হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

প্রচ্ছদস্বাস্থ্য

হাসপাতালের বিল যেন মুক্তিপণ: লাশ আটকানো যাবে না : হাইকোর্ট

টেকনাফ নিউজ ডেস্ক::টাকার অভাবে লাশ আটকে রাখার অভিযোগ নিয়ে কিছুদিন আগে মহাখালীর দুটি হাসপাতালে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। মোহাম্মদপুরের আরেক হাসপাতালে বিল দিতে দেরি করায় জীবিত শিশুর পরিবর্তে মৃত শিশু দেওয়ার অভিযোগ নিয়েও হয় থানা-পুলিশ।

মাঝেমধ্যেই এমন অভিযোগের আঙুল ওঠে বিভিন্ন চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের দিকে। প্রশ্ন ওঠে প্রাইভেট হাসপাতালের সেবার ধরন নিয়ে। ভুক্তভোগী অনেক রোগী বা স্বজনের কাছেই এখন ‘হাসপাতাল বিল’ রীতিমতো ‘মুক্তিপণ’ হিসেবে বিবেচিত। এমন এক সময়ে গতকাল সোমবার উচ্চ আদালত থেকে রায় দেওয়া হয়েছে—চিকিৎসা খরচ পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ মৃত ব্যক্তির লাশ জিম্মি করে রাখতে পারবে না।

বিশেষজ্ঞরা জানান, ‘কমিশন বাণিজ্য’ ও মানবিকতার বদলে মুনাফামুখী নীতির কারণেই এ ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটছে। এর আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণামূলক প্রতিবেদনে ডাক্তারদের ক্ষেত্রে এ কমিশনের হার ৩০-৫০ শতাংশ এবং দালালদের ক্ষেত্রে কমিশন ১০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী এক রোগীর স্বজন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার এক রোগী মারা যাওয়ার পর চাহিদা অনুসারে টাকা দিতে না পারায় প্রায় ১৫ ঘণ্টা একটি হাসপাতালে লাশ আটকে রাখা হয়। এ নিয়ে অনুনয়-বিনয় করতে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাকেও উল্টো আটকে রাখে ও নাজেহাল করে। পরে আংশিক টাকা ও মুচলেকা দিয়ে সেখান থেকে আমাদের ছাড়া পেতে হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের অভিমত—প্রাইভেটে হাসপাতালে রোগী টানতে আধুনিক সব পদ্ধতি প্রয়োগ করে প্রচার-প্রচারণা চলে প্রকাশ্যে। আর আড়ালে চলে দালালের তৎপরতা। বাইরে দালাল, ভেতরেও দালাল! সঙ্গে থাকে এক শ্রেণির অসাধু চিকিৎসক ও কর্মচারীদের যোগসূত্র। ছোট থেকে বড় সব প্রাইভেট হাসপাতালেই রোগীদের টেনে নেওয়া হয় নানা প্রচারণায় প্রলুব্ধ করে, ফুসলিয়ে কিংবা দালালের জালে ফেলে। পরে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ডাক্তারের ভিজিটিং ফিসহ নানা খাতে বিলে ভারী হতে থাকে কাগজ। শোধ করতে না পারলে ঘটে জিম্মি করার ঘটনা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাইভেট হাসপাতালে বিশেষ করে রোগী মারা গেলে বকেয়া বিল পরিশোধ নিয়ে অনেক সময়ই ঝামেলা বাধে। বিষয়টি অবশ্যই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অনেক দেশেই স্বাস্থ্যবীমা কার্যকর  একটি উপায়। আমাদের এখানে এখনো এ পদ্ধতিটি কার্যকর হয়নি। তবে এসব সমস্যা সমাধানে এখন বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নতুন নতুন আইনেরও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ’

আদালত সূত্র জানায়, গতকাল উচ্চ আদালতের রায়ে এ জাতীয় ঘটনায় চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধে একটি তহবিল গঠন করতে স্বাস্থ্যসচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি মো. আতাউর রহমান খানের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল সোমবার এ রায় দেন। এ বিষয়ে পাঁচ বছর আগে জারি করা রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেন আদালত।

রায়ে রাজধানীর সিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের ফান্ডে পাঁচ হাজার টাকা জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এক নবজাতকের লাশ হস্তান্তর না করায় মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অমানবিক আচরণ করার দায়ে অনুদান হিসেবে এ টাকা দিতে বলা হয়েছে।

জনস্বার্থে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) করা এক রিট আবেদনে এ রায় দেওয়া হয়। আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার। সিটি হাসপাতালের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট নাবিল আহসান।

রায়ের পর অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মাঝেমধ্যেই গণমাধ্যমে সংবাদ দেখি— টাকা পরিশোধ করতে না পারায় হাসপাতাল বা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ মৃত ব্যক্তির লাশ আটকিয়ে রাখছে। এ ঘটনা দুঃখজনক। তাই মানবিক এ বিষয়ে আদালতের এ রায় ঐতিহাসিক।

এ রায়ের পর হাসপাতালে বিল পরিশোধ না করার প্রবণতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না প্রশ্নের জবাবে এ আইনজীবী বলেন, ‘আমাদের দেশে একজন মুসলমান মারা গেলে তার জানাজায় বলা হয়ে থাকে যেকোনো দেনা থাকলে তা পরিবারের লোক পরিশোধ করবে। আর যদি সামর্থ্য না থাকে তাহলে ক্ষমা চাওয়া হয়। তাই টাকা পরিশোধ না করেই লাশ নেওয়ার ঘটনা ঘটবে বলে মনে করি না। আর যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বিল পরিশোধ না করে মৃত ব্যক্তির লাশ ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে। ’

আদালত সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ৮ জুন মোহাম্মদপুর সিটি হাসপাতালে গাজীপুরের কাপাসিয়া থানার ডিগদা গ্রামের সাইফুল ইসলাম ও রোকেয়া বেগম তাঁদের নবজাতককে ভর্তি করান এবং চিকিৎসার জন্য ১৫ হাজার টাকা জমা দেন। কিন্তু চিকিৎসাধীন সন্তানটি মারা গেলে আরো ২৬ হাজার টাকা বিল বকেয়া দাবি করে লাশ হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। পরে নবজাতকের লাশ তার মা-বাবার কাছে হস্তান্তর না করে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামকে দিয়ে কবর দেওয়া হয়। এ নিয়ে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় এবং এইচআরপিবি এ নিয়ে রিট আবেদন করে। রিট আবেদনে হাইকোর্ট ওই বছরের ১৫ জুন এক আদেশে সিটি হাসপাতালের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং মোহাম্মদপুর থানার ওসিকে তলব করেন ও রুল জারি করেন। এ রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে গতকাল রায় দিলেন আদালত।

এমন ঘটনা নিয়ে জাতীয় সংসদেও আলোচনা ওঠে। চলতি দশম জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের ১১তম কার্যদিবসে লাশ আটকে রাখার ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নোটিশ দেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও চিকিৎসক মো. রুস্তম আলী ফরাজী। তিনি নোটিশে বলেন, এ ধরনের ঘটনায় জাতি হিসেবে আমাদের মাথা নিচু হয়ে যাচ্ছে। এর দায় সরকার এড়াতে পারে না, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কোনো দায় নয়, এটা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। নোটিশে ওই সংসদ সদস্য মনে করিয়ে দেন, সংবিধানের ১৫(ক) ধারা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবার যাবতীয় উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। অথচ বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে জনগণের প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। এক শ্রেণির মুনাফালোভী চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা সরকারি ও জনগণের পকেটের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কোথাও কোথাও গরিবের রক্ত চুষে নিচ্ছে। জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজী আরো বলেন, চিকিৎসা এখন আর সেবা নয়, পণ্য ও বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে।

জানতে চাইলে রাজধানীর ধানমণ্ডির বাংলাদেশ ইএনটি হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিটি প্রাইভেট হাসপাতালেই প্রতিদিন বহু রোগীকে বিলের ওপর বিভিন্ন অঙ্কের ছাড় দিতে হয়। এই ছাড়ে আপত্তি করলেও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে বিপত্তি দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যেমন যতটা সম্ভব মানবিক আচরণ করা উচিত, তেমনি রোগীদেরও সচেতন হতে হবে—অর্থনৈতিক সাধ্য অনুসারে হাসপাতাল বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে।

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.