টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

রোহিঙ্গা মুসলমান: বাংলাদেশের কূটনীতি

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : রবিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১২
  • ১৬৩ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

-মুহম্মদ নূরুল ইসলাম:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারকে আবারও আরাকানি মুসলমানদের বাংলদেশে আশ্রয় দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। এনিয়ে আরাকানি মুসলমান তথা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব এবং জাতিসংঘ বাংলাদেশকে একাধিকবার অনুরোধ করলো। বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় অনুরোধটি এসেছে গত ১৫ নভেম্বর । ফলে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এর আগে গত জুন মাসে আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমান উচ্ছেদে শুরু হওয়া সহিংসতার পরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব এবং জাতিসংঘ আরাকানি রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। বিন্তু যুক্তিসংগত কারণেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গা মুসলমানদের আশ্রয় দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. দীপু মণি রাখডাক না রেখেই স্পষ্ট করেই বলেছেন মিয়ানমারের বাসিন্দা রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশ এমনিতেই বিশ্বের একটি অত্যন্ত জনসংখ্যা বহুল দেশ। জনসংখ্যার ভারে দেশ এমনিতেই জর্জরিত। তার উপর কক্সবাজারের সীমান্তের দুইটি শরণার্থী শিবিরে প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী, তার পাশাপাশি দুইটি আনরেজিষ্টার্ড শিবিরে রয়েছে আরো প্রায় দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলমান। এর বাইরে কক্সবাজার, বান্দরবান, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরো তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলমান। এদের অনেকেই বাংলাদেশের জাতীয়তার মর্যাদা যেমন পেয়েছে ঠিক তেমনি ভাবে তারা বাংলাদেশের ভোটার হয়েছে। আবার অনেকেই অবৈধভাবে পাহাড়ে জঙ্গলে বসবাস করছে। রোহিঙ্গা মুসনমানদের বিরুদ্ধে কক্সবাজারসহ বাংলদেশের মানুষের অনেক অভিযোগ। রোহিঙ্গা মুসলমানেরা চুরি, ডাকাতি থেকে শুরু করে হেন কোন অপরাধ নেই যার সাথে জড়িত নেই এমন অভিযোগই রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে। প্রকৃত পক্ষেই কোন কোন রোহিঙ্গারা এসব অপরাধের সাথে জড়িত নেই এমন বলা যাবেনা। তবে সবাই যে এসব অভিযোগে অভিযুক্ত একথা স্পষ্ট করে বলা যাবে। তবে একথা সঠিক যে, রোহিঙ্গা মুসলমানেরা অশিক্ষিক। অশিক্ষিত মনেই বর্বর। তাদেরকে স্থানীয় জন প্রতিনিধিরাই বিভিন্ন অপরাধ কর্মকান্ডে ব্যবহার করে থাকে। আমাদের অনেক জনপ্রতিনিধির পূর্ব পুরুষ রোহিঙ্গা মুসলমান। সঙ্গত কারণেই রোহিঙ্গা মুসলমানদের প্রতি এসব জনপ্রতিনিধিদের সহানুভূতি থাকবেই। এতে দোষের কিছু দেখিনা। আমাদের জনপ্রতিনিধিরাও এসব রোহিঙ্গা ভোটারের উপর নির্ভর করে নির্বাচনী বৈতরনি পার হয়। এসব জনপ্রতিনিধিরাই এসব অবৈধ রোহিঙ্গাকে ভোটর বানাতে সক্রিয় থাকে। মূলত রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড এবং কক্সবাজারের পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করার ফলেই স্থানীয় জনসাধারণ রোহিঙ্গাদের উপর ক্ষুদ্ধ। সরকার স্থানীয় লোকজনের সেনটিমেন্টকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে আশ্রয় না দেওয়ার ব্যাপারে সুদৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। সরকারের এই মনোভাবকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে বংলাদেশে আশ্রয় না দেওয়ার প্রেক্ষিতে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী প্রশংসনিয় ভূমিকা পালন করছে। মিয়ানমার সরকার এবং তাদের মদদপুষ্ট রাখাইন রাজনৈতিকদলগুলো গত জুন মাসে একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানদেরক তাদের বসতবাড়ি পুঁড়িয়ে দিয়ে উচ্ছেদ শুরু করে। নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। নারী ধর্ষণতো আছেই। এরপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা মুসলমনেরা নিজেদের পৌত্রিক ভিটেবাড়ি ফেলে জীবনরক্ষার্থে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে চেষ্টা করে। কিন্তু আমাদের সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীরা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শক্তহাতে রুখে দিয়েছে। তবে বাংলদেশর সীমান্তরক্ষীরা মিয়াানমারের সীমান্তরক্ষী নাসাকা বা দাঙ্গা পুলিশ নাটালা, লুসথিংসহ অন্যান্য আইনশৃংখলারক্ষাকারী বাহিনীর ন্যায় নির্যাতন-নিপীড়ন না করে রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে চিকিৎসা দিয়ে, খাবার দিয়ে আবার স্বদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তর ১৫, ১৭ ও ৪২ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন এবং কোস্টগার্ড এযাবৎ প্রায় সাড়ে তিন হাজারের রোহিঙ্গা মুসলমানকে স্বদেশে ফেরৎ পাঠিয়েছেন। স্বদেশে ফেরৎ পাঠানোর বিষয়টি নতুন নয়। অবৈধ অনুপ্রবেশকরীদেকে আটকের মাধ্যমে স্বদেশ ফেরৎ পাঠানো সীমান্তরক্ষীদের রুটিন কাজ। তবে সরকার প্রধান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের পরে রোহিঙ্গা মুসলমানদের স্বদেশে ফেরৎ পঠানোর বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সীমান্তরক্ষীদের কাছে। তবে এখানে বলে রাখা ভাল যে, স্বদেশে ফেরৎ পঠানোর বিষয়টি যত সহজভাবে বলা যায় তা তত সহজ নয়। একারেণই বলছি যে, বাংলদেশ-মিয়ানমারের সীমান্তের ৬০ কিলোমিটার এলাকা নাফ নদী। নদীর এপারে রয়েছে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড। নদীর ওপারে রয়েছে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী নাসাকা। নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের স্বল্প পরসরের স্থল রয়েছে যেখান থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। নাফ নদী অতিক্রম করেই নৌকা যোগে বেশির ভাগ রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। স্থল সীমান্তের রোহিঙ্গাদেরকে সরাসরি ঠেলে দিয়ে স্বদেশে ফেরৎ পাঠানো যায়। সেক্ষেত্রে নৌকায় করে আরাকান থেকে আসা রোহিঙ্গাদেরকে ফেরৎ পাঠাতে হয় নৌকায় করে। তাদেরকে আমাদের সীমান্তরক্ষী বিজিবি প্রতিপক্ষ নাসাকার হাতে সরাসরি হস্তাস্তর করতে পারে না। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বিজিবির কাজ হচ্ছে রোহিঙ্গা ভর্তি নৌকা বা জলযানগুলোকে সাগরে ঠেলে দেওয়া এবং তাদেরকে বলা তোমরা যেখান থেকে এসেছো সেখানে চলে যাও। অনেকটা ‘যাও পাখি বল তারে সে যেন ভুলে না মোরে‘র এর ন্যায়। যার ফলে এসব রোহিঙ্গারা সাগরে কয়েকদিন ভাসার পরেই কোন এক ফাঁকে বাংলদেশের কোন এক উপকূল দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। এভাবে গত জুন মাসের পর থেকে কমপক্ষে ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এসব রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে মূলত সরকার প্রধান ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী কর্তৃক রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলাদেশে আশ্রয় না দেওয়ার শক্ত অবস্থান নেওয়ার পরে। এব্যাপারে দৈনিক প্রথম আলো গত ৩ নভেম্বর ‘টেকনাফে ঝাউবনে ৩৫ হাজার রোহিঙ্গা‘ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে গত জুন মাসে আরাকানে মুসলমানদের উপর নির্যাতন, নিবর্তন, অত্যাচার শুরু হলে নাফনদী ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে এসব রেহিঙ্গা মুসলমান বাংলদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। তাহলে সরকার প্রধান এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের কি হল? আর আমাদের কূটনীতিরই বা কি হল? অন্তত রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাংলদেশে আশ্রয় দিলে বিশ্ববাসীকে গলা উচু করে বলা যেত আমরা তদেরকে ্আশ্রয় দিয়েছি। প্রথম আলোতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী টেকনাফের ঝাউবনে আশ্রয় নেয়া ৩৫ হাজার রোহিঙ্গা কোথা থেকে আসলা? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, জাতিসংঘসহ বিশ্ববাসীর অনুরোধ উপরোধ উপেক্ষা করে রোহিঙ্গা মুসলমানদের আশ্রয় না দেওয়ার ফলে এখন আর বলা যাচ্ছেনা এসব লোকজন আরাকান তথা মিয়ানমারের বাসিন্দা? এখানেই কি আমাদের কূটনীতির স্বার্থকতা বা ব্যর্থতা ? অনেকটা বলা যেতে পারে ‘কাঁটার জন্য গেলা যাচ্ছে না আর মজার জন্য ফেলা যাচ্ছে না‘ আমাদের।
এদিকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রপতি থেইন সেইনের মতো মিয়ানমারের গণতান্ত্রি¿ক আন্দোলর্নে আইকন, শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত নেত্রী অং সান সুকিও রাখডাক না করে সুজাসুজি বলে ফেলেছেন ‘এমন কোন প্রমাণ নেই যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক‘। তিনি গত ১৫ নভেম্বর ভারতে সফরকালে এসডিটিভিকে প্রদত্ত সাক্ষ্যাৎকারে একথা বলেছেন। দৈনিক আমার দেশ-এ গত ১৫ নভেম্বর প্রকাশিত অং সান সুকির সাক্ষ্যাৎকারে আরো বলা হয়েছে, অবৈধ সীমান্ত পারাপার বন্ধ করা না গেলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হবে না। অং সান সুকির এই কথার অর্থ দাঁড়ায় এসব রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকেই মিয়ানমারের যাচ্ছে। কিন্তু অবস্থা হচ্ছে মিয়ানমার সরকারের অব্যাহত অত্যাচার, নির্যাতন, নিবর্তন, দমন পীড়নের ফলে আরাবানের রোহিঙ্গা মুসলমনেরা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আত্মরক্ষা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার সরকারের পাশাপাশি রাখাইন রাজনৈতিক দলগুলোর সশস্ত্রলোকজন ও রাখাইনদের বাড়িঘর পুঁড়িয়ে দেওয়াসহ তাদেরকে উচ্ছেদ করছে। এখন প্রশ্ন আসে এসব রেহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে মিয়ানমরের গেলে মিয়ানমরের সীমান্তরক্ষী নাসাকারা কোথায় যায়? মূলত বাংলাদেশে যেসব রাখাইন রাজনৈতিক বিপ্লবীরা অবস্থান করছে তারাই সীমান্ত অতিক্রম করে মিয়ানমারের যাওয়া আসা করে। কক্সবাজারের রাখাইন ও বান্দরবানের মার্মাদের চেহারার সাথে আরাকানের রাখাইনদের একই চেহারা হওয়ার ফলে সীমান্ত অতিক্রম করে মিয়ানমারের রাখাইনরা এপার-ওপার করলেও তারা ধরা পড়ে না। ফলে এখন সরকারের কোর্টেই বলটি ঠেলে দিয়েছেন মিয়ানমারের বিরোধী দলীয় নেত্রী অং সান সুকি। বাংলাদেশ সরকারকেই এব্যাপারে ফয়সালা করতে হবে।
লেখক: ইতিহাস লেখক, লোকগবেষক, সাংবাদিক, সভাপতি, কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমী।
Islamcox56gmail.com

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT