডুবে যেতে দেখবেন প্রবাল আর পাথরগুলোকে। তবে পূর্ণ জোয়ার চলে আসার আগেই আপনার উচিত হবে আগের নিয়মে নৌকায় করে গিয়ে আবার ¯িপডবোটে উঠে পড়া। কেননা উত্তাল সাগরে নৌকা বা ¯িপডবোটে চড়ার অনভিজ্ঞতা আপনাকে রীতিমতো ভয় পাইয়ে দেবে, যখন বিশাল বিশাল ঢেউ ছুটে এসে গোটা ¯িপডবোটকে গিলে ফেলতে চাইবে বা উথাল-পাতাল করে দেবে। সেন্ট মার্টিন ও ছেঁড়াদ্বীপে যাওয়ার মৌসুম হচ্ছে নভেম্বর থেকে ফেব্র“য়ারি এই চার মাস। ঢাকা থেকে সরাসরি টেকনাফ পর্যন্ত বাস সার্ভিস আছে। যারা কক্সবাজারে থেমে যেতে চান, তাঁরা কক্সবাজার থেকেও বাসে বা রিজার্ভ মাইক্রোবাসে টেকনাফ যেতে পারেন। টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার জাহাজ কেয়ারী সিন্দাবাদ আর কুতুবদিয়া প্রতিদিন ছাড়ে সকাল ১০টায়, আবার সেন্ট মার্টিন থেকে বিকেল চারটায় রওনা দিয়ে টেকনাফে ফিরে আসে। পর্যটক হিসেবে আপনার উচিত হবে সেন্টমার্টিনে রাত্রিযাপন করা এবং পরদিন বিকেলের জাহাজে ফেরা। আর রাত্রিযাপন না করলেও সেন্ট মার্টিন থেকে ছেঁড়াদ্বীপ ¯িপডবোটে বা ট্রলারে করে ঘুরে আসতে সর্বমোট দেড়-দুই ঘণ্টার বেশি ব্যয় হবে না। সেন্ট মার্টিনে যেতে হলে আপনাকে অবশ্যই যা সঙ্গে নিতে হবে তা হলো একটি টর্চ, মোমবাতি, মশার ওষুধ ও সমুদ্রøানের উপযোগী কাপড়চোপড়।


সর্বশেষ সংবাদ