টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

হেফাজতে ইসলামের ৫০ সদস্যসহ ১৫০ হত্যা, তদন্তে নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের আহ্বান

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : রবিবার, ৪ আগস্ট, ২০১৩
  • ১২৪ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

মানবজমিন ডেস্ক: রাজপথের বিক্ষোভে বাংলাদেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে। এভাবে শক্তি প্রয়োগ করে তারা ফেব্রুয়ারি থেকে কমপক্ষে ১৫০ জনকে হত্যা করেছে। গত ৫ ও ৬ই মে ঢাকায় হত্যা করা হয়েছে হেফাজতে ইসলামের কমপক্ষে ৫০ সদস্যকে। এতে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০০০ মানুষ। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ যাতে অবিলম্বে বন্ধ করে তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। গতকাল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এসব কথা বলেছে। তারা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আরও আহ্বান জানিয়ে বলেছে, শিশু সহ কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী হত্যা তদন্তের জন্য একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করতে হবে। আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে যে-ই দায়ী থাকুক তার বিচার করতে হবে। জাতিসংঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিউরদের বাংলাদেশে এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তথ্য-তালাশের জন্য অনুমতি দেয়া উচিত বাংলাদেশের। এতে সুপারিশে বলা হয়, অবিলম্বে সংবাদমাধ্যমের উপর আরোপিত সমস্ত বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে, যার মধ্যে বিরোধী-সমর্থক বলে ধারণাকৃত গণমাধ্যমগুলির আরোপিত বিধিনিষেধগুলি অর্ন্তভুক্ত রয়েছে। ব্লগার ও সংবাদমাধ্যমের সদস্যদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগগুলি পর্যালোচনা ও প্রত্যাহার করে নিতে হবে। আর্ন্তজাতিক কনভেনশন এগেইনস্ট এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স (বলপ্রয়োগকৃত নিখোঁজের বিরুদ্ধে কনভেনশন) এবং কনভেনশন এগেইনেস্ট টর্চার (নির্যাতনের বিরুদ্ধে কনভেনশন)-এর অপশনাল প্রোটোকলে স্বাক্ষর করা ও তা প্রয়োগ করা এবং তাদের শর্তাবলী পূরণের জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় আইন ও অন্যান্য পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করতে হবে।
এ রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, নির্যাতনের শিকার ও তাদের পরিবারের সদস্য, প্রত্যক্ষদর্শী, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও আইনজীবীদের ৯৫ জনের সাক্ষাৎকার ভিত্তিক ৪৮ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা। এর শিরোনাম ‘ব্লাড অন দ্য স্ট্রিটস: দ্য ইউজ অব এক্সেসিভ ফোর্স ডিউরিং বাংলাদেশ প্রোটেস্টস’। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গতকাল তাদের নিজস্ব ওয়েবপেজে ‘বাংলাদেশ: সিকিউরিটি ফোর্সেস কিল প্রোটেস্টারস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে। এতে বলা হয়, এ বছরের ফেব্রুয়ারি দেড় শতাধিক বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হলেও বাংলাদেশ সরকার এর জন্য দায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর কোন সদস্যকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কোন অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে এমনটা দেখা যাচ্ছে না। পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনী র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ (বিজিবি)র সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রকাশ্যে গুলি অথবা তাদেরকে আইনবহির্ভূতভাবে প্রহার করেছে। এ বিষয়ে প্রতিটি ঘটনা ডকুমেন্ট হিসেবে উত্থাপন করা হয়েছে ‘ব্লাড অন দ্য স্ট্রিটস: দ্য ইউজ অব এক্সেসিভ ফোর্স ডিউরিং বাংলাদেশ প্রোটেস্টস’ রিপোর্টটিতে। কোন কোন ক্ষেত্রে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এ রিপোর্টে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নিরাপত্তা রক্ষাকারী ও পুলিশ অফিসার হত্যার কমপক্ষে এক ডজন ঘটনা প্রামাণ্য হিসেবে তুলে ধরেছে। তুলে ধরা হয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের তিন সদস্য হত্যার ঘটনাও। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বলেন, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন ও যুদ্ধাপরাধ মামলার আরও রায় সামনে। এতে রাজপথের বিক্ষোভ আরও জোরালো হতে পারে। সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। এ সময়ে বাংলাদেশ সরকর যদি নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের লাগাম টেনে না ধরে তাহলে এ বছর শেষ হওয়ার আগেই রাজপথে আরও অনেক বেশি রক্তপাত হতে পারে। এখন বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের অবিলম্বে প্রশিক্ষণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া বাংলাদেশ সরকারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত জামায়াতে ইসলামীর ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দেন। এ নিয়ে জামায়াত হরতাল আহ্বান করে, সহিংসতায় লিপ্ত হয়, প্রতিবাদ বিক্ষোভ করে। এ সময় নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা হত্যা করে কয়েক ডজন মানুষকে। আহত হন কয়েক শত বিক্ষোভকারী ও পথচারী। ৫ ও ৬ই মে ঘটে আরেক রক্তপাত। হেফাজতে ইসলামের ব্যাপক বিক্ষোভের জবাবে ঢাকায় সহিংসতা হয়। লক্ষাধিক বিক্ষোভকারীর মুখোমুখি হয় নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কিছু পুলিশ সদস্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের চেষ্টা করেন। কিন্তু অন্যরা আইনবহির্ভূতভাবে শক্তি প্রয়োগ করে। এতে কমপক্ষে ৫০ জন নিহত হন। এ বিষয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কথা বলেছে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে। তারা বলেছেন, তারা দেখেছেন কিভাবে পুলিশ প্রহার করেছে। খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, প্রত্যক্ষদর্শী ও নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে যারা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখানোর জন্য নিরাপত্তা বাহিনী মিথ্যা অভিযোগ এনেছে। বিক্ষোভের পর পুলিশ অজ্ঞাত হাজার হাজার মানুষের বিরুদ্ধে এফআরআই করেছে। বিক্ষোভকারীরা যে এলাকায় বসবাস করে পুলিশ সেখানে গিয়েছে। সেখানে জামায়াতের সমর্থক আছে এমন ব্যক্তিদের খেয়ালখুশি মতো গ্রেপ্তার করেছে। এতে ওই এলাকার মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে আত্মগোপনে যান।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও বলেছে, বিক্ষোভের নিরপেক্ষ খবরের জন্য মিডিয়া সংকুচিত করা হয়েছে। সুশীল সমাজ চুপ থেকেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থন ইসলামিক টিভি ও দিগন্ত টিভি সরকার বন্ধ করে দিয়েছে ৫ ও ৬ই মে। এর পর থেকে তা বন্ধই আছে। ওই টেলিভিশন দুটি শাপলা চত্বরের বিক্ষোভের চিত্র সরাসরি সমপ্রচার করছিল। একই সঙ্গে সরকার বন্ধ করে দিয়েছে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা। জেলে পাঠিয়েছে এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও অন্য সাংবাদিকদের। জেলে পাঠিয়েছে ৪ ব্লগারকে। ব্রাড অ্যাডামস বলেন, সরকার দাবি কারে তারা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক। কিন্তু তারা সমালোচকদের কণ্ঠকে রোধ করার মাধ্যমে সেই দাবিকে তুচ্ছ করে দিয়েছে। সহিংসতাকে উসকে দেয় এমন বিষয়ে সরকার অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে পারে। কিন্তু তাই বলে বিরোধী মিডিয়াকে বন্ধ করে দিতে পারে না। তাই হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের শক্তি ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কিত জাতিসংঘের মূলনীতি অনুসরণ করতে প্রকাশ্যে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি নির্দেশ দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলামের মতো স্বতন্ত্র সংগঠনের উচিত তাদের সমর্থকদের অন্যায় হামলা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেয়া। তাদেরকে বিরত থাকতে হবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য অথবা বিভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসীদের ওপর হামলা বন্ধ করা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যেসব ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছে তাদের কয়েকজনের বক্তব্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হয় এ প্রতিবেদনে। ৬ই মে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা অপারেশন চালানোর সময় পুলিশ গুলি করে ১৩ বছর বয়সী এক বালককে। তার পুরো নাম প্রকাশ করা হয়নি। তবে ইংরেজিতে তার নামের আদ্যক্ষর হলো- এ. আর। সে বলেছে, দু’পুলিশ আমার ডানহাত আঁকড়ে ধরে। দু’জন ধরে বাম হাত। পঞ্চম জন আমার দিকে বন্দুক তাক করে ধরে। আমি কাঁদতে শুরু করি। কিন্তু কিছু বলতে পারিনি। তারা আমাকে নড়াচড়া না করার নির্দেশ দিল। আমাকে গুলি করার সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করলাম। সে আমার বুক টার্গেট করেছিল। কিন্তু ৬টি রাবার বুলেট আমার মুখে বিদ্ধ হয়। আমি মড়ার মতো পড়ে থাকি। তারা আমাকে মৃত ভেবে লাশের ভিতর ফেলে যায়। যখন আমি দেখি র‌্যাব আসছে। তাদের কাছে সাহায্য চাই। একজন আমাকে পানি দেন এবং আমাকে চলে যেতে বলেন। কক্সবাজারে পুলিশ হত্যা করেছে এক দোকান মালিকের ভাইপোকে। ওই দোকানির পুরো নামের ইংরেজি সংক্ষিপ্ত রূপ হলো- এন. ইউ। তিনি বলেছেন, বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। লোকজন দৌড়াদৌড়ি করছিল। সাজাত পুলিশের ভিতর দিয়ে দৌড়াচ্ছিল। ভয়ার্ত সাজাত দৌড়ে একটি বাসার সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছিল। তার পিছনে ছিল একজন বা দু’জন মানুষ। কিন্তু এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে অনুসরণ করছিল। তিনি একটি রাইফেল বহন করছিলেন। বাকিরা ছিল সিঁড়ির নিচে। আমি শুনতে পাই গুলির শব্দ। দেখতে পাই অন্য যেসব লোক সাজাদকে অনুসরণ করছিল তারা সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। আমি তখনও জানি না আমার ভাইপোকে গুলি করেছে কিনা। সবাই যখন চলে যায় আমি সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠি। আমার ভাইপোকে দেখতে পাই কপালের বাম দিকে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে। রক্তে সয়লাব। তার কপালের বাম দিকের অংশ উড়ে গেছে। ওদিকে আরেক রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে নিহত সাইদের কাহিনী। এর পর তার দাদা নাজিউদ্দিনকে ওই হত্যায় অভিযুক্ত করে।
নাজিউদ্দিনের কাহিনী
সাইদ (১২) নামে এক নাতিকে হত্যার দায়ে পুলিশ অভিযুক্ত করেছে ৫০ বছর বয়সী কৃষক নাজিউদ্দিনকে। তারপর থেকে তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রতি রাতে স্থান পরিবর্তন করেন। নাজিউদ্দিন বলেন, এক জমায়েতে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা গুলি করে হত্যা করে তার নাতিকে। তখন সে দাঁড়িয়েছিল মাদরাসার বাইরে। দেখছিল রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেম একটি বিক্ষোভ র‌্যালি। সাইদ নাজিউদ্দিনের মতো তা দেখছিল। এক পর্যায়ে ওই বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে। এ সময় পুলিশ সরাসরি গুলি ছোড়ে। এতে সাইদ নিহত হয়। সাইদের পিতা এতটাই ভেঙে পড়েছেন যে, তিনি এ নিয়ে কথা বলতে চান না। কিন্তু নাজিউদ্দিন কক্সবাজার থেকে ঢাকায় আসেন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিতে।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT