সেন্টমার্টিনের সেই বাড়ীতে আর কখনও ফিরবেন না হুমায়ূন আহমেদ

প্রকাশ: ২৩ জুলাই, ২০১২ ৯:৫৩ : অপরাহ্ণ

সদ্য প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদ নব্বই দশকের প্রথম দিকে ‘রূপালি দ্বীপ’ নামক একটি উপন্যাস লিখে দেশে নতুন পরিচিতি এনে দিয়েছিলেন দেশের সর্ব দক্ষিণ পূর্ব সীমানা কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় অবস্থিত সেন্টমার্টিন দ্বীপ বা নারিকেল জিঞ্জিরার। ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে এই দ্বীপে জমি কিনে বাড়ীও করেন তিনি। বাড়ীর নাম দেন ‘সমুদ্র বিলাস’। এরপর সারাদেশে নতুন ফোকাস পায় সেন্টমার্টিন। ক্রমেই পর্যটকদের ভীড় বাড়তে থাকে প্রত্যন্ত এই দ্বীপে। হুমায়ূন আহমদের স্বপ্নের ‘সমুদ্র বিলাস’ দেখতেও! বাড়ী করার পর তিনি মাঝে মধ্যে সেন্টমার্টিনে এসে থাকতেন। সমুদ্র বিলাসে বসে উপ্যাস লিখতেন। সর্বশেষ ২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর স্ত্রী শাওন, দুই সন্তান নিশাদ ও নিনিত এবং নাট্যপরিচালক মাসুদ রানাসহ তিনি এসেছিলেন সমুদ্র বিলাসে। তবে কে জানতো সেটিই তার শেষ আসা হবে! তিনি আর কখনও আসবেন না তার স্বপ্নের ‘রূপালি দ্বীপ’ বা ‘দারুচিনি দ্বীপ’-এ।
জানা যায়, হুমায়ূন আহমেদ সেন্টমার্টিন নিয়ে ১৯৯৩ সালে ‘রূপালি দ্বীপ’ উপন্যাস লেখার পর পরবর্তীতে এই উপন্যাসের চলচ্চিত্র রূপ দেন ‘দারুচিনি দ্বীপ’ নামে। এসব উপন্যাস ও চলচ্চিত্র দারুণ প্রভাব ফেলে তরুণ সমাজের মাঝে। ক্রমেই সেন্টমার্টিনে উৎসুক তরুণদের ভীড় বাড়তে থাকে। ১৯ বছর আগে এই দ্বীপে যেখানে মাত্র একটি খাবার হোটেল ছিল, তাও বছরের কিছু সময়ের জন্য, সেখানে এখন অন্তত অর্ধশত খাবার হোটেল রয়েছে। সেন্টমার্টিন অনেক আধুনিকতাও পেয়েছে। ১৯ বছর আগে এই দ্বীপে হাতেগোনা কয়েকটি টিনের বাড়ী ছিল, তা এখন কয়েক শতে এসে ঠেকেছে। পর্যটন শিল্পের বিকাশের কারণে এই দ্বীপের বাসিন্দাদের দারিদ্রও দূরীভূত হয়েছে। এই কৃতিত্ব হুমায়ূন আহমদেরই। তার মৃত্যুতে দ্বীপ জুড়ে বিরাজ করছে শোকাবহ পরিবেশ।
সেন্টমার্টিন দ্বীপের সাবেক চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমদ খান জানান, ১৯৯৩ সালের ১৬ মার্চ সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দা মরহুম ছৈয়দ আকবরের মেয়ে জুলেখা খাতুনের কাছ থেকে টেকনাফ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাব-কবলা দলিল মূলে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে ২২ শতক জমি কিনেছিলেন ঢাকার ধানমণ্ডি থানার সাত-সি, এলিফ্যান্ট পার্ক, এলিফ্যান্ট রোডের মরহুম ফয়েজুর রহমান আহমদের ছেলে হুমায়ূন আহমেদ। পরে ১৯৯৪ সালে সেখানে তিনি একটি বাড়ী নির্মাণ করেন। বাড়ির নাম দেন ‘সুমদ্র বিলাস’।
ঢাকার টিকালারটেক এলাকার ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম জানান, ছাত্রাবস্থায় হুমায়ূন আহমদের ‘রূপালী দ্বীপ’ উপন্যাস পড়ে উদ্ভূদ্ব হয়ে ১৯৯৪ সালের এপ্রিল মাসে সেন্টমার্টিন বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে গিয়ে দেখেন তার মত অনেকেই হুমায়ূন আহমদের উপন্যাস পড়েই সেন্টমার্টিন দেখতে গিয়েছেন। তারা ‘সমুদ্র বিলাস’ এর সামনে দাড়িয়ে ছবিও তুলেছেন।
তিনি জানান, ১৯৯৪ সালে সেন্টমার্টিনে কোন আবাসিক হোটেল ছিল না। একটি মাত্র খাবার হোটেল ছিল। আর এখন দেশের পর্যটনের এক জনপ্রিয় ঠিকানা সেন্টমার্টিন।
জানা যায়, হুমায়ূন আহমদের দেখাদেখি আরো অসংখ্য লোক সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে জমি কিনতে শুরু করে। বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনও এই দ্বীপ থেকে জমি কিনেছিলেন। বর্তমানে ঢাকার শতাধিক ব্যক্তি ওই দ্বীপে জমি কিনে পযর্টনশিল্প গড়ে তুলে রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছেন। হুমায়ূন আহমদের ছোঁয়ায় এই দ্বীপের জমি বর্তমানে স্বর্ণতুল্য হয়ে ওঠেছে। মাত্র ১৯ বছরের ব্যবধানে এই দ্বীপের জমির দাম এখন অন্তত ৪শ গুণ বেশি।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমদ খাঁন আরো জানান, একমাত্র হুমায়ূন আহমেদের অনুপ্রেরণায় অবহেলিত এ দ্বীপটি পৃথিবী জুড়ে পযর্টকদের কাছে পরিচিতি লাভ করেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সমুদ্র বিলাসের তত্ত্বাবধায়ক আব্দুর রহমান রাসেল জানান, হুমায়ূন আহমদের এই বাড়ীটিতে তাঁর জীবন ও প্রকাশিত বইগুলোর একটি মিউজিয়াম স্থাপন করা হবে। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত বই থেকে দারুচিনি দ্বীপ, কোথাও কেউ নেই, আমার আছে জল, হিমুর মধ্য দুপুর, মিসির আলী আপনি কোথায়, শ্রাবণ মেঘের দিন নামে ৬টি কটেজ ও শঙ্খনীল কারাগার নামে একটি রেস্তোরাঁ স্থাপন করা হয়েছে এবং ওই এলাকাকে নুহাশ পয়েন্ট নামকরণ করা হয়েছে।
জানা যায়, হুমায়ূন আহমদের ‘সমুদ্র বিলাস’ সেন্টমার্টিনের অন্য ১০টি বাড়ীর মত হলেও প্রতিবছর হাজার পর্যটক সেই বাড়ীটি দেখতে যান।


সর্বশেষ সংবাদ