হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

সাহিত্য

স্বপ্নের ছদ্মাবরণে গ্লানির বিভীষিকা…

2013-12-18 13.00.40ফারুক আজিজ:::মা….ও-মা…মারে! কেন আমায় একা ফেলে চলে গেছো? মা! একটু কথা বলো না, শুধু একবার বলে দাও কার সাথে থাকবো! আমি কি আর স্কুলে যাবো না? মা…ও-মা… মারে..!

পৃথিবীটা আমার সাথে এতো বিরূপ আচরণ করেছে কেন? দোষটা কী ছিলো আমার? তোমরা সবাই আমায় ছেড়ে চলে যাও? আমি কি ভীষণ দুষ্টু! আমি আর দুষ্টুমি করবো না; মা…. প্লিজ.. একবার কথা বলো……

এ হলো এক নিঃস্ব এতিম অরুণের বেদনা নিংসৃত করুণ সুর। যার উপর থেকে পৃথিবী নামক দানব তুলে নিল মায়া নামক ছায়া। ভাষা হারিয়ে ফেলেছে অরুণ। আশাও নেই পথচলার, হতাশা যেন তার সারথী।

পদ্মার ওপাড়ের মানুষ ভাগ্যকে নিয়ে অনেক সংগ্রাম করে, করতে হয় আজীবন। কারণ তাদের মূল উপজীব্য হলো পদ্মানদী। বরষার পানিতে ইলিশের ভরপুরে তাদের ভাগ্যে উদিত হয় এক নবো চাঁদ, আবার চৈত্রের খরতাপে পদ্মা তাদের দিকে আর ফিরে তাকায় না- যেন তাদের ভাগ্য অস্তমিত হয়ে আসে।

মোটামুটি অর্ধ-সচ্ছলভাবে চলছিল তারেক মিয়ার সংসার; পদ্মার নদীতে নৌকা নিয়ে মাছ ধরা ছিল তার সংসারের মূল আয়ের উৎস। মানুষটির আয়ের উৎস স^ল্প হলেও তার মনের আয়তনটা ছিল বড় ব্যাপক। দুই মেয়ে, বড় মেয়ে তারিন নবম শ্রেণিতে স্থানীয় স্কুলের সেকেন্ড স্টুডেন্ট। আর ছোট মেয়ে ছিল আফরিন সপ্তম শ্রেণিতে এবং একটি ছেলে সদ্য ভূমিষ্ঠ।

দিন যায় রাত আসে। বরষার মৌসুমে ইলিশ মাছের ধুম পড়েছে । তারেক মিয়া সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুকে চুমু খেয়ে কাঁধে জাল নিয়ে ভাগ্যের মোহনা পদ্মার দিকে রওনা দিল। জহুরা বেগম উঠোনে বের হয়ে বলল, “ওগো! তাড়াতাড়ি চলে আসিও, আসার সময় পারলে কয়েকটা ইলিশ মাছ আনিও; প্রতিবেশীকে খাওয়াতে হবে, যেন আমাদের শিশুর ভবিষ্যৎ উজ্জল হয়।” কিন্তু এক ঝড়ো বাতাসে পদ্মার বুকে হারিয়ে গেল তারেক মিয়া। তার এ যাওয়া যে শেষ যাওয়া তা কি কেউ জানতো? তারেক মিয়া সন্তানের নামটাও রাখতে পারল না। নেমে এল পরিবারে এক অচেনা অভাব-অনটন। কী করবে জহুরা বেগম, নেই কোনো সহায় সম্বল। মেয়ে দুটোর পড়ালেখা! যে পদ্মা তাদের ভাগ্যের মোহনা, সে পদ্মাই কেড়ে নিল তাদের ভাগ্যের প্রতীক। ছোট শিশুটির নাম রাখল অরুণ (সূর্য)। অর্থাৎ সূর্য যেমন ঘুটঘুটে অন্ধকার পৃথিবীকে আলোর স্ফুরণে আলোকিত করে, তেমনি অরুণও তারেক মিয়ার সংসারকে আলোকিত করবে এবং লেখা-পড়া শিখে জাতিকে উন্নীত করবে। নিরুপায় হয়ে চলে এলো ঢাকা শহরে। বড় বড় দালান-কোটা, কিন্তু দালানের প্রতিটি ইটের ফাঁকে ফাঁেক অসহায় মানবের আর্ত- চিৎকার-আর্তনাদ এবং রক্তসম ঘামের ফোঁটার ছোপ ছোপ দাগ। কলোনিতে গিয়ে একটি বাসা ভাড়া নিল। তারিন আফরিন দুজনই তাদের শিক্ষার ট্্েরনকে শ্লথ করে দিল। সংসারের চাকা চালিয়ে নিতে দুজনই সিদ্ধান্ত নিল, কোনো ফ্যাক্টরি বা গার্মেন্টসে চাকরি নেবে। অবশেষে চাকরি হয়ে গেল। তারিন তাজরিন ফ্যাশনে এবং আফরিন পেল রানা প্লাজায়।

মা বাড়িতে অরুণের দেখাশোনা করে। বছর পাঁচেক হল। অরুণকে ভর্তি করিয়ে দিল একটি কিন্ডার গার্টেনে। বেলা শেষে যখন রাতে খাবার খেতে বসে, তারিন বলে, অরুণ! তোকে ডাক্তার বানাবো। অরুণ বলে না, না, না, আমি ডাক্তার হবো না, সাংবাদিক হবো। তারিন বলে, তুই এগুলি কী বুঝিস? এ রকম খুনসুটিতে তাদের সংসারে আবারো একটু-আধটু ফিরে এলো আলোর আভা ও সুখের আভাস। মুছে যেতে লাগলো বাবা হারানোর দুঃখ-বেদনা।

কিন্তু কালের নির্মম পরিহাস! মা ও অরুণ টিভির পর্দাতে দেখতে পেল, আগুন! আগুন!!

অরুণ বলে, মা! আগুন ধরছে কোথায় রে? হঠাৎ টিভির স্ক্রীনে ভেসে ওঠে “তাজরিন ফ্যাশনে আগুন” জহুরা বেগমের হৃদপি- প্রায় অচল হতে লাগল । জহুরা বেগমের চোখের কোণে অশ্রু, হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে, তারিন! তারিন!! বেলা শেষে তাজরিন ফ্যাশনের কাছে গিয়ে দেখতে পেল তারিনকে, অক্ষত সব ঠিকঠাক আছে, শুধু নেই তারিনের প্রাণ পাখিটা। শত বেদনা বুকে চাপা দিয়ে অশ্রু-সজল নয়নে কাফনে মুড়িয়ে মাটির গোরে দাফন করে দিল। যদিও আফরিনের বেতনে সংসার চলে, তবু মানসিক ভাবে আবারো নেমে এলো কালো মেঘ। কয়েক দিন পূর্বে যে রাতে ভাই বোন মিলে খুনসুটি খেত, কতই না আনন্দে মেতে উঠত তাদের পরিবারের রাতের অবয়ব; কিন্তু এখন রাতে কান্না ছাড়া আর কিছুই হয় না, যেন মলিনতার এক গহ্বর। দিন দিন জহুরা বেগমের চোখের চারপাশটা কালো হয়ে যাচ্ছে। আফরিন মাকে সান্ত¦না দিয়ে বলে, মা!  এতো চিন্তা করো কেন? আমি আছি না, ইনশাআল্লাহ আমি এই পরিবারে আলোর স্ফুরণ ঘটাবো। তুমি চিন্তা করো না। জহুরা বেগম ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে বলে, নাড়িছেঁড়া ধন আমার তারিন! কেন তোর কথা এতো বেশি মনে পড়ে?! সূচিত হয় আবার কন্নার রোল। থামো.. থামো মা, বলে অরুণ। আমিও বড় হচ্ছি না! আমি এখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি, আর কতো দিন! আমি লেখাপড়া করে তোমাদের সুখে রাখবো। শুধু তুমি আমার পাশে থাকবে আর উৎসাহ যোগাবে।

দিনটি ছিল অরুণের জন্মদিন। অরুণ বলে, আপু আজকে চাকরিতে যেয়ো না, আমরা সবাই দুপুরে খেয়ে আপুর কবর জিয়ারত করতে যাবো। আফরিন বলে, অরুণ! আজকে চাকরিতে না গেলে তিন দিনের বেতন কেটে ফেলবে, সুতরাং তুমি আর আম্মু দুপুরে খেয়ে আপুর কবর জিয়ারত করে আসিও। আমি আসার সময় আপুর কবর দেখে আসবো এবং একটি ফুলের তোড়া উপহার দিয়ে আসবো- এই বলে চাকরিতে চলে গেল আফরিন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! টিভির স্ক্রীনে দেখা যাচ্ছে রানা প্লাজা ধসে গেল। মায়ের মুখে ভাষা নেই, যেন প্রায় অবচেতন শুধু অশ্রু বেয়ে কপোল হয়ে যেন স্রোত-বন্যা। কিছুক্ষণ পর জহুরা বেগমের হুশ এল, চলে গেল রানা প্লাজায়। এদিক ওদিক ছোটাছুটি … আফরিনের কোনো দেখা নেই । হাজার হাজার মানুষ- সবার চোখে দুঃখ ভরা চাহনি। হঠাৎ উদ্ধারকারী নিয়ে এল ঝকঝকে এক তরুণীর লাশ। কাছে গিয়ে দেখা গেল লাশটি ছিল আফরিনের। সকালে ছোট ভাইকে বলে আসলো বিকালে আসার সময় আপুকে দেখে আসবে। কালের নির্মম প্রবাহ আপুর সাথে দেখা করিয়ে দিল!

লাশটি নিয়ে কফিনে মুড়িয়ে বাসায় নিয়ে গেল। ছোট্ট অরুণের আকুতি, আপু! তুমি সত্যি বলেছ, তারিন আপুকে দেখে আসবে! হ্যাঁ, হয়তো এখন তারিন আপু তোমার প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে।এদিকে দুঃখের বোঝা সয়তে না পেরে হোঁচট খেলো জহুরা বেগমের প্রাণের স্পন্দন, নিভে গেল আরেকটি জীবন। এভাবে কেড়ে নিল চার-চারটি জীবন। এখন ছোট্ট অরুণের মুখে কোনো ভাষা নেই, যেন একটি মূর্ত প্রতীক দাঁড়িয়ে আছে মা এবং বোনের সিথানে। হায় পৃথিবী! কেড়ে নিলে তুমি শিশু অরুণের মুখের ভাষা। ছিনিয়ে নিলে তুমি তার পথচলার আশা। দিয়ে গেলে শুধু হতাশা। বেদনা যেন তার সারথী…ফারুক আজিজ

ছাত্র: আই,ইউ,পি (জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া)

সি,ইউ, (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়)   ০১৮১৪৮২০৮৩৩