হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

কক্সবাজারপ্রচ্ছদফিচার

শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার

মাওলানা মুহাম্মদ আলমগীর = ইসলামের দৃষ্টিতে সকল মানুষই শ্রমিক। একজন রাষ্ট্রপতি ও শ্রমিক। আল্লাহর প্রেরিত সকল নবী-রাসুলই শ্রমিক ছিলেন এবং আল্লাহ ও আল্লাহর নবীগণ মানুষকে শ্রম দিয়ে উপার্জন করার তাগিদ দিয়েছেন। পৃথিবীর প্রথম মানুষ, প্রথম নবী হযরত আদম (আঃ) কৃষি শ্রমিক ছিলেন, হযরত দাউদ (আঃ) কর্মকার ও সুতা কাটতেন, হযরত ইদ্রিস (আঃ) দর্জি ছিলেন, হযরত নুহ (আঃ) কাঠমিস্ত্রী ছিলেন, হযরত মুসা (আঃ) ছাগল ছড়াতেন এবং শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ছাগল ছড়িয়েছেন এবং খেজুর বাগানে পানি দিয়েছেন। আর এই মহান মনিষী নবী রাসুলগণ হলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মর্যাদাবান মানুষ। উনারা যেমন শ্রমিক ছিলেন আমরাও শ্রমিক হিসেবে তাদের কাতারের মানুষ হিসেবে মর্যাদাশীল। এরপরে আল্লাহর নবী ঘোষণা করে শ্রমিকরা মহান আল্লাহর বন্ধু (আল হাদিস)। তিনি আরো বলেন আল্লাহর তার ঐ বান্দাকে দেখতে অপছন্দ করেন যে ইহকাল ও পরকালের কর্ম থেকে বিমুখ (মিশকাত)। শ্রমজীবি খেটে খাওয়া দিন মজুর মেহনতি মানুষগুলোকে মহান রাব্বুল আলামিন তার বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে শ্রমিকদের মর্যাদাশীল করেছেন। আজকের আধুনিক পৃথিবীর নির্মাতা হলেন শ্রমজীবি খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষগুলো, শ্রমিক ভাইয়েরা রাস্তা তৈরি করেছেন, ৩০ তলার অট্টালিকা তারাই তৈরী করেছেন, আধুনিক মানুষের বাসযোগ্য করে পৃথিবীটা শ্রমিকরাই সাজিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শ্রমিকরা ২০ তলার বিল্ডিং তৈরী করেছেন সেই শ্রমিক স্ত্রী-পুত্র পরিজন নিয়ে রাস্তার পাশের গাছতলায় বসবাস করছে। আধুনিক বিজ্ঞানের এই যুগে বৈজ্ঞানিকের দূর পাল্লার অনুবীক্ষণ যন্ত্রদ্বারা মহাশূণ্যের হাজার রহস্য উদ্ঘাটন করলেও অসহায় শ্রমিকদের দুঃখ কষ্ট বৈজ্ঞানিকের যন্ত্রে ধরা পড়েনি। মানুষ যখন মহাশূণ্য যানের সাহায্যে চন্দ্রে অবতরণ করে বিজয় পতাকা উড্ডীন করছে, তখন মাটির পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী অসহায় মানুষ অনাহারে অর্ধহারে মানবেতর জীবনযাপন করছে। মানুষ যখন রেডিও, টিভি ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের বাণী সারা দুনিয়া পৌঁছে দিচ্ছে তখন অসহায়, বঞ্চিত শ্রমিকদের আর্তনাদ শ্রমিক ও মালিকদের কানে পৌঁছেনা। আধুনিক যুগে কুকুরের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল তৈরি হচ্ছে অথচ রোগাক্রান্ত শ্রমিকরা চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে। যেই শ্রমিক দেশের কোটি কোটি মানুষের বস্ত্র তৈরী করছে তার স্ত্রী ও সন্তানেরা বস্ত্রের অভাবে লজ্জা নিবারণ করতে পারছেনা। যে শ্রমিক কোটি কোটি মানুষের ঔষুধ তৈরী করছে তার মৃত্যুর সময় মুখে দেওয়ার ঔষুধ সে পাচ্ছেনা। যে শ্রমিকের কঠোর সাধনায় মালিকদেরকে একটি কারখানার পরিবর্তে দশটি কারখানার মালিক হয়েছে খাদ্যের অভাবে সেই শ্রমিকের হাড় এবং মাংস এককার হয়ে যচ্ছে। তাহলে বিংশ শতাব্দীর চরম উন্নতি কি শুধু বিত্তবান,ধনী এবং শোষকদের জন্য? আর অসহায় শ্রমজীবি মানুষের জন্য বরাদ্ধ অভিশাপ, অবহেলা আর ঘৃণ্য উপহাস শোষণ ও নির্যাতন, বিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক উন্নতি যদি মানুষের জন্য হয়ে থাকে তাহলে শ্রমজীবি কি মানুষ নয়? যদি সত্যিকার অর্থে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হয় তাহলে দেশ সার্বিকভাবে উন্নতি লাভ করবে। শ্রমিকদের অধিকার তার কর্মঘন্টা ৮ ঘন্টা এর বেশী হলে অবশ্যই তাকে ওভার টাইম দিতে হবে। আর সপ্তাহে দেড় দিন ছুটি দিতে হবে যদি ওভার টাইমের অতিরিক্ত বেতন এবং ছুটির ব্যাপারে সমঝোতা না হলে মালিকের উপর হক থেকে যাবে। শ্রমিকের হক আদায় না করে মালিকের নামাজ, রোজা, হজ্জ, দোয়া কিছুই কবুল হবে না। বেতন ও মজুরী পরিশোধের ব্যাপারে বাংলাদেশে ৬টি আইন বহাল আছে- ১। মজুরী পরিশোধ আইন ১৯৩৬, ২। মজুরী পরিশোধ আইন ১৯৫৭, ৩। বঙ্গীয় মজুরী পরিশোধ পদ্ধতি ১৯৪০, ৪। নিুতম মজুরী পরিশোধ আদেশ ১৯৬১, ৫। বিধি ১৯৬১, ৬। কৃষি শ্রমিক মজুরী ১৯৮৪ এর পরে ইসলামে মজুরী পরিশোধ সংক্রান্ত নির্দেশ আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলেনÑ তোমরা শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকাবার পূর্বেই তার মজুরী আদায় কর (ইবনে মাজাহ)। অপর হাদিসে হযরত আবু হুরাইরা (র) থেকে বর্ণিত নবি করিম বলেছেনÑ আল্লাহর রাব্বুল আলামিন এরশাদ করছেন ১। যে ব্যক্তি আমার নামে চুক্তি করে তা ভঙ্গ করে, ২। যে স্বাধীন মানুষ বিক্রি করে তার মূল্যে ভোগ করে কিন্তু তার মজুরী পরিশোধ করেনি কিয়ামতের দিন আমি তাদের বিরুদ্ধে ফরিয়াদ পেশ করবো (বোখারী ও মুসলিম)। এরপরে রাসুল (সাঃ) ঘোষণা করেন, তোমরা শ্রমিকদের উৎপাদিত পণ্য হতে অংশ প্রদান কর কেননা আল্লাহর মজুরকে বঞ্চিত করা যায় না (মুসনাদে আহামদ)। আল্লাহর রাসুল আরো বলেছেন তোমরা যা খাও শ্রমিককে তা খেতে দাও, তোমরা যা পারো শ্রমিককে তা পরতে দাও এবং তোমরা তোমাদের শ্রমিকদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। আজকের তথাকথিত আধুনিক সভ্যতার নামে বস্তুবাদী সমাজ ব্যবস্থা এটি আসলে সভ্য নয়, বরং এটি হল ডিজিটাল জাহেলিয়াতের যুগ। বাস্তবাদী দর্শনে বিশ্বাসী বুর্জোয়া শোষক শ্রেণির কাছে শ্রমিক জনতার সম্মান ও মর্যাদা নাই। মর্যাদা আল্লাহর কাছেই। এজন্য তিনি ঘোষণা করেছেন তোমাদের ধনী-গরীব উচু-নীচু, সাদা-কালো কোন ব্যবধান নেই। ব্যবধান হলো- যেই আল্লাহকে বেশি ভয় করে আল্লাহর কাছে তার সম্মান বেশী। আড়াই হাজারের বেশী বয়সী অন্ধকার যুগের মতাদর্শ বুর্জোয়া তৈরীর হাতিয়ার পুজিবাদ আজ শ্রমজীবি মেহনতি মানুষের রক্ত চোষায় পরিণত হয়েছে। আরেক জাহেলিয়াতের নাম সমাজতন্ত্র সাম্যবাদের নামে প্রতারণার শ্লোগান দিয়ে শ্রমিকদের গায়ে নির্যাতনের ষ্টীমরোলার চালিয়েছে। আজকে শ্রমজীবি খেটে-খাওয়া মেহনতি মানুষের অধিকার আদায় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে।

লেখক:-
মসজিদের খতিব,সংগঠক ও সভাপতি : বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যান ফেড়ারেশণ,কক্সবাজার জেলা।

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.