রোহিঙ্গা কারা ?

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১০:৩৬ : অপরাহ্ণ

 

এস, এম, মহিউদ্দীন (মুকুল) = তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনি এরদোগানের অশ্রু কোটি কোটি লোককে কাঁদিয়ে দিলো। তিনি কিছু দিন আগে রোহিঙ্গা মুসলমানদের খোঁজখবর নিতে বাংলাদেশ গিয়েছিলেন, যেখানে সাড়ে ছয় লাখেরও বেশিরোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এমিনি এরদোগান রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একটি ক্যাম্পে নির্যাতিত নারীদের বুকফাটা কান্না দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি। তিনি নিজেও অঝোরে কাঁদেন। তিনি অসহায় রোহিঙ্গানারীদের বুকে টেনে নেন। তাদের সান্ত্বনা দেন এবং আশ্বাস দেন তুরস্ক তাদের পাশে আছে। এমিনি এরদোগানের বাংলাদেশ সফরের পর তুরস্ক বাংলাদেশ সরকারের কাছে রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্য বর্ডার খুলেদেয়ার আবেদন জানিয়েছে। তাদের থাকা-খাওয়ার যাবতীয় খরচ তুরস্ক বহন করবে। পাকিস্তানেও রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাথে নির্যাতন ও বর্বরতার ঘটনায় বিশেষ অস্থিরতা বিরাজ করছে। কয়েকটি শহরেরোহিঙ্গা মুসলমানদের পক্ষে বিক্ষোভও হয়েছে। পাকিস্তানের পার্লামেন্টের উভয়কক্ষে রোহিঙ্গা মুসলমানদের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করা হয়েছে। কয়েকজন রাজনীতিবিদ দাবি করেছেন, পাকিস্তানস্থ মিয়ানমারেররাষ্ট্রদূতকে পাকিস্তান থেকে বহিষ্কার করা হোক।

পাকিস্তানিদের একটি বিশাল অংশ রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাহায্য করতে চায়, কিন্তু বেশিরভাগ লোকই জানেন না, তাদের মজলুম ভাই-বোনদের কাছে সাহায্য কিভাবে পৌঁছানো যাবে?
অনেক রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক এটাও জানেন না, রোহিঙ্গা কারা? রোহিঙ্গা মুসলমানদের নেপথ্য ইতিহাস না জানলে, এটা জানা যাবে না যে, মিয়ানমার সরকার তাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে কেন? মিয়ানমারের পুরনো নাম বার্মা। চীনগামী আরব ব্যবসায়ীরা এখানে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব আলমগীরের শাসনামলে শাহ সুজা বাংলার সুবেদার ছিলেন। তিনি তার ভাইয়েরবিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, যা ব্যর্থ হয়েছিল। বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি চট্টগ্রামের পথ ধরে বার্মার আরাকান এলাকায় আত্মগোপন করেন। চট্টগ্রাম থেকে আরাকান যাওয়ার একটি রাস্তাকে আজও সুজা রোড বলাহয়। আরাকানের শাসক সান্দা থু ধম্মা শাহ সুজার কাছে ওয়াদা করেছিলেন, তিনি তাকে মক্কা মুকাররমা যাওয়ার জন্য সামুদ্রিক জাহাজের ব্যবস্থা করে দেবেন, কিন্তু তিনি তার ওয়াদা ভঙ্গ করেন এবং শাহ সুজারমূল্যবান সম্পদ লুট করে নেন (এবং তাকে হত্যা করেন-অনুবাদক)। এরপর আওরঙ্গজেব আলমগীর তার বাহিনী পাঠিয়ে চট্টগ্রাম দখল করেন, যা আরাকানের অংশ ছিল। এভাবে চট্টগ্রামের পথ দিয়ে মোগল ওবাঙালিদের আরাকানে যাওয়া-আসা শুরু হয়।

১৮৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ মোগল বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফরকে রেঙ্গুনে নির্বাসন দেয়া হয়। ব্রিটিশ সরকার বার্মাকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার অংশ বানিয়ে নেয় এবং বহুভারতীয়কে বার্মায় নিয়ে এসে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে, যাদেরকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান বলা হতো। ১৯৩৭ সালে বার্মাকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে পৃথক করে দেয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান বার্মা দখল করেনিলে স্থানীয় বৌদ্ধরা জাপানের পক্ষ নেয়। ব্রিটিশবাহিনী আরাকানের মুসলমানদের অস্ত্র সরবরাহ করে এবং তারা জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে। ব্রিটিশ সরকার আরাকানের মুসলমানদের কাছে ওয়াদাকরেছিল, তাদের এলাকাকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেয়া হবে। কিন্তু মূলত ওই মুসলমানদের জাপানি বাহিনীকে বাধা দেয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে আরাকানেরমুসলমানেরা অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে উত্তর আরাকান মুসলিম লিগের প্লাটফর্ম থেকে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নিতে শুরু করে। ১৯৪৭ সালে আরাকান মুসলিম লিগের একটিপ্রতিনিধিদল কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে সাক্ষাৎ এবং আবেদন করে, আরাকানকে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত করে নেয়া হোক। কেননা আরাকান ও চট্টগ্রামের লোকদের ভাষা ও চালচলনে খুব একটাপার্থক্য নেই। তবে কায়েদে আজম তাদের কাছে কোনো মিথ্যা ওয়াদা করেননি। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে।

আরাকানে মুসলমানদের একটি গ্রুপ তাদের স্বাধীনতার জন্য জিহাদের ঘোষণা দেয়, যে কারণে পাকিস্তান ও বার্মায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বার্মা সরকার অভিযোগ করে, আরাকানের বিদ্রোহী মুসলমানরা চট্টগ্রামেপ্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি করে রেখেছে। এ উত্তেজনা কয়েক বছর অব্যাহত থাকে এবং ১৯৬২ সালে বার্মায় সেনাসরকার ক্ষমতায় আসার পর শেষ হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রোহিঙ্গা মুসলমানদেরপাকিস্তানের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮২ সালে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর জুলুম নির্যাতনের এক নতুন যুগ শুরু হয়। বার্মা সরকার তাদের নাগরিকত্ব বিলুপ্ত করে দেয়। সরকারি চাকরি থেকেওবহিষ্কার করে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরোজাও তাদের জন্য বন্ধ করে দেয়। রোহিঙ্গা মুসলমানরা বার্মা থেকে পালাতে শুরু করে। প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান পাকিস্তান আসে।

করাচির আরাকান কলোনি ও বার্মা কলোনিতে ওই রোহিঙ্গা মুসলমানরাই বসবাস করছেন। অনেক রোহিঙ্গা সৌদি আরব চলে যান। ২০১২ ও ২০১৬ সালে বার্মা সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর আরো বেশিনির্যাতন শুরু করলে তারা দেশ ত্যাগ করে বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড পাড়ি জমাতে থাকেন। এ সময় আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বার্মার নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা শুরু করে। এসংগঠনের নেতা আতাউল্লাহ, যার ব্যাপারে বার্মা সরকারের দাবি- তিনি করাচিতে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সৌদি আরবে বড় হয়েছেন। আতাউল্লাহর তৎপরতার কারণে বার্মা সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপরআরো বেশি কঠোর অভিযানের বৈধ অজুহাত পেয়ে গেছে। কিছু দিন আগে আতাউল্লাহ অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন।

রোহিঙ্গা মুসলমানদের মোট সংখ্যা ১৫ লাখের বেশি নয়। তাদের বিশাল অংশটাই শরণার্থী হয়ে গেছে এবং সারা বিশ্বের মুসলমানদের দিকে সাহায্য কামনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন। পাকিস্তানে এ প্রতিক্রিয়াজানানো হচ্ছে যে, চীনের মাধ্যমে বার্মার ওপর চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে। খুব কম লোকেই জানে, বার্মা ও চীন সীমান্তে কাচিন এলাকায় কাচিন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের একটি সংগঠনও রয়েছে, যারা মিয়ানমার থেকেস্বাধীনতা চাচ্ছে। এ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ খ্রিষ্টান। এমন প্রতিক্রিয়াও রয়েছে যে, এ সংগঠনকে কিছু পশ্চিমা শক্তি সহায়তা করছে। রোহিঙ্গা মুসলমানদের পাকিস্তানের অবশ্যই সাহায্য করা উচিত এবং তুরস্কের মতোবাংলাদেশের বোঝা ভাগাভাগি করে নেয়া উচিত। পাশাপাশি মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করাও উচিত, তবে সতর্কতার আঁচল ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না। অজ্ঞাতসারে আমাদের কারো ষড়যন্ত্রের অংশ হওয়াউচিত হবে না।

লেখক : এস, এম, মহিউদ্দীন (মুকুল) সম্পাদক নাইক্ষ্যংছড়ী নিউজডটকম


সর্বশেষ সংবাদ