হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

Uncategorizedপ্রচ্ছদবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

নিরীহদের আঙুলের ছাপে অপরাধীর সিম! রেজিস্ট্রেশনের তথ্য গায়েব

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পরিচয় দিয়ে তাঁর মোবাইল ফোন নম্বরের মতো একই রকম নম্বর থেকে কল করা হয় ওই উপজেলার কয়েকজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে। ফোনে বলা হয়, ‘হ্যালো চেয়ারম্যান সাহেব, অতিরিক্ত সচিব স্যার ফোন দিয়েছিলেন।

আপনারা যে কাজের বরাদ্দ চেয়েছেন, সেটা হচ্ছে। তাড়াতাড়ি টাকা পাঠান। ’ এমন ফোন পেয়ে দ্রুত একটি বিকাশ নম্বরে কয়েক লাখ টাকা পাঠান ওই ইউপি চেয়ারম্যানরা। এরপর ইউএনওকে ফোন করে টাকা পাঠানোর সংবাদ দিতে গেলেই বাধে বিপত্তি। ইউএনও জানান, তিনি ফোন করে টাকা চাননি। ওই ঘটনায় স্থানীয় থানায় মামলা করে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে আসে মোবাইল ফোনে ‘কল স্মকি’ বা কল জালিয়াতি করে প্রতারণা করেছে একটি চক্র। সেই মামলার গভীর তদন্ত করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সিআইডি সূত্রে জানা যায়, মোবাইল ফোনে কল করে প্রতারণা, হুমকি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধে ভুয়া তথ্য দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা সিমকার্ড ব্যবহার করছে অপরাধীচক্র।

রংপুর বিভাগের আট জেলায় আছে একটি সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা সাধারণ সিমকার্ড ক্রেতাদের হাতের ছাপ ও তথ্য নিয়ে তাদের নামে অনেক সিম রেজিস্ট্রেশন করে ফেলেছে। এসব সিম ঢাকায় এনে অপরাধীচক্রের কাছে বিক্রি করছে সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা।

সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষ সহজ-সরল হওয়ায় সেখানেই আস্তানা গেড়েছে জালিয়াতচক্রটি। রংপুর থেকে ঢাকায় অবৈধ সিম সরবরাহকারী ওই চক্রে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান টেলিটকের এজেন্টসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এজেন্টরাও জড়িত। তারা সিমকার্ড ক্রেতাদের রেজিস্ট্রেশনের নামে অনেকবার আঙুলের ছাপ নিয়ে নেয়। এরপর তারা তথ্য ও ছবি জুড়ে দিয়ে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন করে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। এভাবে কয়েক হাজার সিম কালোবাজারে ছেড়েছে চক্রটি। গত সোম ও রবিবার রংপুর ও ঢাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন রংপুরের স্টেশন রোড এলাকার টেলিটকের কাস্টমার কেয়ার সেন্টারের সুপারভাইজার আহম্মদ জাহিদ আনোয়ার (৩০), রংপুর সিটি করপোরেশনের কম্পিউটার অপারেটর মাহমুদুল হাসান মামুন (৩০) এবং ঢাকার একটি মাদরাসার ছাত্র সাইদুল ইসলাম (২২)। জাহিদ আনোয়ারের কাছ থেকে ৬৫০টি, মামুনের কাছে ৫০০টি এবং সাইদুলের কাছ থেকে ৫০টি সিম জব্দ করে সিআইডির দল। এই এক হাজার ২০০ সিম ছিল টেলিটকের অপরাজিতা ও বর্ণমালা প্যাকেজের। রাজবাড়ী থানার মামলা ছাড়াও তিনজনের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় আরেকটি জালিয়াতির মামলা করেছে পুলিশ।

সিআইডির এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকায় লিয়াকত নামে এক ব্যক্তি ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের সিম বিক্রি করছিল। তাকে এসব সিম সরবরাহ করে জাহিদ আনোয়ার এবং আরেকটি বেসরকারি কম্পানির সিম রেজিস্ট্রেশন এজেন্ট। লিয়াকত এবং ওই এজেন্টকে খুঁজছি আমরা। মানুষের হাতের ছাপ নিয়ে এভাবে আরো কতিপয় এজেন্ট জালিয়াতি করেছে বলে তথ্য মিলছে। টেলিটকের মতো প্রতিষ্ঠানও তথ্য যাচাই না করে সিম রেজিস্ট্রেশন করছে। ’ ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘অপরাধে ব্যবহৃত পাঁচটি টেলিটক নম্বরের রেজিস্ট্রেশনের তথ্য চাওয়া হয় সোমবার। টেলিটক থেকে জানানো হয়, তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এমনকি এনআইডির তথ্যও নেই। এটি খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। ’

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত বিশেষ সুপার রাজীব ফারহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি মামলার তদন্তে গিয়ে ভয়ংকর সব তথ্য মিলেছে। এ বিষয়ে এখনো তদন্ত চলছে। সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদেরও আমরা ধরার চেষ্টা করছি। সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে যেন কেউ তাদের আঙুলের ছাপ বেশি না নিতে পারে। তথ্য ও ছবি চুরি করতে না পারে। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণত এসব সিম দিয়ে ছয় ধরনের অপরাধ হয়। এগুলো হলো কাউকে হুমকি দেওয়া, চাঁদাবাজি করা, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া আইডি খোলা, বিকাশের পারসোনাল অ্যাকাউন্ট খুলে প্রতারণা করা, ভুয়া পরিচয়ে ফোনে প্রতারণা করা এবং ভিওআইপিসহ অবৈধ কল সার্ভিস চালানো।

সিআইডি কর্মকর্তা রাজীব ফারহান আরো বলেন, ‘আমরা একটি নম্বর শনাক্ত করলাম, যে নম্বর থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে হুমকি দিয়েছে। তথ্য নিয়ে দেখা গেল, সে রংপুরের গ্রামের একজন ভিক্ষুক। চক্রটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের সঙ্গেই বেশি প্রতারণা করেছে। রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁওসহ কয়েকটি জেলায় সাধারণ মানুষ সিম কিনতে গেলে এই কাজ করে জালিয়াতচক্র। ঠিকমতো হয়নি বলে এবং ফ্রি সিম দেওয়ার কথা বলে আঙুলের ১০-২০টা ছাপ নেয় তারা। এরপর ওই মানুষটির নামে করা সিম ঢাকায় পাঠায়। ’

সিআইডি সূত্রে জানা যায়, টেলিটকের সুপারভাইজার জাহিদের বাড়ি রংপুর শহরের ধাম সরদার পাড়ায়। তিনি গত এক বছর ধরে সিম জালিয়াতি করলেও ছয়-সাত মাস বেশি মাত্রায় করেছেন। এ সময়ে তিনি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে কয়েক হাজার সিম ঢাকার মতিঝিলে লিয়াকত সিন্ডিকেটের কাছে পাঠিয়েছেন। একইভাবে আরেকটি বেসরকারি মোবাইল ফোন অপারেটরের এক এজেন্টও ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের সিম ঢাকায় পাঠিয়েছেন। সাইফুলসহ কয়েকজনকে দিয়ে লিয়াকত ও তাঁর সহযোগীরা এসব সিম অপরাধীদের কাছে বিক্রি করেছে। ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের জন্য জাহিদ ও তাঁর সহযোগীরা ২০০-৩০০ টাকা অতিরিক্ত পান। অপরাধীদের কাছে প্রতিটি সিম দুই হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়।

সূত্র মতে, পলাতক লিয়াকত জালিয়াতির মামলায় আগে একবার গ্রেপ্তার হয়ে এক বছর কারাভোগ করেছিলেন। ছয় মাস আগে জামিনে ছাড়া পেয়ে তিনি আবার ভুয়া রেজিস্ট্রেশনের সিম বিক্রি শুরু করেন। ঢাকা ও উত্তরাঞ্চল মিলে এই সিন্ডিকেটে আরো অনেকে জড়িত।

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.