হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

টেকনাফপ্রচ্ছদ

রোহিঙ্গা শিবিরে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বন্ধে কাজ করবে ‘পরিবর্তক’

টেকনাফ নিউজ **

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের মধ্যবয়স্ক নারী সমুদা বেগম তার সমাজের নারীদের মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে চান। নিজ সম্প্রদায়ের নারীরা যাতে সমান অধিকার নিয়ে জীবনযাপন করতে পারে সেজন্য কাজ করতে আগ্রহী এই রোহিঙ্গা নারী। গত বুধবার মঞ্চে দাঁড়িয়ে কয়েকশ শ্রোতার সামনে এই ভাবেই সাহসী প্রত্যয় ব্যক্ত করেন সমুদা। বাস্তুচ্যুত এই রোহিঙ্গা নারী কক্সবাজারের উখিয়ায় ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরে বসবাস করছেন।

শুধু কথায় নয়, সমুদা নিজের নামও লিখিয়েছেন ‘পরিবর্তক’ দলে। ‘পরিবর্তক’ হল রোহিঙ্গা শিবিরের কমিউনিটি এডভোকেটদের একটি নেটওয়ার্ক । সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও সহযোগী স্থানীয় এনজিও পালস বাংলাদেশ এই নেটওয়ার্কটি তৈরী করেছে। এই নেটওয়ার্কটি রোহিঙ্গা শিবিরে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা রোধ এবং লিঙ্গভিত্তিক সেবাপ্রদান নিশ্চিত করতে শরণার্থীদের সচেতনতার কাজ করবে। ফলে কমিউনিটি এডভোকেসির মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠীকে সচেতনতার কাজ আরো ত্বরান্বিত হবে।

গত বুধবার নয় নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরে এই নেটওয়ার্ক কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার কাজী মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক।

‘এক সাথে চলার মাধ্যমে শুরু, একতাবদ্ধ থাকাই উন্নতি এবং একসাথে কাজ করাতেই সাফল্য’- এই মন্ত্রে উজ্জীবিত ‘পরিবর্তক’ সদস্যরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে নারী-মেয়ে শিশুসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষদের সচেতন করবে। ইতোমধ্যে ৪০০ রোহিঙ্গা কমিউনিটি এডভোকেট সমাজের জন্য নিজেদের কার্যকরী পরিবর্তক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং তারা জুলাই ২৪ থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে তাদের কাজ শুরু করেছেন।

‘পরিবর্তক’ নেটওয়ার্কটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইওএম বাংলাদেশ মিশনের উপ-প্রধান ম্যানুয়েল পেরেরা পেরেজ বলেনঃ “আইওএম বাংলাদেশে লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতার বন্ধে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আইওএম নতুন নতুন কাজের ধারণা নিয়ে আসে। পরিবর্তক-নেটওয়ার্কটি তেমনই একটি ব্যতিক্রমী ধারণা। সমাজের মানুষদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও নিরাপদ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ সমাজে সমানভাবে সম্মান পায় সেই লক্ষ্যেই এই নেটওয়ার্কটি গড়ে তোলা। এই কাজটি সুষ্ঠুভাবে করার জন্য কমিউনিটি এডভোকেটদের দক্ষতা বৃদ্ধি মূলক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। ফলে তারা নিজ নিজ সমাজে সম্মানজনক ভাবে স্বীকৃত হবে।“

আইওএম ও পালস বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলো থেকে ১০০টি সাবব্লক বেছে নেয় এবং প্রতি সাবব্লকে চারজন কমিউনিটি এডভোকেট নেওয়া হয়েছে। একজন নারী, একজন পুরুষ, একজন ছেলে শিশু এবং একজন মেয়ে শিশু এই চারজন বাছাইকৃত প্রতিটি সাবব্লকে কাজ করবেন। নিজ সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীকে লিঙ্গ ভিত্তিক সহিংসতার ব্যাপারে সচেতন করতে প্রতি সপ্তাহে একঘন্টা সময় ব্যয় করবে এবং প্রতি মাসে একদিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবে। এভাবে প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ২,০০০ মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং নিয়মিত নিজ সম্প্রদায়ের নেতা ও সামাজিক সংগঠনগুলোর কাছে এই বার্তা পৌঁছাবে। এভাবেই নিজ নিজ সামাজিক রীতিনীতি ও সংস্কৃতি অনুযায়ী তাঁরা সমাজে লিঙ্গভিত্তিক সমতার জন্য কাজ করবে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর পাশাপাশি, আইওএম ও পালস বাংলাদেশ স্থানীয় জনগোষ্ঠীদেরও লিঙ্গভিত্তিক ইস্যুগুলোতে আরো সচেতন করতে ৩২০ জন কমিউনিটি এডভোকেট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে কাজ করছে। এখানে উল্লেখ্য, এসব কমিউনিটি এডভোকেটরা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং আর্থিক সহায়তা ছাড়াই এই সামাজিক দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং সংকটে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা গুলোতে সৃজনশীল ধারণা নিয়ে কাজ করার জন্য আইওএম ও পালস বাংলাদেশকে স্বাগত জানিয়ে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার কাজী মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেনঃ “যেহেতু এই কমিউনিটি এডভোকেটদের তাদের নিজ নিজ জনগোষ্ঠির থেকেই নির্বাচন করা হয়েছে তাই তারা খুব দ্রুতই তাদের সম্প্রদায়ের বিশ্বাস অর্জন করতে পারবে। আমি আশা করছি কমিউনিটি এডভোকেটরা তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন ও পারস্পরিক সম্পর্কগুলোর মধ্যে এসব সামাজিক শিক্ষার প্রয়োগ ঘটিয়ে নিজ নিজ সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।“

আইওএম-এর সুরক্ষা বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার চেসি মুলার বলেনঃ “আইওএম ও পালস বাংলাদেশ-এর এই কমিউনিটি এডভোকেসি পদক্ষেপের মাধ্যমে সমাজের সকল স্তরের মানুষদের সাথে কমিউনিটি এডভোকেটদের যোগাযোগ বাড়বে। পাশাপাশি সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীদের সাথে সরকার, এনজিও এবং জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন হবে যা জনগোষ্ঠীগুলোর সচেতনতার হার বাড়াবে।“

রোহিঙ্গা কমিউনিটি এডভোকেট আনাস হোসাইন (১৯) বলেনঃ “আমি আমার সম্প্রদায়কে লিঙ্গভিত্তিক ইস্যুগুলোতে সচেতন করার মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে বদ্ধপরিকর। আমি মনে করি যে কারো পক্ষেই এমন পরিবর্তন আনা সম্ভব। সব মানুষরেই সমান মর্যাদা পাওয়ার অধিকার আছে এবং এমন ব্যবহার নিজের থেকেই প্রথম শুরু করতে হবে

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.