হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

টেকনাফপর্যটনপ্রচ্ছদবিশেষ সংবাদ

সেন্টমার্টিনে রাতযাপন নিষেধাজ্ঞায় পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাবের আশংকা

হাফেজ মুহাম্মদ কাশেম, টেকনাফ … সেন্টমার্টিনদ্বীপে রাতযাপন নিষেধাজ্ঞায় পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাবের আশংকা দেখা দিয়েছে। সেই সাথে পর্যটক নির্ভর দ্বীপের বাসিন্দাগনও আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হবেন বলে দাবি করছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সচেতন মহল। দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত সেন্টমার্টিনদ্বীপে আগামী বছর ২০১৯ সালের ১ মার্চ থেকে যেতে হলে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে। শুধু দিনের বেলায় পর্যটকরা সেখানে যেতে পারবেন। এই প্রবাল দ্বীপে রাতে পর্যটকদের অবস্থান নিষিদ্ধ হলে পর্যটন শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পর্যটক ব্যবসায়ীরা বলছেন, এতে পর্যটন ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তবে জেলা প্রশাসন মনে করেন জীববৈচিত্র রক্ষায় এই সিদ্ধান্তের বিকল্প নেই। তাঁদের দাবি, সেন্টমার্টিন বাঁচলে পর্যটনও থাকবে।
দেশের পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান আকর্ষনীয় স্থান প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। সেন্টমার্টিনের নাম শুনেননি এমন ভ্রমণ পিপাসু মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবেনা। দেশ বিদেশের সৌন্দর্য প্রিয় ও ভ্রমণ পিপাসু মানুষ গুলো প্রতিবছর পর্যটন মৌসুমে দল বেঁধে কেউ বা সপরিবারে ঘুরতে আসেন সেন্টমার্টিনদ্বীপে। আর যারা একবার দ্বীপ ভ্রমণ করেছেন তারা আবারও আসতে চান এখানে। এমনই মায়াবী সৌন্দর্য এই দ্বীপের। ১৯৯০ সালের পরে পর্যটন আকর্ষনীয় স্থান হিসাবে ধীরে ধীরে সেন্টমার্টিনের নাম ছড়িয়ে পড়ে। তখন শীত মৌসুম কিছু কিছু পর্যটক দ্বীপ ভ্রমণের জন্য আসা শুরু করেন। কাঠের ট্রলারে প্রথম প্রথম পর্যটকরা সেন্টমার্টিন ভ্রমণ শুরু করলেও ২ হাজার সালের পর জাহাজ চলাচল শুরু হলে পর্যটকদের আগমন বেড়ে যায়। বর্তমানে পর্যটন মৌসুম এলে ৮ থেকে ১০টি জাহাজ পর্যটকদের নিয়ে সেন্টমার্টিন আসা যাওয়া করে থাকে। পর্যটকদের রাত্রী যাপনের সুবিধার্তে দ্বীপে গড়ে উঠেছে শতাধিক আবাসিক হোটেল কটেজ। তবে অতিরিক্ত পর্যটক ভ্রমণ, আইন অমান্য করে গড়ে উঠা একের পর পাকা ভবণ ও পরিবেশ বিরোধী কর্মকান্ড সেন্টমার্টিনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন পরিবেশবিদরা। সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহন না করলে দ্বীপের অস্থিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করেছেন দ্বীপের বাসিন্দাসহ সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু বর্তমানে দ্বীপের ভাঙ্গন, যাতায়তের একমাত্র জেটিটির বেহাল দশা পরিবেশগত নানা হুমকির মুখে পড়েছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ। সেন্টমার্টিনদ্বীপকে বাঁচিয়ে রেখে পর্যটন বিস্তারে দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৯ সালের দিকে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হলেও এ পর্যন্ত সরকার দ্বীপে অবকাঠামো নির্মাণসহ অন্যান্য কোন কাজকর্ম সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করেনি। ফলে নীতিমালাহীন দীর্ঘ ২৮ বছরের মধ্যে দ্বীপে লোকসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে ইতিমধ্যে অনুমতিবিহীন ও অপরিকল্পিতভাবে অনেক অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। নির্মাণ করা হয়েছে সরকারী ও বেসরকারীভাবে বহুতল ভবণ। গড়ে উঠেছে শতাধিক আবাসিক হোটেল রিসোর্ট। সেই সাথে দ্বীপটি পর্যটকদের কাছে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান হিসাবে স্থান করে নিয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ৯ সেপ্টেম্বর আন্তঃ মন্ত্রণালয়ের সভায় সেন্টমার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র ধ্বংসের চিত্র তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে পরিবেশ অধিদফতর। এর ভিত্তিতে ২৩ সেপ্টেম্বর দ্বীপ রক্ষায় গঠিত আন্তঃ মন্ত্রণালয় কমিটি কয়েকটি সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। সিদ্ধান্তগুলো হচ্ছে বিপন্ন হতে চলা সেন্টমার্টিন রাতে পর্যটকদের জন্য নিষিদ্ধ থাকবে। ছেঁড়াদ্বীপ ও গলাচিপায় পর্যটকদের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে।
মোটরসাইকেল, গাড়ি ও স্পিডবোট চলাচল করতে পারবেনা। কচ্ছপের প্রজনন ব্যাহত হওয়ায় রাতে আলো জ্বালানো যাবেনা। বঙ্গোপসাগরে জাহাজ চলাচলের ওপর গতিবিধি আরোপ করা হবে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০০ পর্যটক বেড়ানোর সুযোগ পাবেন। সব ধরনের নতুন স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জেনারেটর নিষিদ্ধ থাকবে। প্রয়োজনে সৌরশক্তি ব্যবহার করতে হবে। জমি বেচাকেনা করা যাবে না। সব হোটেল-মোটেল ও স্থাপনা উচ্ছেদ করে জমি অধিগ্রহণ করে বসবাসকারীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে।
আগামী একবছরের মধ্যে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দীর্ঘমেয়াদে শুধু জীববৈচিত্রের জন্য সংরক্ষণ করা হবে সেন্টমার্টিনদ্বীপ। তবে এ ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন পর্যটন ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা। কক্সবাজারের হোটেল সী-গালের ম্যানেজার নূরে-এ আলম মিথুন বলেন, ‘সরকার কী কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে জানিনা। এগুলো বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে পর্যটন শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে করে কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা কমে আসবে। সরকার যদি পর্যটন শিল্পের জন্য সাময়িক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে থাকে আমরা স্বাগত জানাবো। তবে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা পর্যটন খাতের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে’। কক্সবাজার কলাতলী মেরিন ড্রাইভ হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুখিন খাঁন বলেন, ‘সেন্টমার্টিন হচ্ছে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। এই প্রবাল দ্বীপে বেড়ানোর উদ্দেশে অনেক পর্যটক তিন দিন অথবা এক সপ্তাহের জন্য কক্সবাজারে আসেন। কিন্তু সেন্টমার্টিনে রাতে অবস্থানের ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে পর্যটন শিল্পের ওপর বিরূপ প্রভাবে পড়বে। কারণ সেন্টমার্টিনে যেতে না পারলে কক্সবাজারবিমুখ হয়ে যাবে ভ্রমণকারীরা। এতে করে পর্যটন খাত থেকে আসা রাজস্ব হ্রাস পাবে’।
এদিকে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের অনেকে বলছেন, ‘সেন্টমার্টিনে রাতের সৌন্দর্য অন্যরকম। রাতে সেন্টমার্টিনে থাকতে না পারলে জ্যোৎস্না দেখা অপূর্ণ রয়ে যাবে। রাতের সেন্টমার্টিন খুব সুন্দর। দুই বছর আগে আমরা সেন্টমার্টিনে ঘুরতে এসে দুই রাত ছিলাম। আমাদের তো মনে হচ্ছে, রাতে সেন্টমার্টিনে থাকতে না পারলে অনেকেই কক্সবাজারে আসা বন্ধ করে দেবে। সেন্টমার্টিনে রাতে থাকতে না পারলে নিঃসন্দেহে পর্যটক হ্রাস পাবে। বেশিরভাগ মানুষ সেন্টমার্টিন ভ্রমণের জন্য কক্সবাজারে আসেন। মাত্র একদিনে সেন্টমার্টিন দেখা হয়ে ওঠেনা। কারণ টেকনাফ থেকে সকালে জাহাজে চড়ে সেন্টমার্টিন পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে যায়। মাত্র দুই-তিন ঘণ্টায় কারও পক্ষে সেন্টমার্টিন উপভোগ্য মনে হবে না’।
তবে ভিন্ন মত পোষন করেন কক্সবাজারের হোটেল লং বিচের ম্যানেজার মোহাম্মদ তারেক। তিনি বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ওপর রাত্রিকালীন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে পর্যটন শিল্পে সাময়িক প্রভাব পড়লেও দীর্ঘমেয়াদি লাভবান হবেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। কারণ এই প্রবাল দ্বীপে আগের মতো সৌন্দর্য নেই। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাও চোখে পড়েনা। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষের পদচারণায় দিন দিন সৌন্দর্য হারাচ্ছে দ্বীপ। তবে আমার আশা, পর্যটন শিল্প অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াবে’।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (পর্যটন ও আইসিটি) এসএম সরওয়ার কামাল বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের ওপর রাত্রিকালীন নিষেধাজ্ঞায় পর্যটন শিল্পে কোনও ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। বরং পর্যটকদের আকর্ষণ আরও বাড়বে। এতদিন পর্যটকদের অবাধ যাতায়াতের কারণে সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র ধ্বংসের পথে চলে গেছে। এ কারণে ২০১৯ সালের ১ মার্চ থেকে সেন্টমার্টিনে রাত্রিকালীন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। পর্যটকরা শুধু দিনের বেলায় সেখানে বেড়াতে পারবেন। সেন্টমার্টিন দ্বীপে ৬৮ প্রজাতির প্রবাল রয়েছে। আরও আছে ১৫১ প্রজাতির শৈবাল, ১৯১ প্রজাতির মোলাস্ক বা কড়ি-জাতীয় প্রাণী, ৪০ প্রজাতির কাঁকড়া, ২৩৪ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৪ প্রজাতির উভচর, ২৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ১২০ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। এছাড়া এই প্রবাল দ্বীপে ১৭৫ প্রজাতির উদ্ভিদ, দুই প্রজাতির বাদুড় ও পাঁচ প্রজাতির ডলফিন দেখা যায়’।
সেন্টমার্টিনদ্বীপ ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব নুর আহমদ সেন্টমার্টিনে রাতযাপন নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ এবং দেশী-বিদেশী পর্যটক ভিআইপি ও ভিভিআইপিসহ শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় পর্যটন দ্বীপ সেন্টমার্টিনের পরিবেশ রক্ষার দোহাই দিয়ে দ্বীপে পর্যটকদের রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষন করে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু তনয়া জননেত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাপী ‘মানবতার মা’ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। আমাদের প্রাণের দাবি মমতাময়ী মায়ের কাছেই। আমি সরকারের সিদ্ধান্ত এবং মন্ত্রীর ঘোষণাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলতে চাই দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে ১ হাজার ৩৫৪ পরিবারের সাড়ে ১০ হাজারেরও বেশী মানুষ বসবাস করে। ভোটার সংখ্যা ৩ হাজার ৩০৪ জন। আবাসিক হোটেল আছে ৮৪টি। দ্বীপের বাসিন্দারা এমনিতেই গরীব। উপরন্ত দ্বীপবাসীর ৮০ ভাগেরও বেশী লোকের আয়ের উৎসই হচ্ছে পর্যটক কেন্দ্রীক। সেন্টমার্টিনদ্বীপে মানুষ বসবাস করবে, পর্যটক যাতায়ত করবে কিন্ত হোটেল থাকবেনা এবং পর্যটকরা রাত যাপন করতে পারবেনা এসিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে দ্বীপের বাসিন্দাগণ চরম আর্থিক দুর্ভোগের সম্মুখীন হবে। দ্বীপের অসহায় গরীব মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বেড়ে যাবে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার আগে অবশ্যই আবশ্যিকভাবে দ্বীপবাসীর জন্য যথা-উপযুক্ত বিকল্প আয়ের উৎস এবং কর্মসংস্থান ঠিক করতে হবে। প্রতি বছর লাখো পর্যটক সেন্টমার্টিন ভ্রমণে আসেন। কিন্তু দ্বীপের একমাত্র জেটির বর্তমানে করুন হাল বিরাজ করছে। একমাত্র জেটিটি কখন ভেঙ্গে পড়ে তা নিয়ে শংকিত দ্বীপবাসী। এছাড়া গত কয়েক বছর ধরে দ্বীপের চতুর্দিকেই ভাঙ্গন শুরু হওয়ায় এর অস্তিত্ব রক্ষা নিয়েও আতংকিত দ্বীপবাসী। পর্যটনের স্বার্থেই দ্বীপ রক্ষা করা প্রয়োজন সর্বাগ্রে। কোন প্রকার উচ্ছেদ-উৎখাত ও পর্যটক যাতায়তে বিধি-নিষেধ আরোপ বা রাত্রিযাপন বন্ধের নীতিমালায় না গিয়ে পর্যটক আগমনের পাশাপাশি একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে দ্বীপের মূল সমস্যা ও সম্ভাবনাময় চিহ্নিত করে সেন্টমার্টিন দ্বীপ রক্ষার ব্যবস্থা নেয়া জরুরী’। ##

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.