হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

কক্সবাজারসাহিত্য

সত্যিই রফিকের দিন বদলে গেছে

OK Tofayelরিপোর্টারের ডায়েরি :::তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার::::২০০৫ সালের নবেম্বর মাস। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের তখন অমাবশ্যা-পূর্ণিমার জোয়ারের (স্থানীয়ভাবে এ সময় ‘জো’ হিসাবে পরিচিত) মত অবস্থা। ক্ষমতাসীন দলের এমন টগবগে সময়ে কোন একজন বিএনপি সমর্থক ব্যক্তি দলীয় নেতা- কর্মীদের অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে-এরকম চিন্তাই করা যায় না। তবুও যেন অত্যন্ত সাহস করে রফিক নামের একজন আমার কাছে এসেছিলেন। তাও ঠেকায় পড়ে। অর্থাৎ পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকেছিল তখন। আমি এসময় দৈনিক জনকন্ঠে কাজ করি। অত্যন্ত সাহসের সাথে রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে আমার বিরুদ্ধে দুর্নাম তো রয়েছেই। সেদিন ১১ নবেম্বর শুক্রুবার ছিল। রফিককে সাথে করে কক্সবাজারে এসেছেন রিগ্যান নামের নোয়াখালীর একজন বাসিন্দা। তাও নোয়াখালীর বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত নোয়াখালীর ইতিহাসে যার বিচরণ সেই সাংবাদিক মরহুম কামাল উদ্দিন আহমদের (যিনি ইংলিশ কামাল হিসাবে পরিচিত) রেফারেন্স নিয়ে আসা রিগ্যানের।

পায়ের ব্যথার চিকিৎসা করতে এসেছিলেন রিগ্যান ডুলাহাজারা খ্রীষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে। এই হাসপাতালে এসেই রিগ্যানের সাথে পরিচয় ঘটে হাসপাতাল সংলগ্ন ডুমখালী এলাকার বাসিন্দা রফিকের। রিগ্যান লেখালেখি করেন। তিনিও একজন সংবাদপত্রসেবী। অত্যন্ত সামাজিক লোক। সবার সাথে সহজেই মিশে যেতে অভ্যস্ত তিনি। ডুলাহাজারা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য কয়েকবার আসার কারনে রফিকের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে যান মানব দরদী লোক রিগ্যান। রফিক সম্পর্কে রিগ্যানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ হচ্ছে-‘ডুলাহাজারার ডুমখালী গ্রামের বাসিন্দা রফিক চিংড়ি ব্যবসায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। রফিকের ব্যবসা ছিল স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সাথে। রফিক নিজেও একজন কট্টর বিএনপি সমর্থক। সংগটনে তার অবদান রয়েছে। এক সময় সেই বিএনপি নেতারাই রফিকের সব কিছু হাতিয়ে নেয়। বেচারা রফিক পথে বসে যায়।’

গ্রামীণ একজন তরুন ব্যবসায়ীর ‘পথে বসে যাবার’ দুঃখে ব্যথিত হন রিগ্যান। এমন সময়ে তাকে সাহস দেয়ার আছে। আছে রফিককে সমবেদনা জানানোর। এছাড়া আর কি করার আছে রিগ্যানের। তবুও রিগ্যান ডুলাহাজারার সেই ‘পথে বসা’ ব্যবসায়ী যুবক রফিককে সাথে করে কক্সবাজারে আসলেন। আমার সাথে পরিচয় পর্বের পর বিস্তারিত জানালেন তার দুঃখের পাঁচালী। বললেন, রফিকের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করে শেয়ার হোল্ডারগন যথারীতি লাভের ভাগ নেয়ার পরেও তাদের পেট ভরেনি। সেইসব শেয়ার হোল্ডারগন এলাকার প্রভাবশালী এবং সেই আমলের ক্ষমতাসীন দলের হর্তকর্তা। তাই সর্বশেষে তার জমি-জিরাত জবর দখল করে একদম ‘বেগুনতুলা’ খেয়ে রফিককে ফতুর করে দেয়া হয়েছে।

আমি রফিককে বললাম-‘আপনাকে নিয়ে জনকন্ঠের জন্য একটি ভাল রিপোর্ট হবে। যাকে বলা হয় ফাটাফাটি রিপোর্ট। তবে রিপোর্ট প্রকাশের পর আমার উপর কি যাবে সেটা সর্ম্পকে আমি ওয়াকিবহাল এবং সেটার জন্য আমি প্রস্তুত। কিন্তু আপনার উপর যে ফাটাফাটি অবস্থা এবং ধকল যাবে সেটা সহ্য করতে পারবেন কিনা ? একথা শুনার পর রফিক ভয়ে হাউমাউ করে উঠে বললেন-ওরা তাহলে আমার ব্যবসা-বাণিজ্য জমি-জিরাত সবই নিয়ে এবার আমাকে জানেই মেরে ফেলবে ? তার চাইতে বরং আমি অপেক্ষায় থাকি-দিন বদলের।’ যাক-ডুলাহাজারার সেই বিএনপি সমর্থিত ব্যবসায়ী যুবক রফিককে নিয়ে জনকন্ঠে রিপোর্ট লেখা আর হয়নি। কেননা রিপোর্ট প্রকাশের পর ক্ষমতাসীনরা রফিককে কি করতে পারে এবং সম্ভাব্য অবস্থাও কি হতে পারে সেটা তাকে জানানোর পর তার (রফিক) নিঃশ্বাসই যেখানে বন্ধ হবার উপক্রম হয় সেখানে রিপোর্ট লিখে একজন সাধারণ মানুষকে আরো বিপদগ্রস্থ করার কোন মানে নেই। তাই রিপোর্ট করলাম না।

তখন দৈনিক জনকন্ঠের সম্পাদকীয় পাতায় সপ্তাহের একদিন অর্থাৎ প্রতি সোমবার ‘রিপোর্টারের ডায়েরি’ শিরোনামে শুধু মাত্র সাংবাদিকদের লেখার জন্য বরাদ্দ ছিল। এ কলামে সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং যেসব বিষয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট করা যায়না অথচ পাঠকের জানার আছে সেইসব বিষয়গুলো লেখা হয়। বেশ পাঠক সমৃদ্ধ সংবাদপত্র ছিল তখন দৈনিক জনকন্ঠ। প্রায় প্রতি সোমবারের রিপোর্টারের ডায়েরি কলামে আমি লিখতাম নানা বিষয়ে। তখন অনেক পাঠকের প্রতিক্রিয়াও নানাভাবে পাওয়া যেত। ডুলাহাজারার সেই ব্যবসায়ী যুবক রফিকের বিষয়ে জনকন্ঠে একটি ফাটাফাটি রিপোর্ট লেখার লোভ সামাল দিতে পারছিলাম না। তবুও রফিককে নিয়ে সামান্য কথাবার্তা নিয়ে ‘রিপোর্টারের ডায়েরি’ লিখেছিলাম। যা ছাপা হয়েছিল জনকন্ঠের ২০০৫ সালের ১৪ নবেম্বরের সংখ্যায় ‘দিন বদলের অপেক্ষায়’ শিরোনামে। দৈনিক জনকন্ঠ ছেড়ে আমি দৈনিক কালের কন্ঠে যোগ দেয়ার পর সেই ‘রিপোর্টারের ডায়েরি’ শিরোনামের কলামে দৈনিক কক্সবাজারের পাঠকদের জন্য সমকালীন বিষয়ে লেখা লেখি অবশ্য ছাড়তে পারিনি।

রফিক সেদিন আমার নিকট থেকে বিদায় নেয়ার সময় বলেছিলেন- পত্রিকায় আপাতত বড় আকারের রিপোর্ট যাতে করা না হয়। কারন রিপোর্ট হলে তিনি আরো ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। অতএব রফিক অপেক্ষায় থাকবেন-দিন বদলের। রফিকের সাথে আমার একথা হচ্ছিল ২০০৫ সালের ১১ নবেম্বর। সেই বিএনপি-জামায়াত জোটের অমাবশ্যা-পূর্ণিমার জোয়ারের পানি ভাটা হয়ে গেছে। এরপর শেষ হয়েছে মঈনুদ্দিন-ফখরদ্দিনের দুই বছরের জোয়ার-ভাটাও। আওয়ামী লীগের দিন বদলের সরকারেরও টানা ৫ বছর এবং সর্বশেষ ভোটারবিহীন নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দ্বিতীয়বারের আরো ৬ মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই ৯ বছরেও সেই হতভাগা ডুলাহাজারার রফিকের খবর কিন্তু আমার নেয়া হয়নি। দেখা-সাক্ষাৎও মিলেনি এতদিনে। তিনি কেমন আছেন ? বেচারা রফিক আবার কোন রকমে দাঁড়াতে পারলেন কিনা ? নাকি আবার বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগারদের কবলে পড়ে যাই আছে তাও হারালেন ?

তবে দৈনিক কক্সবাজার এর বর্ষপূর্তির জন্য এ লেখাটি লিখতে গিয়ে ডুলাহাজারার বিএনপি সমর্থিত ব্যবসায়ী হতভাগ্য যুবক রফিকের খবর নেয়ার প্রয়োজন অনুভব করেছি। না হলে পাঠকরাই অভুক্ত থাকবেন। এককালের সংবাদকর্মী ডুলাহাজারার শাহ আলমের নিকট শুনলাম-সেই অভাগা রফিক নাকি বিএনপি থেকে বর্তমানে এলাকার ডাকসাইটে আওয়ামী লীগ নেতা। এমনকি প্রমোশন পেয়ে একেবারে ডুলাহাজারা ইউনিয়নের ওয়ার্ড সভাপতির পদে তিনি। নিশ্চয়ই সুখবর বটে। আজ থেকে ৯ বছর আগে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিএনপি সমর্থিত শেয়ার হোল্ডারগনের হাতে নিঃস্ব হওয়া রফিক অপেক্ষায় ছিলেন হয়তোবা এমন একটি দিন বদলের। অবশ্য দেশবাসীর জন্য কতটুকু বদলেছে দিন তা জানি না তবে রফিকদের দিন এভাবেই বদলায়….। তোফায়েল আহমদ, সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক কালের কন্ঠ এবং ষ্ট্রিঙ্গার, আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম এপি ও বিবিসি-tofayelcox@yahoo.com

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.