টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!
শিরোনাম :
জাওয়াদে উত্তাল সমুদ্র: সেন্টমার্টিনে ৫ ও ৬ ডিসেম্বর পর্যটকবাহী জাহাজসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ : প্রভাব বাংলাদেশে, ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত প্রবালদ্বীপের একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালম ইন্তেকাল আজ সোমবার সূর্যগ্রহণ বেলা ১১টা থেকে দুপুর ৩টা ৭ মিনিট পর্যন্ত রোহিঙ্গারা ভাসানচর থেকে বেড়াতে কক্সবাজার কোন দিকে যাচ্ছে ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ? টেকনাফে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস পালিত বাঁকখালী নদী ও প্যারাবন ধ্বংস: পরিবেশ আইনে ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা টেকনাফে সাড়ে ৩ হাজার একর জমিতে লবণ উৎপাদনে চাষীরা এখন মাঠে এবার দুর্নীতিকে ‘লালকার্ড’ দেখাবে শিক্ষার্থীরা

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শ্রী শ্রী আদিনথ মন্দিরের পূজারী ও ভক্তদের ভিড়

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১২
  • ৫১৩ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

 

মোহাম্মদ সিরাজুল হক সিরাজ, মহেশখালী/

এশিয়া মহাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শ্রী শ্রী আদিনথ মন্দিরের পূজারী, ভক্তদের প্রচন্ড ভিড় দেখা গেছে। শ্রী শ্রী আদিনাথ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের দেবতা দেবাদিদেব মহোদেবের নামানুসারে। বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী বঙ্গোপসাগর ঘেরা মৈনাক পর্বতের সর্বউঁচু চুঁড়ায় মনোরম পরিবেশে আদিথান শিব, তীর্থ মন্দিরটির অবস্থান। আদিনাথের অপর নাম মহেশ। এই মহেশের নাম অনুসারে মহেশখালী। আদিনাথের গোড়াপত্তন কয়েক হাজার বৎসর পূর্বে ত্রেতাযুগে, এর একটি ঐতিহাসিক সত্যতা রয়েছে এবং তাহা পাওয়া যায় হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ, রামায়ণ, পুরাণ ও ঐতিহাসিকদের বর্ণনায়। তিনি সর্ব গুণমত হইয়াও গুণাতীত অব্যক্ত ভগবান। ব্যক্ত চরাচরে শিবরূপি ঊর্ধরুপি শিবলিঙ্গ। সকলি নিজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত রাখিয়া জ্ঞানময়, কল্যাণময়, মঙ্গলময় সর্বকল্যুষ বিনায়ক, সত্য শ্বাশত সনাতন। সাগর পাড়ের পাহাড় ঘেষা নির্জন মনোমুগ্ধকর স্থানে শ্রী শ্রী আদিনাথের গোড়াপত্তন। প্রকাশ মন্দির নির্মাণ। তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত লাভের ইতিহাস ব্যাপক। তবে সংক্ষিপ্ত আকারে এই সব ইতিহাস এখানে আলোচিত হয়েছে। শ্রী শ্রী আদিনাথ হিন্দু সম্প্রদায়ের বৃহৎ তীর্থস্থান। যেকোন সনাতনী ব্যক্তি শ্রী শ্রী আদিনাথ দর্শন না করে অন্য তীর্থ কখনও সফলকাম হয় না। যেহেতু স্বয়ং মহাদেব একমাত্র এই স্থানেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। সুতরাং তীর্থ মোক্ষ্য লাভের এবং মানসকামনা পূরণের জন্য শ্রী শ্রী আধিনাথ দর্শনই সর্বশ্রেষ্ঠ। ত্রেতা যুগে রাম রাবণের যুদ্ধের কথা। রাবণ লংকা যুদ্ধে রামের সঙ্গে জয় লাভের জন্য উদগ্রীব। তিনি দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে অমরত্ব বর প্রার্থনা করেনে। এই সময়ে মহাদেব কৈলাসে ধ্যান মগ্ন রাবণের আরাধনার দেবাদিদেব সন্তুষ্টি হয়ে রাবণকে বর দিলেন। তবে সঙ্গে শর্ত জুড়ে দিলেন। শর্ত হল শিবরূপি উর্ধমুখী শিবলিঙ্গকে কৈলাস থেকে বহন করে লংকায় নিয়ে যেতে হবে, পথিমধ্যে কোথাও রাখা চলবে না। যদি পথিমধ্যে কোথাও রাখা হয় তাহা হইলে মহাদেব সেই স্থানেই অবস্থান নিবেন। রাবণ শর্তে মেনে নিলেন এবং মহাদেবকে কান্দে করে নিয়ে রওয়ানা হলেন। যাত্রা পথে এই মৈনাক শিখরে রাখতে বাধ্য হন। ঐ সময় এই স্থানে নারায়ন ব্রাহ্মণ রূপে আবির্ভূত হলেন। রাবণ এই ব্রাহ্মণকে স্বাক্ষী স্বরূপ দাঁড় করে এই পর্বতের পিছনে প্রাকৃতির কাজ সারতে গেলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ রূপে নারায়ন কাল ক্ষেপন না করার জন্য সময় বেধে দিলেন। রাবণ প্রকৃতির কাজ কয়েক ঘন্টায় শেষ করতে পারিলেন না, ঐ জায়গাটি এখনও বিদ্যামান, যাহার নাম মুদিচড়া রূপে পরিচিত বহন করিতেছে মন্দিরের এক কিলোমিটার পিছনে। প্রকৃতির কাজ সেরে রাবণ এসে সেই ব্রাহ্মণ দেখতে পেলেন না। অবশেষে শিলারূপি মহাদেবকে কাধে উঠাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোন অবস্থাতেই উঠাতে পারলেন না। শেষে ক্রোধান্বিত হয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করেও উঠাইতে পারলেন না। উঠানো চেষ্ঠার চিহ্ন হিসাবে এই পাথরের উপর একটি চাপ পড়ে। যাহা এখনো বিদ্যামান। শেষে দেববাণী হতে লাগল রাবণ তোমার অমরতœ লাভ ব্যর্থ হল, তুমি খালি হাতে লঙ্কায় চলে যাও। মহাদেব এই মৈনাক শিখরেই অবস্থান নিবেন। রাবণ যেই লংকায় পৌছলেন তখন রামের সহিত ভয়ংকরের যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পরাজয় বরণ করলেন। এদিকে শ্রী শ্রী আদিনাথের মৈনাকে অবস্থান নেওয়া এবং আবিষ্কার সম্পর্কে এত সুন্দর জনশ্রুতি আছে। জনশ্রুতি হলেও এলাকাবাসীদের মতে ঘটনাটি সত্য। এই সত্য আরো সুন্দর হয়ে উঠেছে। তা হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের এই তীর্থ স্থানটি আবিষ্কৃত হয় ও বিশেষ মর্যদা পায় এই মহেশখালীর একজন সচ্ছল মুসলিমের হাতে। তার নাম নুর মোহাম্মদ সিকদার। তার একটি গাভী হঠাৎ দুধ দেওয়া বন্ধ করিয়া দেয়। এই ব্যাপারে তিনি রাখাল ছেলের উপর সন্দিহান হন এবং প্রতিদিন রাখাল ছেলেকে গালমন্দ দিয়ে থাকেন। মনিবের গালমন্দে অতিষ্ঠ হয়ে রাখাল ছেলেটি রাত্রি বেলায় গোয়াল ঘরের গাভীটিকে পাহারা দেওয়া আরম্ভ করতেন। কারণ কেউ দুধ চুরি করে কিনা। গভীর রাতে সেই দেখতে পায় গাভীটি গোয়াল ঘর থেকে বের হয়ে গভীর জঙ্গলের দিকে চলে যাচ্ছে। এই দিকে রাখাল বালকও গাভীটির পিছনে অনুসরণ করতে থাকে। গাভীটি সোজা চলে এসে ঐ কাল পাথরের উপর দিয়ে দাড়ায় এবং আপনা আপনি ঐ পাথরের উপর দুধ পড়তে থাকে। যে দুধ পড়া শেষ সঙ্গে সঙ্গে গাভীটি ঐ নুর মোহাম্মদ সিকদারের গোয়াল ঘরে চলে গেলেন। এই অবস্থা রাখাল বালকটি স্বচক্ষে দেখে তার মালিককে পূর্ণ ঘটনা খুলে বলে। কিন্তু গৃহকর্তা তেমন গুরুত্ব না দিয়ে গাভীটিকে বড় মহেশখালী নামক স্থানে সরিয়ে নিয়ে রাখলেন। এই সময় তিনি রাত্রিতে স্বপ্নে দেখেন যে, গাভীটিকে দুরে লোহার শিকলে বেধে রাখলেও ঐ স্থানে দুধ দেওয়া বন্ধ হবে না বরং গাভীটির আশা যাওয়া কষ্ট হবে। তিনি আরো স্বপ্নে আদেশ পান ঐ স্থানে মন্দির বেধে দেওয়ার স্থানীয় হিন্দু জমিদারকে বলার জন্য। ইতিমধ্যে সে রাখাল ছেলেটি ঐ কাল পাথরের একখানা ছোড়া দিয়ে শান দিতে থাকায় তখনই অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পরে তাহাকে উদ্ধার করা হলেও আর বাচানো যায় নি। আবার এই নুর মোহাম্মদ সিকাদারই শিবের শক্তি অষ্টভূজাকে সুদূর নেপাল থেকে এনে এই মৈনাক শিখরে অবস্থান করানোর আদেশ পান এবং নাগা সন্ন্যাসীর মাধ্যমে ১৬১২ সালে নেপাল ষ্টেইটের মন্দির থেকে চুরি করে নিয়ে আসার সময় ধরা পড়ে যায় ও জেল বন্ধি হয়ে পড়েন। সেই দিন রায় ঘোষনা হবে পূর্ব রাত্রিতে এই নাগা সন্ন্যাসী যোগমায়া বলে মহাদেবের সান্বিধ্যে কৃপা লাভ করেন এবং মহাদেব অভয় বাণী দেন। বিচারক তোমাকে যে প্রশ্নই করুক না কেন তুমি নির্ভয়ে তোমার মুখ দিয়ে যাহা বের হবে তাহাই বলিবে। পরের দিন হলো তাই। মহামান্য বিচারক নেপাল রাজাকে প্রশ্ন করে মুর্তিটির রং জানতে চান। রাজা উত্তরে উনার মুর্তির রং কষ্টি পাথরের বর্ণনা দেন, আবার ঐ নাগাসন্ন্যাসী উত্তরে বলেন, আমার মুর্তিটির রং সাদা। এখন মহামান্য বিচারক প্রত্যেকের সম্মুখে উন্মোচন করে দেখেন প্রকৃত সাদা রং-ই মুর্তিটির আসল রং। তখনই নাগাসন্ন্যাসীর পক্ষে রায় ঘোষনা হয় এবং নেপালের রাজা ক্ষমা প্রার্থনা করে প্রকৃত ঘটনা জাতে উদগ্রীব। তখন নাগাসন্ন্যাসী বিস্তারিত খুলে বলেন। এতে ঐ রাজাই এই মুর্তিটিকে যথাযথ মর্যদার সহিত এই মৈনাক পর্বতে শ্রী শ্রী আদিনাথের পার্শ্বেই স্থাপিত করে এবং মূল মন্দির নির্মাণ করে যান। এখনো প্রায় সময় নেপাল সরকার মাঝে মধ্যে যথাসাধ্য অনুদান দিয়ে থাকেন। এই মৈনাক পর্বত হিমালয়ের শাখা, পূরাকালে প্রাগইতিহাস্পুর, ত্রিপুরা, চট্টগ্রাম, আরকান, ব্রহ্মদেশ, মালদীপ ও পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত এক সম সূত্রে গাথা ছিল। বর্তমান সময়ের নি¤œ বঙ্গ ছিল সাগর গর্ভে, আর্যরা এই অঞ্চলকে পূর্ব সাগর বলত। অর্থাৎ মগদের পরই ছিল সমুদ্র। এমনকি বিন্দ পর্বত ও দক্ষিণ সাগর তীরবর্তি বলে উল্লেখ আছে। এই মৈনাকের অবস্থান লবণ সমুদ্রে, পুরাণ আদিতে উল্লেখ আছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ পশ্চিম দিকস্থ মহেশখালী দ্বীপ। এই দ্বীপই মৈনাক, মৈনাক শীর্ষেই আদিনাথ শিবের অবস্থান। তৎকালীন নবাব আলীবর্দী খান দেওয়ান ব্রজ কিশোর লাল কানুনগোর প্রতিনিধি দেওয়ান কালী চরণের ৯ বৎসরের কিশোর শরৎ চন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে এই দ্বীপে আসেন এবং দ্বীপটি ক্রয় করে দেন। পরে শরৎ চন্দ্র ঐ নাগা সন্ন্যাসীর সংষ্পর্শে এসে ধিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি পরবর্তীতে তাহার জমিদারী সম্পত্তি ১৮৭৬ সালে শ্রী শ্রী আদিনাথ মন্দিরের নামে দেবত্তর সম্পত্তি হিসাবে উইল করে যান। আদিনাথ দৈত ব্যবস্থাপনা পুরী ষ্টেট অনুযায়ী মোহন্ত শাসনে ছিল। পরে মোহান্ত দের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে ১৯১১ ইংরেজীতে এর ব্যবস্থাপনা সীথাকুন্ড ¯্রাইন কমিটির অধিনে চলিয়া যায়। যাহা এখনো বর্তমান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের হাজার হাজার তীর্থ যাত্রী পূণ্য অর্জনের জন্য প্রতিনিয়ত যাতায়ত করে পূণ্য সঞ্চয় করে থাকেন। প্রত্যেক বছর ফাল্গুনের শিব চতুর্দ্দশী তিথিতে লক্ষ লক্ষ পণ্যার্থি এসে পূণ্য সঞ্চয় করে যান। এই শিব চতুর্দ্দশী মেলা পক্ষ কাল ব্যাপি স্থাপি¦ত হয়ে থাকে। উপ মহাদেশের সকল স্থান থেকে সকল সম্প্রদায়ের ভীড়ে লোক লোকারন্য হয়ে উঠে। মিলনমেলা ও তীর্থক্ষেত্র। আবার অনেকেই প্রতিনিয়ত এসে মানত করে যান মন কামনা পূর্ন হওয়া এবং দুঃখ যন্ত্রনা লাগবের জন্য। আরো দেখা যায় মন্দিরের বিভিন্ন স্থানে গাছে সুতলি বেধে মানত করেন, আবার সফলতা লাভ করে পুনরায় এসে সুতলির বাধন খুলে পূজা পার্বণ দিতেও দেখা যায়। মহেশখালীতে কোন দূর্গা বানানো হয় না। কারণ স্বয়ং অষ্টভূজা দূর্ঘা জাগ্রত আছেন। বর্তমানে আয়তন প্রায় ১৫৫ বর্গমাইল এবং লোক সংখ্যা ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৫ শত জন। এই আধিনাথ মন্দিরের পাদদেশে রাম কৃষ্ণ মিশন ও সেবাশ্রম আছে। লোকনাথ মন্দির আছে। গঙ্গা মন্দির আছে। এখানে আবার রাম কৃষ্ণ মিশনের ত্রিতল ভবন কার্যক্রমের কাজ লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করিয়া যাইতেছে। তাহা সাহায্য সহযোগিতার উপরে। রাম কৃষ্ণ সেবাশ্রম এর দায়িত্বে আছেন অধ্যপক দীপক ভট্টাচার্য্য, আশিষ চক্রবর্তী, কানু কুমার চৌধুরী, ডাঃ পরিমল কান্তি দে, রঞ্জিত বৈদ্য। এদিকে আধিনাথ মন্দিরের সভাপতি ও অন্যান্য কমিটির লোকজন জানায়, ফাল্গুন মাসের তীর্থ ও মহা মিলন মালায় লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থী আসে পূণ্যের জন্য। কিন্তু আমাদের মন্দিরের পাশে অত্যাধুনিক ত্রিতল আবাসিক আশ্রম খানা, খাওয়া পরার, থাকার সু বন্দোবস্থ করার প্রয়োজন। তাই সকলের সহযোগিতা, সহ মর্মিতা প্রয়োজন বলে মন্দির কমিটির লোকজন জানিয়েছেন।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT