স্বাস্থ্য খাত আজ ‘বিশ্ব বেহায়া’র খপ্পরে

প্রকাশ: ১৪ জুলাই, ২০২০ ১০:৫৬ : অপরাহ্ণ

জ. ই. মামুন:: স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা বা ওই হাসপাতালকে বিশেষায়িত কোভিড হাসপাতাল ঘোষণার চুক্তির ব্যাপারে তিনি কিছুই জানতেন না। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালকের অনুরোধে মন্ত্রী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তার এই কথা হয়তো জিকেজির সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ মন্ত্রী সাধু, তিনি ‘স্যানিটাইজড’ তুলসি পাতা।

করোনাভাইরাসের করাল থাবা থেকে বাঁচতে বিশ্বের দেশে দেশে সরকারগুলো যে বহুমুখী তৎপরতা দেখাচ্ছে, সেখানে আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের, বিশেষত মন্ত্রীর যোগ্যতা কতখানি তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে আগেই। সবশেষ জিকেজি আর রিজেন্টের করোনা কেলেঙ্কারি দেশের মানুষের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অযোগ্য। ৯০-এ স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের আগে আগে পটুয়া কামরুল হাসান বিখ্যাত ছবি এঁকেছিলেন- দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে। ৩০ বছর পরে এসে দেখছি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আজ আরেক বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানেন না যে তার মন্ত্রণালয়ের ভেতরে তারই কর্মকর্তা কর্মচারীরা কত বড় বড় অপরাধ করছেন। এর দায় কে নেবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছাড়া? প্রতিদিন স্বাস্থ্য অধিদফতর যে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে অনলাইনে ব্রিফ করে, সেখানে যে তথ্য দেওয়া হয় সে তথ্য এখন খণ্ডিত, দূষিত এবং অসত্য। জিকেজি এবং রিজেন্টের ভুয়া তথ্য যুক্ত হয়ে শুধু দেশের করোনাভাইরাস ডাটাবেজকেই দূষিত করেনি, এই তথ্য-উপাত্ত যেহেতু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও ব্যবহার করে, তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকেও কলুষিত করেছে বাংলাদেশের করোনা কেলেঙ্কারির চিত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটিসহ বিশ্বের যেসব গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের তথ্য ব্যবহার করে করোনাভাইরাসের গতি প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করছে, তাদের হিসাবেও গোলমাল বাঁধিয়ে দেবে এসব তথ্য। প্রশ্ন হচ্ছে, এসবের দায় কি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নয়?
রিজেন্টের সাহেদের সঙ্গে কার কার ছবি আছে সেই বিষয় নিয়ে ক’দিন ধরেই উত্তাল ফেসবুক-টুইটার থেকে শুরু করে মূলধারার গণমাধ্যম। তাতে দেখা যাচ্ছে, দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি, সেনাবাহিনী প্রধান, পুলিশের আইজি, র‌্যাবের ডিজি থেকে শুরু করে সাংবাদিক, নায়ক নায়িকা কেউ বাদ নেই। আমার মনে হয় না সাহেদের সঙ্গে এসব ছবিতে কিছু প্রমাণিত হয়। বরং তিনি যে অতি ধুরন্ধর প্রকৃতির মানুষ, একজনের ছবি আরেকজনকে দেখিয়ে তিনি যে অপকর্ম করেছেন তা বোঝার জন্য রকেট সায়েন্স পড়তে হয় না। আর এই মোবাইল ফোন ক্যামেরার যুগে, সেলফির যুগে কারও সঙ্গেই টুস করে একদা সেলফি তুলে ফেলাও দুঃসাধ্য কোনও কাজ না। তাই সাহেদের সঙ্গে নানাজনের ছবি আমাকে যতটা না বিস্মিত করেছে তারচেয়ে অনেক বেশি বিস্মিত করেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই দায় এড়ানো এবং কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য।
আরও দু-একটি কথা বলা দরকার এই প্রসঙ্গে। সাহেদ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কোনও এক সাব-কমিটির নেতা। শোনা যায়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তিনি হাওয়া ভবনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে তার দুই নম্বরি কর্মকাণ্ড ধরা পড়ার পর কেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বা অন্য নেতারা এগুলো নিয়ে কথা বলেছেন? কাউকে দলে নেওয়ার সময় তার অতীত, ইতিহাস, চরিত্র দেখে নিলে তো পরে আর আপনাদের বিব্রত হতে হয় না বা হাইব্রিড-কাউয়া বলে দায় এড়ানোর দায় পড়ে না। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, আমার আশঙ্কা- এই সাহেদ বা জিকেজির আরিফ বা সাবরিনার মতো লোকদের নিয়ে এখন যতই মাতামাতি হোক, দুদিন পরে অন্য ইস্যু সামনে চলে এলে এবং মিডিয়ায় আলোচনা কমে গলে যথারীতি চাপা পড়ে যাবে রিজেন্ট বা জিকেজির দুর্নাম। যেমন আমরা ইতোমধ্যে ভুলে গেছি ক্যাসিনো কেলেঙ্কারি, সম্রাট বা জিকে শামীমদের কথা। তাই আগামী কোনও এক নির্বাচনে কয়েকশ’ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সাহেদ যদি কোনও জায়গা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসেন তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
অন্যদিকে দেখছি সাহেদের দুর্নীতি অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক।  এই প্রসঙ্গে আমার প্রশ্ন, যখন কোনও ব্যক্তির অপরাধ এবং দুর্নীতির খবর টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়, তার ব্যাপারে সাধারণ ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়, তারপরে টনক নড়ে দুদকের। কেন, আগেভাগে একটু খোঁজ-খবর করা যায় না? তাহলে তো মানুষের মধ্যে অন্তত এটুকু আস্থা জন্মায় যে দুদক নিজেরাও কিছু একটা করছে, শুধু টিভি নিউজ আর পত্রিকার পাতার দিকে তাকিয়ে না থেকে।
আবার আসি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রসঙ্গ, তার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক একের পর এক ভুয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করছেন, অযোগ্য অসৎ লোকদের করোনা টেস্ট করার অনুমতি দিচ্ছেন, তারা মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে মানুষকে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে- করোনা টেস্ট না করেই বলছে কারও নেগেটিভ, কারও পজিটিভ। একজন সত্যিকারের পজিটিভকে নেগেটিভ সার্টিফিকেট দিয়ে তাকে-সহ আরও অনেককে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে, আবার একজন সুস্থ মানুষকে করোনা পজিটিভ সার্টিফিকেট দিয়ে তাকে এবং তার পরিবারকে চরম আতঙ্ক এবং হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত করছে। এই অপরাধ কোনও অংশেই হত্যাকাণ্ডের চেয়ে কম নয়। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া ছাড়া পরিকল্পনাকারীরাও যেমন খুনের মামলার আসামি হন, তেমনি জিকেজি বা রিজেন্টের বিরুদ্ধে মামলায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং মহাপরিচালকও আসামি হওয়ার মতো অপরাধী।
আরও নাটকের জন্ম দিচ্ছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেছেন, চুক্তির আগ পর্যন্ত রিজেন্টের সাহেদকে তিনি চিনতেনই না। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই তিনি রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। ফলে স্পষ্টতই মুখোমুখি অবস্থানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য মহাপরিচালক। এই বাঘ-মহিষের লড়াইয়ে প্রাণ যাচ্ছে আমাদের মতো সাধারণ উলু খাগড়ার।
দেশের কিংবা বিশ্বের এই মহাদুর্যোগকালে আমরা দেশের মানুষ আমাদের সরকারের কাছ থেকে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে, স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার কাছ থেকে মানবিক এবং নৈতিক আচরণ আশা করেছিলাম। তারা মানুষের সেই আশা বহুলাংশে পূরণ করতে পারেননি। ব্যর্থ হয়েছেন এই খাতের নেতা স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তবে আমার ধারণা, তিনি যদি নিজের অজ্ঞতা, অপারগতা বা অযোগ্যতার কথা চেপে রেখে শুধু স্বাস্থ্যগত কারণেও মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন তাহলে তিনি আগামীর ইতিহাসে ইতিবাচক একটি জায়গা পেলেও পেতে পারেন। অন্যথায় এই অযোগ্যতা নিয়ে পদ আঁকড়ে ধরে থাকলে, সন্দেহ নেই, ইতিহাস তাকে আস্তাকুঁড়েই নিক্ষেপ করবে। তাই এখনও সময় আছে, নিজেকে প্রশ্ন করুন মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, ইতিহাসের কোথায় জায়গা চান?

লেখক: সাংবাদিক


সর্বশেষ সংবাদ