হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

টেকনাফপ্রচ্ছদ

স্মৃতিচারণ,  যুদ্ধকালীন টেকনাফের শামলাপুর

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাত্রী পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের উপর নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করলে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে বাংলাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় টেকনাফের শামলাপুর গ্রামে রেডিওর মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধের সংবাদ প্রাপ্ত হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ায় গ্রামে সকলের মাঝে আতংক শুরু হয়েছে। একদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি অপর দিকে রাজাকার ঠেকাও। এভাবে কিছু দিন চলে যায়।
শামলাপুর গ্রামের হাজি সিরাজুল হকসহ গ্রামের স্বাধীনতার সপক্ষের লোকজন রেডিওতে শুনে মুক্তিযোদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। শামলাপুর বাজারের পশ্চিম পাশের মাঠে মুক্তিযুদ্ধে নতুন অংশগ্রহণকারীদের জন্য ট্রেনিং প্রদানের ব্যবস্থা করেন। শামলাপুর গ্রামটি বাংলাদেশের সর্বশেষ ও প্রত্যন্ত অঞ্চল হিসেবে স্বাধীনতা পক্ষের লোকজনের দাপটে রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকেরা গ্রামের কোন হত্যাযজ্ঞ, লুটতরাজ বা আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটাতে সাহস করেনি যুদ্ধের প্রথম দিকে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সপক্ষের শক্তির সাথে রাজাকারেরা হত্যাযজ্ঞ লুটতরাজ বা আগুন লাগানোর মত ঘটনা করতে না পারায় তারা পাকিস্থানী মিলিটারীর সহযোগিতা নেন। এলাকার শান্তি কমিটি ও বাহারছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মৌলভি সুলতানের নেতৃতে দীর্ঘ ৬ মাস পর ১৯৭১ সালে ২৮ আগষ্টের তিনদিন পূর্বে রাতের বেলা বাজারের বাইরে রাজাকার ও মুসলিমলীগদের সদস্যদের নিয়ে মিটিং করে মুক্তি যুদ্ধের সপক্ষের সকলকে দাম্ভিকতার সহিত জানিয়ে দেয় পাকিস্থানের পক্ষে যারা কাজ করবে না তাদের বাড়িঘর আগুনে পুড়ে শেষ করে দেবে। হাজি সিরজুল হককে এবং অন্য কয়েকজনকে নির্দিষ্ট করে জানিয়ে দেয় তাঁর ঘরও জালিয়ে দেবে। এ সংবাদ তিনি জানার পর তাঁর ঘরের সামান্য মালামাল প্রতিবেশীর ঘরে এবং অনেকগুলো মালামাল বাজারের দোকানে নিয়ে হেফাজত করে রাখেন। বাড়িতে আগুন দিলে হয়তো দোকানে আগুন না দিতে পারে এ চিন্তা করে। তৎপরবর্তীতে স্থানীয় লোকদের নিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের লোকদের সাথে রাজাকার প্রতিরোধ দল গঠন করে গ্রাম পাহারা দেয়া শুরু হয়।
১৯৭১ সালের ২৮ আগষ্ট স্থানীয় রাজাকার মকবুল আহমদ, ফজল আহমদ ওরফে বান্ডাইয়াসহ ৮০/৯০ জনের একটি দল হোয়াইক্যং এর দিকে থেকে এসে আমার বাবার বাড়ি ঘিরে রাখে সশস্ত্র অবস্থায়। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গাড়ি বহর টেকনাফ হয়ে সাগর পাড় দিয়ে বাজারে আসে। পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর গাড়ি বহর শামলাপুর গ্রামের শামলাপুর বাজারে দুপুর অনুমান ১০/১১ টার সময় আসে। তখন রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকজন আনন্দ করছিল। এ সময় হাজি সিরাজুল হক ও তার ভায়েরা শফিক খলিফাকে খোঁজেন। তাঁদেরকে না পেয়ে হাজি সিরাজুল হকের দোকানে আগুন লাগিয়ে দেয়। তখন দোকানে অনেক সম্পদ ছিল। বিশেষ করে লবন দেয়া ইলিশ মাছ, যেগুলো চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে যেত বিক্রি করার জন্য। অনুমান ১ ঘন্টা পর আমার বাবার বাড়িতে আসে। তাঁদেরকে না পেয়ে আমার বৃদ্ধ দাদাকে গুলি করার চেষ্টা করে। কিন্তু তিনি বয়োবৃদ্ধ দেখে গুলি না করে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। পাষন্ড হানাদার বাহিনী আমাদের ঘরের সমস্ত মালামাল পুড়ে না যাওয়া পর্যন্ত ঘরে উঠানে অবস্থান করে। বিকেলের দিকে ঘর ও দোকানের সমস্ত সম্পদ পুড়ে শেষ হলে আনন্দ করে শামলাপুর গ্রাম ত্যাগ করে।
একই দিনে বিকেলে হাজি সিরাজুল হকের বড় বোন মাইমুনা খাতুনের বাড়ি পুরান পাড়াতে আগুন দেয়। তারপর শফিক খলিফার বাড়ি পুরান পাড়ায় আগুন দেয়। সকলের সকল সম্পদ পুড়ে শেষ হলে স্থানীয় রাজাকারদের সমন্ময়ে সশস্ত্র অবস্থায় শামলাপুর প্রাইমারি স্কুলে ঘাঁটি করে। পাকিস্তানী বাহিনী হাজি সিরাজুল হকের দোকান ও দোকানের মালামাল, বাড়িঘর, আসবাবপত্র, ধান-চাল এবং অন্যান্য মালামালসহ সর্বমোট তৎকালীন মূল্য অনুমান ৭ লাখ টাকারও বেশি হবে সবকিছু পুড়ে ছাঁই করে দেয়। হানাদার বাহিনী রাজাকারদের সহযোগীতায় শামলাপুর প্রাইমারি স্কুলে অবস্থান নেয়। তখন তাঁর দোকানে আগুন দেয়ার পর তিনি বুঝতে পেরে আশ্রয় নেওয়ার জন্য প্রথমে মনখালী চাকমা পাড়া, পরদিন হোয়াইক্যং চাকমা পাড়া, তার পরদিন বার্মার শিলখালী গ্রামে যায়। ওখানে অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী (সাবেক এমপি) সাহেবের সাথে দেখা হয়। পরদিন কুয়ানচিবং যায়। ঐ গ্রামে শত শত স্বাধীনতাকামী বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ অবস্থান করেন। তিনিও ঐ পাড়ায় অন্যান্য বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আশ্রয় গ্রহণ করেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি কমান্ডার নজীর আহমদ চৌধুরী, বালুখালী কমান্ডার আবু বক্কর, বালুখালী, কমান্ডার মোজাম্মেল হোসেন, কক্সবাজার এবং ক্যাপ্টেন সোবহান ও আয়ুব বাঙ্গালীর নেতৃত্বে যুদ্ধ করেন।
স্বাধীন হওয়ার পূর্ব মূহুর্তে অন্যান্য সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ এলাকায় ফিরে গেলে তিনিও গ্রামে ফিরে আসেন। রাতে শামলাপুর গ্রামের বড় মসজিদে এশার নামাজ পড়তে গেলে রাজাকার ও তার দোসররা মসজিদে হতে তাকে ধরে নিয়ে স্কুলে হত্যা করার প্রস্তুতি নেয়। ইতিপূর্বে তার ছোট ভাই আজিজুল ইসলাম, মমতাজুল ইসলাম এবং মোজাহেরুল ইসলামসহ তাঁর স্ত্রী-পুত্র মেয়ে কেহ গ্রামের বাড়িতে থাকতে পারেননি। তাঁর স্ত্রী ছোট দুই ছেলে রফিক উললাহ্ ও সাইফ উল্লাহকে নিয়ে প্রথমে মনখালী গ্রামে তার মামা হাবিবুর রহমানের বাড়িতে সাত দিন থাকার পর রাজাকারেরা সে বাড়িতেও আগুন জালিয়ে দেবে বলে সংবাদ পাঠায়। তখন তাঁর স্ত্রী আমেনা খাতুন কোন উপায় না দেখে দেবর মোজাহেরুল ইসলমকে নিয়ে আরো ৭/৮ মাইল উত্তরে চুয়াংখালি গ্রামে দুর সর্ম্পকিত এক গরিব আত্মীয় মোঃ আমির উদ্দিনের বাড়িতে অবস্থান নেয়। রাজাকারেরা তাদের সে বাড়িও জালিয়ে দেয়ার সংবাদ তাদের কানে পৌঁছায়। এসময় আত্মীয়রা দা নিয়ে গাছের উপর উঠে মানুষেরা শুনে মত ঘোষণা করে এই গ্রামে আসলে কেটে ফেলব।
এভাবে অনেক কষ্টে সময় কাটতেছিল তার স্ত্রীর। খাবার ছিল না, হাতে টাকা ছিল না। অনেক দিন শুধু ফেলং এর ডাল ও ভাত খেয়ে থাকে। একদিন তাঁর স্ত্রী রান্না করার সময় চুলার পাশে তার বড় ছেলে রফিক লেংটা অবস্থায় মা’র এর সাথে দাড়িয়েছিল। এমন সময় হঠাৎ করে ডালের ডেকসিতে প্রশ্রাব করে দিয়েছিল তার বড় ছেলে রফিক। সে পেশাব করা ডালও তাদের খেতে হয়েছিল। আর কোন খাবার তাদের ঘরে ছিল না। যুদ্ধ শেষের দিকে হাজি সিরাজুল হক বাড়িতে এসেছে সংবাদ পেয়ে স্ত্রীও গ্রামে আসে। তখন রাজাকারদের হাতে তিনি আটক হওয়ার পর তার স্ত্রী দোচালা একটি কুড়ে ঘরে থাকা অবস্থায় রাতের রান্না করছিল। রাজাকার ফজল সে ঘরে এসে তার স্ত্রীকে গালি দেয় এবং চুলার উপর থাকা তরকারির ডেকসিটি লাটি দিয়ে গুতো দিয়ে ফেলে দেয়। রাজাকারেরা তাদের মহিষ, গরু, ছাগল সব খেয়ে ফেলে। তার একটি বড় রামছাগল ছিল। সে রামছাগলটি সবসময় বাজারে থাকত তার দোকানের সামনে ঘুমাত। রাজাকার নূরুল ইসলাম সর্বশেষ সে রামছাগলটিও খেয়ে ফেলে।
বিজয়ের মাসে যুদ্ধে দেশের বিজয় নিশ্চিত হওয়ার সংবাদ রেডিওতে প্রচার হলে রাজাকারেরা স্কুল থেকে পালিয়ে গেলে তার আত্মীয়-স্বজন তাকে স্কুল থেকে উদ্ধার করেন। তার ভাগিনা সাবেরুল ইসলামকে দিয়ে রাজাকার মকবুল আহমদ বিভিন্ন কাজ জোর করে রাইফেলের ভয় দেখিয়ে করাত ও অনেক কষ্ট দিত। তিনি বর্তমানে বেঁচে নেই। তার স্ত্রী ও ভাগিনা সাবেরুল ইসলামসহ অনেক প্রত্যক্ষদর্শী এখনো বেচেঁ আছেন। যুদ্ধ শেষ হলে রাজাকার মকবুল আহমদ মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারে লোকদের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে বান্দরবানে পালিয়ে যায়। সেও মারা গিয়েছে বান্দরবানে। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মৌলভী সুলতানকে মারা যাওয়ার পর এলাকার কবরস্থানে কবর দিতে দেয়নি। পাকিস্তানী বাহিনী ও স্থানীয় রাজাকারদের সেই বর্বরতায় আমাদের গ্রামের সবাই জানে ও দেখেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজি সিরাজুল হকের দোকান ও বাড়িঘর পুড়ে যাওয়ার সাহায্য হিসেবে দুই বান্ডিল ঢেউটিন ও ৪টি কম্বল সরকারের পক্ষ হতে প্রাপ্ত হন। তাদের পরিবারে ঈদুল আযহা, ঈদুল ফিতর বা অন্য সময় সকলে একত্রিত হলে এখনো সে বিভীষিকাময় গল্প একবার হলেও আলোচনা হয়।
২০১০ সালের ২৭ মে টেকনাফ থানায় জনাব হাজি সিরাজুল হক বাদী হয়ে রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-৪৬, তাং ২৭-০৫-২০১০। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন। ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ হাজি সিরাজুল হক মৃত্যুবরণ করেন। ৪ ফেব্রæয়ারী ২০১৭ বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে যাচাই-বাচাই কমিটিতে হাজি সিরাজুল হককে ২ নং ক্রমিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাচাই করেন এবং তার তালিকা ঢাকায় প্রেরণ করেন।

লেখক,
রফিক উল্লাহ, বর্তমানে ওসি।
মোবাইল-০১৮১৯৯৫৫৮৪৪।

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.