হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

Uncategorizedপ্রচ্ছদসীমান্তস্বাস্থ্য

সীমান্ত দিয়ে আসছে গরু মোটাতাজাকরণ ট্যাবলেট

টেকনাফ নিউজ ডেস্ক::
হঠাৎ করেই দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত দিয়ে গরু মোটাতাজাকরণের নিষিদ্ধ ট্যাবলেটের চোরাচালান বেড়ে গেছে। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সংঘবদ্ধ চোরাচালানকারী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ভারত থেকে দেশে পাচার করে আনছে কোটি-কোটি টাকার গরুমোটাতাজাকরণ ট্যাবলেট। মাঝে মধ্যে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে নিষিদ্ধ ট্যাবলেটের কিছু চালান ধরা পড়লেও অধিকাংশ চালানই চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। আবার সেখান থেকে হাতবদলের মাধ্যমে এসব ট্যাবলেট চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত গরুর খামারগুলোতে। অতি মুনাফালোভী কিছু ব্যক্তি এসব ট্যাবলেট খাইয়ে অল্প দিনের মধ্যেই গরুকে মোটা দেখিয়ে বিভিন্ন হাটে বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছে।

হিলি সীমান্তের কয়েকটি বিজিবি ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ ও ৩০ জুন দুটি চালানের মাধ্যমে ২ লাখ ২৮ হাজার পিস ডেক্সিন ট্যাবলেট ও ২৮ হাজার প্রাকটিন ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। চলতি জুলাই মাসের ৩, ৭, ১২, ১৩ তারিখে ৪টি চালানের মাধ্যমে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৯৫০ পিস প্রাকটিন ট্যাবলেট, ৯ লাখ ৪০ হাজার ডেক্সিন ট্যাবলেট ও ৭২ হাজার ৬শ পিস সিজেট ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। দুই মাসে অন্তত ২০ লাখ ৩০ হাজার ৫৫০পিস নিষিদ্ধ গরু মোটাতাজাকরণ ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এর মধ্যে অধিকাংশ ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে বিজিবির বাসুদেবপুর ক্যাম্প। উদ্ধার করা এসব ট্যাবলেটের বিজিবি নির্ধারিত মূল্য ৬ কোটি ৯লাখ ১৬ হাজার ৫শ’ টাকা। তবে ধরা পড়ার পরও সীমান্ত দিয়ে থামছে না চোরাকারবারীদের তৎপরতা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানের কথা বলছেন বিজিবি কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ট্যাবলেট ব্যবসায়ী জানান, দিনাজপুরের হিলিসহ আশপাশের সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারত থেকে দেশে যেসব গরুমোটাতাজাকরণ ট্যাবলেট আসে তার পুরোটাই সরবরাহ করে থাকেন ভারতের হিলির সোনু মোনু নামের এক ব্যক্তি। তবে তার বিরুদ্ধে ভারতের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

তিনি জানান, ভারতে প্রতি হাজার প্রাকটিন ট্যাবলেটের দাম পড়ে ২২০ টাকা। আর সাদা রংয়ের ডেক্সিন ট্যাবলেটের প্রতি হাজারে দাম পড়ে ২৯০ টাকা থেকে ৩শ’টাকা। এর পর প্রকারভেদে ১২, ১৫, ১৮ হাজার করে একেকটি প্লাষ্টিকের বস্তার ঢোপ (স্তূপ)বানানো হয়। প্রকারভেদে প্রতিটি ঢোপ ভারত থেকে সীমান্ত অতিক্রম বাংলাদেশে প্রবেশ এবং হিলির পাশের ঘোড়াঘাট থানায় পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ঢোপে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা করে খরচ পড়ে। আর ভারতের মহাজনের কাছ থেকে সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য ভারত অংশের পাচারকারীরা প্রতি ঢোপে ৩ থেকে ৪ হাজার রুপি করে নিয়ে থাকে।

ওই ব্যবসায়ীর দাবি,সীমান্ত পার করার সময় বিজিবি সদস্যরাও এই চোরাচালান থেকে বখরা আদায় করে থাকে। প্রতিটি ঢোপ দেশে ঢোকার বিনিময়ে দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা উৎকোচ নিয়ে থাকে বিজিবি সদস্যরা।

গরু মোটাতাজাকরণের এসব ট্যাবলেট রাজধানী পর্যন্ত পাচারের রুটও বলে দেন ওই ব্যবসায়ী। তিনি জানান, হিলি সীমান্ত পার করার পর এসব ট্যাবলেট চলে যায় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানা এলাকায়। সেখান থেকে সিএনজি, বাসসহ বিভিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে এগুলো চলে যায় বগুড়ায় খান মার্কেটে। সেখান থেকে ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায় চলে যায় এসব নিষিদ্ধ ট্যাবলেট। পরে সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয় এসব ট্যাবলেট।

তিনি জানান, বগুড়ায় এসব ট্যাবলেট সাদা রংয়ের ডেক্সিন ট্যাবলেট বিক্রি হয় ৩৯০ টাকা হাজার দরে এবং লাল রংয়ের প্রাকটিন ট্যাবলেট বিক্রি হয় ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা হাজার দরে। আর ঢাকায় এসব ট্যাবলেটের দাম আরেকটু বেশি। সীমান্ত এলাকা ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানে এসব ট্যাবলেট বহনে তেমন কোনও প্রশাসনিক ঝামেলা পোহাতে হয় না।

প্রতি বছর কোরবানির ঈদের আগে এসব ট্যাবলেটের চোরাচালান বেশি হয়ে থাকে বলেও জানান

জানা গেছে, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে একশ্রেণির অসাধু খামারি গরু মোটাতাজাকরণে মরিয়া হয়ে উঠে। আর এ কারণে দেশের খামারিদের কাছে বেড়ে যায় গরু মোটাতাজাকরণ কাজে ব্যবহৃত এসব ট্যাবলেটের চাহিদা। আর এই চাহিদাকে পুঁজি করে চোরাকারবারীরা মরিয়া হয়ে উঠে সীমান্ত পথে ভারত থেকে গরু মোটাতাজাকরণ ট্যাবলেট পাচার করে দেশে আনতে। এবারও সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করছে কোটি-কোটি টাকার গরু মোটাতাজাকরণ ট্যাবলেট।

হাকিমপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. নাসিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবারও কোরবানির ঈদকে ঘিরে দেশের অন্যান্য এলাকার মতো আমাদের হিলি সীমান্ত এলাকাতেও গরু মোটাতাজাকরণ করা হচ্ছে। তবে হিলি একটি সীমান্ত এলাকা হওয়ায় আমাদের পক্ষ থেকে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখানে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে এবং আমরা নিজেরাও এসব এলাকায় যারা গরু মোটতাজাকরণ করছেন তাদের প্রতি কঠোর নজরদারি রাখছি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে অথবা সভা-সেমিনার ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে তাদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। তারা যেন প্রাকৃতিক উপায়ে দানাদার খাদ্য খড় ও ঘাস খাইয়ে গরু মোটাতাজাকরণ করে। কোনোভাবেই যেন ভারতীয় নিষিদ্ধ ট্যাবলেট দিয়ে গরু মোটাতাজাকরণ না করে এবং তারা যেন এসব ব্যবহারও না করতে না পারে সেদিকে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর পরেও কেউ যদি গরু মোটাতাজাকরণ কাজে ট্যাবলেট ব্যবহার করে সেটি জানতে পারলে তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি কোনও খামারি এইসব ট্যাবলেট খাইয়ে গরু মোটাতাজাকরণ করে তাহলে গরুর শরীরে পানি জমবে, গরুকে অত্যধিক মোটা দেখা যাবে। গরু অবশ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই আমরা বার বার খামারিদের সতর্ক করছি তারা যেন কোনোভাবেই এই নিষিদ্ধ ট্যাবলেট ব্যবহার করে গরু মোটাতাজাকরণ না করেন।’

তিনি আরও জানান, ‘নিষিদ্ধ এসব ট্যাবলেট খাওয়ালে গরুর যে মূল অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো রয়েছে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। গরুর শরীরে পানি জমবে, গরুগুলোকে অত্যধিক মোটা দেখা যাবে, গরুর চোখ ফুলে যাবে, গরু অবশ হয়ে যাবে। আর অল্প দিনের মধ্যেই শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন কলিজা, কিডনি ইত্যাদি নষ্ট হয়ে গরু মারা যাবে।

ট্যাবলেট খাইয়ে মোটাতাজা করা গরু চেনার উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, এমন গরু চেনা খুব কঠিন না। এরকম গরুর শরীরের বিভিন্ন অংশে পানি জমবে, শরীরের চামড়াগুলো থল থল করবে, গরুর চোখ, পা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাবে, বুকের হার দেখা যাবে না, বুকের মাংসের ওপর ও ঘাড়ের মাংসে আঙুল দিয়ে চাপ দিলে তাৎক্ষণিকভাবে আগের অবস্থায় ফিরে না এসে দীর্ঘ সময় গর্ত হয়ে থাকবে। গরু চোখ বন্ধ করে ঝিমাবে, একটু পরিশ্রমেই শ্বাসকষ্ট দেখা দেবে, গরুটি সবসময় অস্বস্তি বোধ করবে।’

হাকিমপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. আহসান আলী সরকার বকুল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘কৃত্রিমভাবে মোটাতাজাকরণে (স্টেরয়েড) যেসব ট্যাবলেট গরুকে খাওয়ানো হয় সেগুলো মাংসের মাধ্যমে মানুষের দেহে পৌঁছালে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। মানুষের রক্তনালী, কিডনি, লিভারসহ সব জায়গাতে চর্বি জমে যায় এবং শরীর ফুলে যায়। এসময় হার্ট, লাঞ্চ, লিভার, কিডনি দুর্বল হয়ে পড়ে।’

জয়পুরহাট-২০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল রাশেদ মোহাম্মদ আনিছুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে গরু পাচার ও গরু মোটাতাজাকরণ ট্যাবলেটের চোরাচালান রুখতে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। বেসামরিক সোর্সও নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়া আমাদের সঙ্গে পুলিশ ও র‌্যাবসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাও কাজ করছে।’

হাকিমপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল হাকিম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘হিলি একটি সীমান্তবর্তী এলাকা। এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান রোধে বিজিবির সঙ্গে পুলিশও নিয়মিত কাজ করে থাকে। বিশেষ করে মদ, ফেনসিডিল, ইয়াবা, বিভিন্ন ধরনের মাদকসহ সবধরনের চোরাচালান রোধে সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালানোসহ গোয়েন্দা নজরদারি রাখা হয়। আসন্ন কোরবানির ঈদকে ঘিরে হিলি সীমান্ত এলাকা দিয়ে নিষিদ্ধ ট্যাবলেটের চোরাচালানের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাই সীমান্ত অতিক্রম করে দেশের অভ্যন্তরে যেন কোনোভাবেই এসব নিষিদ্ধ ট্যাবলেট দেশের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য পুলিশি টহল ব্যবস্থা জোরদার করাসহ হিলি থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার যে সব রুট রয়েছে সেসব এলাকায় চেকপোস্টসহ সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.