টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে টালবাহানা করছে মিয়ানমার

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : রবিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১২
  • ১৭৫ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
 টাইম ম্যাগাজিনে রিপোর্ট…

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার বিষয়ে টালবাহানা করছে মিয়ানমার সরকার। নাগরিকত্ব প্রদান সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বাঙালী বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। যারা বাঙালী বলতে অস্বীকার করছে তাদের মারধরও করছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা। কোন কোন ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা নিজেরাই রোহিঙ্গাদের নামের পাশে জাতি বাঙালী লিখে দিচ্ছে। এমন কি বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে পলাতক দেখিয়ে ‘অস্তিত্ব নেই’ উল্লেখ করে তাদের নাগরিকত্ব না দেয়ার পাঁয়তারা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টাইম ম্যাগাজিন। এ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দল সরেজমিনে এর প্রমাণ পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। রোহিঙ্গা বিষয়ে বাংলাদেশের দাবি ও উদ্বেগের সত্যতা পাওয়া গেছে ওই প্রতিবেদনে।
গত কয়েক মাস ধরেই বাংলাদেশ দাবি করে আসছে, মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়া সম্ভব। আর সে লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকারকে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানায় বাংলাদেশ।
মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত অনুপ কুমার চাকমা নবেম্বরের মাঝামাঝি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন পেশ করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, তাতে তিনি রাখাইন-রোহিঙ্গা দাঙ্গা এবং বাংলাদেশে দলে দলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন নিয়ে বিস্তৃত তথ্য জানান।
ওই প্রতিবেদনে রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বিষয়ে সতর্ক করে জানান, যত কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন তা নেয়া উচিত। প্রতিবেদনে তিনি চীন ও ভারতকে দাঙ্গার ঘটনায় উপকারভোগী বলে মন্তব্য করেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দাতা সংস্থাগুলো যাতে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের ওপর চাপ না দিয়ে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন ও বাস্তবায়নের ওপর চাপ দেয় সে লক্ষ্যে বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে থাকার পরামর্শ দেন।
রাষ্ট্রদূত তাঁর প্রতিবেদনে আরও জানান, রোহিঙ্গাদের নিজেদের বলে স্বীকার করে না মিয়ানমার। ফলে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত রোহিঙ্গারা পাসপোর্ট প্রাপ্তি থেকে শুরু করে ভাল চাকরি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সুবিধা বঞ্চিত হয়। তাই উন্নত জীবনের আশায় তারা বাংলাদেশে চলে আসে। বাংলাদেশে তারা কোন নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় থাকে না। উপরন্তু অসাধু চক্রের মাধ্যমে বাংলাদেশী পাসপোর্ট জোগাড় করে বিদেশ পাড়ি দেয়ার সুযোগ পায়। তারা উন্নত জীবনযাপনের আশা থেকেই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তারা মিয়ানমারে নাগরিকত্ব পেলে এ ধরনের অবৈধ অভিবাসন বন্ধ হবে।
এদিকে ৩০ নবেম্বর টাইম ম্যাগাজিনে ‘বার্মা ভেরিফাইং মুসলিম সিটিজেনশীপ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর গণতন্ত্রে ফেরা মিয়ানমার সরকার এখন সবচেয়ে বড় একটি প্রশ্নের সমাধানে অস্ত্রসজ্জিত পুলিশ ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের নিয়ে আরেকটি অপারেশনে নেমেছে। গত জুনে রাখাইন বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলিমদের দাঙ্গার পর এ প্রশ্নটি চলে এসেছে। আর তা হচ্ছে- কারা নাগরিকত্ব পাবে? আর কারা পাবে না?
এপির সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দল মিয়ানমারের পশ্চিমে সিন থেট মো নামের বিদ্যুতবিহীন গ্রামে গিয়ে দেখতে পায় নাগরিকত্ব যাচাইয়ে জরিপ তো নয়, যেন অপারেশন চালাচ্ছেন দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা। বাঁশের তৈরি ঘরের সামনে ময়লা স্থানে একটি টেবিল পেতে কাজ সারছেন কর্মকর্তারা। জন্ম তারিখ ও স্থান, বাবা মা-দাদার নাম এবং বিগত তিন পুরুষের জীবনযাপন ও মৃত্যুর সময় দেখা হচ্ছে। কোন ধরনের প্রচার ছাড়াই হুট করে সিন থেট মো নামক গ্রামটিতে এ অপারেশন শুরু হয়। যেখানে গত ৫ মাসে ২শ’ লোক মারা গেছে এবং ১ লাখ ১০ হাজার লোক পালিয়ে গেছে। যাদের প্রায় সবাই মুসলিম।
থাইল্যান্ডভিত্তিক একটি এ্যাডভোকেসি গ্রুপ অবশ্য সতর্ক করেছে পালিয়ে যাওয়া লোকের এ সংখ্যা অসত্য হতে পারে। তারা বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে পলাতক দেখিয়ে তাদের নাগরিকত্বের বাইরে রাখার পাঁয়তারা করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দশকের পর দশক ধরে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকজনের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে। তাদের দেখা হয়, বাংলাদেশ থেকে আসা বিদেশী।
এপির সাংবাদিকদের কাছে ওই গ্রামের বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সী জো উইন জানান, ১৯১৮ সাল থেকে সিন থেট মো গ্রামে তার পূর্বপুরুষরা বসবাস করছে। অথচ সরকার চায় না তারা এখানে থাকুক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রামের এক পাশে মুসলিম এবং অনেক দূরে আরেকটি ভূখ-ে বৌদ্ধদের বসবাস। গ্রামের প্রাপ্তবয়স্ক রোহিঙ্গাদের প্রায় সবার হাতে একটি সাময়িক জাতীয় নিবন্ধন কার্ড রয়েছে। ২০১০ সালের নির্বাচনের আগে সমর্থন বাড়াতে ভোটের জন্য এই কার্ড দেয়া হয়। তবে তাতে লেখা রয়েছে, এই কার্ড নাগরিকত্ব প্রমাণপত্র নয়।
এদিকে যেসব ফর্মে রোহিঙ্গাদের নাম পরিচয় লেখা হচ্ছে তাতে এক স্থানে জাতি বা মূল ও জাতীয়তা লেখার জন্য ফাঁকা জায়গা রাখা হয়েছে। প্রত্যেক সাক্ষাতের পর রোাহিঙ্গাদের নামের পাশে ওই কর্মকর্তা ‘বাঙালী’ বা ‘বাঙালী/ইসলাম’ লিখে ফাঁকা জায়গা পূরণ করছেন। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা কী স্যান কোন স্পষ্ট উত্তর দেননি। তিনি বলেন, ‘আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি, জাতীয়তা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না।’
কিন্তু কয়েকজন মুসলিম এপির সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাতে গুরুতর অভিযোগ করেছেন র্কমকর্তাদের বিরুদ্ধে। জো উইন নামে এমন একজন রোহিঙ্গা বলেন, কর্মকর্তারা আমাদের রোহিঙ্গা বলে শ্রেণীভুক্ত করতে চাইছে না। আমরা বাঙালী নই। আমরা রোহিঙ্গা। বাঙালী মানেই আমাদের গ্রেফতার করা হতে পারে বা এদেশ থেকে বের করে দেয়া হতে পারে। বাঙালী মানেই আমরা এদেশের কেউ নই। তিনি বলেন, তারা বোঝাতে চাইছে, ‘এখানে কোন রোহিঙ্গা নেই। কাউকে কাউকে জোরপূর্বক বাঙালী বলতে চায় তারা। একজনকে একটি ফরম দিয়ে তাতে বাঙালী হিসেবে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। সে রাজি না হওয়াতে কর্মকর্তারা মারধর শুরু করে।
মিয়ানমারের বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেন সিয়েন কয়েক মাস আগেও রোহিঙ্গাদের প্রতি কঠোর মনোভাব পোষণ করেছিলেন। তিনি বলতেন, মিয়ানমারের এথনিক জাতি নয় এমন রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করা অসম্ভব। তবে রাজনৈতিক কারণে জাতিসংঘের চাপের মুখে তিনি এখন অনেকটাই নমনীয় ভাব প্রকাশ করেছেন। দেশটিতে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গাদের অধিকার দেয়া হবে বলে জানানো হয়। তিনি জানান, এই ধরনের স্থানচ্যুত জনসাধারণকে নাগরিকত্ব দেয়া হবে। তবে তা কবে দেয়া হবে সে বিষয়ে তিনি কোন সময় জানাননি।
মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার আগে থেকে মিয়ানমারে যাদের পূর্বপুরুষরা বসবাস করতেন তারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে বেশিরভাগ রোহিঙ্গাই এ সুযোগ পান না। তারা ভ্রমণ এমন কী কখনও কখনও বিয়ের অনুমতিও পান না। অনেক রোহিঙ্গা ব্রিটিশ শাসনামলে অভিবাসী হিসেবে এলেও নাগরিকত্বের আবেদন করার সময় বৈষম্যের শিকার হন। মিয়ানমারের অন্যান্য এথনিক গ্রুপের চেয়ে তাদের গায়ের রং বাংলাদেশী মুসলিমদের মতো গাঢ় ও কথায় বাঙালী আঞ্চলিক টান আছে বলে বৈষম্যের শিকার হতে হয়। বৌদ্ধরাও তাদের আলাদা এথনিক গ্রুপ হিসেবে গ্রহণ করতে চান না। তাদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মুসলিম আধিপত্য ও ঐতিহ্য রয়েছে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে মিয়ানমারে প্রবেশ করে বসবাস শুরু করেছে। তারা আসলে ‘বাঙালী’।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের এখন কোন রাষ্ট্র নেই। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনে ১৩৫টি এথনিক গ্রুপকে স্বীকৃতি দেয়া হলেও রোহিঙ্গাদের ওই তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। বাংলাদেশও তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে।
প্রতিবেদনে সিন থেট মো গ্রামের এক বৌদ্ধ ছেলের মন্তব্য তুলে ধরা হয়। বৌদ্ধ ছেলেটি জানান, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়। অবৈধ অভিবাসী। এটা আমাদের ভূমি। অথচ রোহিঙ্গারা ধীরে ধীরে আমাদের কাছ থেকে তা কেড়ে নিচ্ছে। কেউই তা বন্ধ করতে কোন উদ্যোগ নিতে পারছে না। রোহিঙ্গাদের জন্মহার এত বেশি যে তারাই আজ গ্রামে সংখ্যাগরিষ্ঠে পরিণত হয়েছে। গ্রামে রাখাইন বৌদ্ধ রয়েছে ১ হাজার ৯শ’। অন্যদিকে রোহিঙ্গা মুসলিম রয়েছে ৪ হাজার।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT