টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

লাব্বাইক,আল্লাহুম্মা লাব্বাইক ধ্বনিতে প্রকম্পিত আরাফাত

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২৬ অক্টোবর, ২০১২
  • ১৭৩ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

*(৩০ লাখ মুসল্লির পবিত্র হজ্ব পাল)‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হা’মদা ওয়াননি’মাতা লাকা ওয়ালমুলক’-মধুধ্বনি-প্রতিধ্বনি পবিত্র আরাফাতের পাহাড় ঘেরা ময়দান ছাপিয়ে আকাশ-বাতাস মুখর ও প্রকম্পিত করে গতকাল বৃহস্পতিবার পবিত্র হজ্ব পালন করেছেন গোটা দুনিয়া থেকে সমবেত লাখো ধর্মপ্রাণ মুসলমান।

সৌদি আরবের আদিগন্ত মরু প্রান্তর এক অলৌকিক পুণ্যময় শুভ্রতায় ভরে উঠেছে। সফেদ-শুভ্র কাপড়ের ইহরাম পরিহিত হাজীদের অবস্থানের কারণে ‘জাবালে রহমত’ সাদা আর শুভ্রতায় একাকার। পাপমুক্তি আর আত্মশুদ্ধির আকুল বাসনায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এই পবিত্র হজ্ব পালন করেছেন। সৌদি আরব থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, এবার ১৫০টি দেশের প্রায় ৩০ লাখ মানুষ হজ্বব্রত পালন করছেন। এরমধ্যে সৌদি আরবের নাগরিক ১০ লাখ এবং অবশিষ্ট ২০ লাখ ১৫০টি দেশের। বাংলাদেশ থেকে এবার হজ্ব পালন করতে গেছেন এক লাখ ১০ হাজার ৫৭৬ জন। পবিত্র হজ্বের খুতবায় সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি সমগ্র মুসলিম জগতকে ‘সিসাঢালা প্রাচীরের’ মতো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়ে বলেছেনঃ মুসলমানরা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে ইসলামই হবে পৃথিবীর মধ্যে সবচাইতে বিজয়ী এবং শক্তিশালী আদর্শ। কিন্তু দুঃখজনক হল আমরা মুসলমানরা আজ ঐক্যবদ্ধ নই। কেউ আমরা আমল নিয়ে, কেউ আকীদা নিয়ে আমরা বিভক্ত। আমাদের সকলের উচিত আজ সিসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ হওয়া। সম্মানিত খতিব আরো বলেন, দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে, মুসলমানরা আজ ঐক্যবদ্ধ নয়। আর এ কারণেই তারা যেখানে সেখানে মার খাচ্ছে। অথচ মহান আল্লাহ রাববুল আ’লামীন কোরআন পাকে এরশাদ করেছেনঃ ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধর, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য মুসলমান আজ শতধাবিভক্ত। মহান আল্লাহ এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম যেটা চাননি। এটা কাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়। মুসলমান একটা দেহের মত। সে পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক অন্য প্রান্তে কোন মুসলমান যদি আক্রান্ত হন, যদি আঘাতপ্রাপ্ত হন, তার সে কষ্টটা সে যতটুকুই অনুভব করবে পৃথিবীর বিপরীত প্রান্ত থেকেও আমাকে ততটুকু ব্যথিত হতে হবে, এটাই ইসলামের শিক্ষা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুসলমান পুরো জাতি একটা ঘরের মত, তার কোথাও আঘাত লাগলে ভিতর থেকে তা উপলব্ধি করা যায়।

নেক আমলের গুরুত্ব সম্পর্কে গ্র্যান্ড মুফতি বলেনঃ মুসলমান হয়ে ঈমান আনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নেক আমল, নামাজ, রোজা, তসবিতাহলিল। এসব কিছুই হচ্ছে নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত। নেক আমলের গুরুত্ব অপরিসীম। যারা ঈমান আনবে তাদের জন্য অপরিহার্য হচ্ছে নেক আমল করা। এ নেক আমলের মাধ্যমে একজন ঈমানদার মুসলমানের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। নেক আমলশূন্য কোন মুসলমান ফলশূন্য গাছের মতো। তার দিকে কেউ তাকায় না। কারণ, সেখান থেকে কেউ ফল পায় না। অর্থাত্ তার সে ঈমান ফলপ্রসূ হ’ল না। রাসুলে খোদা ঠিক এভাবেই উদাহরণ দিয়েছেন। সে কারণেই নাজাতের জন্য, আখেরাতের মুক্তির জন্য নেক আমলের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। নেক আমলের প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে শয়তানের অসওয়াসা। এটা পরিহারের কথাও বলেন সম্মানিত গ্র্যান্ড মুফতি। মুসলমানের সবচেয়ে বড় জিহাদ হচ্ছে তার নফেসর বিরুদ্ধে সংগ্রাম। কারণ, এই নফসই তাকে কু-প্রবৃত্তির দিকে ধাবিত করে। সব মানুষ এক আদমের সন্তান। মহান রব একজন পুরুষ ও একজন মহিলা থেকে সমগ্র মানবজাতি সৃষ্টি করেছেন। এ হিসাবে তারা সকলেই সমান। এর ওপরের ফজিলত হল তাকওয়ার ফজিলত, ঈমানের ফজিলত।

মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমাবেশ এবারের হজ্বে ৩০ লাখের বেশি মুসলমান অংশ নিচ্ছেন। গত বুধবার ফজরের নামাজের পর থেকেই মক্কার অদূরে মিনা নগরে লাখো লাখো হাজীর ঢল নামে। কেউ গাড়িতে, কেউবা তিন-চার ঘণ্টা পায়ে হেঁটে সেখানে পৌঁঁছেন। সারারাত মিনায় তাঁবুর মধ্যে ইবাদত-বন্দেগি করে কাটান আল্লাহ রাবু্বাল আলামিনের মেহমানরা। গতকাল সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে কেউ গাড়িতে, কেউ পায়ে হেঁটে আরাফাতের ময়দানের দিকে রওনা হন। সৌদি কর্তৃপক্ষ হাজীদের আরাফাত ময়দানে আনার জন্য বিপুলসংখ্যক গাড়ির ব্যবস্থা করেন। ইহ্রাম পরা মুসলিমদের এই স্রোত যতই আরাফাতের নিকটবর্তী হতে থাকে, ততই তাঁরা ভাবাবেগে উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। তাঁদের মানসচোখে ভেসে ওঠে সেই আরাফাত ময়দানের ছবি, যেখানে ১৪০০ বছর আগে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্বের ভাষণ দিয়েছিলেন। এই ময়দানে মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় নবীর কাছে সর্বশেষ ওহি নাজিল করেছিলেন, ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে (ইসলাম) পরিপূর্ণ করিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করিলাম।’ (সূরা আল মায়িদা, আয়াত-৩) বিদায় হজ্ব থেকে ফেরার তিন মাসের মাথায় ইসলামের কাণ্ডারি রাহমাতুল্লিল আলামিন প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেন।

আরাফাতের ময়দান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫০ মিটার উঁচুতে। চারপাশে পাহাড়ঘেরা একটি সমতল ভূমি। হাজীদের কেউ কেউ সেখানে তাঁবু টানিয়ে, কেউবা খোলা আকাশের নিচে মাথায় ছাতা ধরে অবস্থান করেন। অনেকে আগের রাতেই সোজা উঠে যান আরাফাত ময়দানসংলগ্ন ৭০ মিটার উঁচু ‘জাবালে রহমত’ বা রহমতের পাহাড়ে। রহমতের পাহাড়ে উঠে সেখানেই তাঁরা দিনভর মহান আল্লাহর করুণা ও মাগফিরাত কামনা করেন। বিশ্বের সর্ববৃহত্ মসজিদ ‘মসজিদে নামিরাহ’ থেকে জোহরের নামাজের আগে বয়ান ও খুতবা পাঠ করেন সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি। হজ্বের অন্যতম অংশ ৯ জিলহজ্ব আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করতে হয়। সূর্যোদয় হতে সূর্যাস্ত অবধি হজ্ব পালনকারীরা আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করেন। খুতবাশেষে জোহর ও আছরের ওয়াক্তের মাঝামাঝি সময়ে জামাতে ‘কসর’ নামাজ আদায় করেন তারা। সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত আরাফাত ময়দানেই অবস্থান করবেন সবাই। আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা হজ্বের অন্যতম ‘ফরজ’ বা অবশ্য পালনীয়। আরাফাতের পাহাড়ে একটি বড় উঁচু পিলার আছে। একে কেউ কেউ দোয়ার পাহাড়ও বলে থাকেন। উঁচু পিলারের কাছে যাওয়ার জন্য পাহাড়ে সিঁড়ি করা আছে, যাতে এটি বেয়ে খুব সহজে চূড়ায় চলে যাওয়া যায়। জনশ্রুতি আছে যে, হযরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া (আ.) দীর্ঘদিন কান্নাকাটির পর এখানেই এসে মিলিত হয়েছিলেন। হাজীরা আরাফাত ময়দানে রাত যাপন শেষে তাদের গন্তব্য মুজদালিফা। সেখানে পাথর নিক্ষেপশেষে তারা ত্যাগের মহিমায় মহামহীয়ান আল্লাহ জাল্লা শানুহুর উদ্দেশে পশু কোরবানি দেন। পশু কোরবানির পর হাজীরা মাথার চুল কামিয়ে ফেলবেন। এরপর তারা ইহরাম ছেড়ে স্বাভাবিক পোশাকে মিনা থেকে মক্কায় গিয়ে কাবা শরিফ সাতবার ঘুরে ’তাওয়াফ’ করবেন। তাওয়াফশেষে হাজীদের গন্তব্য সাফা-মারওয়া পাহাড়। সেখানে সাতবার দৌড়ানোর পর তাদেরকে আবার মিনায় তাঁবুতে ফিরে আসতে হয়। এরপর ১১ এবং ১২ জিলহজ্ব সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার (জোহরের ওয়াক্তের পর থেকে সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত) সাথে সাথে ছোট এবং বড় জামারাকে (তিন শয়তান) পাথর মারতে হয়। তিন শয়তানকে পাথর মারা শেষ হলে সূর্যাস্তের পর মিনা ত্যাগ করে হাজীরা পবিত্র মক্কা নগরীতে ফিরে আসবেন।

অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে সৌদি কর্তৃপক্ষ এ বছর ব্যাপক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। সৌদি পুলিশ মিনার জামারায় শয়তানকে লক্ষ্য করে পাথর ছোঁড়ার সময় যাতে কোন দুর্ঘটনা না ঘটে, সেজন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। এছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও সতর্ক রয়েছে।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT