হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

পর্যটনপ্রচ্ছদ

রোহিঙ্গা সমস্যার প্রভাব সরাসরি পর্যটন খাতে: মৌসুমে ক্ষতির আশঙ্কা

টেকনাফ নিউজ ডেস্ক:: পরিবার নিয়ে গত সপ্তাহে কক্সবাজার বেড়াতে যান ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা আহসান হাবিব। কিন্তু ইনানি বিচে যাওয়ার পথেই হতাশ হতে হয় তাকে। পুরো পথেই ছড়িয়ে ছিল রোহিঙ্গা শরণার্থীর দল। এমনকি পর্যটকবাহী গাড়ি থামলেই ত্রাণের জন্য ছুটে আসছে তারা। এতে পরিবার নিয়ে এক রকম বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন তিনি।

শুধু ইনানি যাওয়ার পথেই নয়। পর্যটকদের জন্য বিব্রতকর এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে হিমছড়ি, মেরিন ড্রাইভ, টেকনাফসহ কক্সবাজার শহরেরও বিভিন্ন স্থানে। কারণ মিয়ানমারে নিপীড়ন শুরু হওয়ার পর অনেক রোহিঙ্গা নির্দিষ্ট স্থানের বাইরে টেকনাফ ও কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে।

পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন স্পট কক্সবাজার। আগামী নভেম্বরেই শুরু হচ্ছে পর্যটনের মৌসুম। প্রতি বছর এ সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক আসে কক্সবাজারে। সংখ্যায় কম হলেও বিদেশী পর্যটকও থাকে এ তালিকায়। আর সারা বছর টুকটাক ব্যবসা করলেও ভরা এ মৌসুমের অপেক্ষায় থাকে পর্যটনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কক্সবাজারের সাড়ে চার শতাধিক হোটেল ও শত শত প্রতিষ্ঠান। কক্সবাজারের যানবাহনচালক, দোকানপাট ও সাধারণ মানুষের জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে পর্যটন। সঙ্গত কারণেই অধিবাসীরা শহরটিকে পরিপাটি ও ঝামেলাহীন দেখতে চায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে রোহিঙ্গারা আসছে, তাতে আসন্ন পর্যটন মৌসুমে ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ট্যুরসের পরিচালক রফিকুল ইসলাম নাসিম বণিক বার্তাকে বলেন, পর্যটন নগরী কক্সবাজারের বর্তমান যে পরিস্থিতি, তাতে আসন্ন পর্যটন মৌসুমে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। দেশের পর্যটকদের মধ্যে যারা মোটামুটি সামর্থ্যবান, তারা দেশের বাইরে ভ্রমণে যাওয়ার কথা ভাবছে। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশে ভারত, নেপাল ও ভুটানে যাচ্ছে তারা।

তিনি বলেন, বিদেশী পর্যটকরা কক্সবাজারে সেভাবে না গেলেও দেশের পার্বত্য এলাকা যেমন— রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান ভ্রমণ করে। কিন্তু এ বছর এরই মধ্যে অনেক বিদেশী পর্যটক তাদের ভ্রমণ বাতিল করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যু এর মূল কারণ হলেও বিদেশী পর্যটকরা বিষয়টিকে মানবিক কারণ দেখিয়ে তাদের ভ্রমণ বাতিল করছে।

জানা গেছে, মিয়ানমারে সহিংসতার শিকার হয়ে পালিয়ে আসা অনেক রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে কক্সবাজার শহরে। এসব রোহিঙ্গা আশ্রয় নিচ্ছে সৈকতের ঝাউ বাগান, হোটেল, মোটেল জোনসহ বিভিন্ন পর্যটন স্পটে। শহরের অলিগলিতে হঠাৎ করে বেড়ে গেছে ভিক্ষুকের সংখ্যা। অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তির জন্য এখানে আসছে। হাত পাতছে বিভিন্ন দোকান ও

সাধারণ মানুষের কাছে। তারা পর্যটকদের পিছু ছাড়ছে না। যদিও পর্যটন স্পটে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।

ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা উপস্থিতি পর্যটন শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন লং বিচ হোটেলের হেড অব অপারেশন মোহাম্মদ তারেক। তিনি বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আসা রোহিঙ্গাদের দ্রুত ফেরত পাঠানো না গেলে ভবিষ্যতে পর্যটকরা হয়তো কক্সবাজারকে এড়িয়ে দেশের বাইরে ভ্রমণে যাবে। কারণ জীবিকা না থাকায় জীবন বাঁচাতে হয়তো ভবিষ্যতে এসব রোহিঙ্গা চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যাবে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে পর্যটন খাতে।

মোহাম্মদ তারেক বলেন, রোহিঙ্গাদের অনেকেই বিচে বসতি গড়ছে। তাদের দ্রুত এক জায়গায় নিয়ে আসতে না পারলে শহরের পর্যটন ব্যবসাসহ জননিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়।

প্রসঙ্গত, এরই মধ্যে প্রায় পৌনে এক লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। তারা অস্থায়ী ঘরবাড়ি তৈরি করে বসবাস শুরু করেছে। কেউ কেউ বিভিন্ন পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা বস্তিতে ঘর ভাড়া করেছে।

কক্সবাজার পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র মাহবুবুর রহমান বলেন, কক্সবাজার পৌরসভার ১২টি ওয়ার্ডের কমিশনারের দেয়া তথ্য, সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে তারা ধারণা করছেন, পৌনে এক লাখের মতো রোহিঙ্গা শহরে ঢুকেছে। রোহিঙ্গাদের নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় রাখার জন্য ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পৌর পরিষদ। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার শহর থেকে সরিয়ে টেকনাফ অথবা উখিয়ায় স্থাপিত রোহিঙ্গা শিবিরে স্থানান্তর করা দরকার। এটা না হলে পর্যটন ব্যবসাসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাও সৃষ্টি করবে।

পর্যটন স্থানগুলোয় রোহিঙ্গা প্রবেশ ঠেকাতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে উল্লেখ করে কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার হোসাইন মো. রায়হান কাজেমী বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে পর্যটন স্থানগুলোয় প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য টহল বাড়ানো হয়েছে। ২৪ ঘণ্টাই আমরা এসব স্থানকে নজরদারির মধ্যে রাখছি।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পর্যটন খাতে গত আট বছরে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা আয় হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরই (২০১৬) পর্যটন খাতে আয় হয়েছে ৮০৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এছাড়া ২০১৫ সালে ১ হাজার ১৩৬ কোটি ৯১ লাখ, ২০১৪ সালে ১ হাজার ২২৭ কোটি ৩০ লাখ, ২০১৩ সালে ৯৪৯ কোটি ৫৬ লাখ, ২০১২ সালে ৮২৫ কোটি ৪০ লাখ, ২০১১ সালে ৬২০ কোটি ১৬ লাখ, ২০১০ সালে ৫৫৬ কোটি ২৯ লাখ ও ২০০৯ সালে ৫৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকা আয় হয়েছে।

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.