টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

হালকা শাস্তি – বেপরোয়া ভাব পুলিশ বলে – সাতখুন মাফ

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২ নভেম্বর, ২০১২
  • ১৬৯ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
  • সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন দারোয়ান হুমায়ুন কবির ওরফে এনামুলকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় মোবাইল ফোন জব্দ করেন গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ সোলাইমান। পরে র‌্যাব ফোনটি উদ্ধার করে ওই কর্মকর্তার ভাইয়ের হেফাজত থেকে। জানা যায়, গুরুত্বপূর্ণ এই আলামতটি জব্দ তালিকায় না তুলে চুরি করেছেন তিনি। এ অভিযোগের মুখে ওই কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে পার্বত্যাঞ্চলে। সাধারণ মানুষ কেউ চুরি করে ধরা পড়লে নূ্যনতম কয়েক বছর জেল খাটতে হয়। অথচ যে পুলিশের কাছে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব সে চুরি করলে সাজা শুধু বদলি। এভাবে অপরাধী পুলিশ সদস্যরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিভাগীয় শাস্তিতে পার পেয়ে যাচ্ছে বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ফৌজদারি আইনের অপরাধেও সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে রেহাই মিলে যায় অপরাধী পুলিশের। কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সংখ্যা নিতান্তই কম। আর সে কারণে হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে তারা অবলীলায় লিপ্ত হচ্ছে। গত তিন বছরে প্রায় ৪২ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সে ক্ষেত্রে মোট দেড় লাখ পুলিশের এক-তৃতীয়াংশ সদস্যই ‘শাস্তিপ্রাপ্ত’। তাই বলে কমেনি পুলিশের অপরাধপ্রবণতা।

অপরাধ ও আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আমলযোগ্য অপরাধ করলে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত। সাধারণের শাস্তির চেয়ে তাদেরটা কঠিন হতে হবে। লঘুদণ্ডে পার পেয়ে গেলে পুলিশ সদস্যরা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুলিশ ও র‌্যাব একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। তবে ব্যক্তিস্বার্থে কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়লে এর দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না। ব্যক্তির কারণে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করার সুযোগ নেই। যে সদস্যরা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে তাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। বিভাগীয় পর্যায়ে যতটুকু সম্ভব শাস্তির পর অনেককে ফৌজদারি আইনে থানায় সোপর্দ করার ঘটনা রয়েছে। এ ব্যাপারে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ এলেই
তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘পুলিশ সদস্যরা অবৈধ অস্ত্র, মাদকদ্রব্য নিয়ে ধরা পড়ছে। চেইন অব কমান্ড ভেঙে না গেলে বা ঊর্ধ্বতনরা জড়িত না থাকলে এসব ঘটনার শাস্তি হওয়ার কথা। কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। বেশির ভাগ ঘটনায়ই দোষী ব্যক্তির উপযুক্ত শাস্তি হয় না। এতে অন্যরাও অপরাধে উদ্বুদ্ধ হয়। আদালতেই অপরাধী পুলিশের উপযুক্ত বিচার সম্ভব। সেনা আদালতের মতো নিজস্ব বিচার বা কোনো স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজন নেই। পুলিশের বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ সাক্ষ্য দিতে চায় না। তাই সাক্ষ্য আইন কিছুটা পরিবর্তন করতে হবে। আসামিকেই তার পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপনের দায়িত্ব দিতে হবে।’
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘প্রচলিত আইনের ফাঁক গলে অপরাধী পুলিশ সদস্যদের বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার করা প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বের পুলিশ বিভাগে এ পদ্ধতি চালু আছে। পুলিশের আচরণ ও কর্মকাণ্ডকে বলা হয় ‘পুলিশ সংস্কৃতি’। এ সংস্কৃতি কেউ ভাঙলে তার আচরণ হয় ভয়াবহ। অন্য অপরাধীদের চেয়েও সে সমাজের জন্য অনিরাপদ। কারণ তার কাছে থাকে অস্ত্র ও প্রশাসনের শক্তি। তাই পুলিশ সংস্কৃতির শৃঙ্খলা ধরে রাখতে অপরাধী পুলিশ সদস্যের কঠোর বিচার নিশ্চিত হওয়া দরকার।”
র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘র‌্যাবের কোনো সদস্য অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি রয়েছে নিজস্ব বিধিমালায়। পাশাপাশি সামরিক ও বিশেষ আদালত বসিয়ে অপরাধী সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হয়। র‌্যাবের যে বিধিমালা রয়েছে সেখানে গুরুতর অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে। অন্য অপরাধে জড়িত সদস্যদের থানায় সোপর্দ করে ফৌজদারি মামলা দায়েরের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।’
পুলিশ আইনে শাস্তির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ শাস্তি চাকরি থেকে বরখাস্ত। অন্য শাস্তির মধ্যে রয়েছে_চাকরি থেকে অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান, পদমর্যাদা বা গ্রেডের সাময়িক বা স্থায়ী পদাবনতি, সাময়িক বা স্থায়ীভাবে পদোন্নতি বন্ধ করা, অনধিক এক বছরের জন্য জ্যেষ্ঠতা বাজেয়াপ্ত, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বেতন কর্তন, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বেতন বৃদ্ধি বন্ধ করা।
আইনে লঘুদণ্ডতে বলা হয়েছে_অনধিক এক মাসের বেতন ও ভাতা কর্তন, অনধিক এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা, অনধিক ৩০ দিনের জন্য কোয়ার্টার গার্ডে প্রেরণ, অনধিক ৩০ দিনের জন্য অতিরিক্ত ড্রিল, অতিরিক্ত গার্ড শ্রম বা অন্যান্য দায়িত্ব পুলিশ লাইনে আটক রাখা।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধে পুলিশের সংশ্লিষ্টতা কমিয়ে আনতে নামকাওয়াস্তে শাস্তি দিলে হবে না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে বেশির ভাগ পুলিশ সদস্য বেপরোয়া আচরণ করে থাকে। তাদের কাছে জানা থাকে কোন ঘটনা কিভাবে সামাল দিতে হবে। অপরাধ করলেও কিভাবে পার পাওয়া যাবে। সাময়িক বরখাস্ত, প্রত্যাহারসহ নানা রকমের বিভাগীয় শাস্তি পুলিশের আচরণ ও কর্মকাণ্ড শুধরাতে কোনো ভূমিকা রাখছে না।
গত ২৯ মে ঢাকার মুখ্য মহানগর আদালত চত্বরে এক নারীর শ্লীলতাহানি এবং কয়েকজন সাংবাদিক ও আইনজীবীকে মারধর করে পুলিশ। ওই ঘটনায় হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত রুল জারির মাধ্যমে কোতোয়ালি থানার ওসি সালাউদ্দিন আহমেদসহ আট পুলিশ কর্মকর্তাকে আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেন। ওই সময় ওসি সালাউদ্দিনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও বর্তমানে তিনি মিরপুর থানার ওসি। এ ঘটনার তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অসদাচরণের অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে তাঁকে শাস্তি দেওয়া যায়নি।
গত ২২ এপ্রিল খুলনা সদর থানায় ছাত্রদলের এক কর্মীকে ঝুলিয়ে ও আরেকজনকে চোখ বেঁধে নির্যাতন করা হয়। এ ঘটনায় ওসিসহ চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়। হত্যা চেষ্টার মতো গুরুতর এ অপরাধেও কাউকে গুরুদণ্ড দেওয়া হয়নি।
গত ১ অক্টোবর কথিত অভিযানের নামে পুরান ঢাকার জামান মেডিসিন মার্কেটে ওষুধ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে ছয় সদস্যের গোয়েন্দা পুলিশ টিম গণপিটুনির শিকার হয়। ওই ঘটনায় তদন্তের পর অপরাধের প্রমাণ পেয়ে গোয়েন্দা পুলিশের ইন্সপেক্টর ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। একই ঘটনায় উপস্থিত ছিলেন ইন্সপেক্টর আশরাফুজ্জামান, কনস্টেবল তোফাজ্জেলসহ ছয়জন। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে নূ্যনতম শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর এ পর্যন্ত সারা দেশে পুলিশ ও র‌্যাবের প্রায় ৪২ হাজার সদস্যকে বিভিন্ন ঘটনায় শাস্তি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে লঘুদণ্ডের সংখ্যাই বেশি। দণ্ডপ্রাপ্ত পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যদের মধ্যে অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি), মেজর, ক্যাপ্টেন, ইন্সপেক্টর, সাবইন্সপেক্টর, সার্জেন্ট, পিএসআই, হাবিলদার, নায়েক ও কনস্টেবলসহ অন্য সদস্যরা রয়েছেন।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে পুলিশ বাহিনীতে বর্তমানে এক লাখ ৪১ হাজার সদস্য রয়েছেন। মোট সদস্য সংখ্যার অনুপাতে এত বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের শাস্তি পাওয়া থেকে এটি স্পষ্ট যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী এই বাহিনীটির ভেতরে বড় গলদ রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুলিশ বাহিনীর কেউ অপরাধ করলে তাকে পুলিশের ডিসিপ্লিন বিভাগের মাধ্যমে ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন ও ১৯৪৩ সালের পিআরবি আইনে ‘গুরুদণ্ড ও লঘুদণ্ড’ দেওয়া হয়। ২০০৭ সাল থেকে পুলিশের দুর্নীতি ও অপরাধ কর্মকাণ্ড ঠেকাতে ক্রিমিনাল ইন্টেলিজেন্স ওভারসাইট (সিআইও) টিমকে মাঠে নামানো হয়েছে।
সূত্র মতে, বিভিন্ন অপরাধের দায়ে গত তিন বছরে প্রায় ৪২ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একই সময়ে র‌্যাবের ৬০৩ জনকে বিভিন্ন সাজা দেওয়া হয়। এ ছাড়া গত তিন বছরে পুলিশ সদর দপ্তরের সিকিউরিটি সেলে ৫৩ হাজার ৪২২টি অভিযোগ জমা পড়েছে।
অন্যদিকে র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত চার হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৭৮ জন র‌্যাব সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ৭৬ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। র‌্যাব ও পুলিশের বিরুদ্ধে আদালতে প্রায় দুই হাজারটি চাঁদাবাজি ও হয়রানির মামলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, গত ১০ মাসে সারা দেশে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রায় ৩১ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগের অধিকাংশের তদন্ত শেষ হয়েছে। তাতে প্রায় ১৫ হাজার পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালে প্রায় ১৪ হাজার পুলিশ সদস্য ও কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। যার ১৩ হাজার সদস্যই পেয়েছে লঘুদণ্ড। গুরুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৬১২ জনকে। গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশের ৯০ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে ৩৭ জনকে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসিপ্লিন বিভাগের একটি সূত্র জানায়, এ বিভাগের কাজ শুধু দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যদের ওপর নজরদারি করা। গত তিন বছরে ডিএমপির বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যকে বিভাগীয় শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT