রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে কোটি টাকার চাঁদা তুলেছে আল-ইয়াকিন

প্রকাশ: ২৯ মে, ২০২০ ৯:৩০ : অপরাহ্ণ

বাংলাদেশ- মিয়ানমার সীমান্তবর্তী  মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি ‘আরসা’ ও আল-ইয়াকিনের তৎপরতার গুঞ্জন বহুদিনের। তবে দেশের গোয়েন্দা সংস্থা গুলো তা বরাবরই উড়িয়ে দিয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার মতে আরসা ও আল-ইয়াকিনের কোথাও অস্থিত্ব নাই।  এসব মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সৃষ্ট গুজব মাত্র।

কিন্তু এবার খোদ কক্সবাজারের টেকনাফ- উখিয়া-রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরে থেকে আল-ইয়াকিনের নামে জিহাদের কথা বলে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে কোটি টাকা চাঁদা তুলেছে একটি চক্র। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে এই চাঁদা উত্তোলন করা হয়েছে। সূত্রের দাবি এখনো চাঁদা আদায় অব্যাহত রয়েছে ক্যাম্পে।

সূত্রমতে,সাধারণ রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে ফিতরা’র নামে,প্রবাসি ও ব্যবসায়ী রোহিঙ্গা পরিবার থেকে যাকাত ও ফিতরা উভয়ের নামে চাঁদা আদায় করা হয়েছে।এ ছাড়া ক্যাম্পের হেড মাঝিদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা,সাধারণ মাঝিদের কাছ এক হাজার টাকা করে বাধ্যতামূলক চাঁদা নেয়া হচ্ছে।ক্যাম্পে আনুমানিক দুই হাজারের বেশি মাঝির পদবী রয়েছে।তাঁদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করেছে আল-ইয়াকিনের সদস্য দাবিদার চক্রটি। এমকি ব্যবহৃত মোবাইল বিক্রি করে চাঁদা আদায় করার খবরও পাওয়াগেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গেল রমজান মাসের শুরু থেকে শরনার্থী ক্যাম্পের অলিগলিতে কয়েকশো রোহিঙ্গা বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে এ ক্যাম্পের ঘরে ঘরে গিয়ে এ বছর ফিতরা এবং যাকাত আদায় করতে রোহিঙ্গাদের পরামর্শ দেন। তাঁদের বেশিরভাগেই বয়স ৩০ থেকে ৪০ ঘরে। প্রত্যেক দলে কয়েকজন করে রোহিঙ্গা মৌলানাও ছিলেন। তাঁরা রোহিঙ্গাদের রক্ষায় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনে আল-ইয়াকিন রোহিঙ্গাদের ভাষায় আলিকিনের গুরুত্ব ও দুর্দশার কথা তুলে ধরেন।মিয়ানমার সেনাদের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য অস্ত্র কিনতে ফিতরা ও যাকাতের টাকা সংগঠনটির ফান্ডে দেয়ার অনুরোধ জানান।প্রচারণায় নিয়োজিত সবাই নিজেদেরকে আল-ইয়াকিনের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন।

পরে ২০ রমজান থেকে চাঁদা উত্তোলন শরু করেন আআল-ইয়াকিনের সদস্য পরিচয় দেয়া সদস্যরা।এতে ব্যাপক সাড়াও দেন সধারণ রোহিঙ্গারা।ফিতরা বাবদ জনপ্রতি নির্ধারিত ৭০টাকা হিসেবে পরিবার কেদ্রিক চাঁদা দিয়েছে অনেক রোহিঙ্গা পরিবার। একটি অসমর্থিত সূত্র বলছে,অানুমানিক দেড় থেকে দুই লাখ রোহিঙ্গার কাছ থেকে কৌশলে এভাবে চাঁদা আদায় করেছে চক্রটি।সব মিলে শরনার্থী শিবিরের ৩৪ ক্যাম্প থেকে কয়েক কোটি টাকা চাঁদা তুলা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

( আল-ইয়াকিনের তৎপরতা ও চাঁদা )

নিরাপত্তার স্বার্থে (ছদ্ম নাম) রোহিঙ্গা আলম
জানান,রোহিঙ্গা শিবিরের ক্যাম্পের প্রত্যেক ব্লকে ব্লকে আলিকিনের ট্রেনিং প্রাপ্ত সদস্যরা রয়েছে। অস্ত্রের যোগান হলে প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের মিয়ানমারে নিয়ে যায় নেতারা। এসব রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ শেষে আবার ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়। আল-ইয়াকিনের নামে চাঁদা উত্তোলন প্রসঙ্গে আলম জানান,এটি তাঁদের হক। আরসা ও আলিকিন অবিচ্ছিন্ন একটি সংগঠন। তাঁরা রোহিঙ্গাদের স্বাধীনতা নিয়ে লড়াই করছে । তাই তাঁদেরকে ফিতরা ও যাকাতের টাকা দান করে থাকেন রোহিঙ্গারা। কেউ যদি চাঁদা দিতে অস্বীকার করেন! উত্তরে আলম জানান উপায় নেই চাঁদা দিতে হবেই।

( আল-ইয়াকিনের নেতা কারা?)

শিবিরের ৩৪টি ক্যাম্পে আল-ইয়াকিন পরিচয়ে চাঁদা আদায়ের আলাদা নেতৃত্বের কথা শোনা যাচ্ছে। তবে একটি ক্যাম্পের কয়েকজন আল-ইয়াকিনের নেতার পরিচয় পাওয়াগেছে।

একটি ক্যাম্পের আল- ইয়াকিন গ্রুপের হেড- লিডার হলেন, মোঃ আবু বক্কর নামের এক রোহিঙ্গা। আবু বক্কর রোহিঙ্গা ক্যাম্প ব্লকঃ বি/৪৪ ক‍্যাম্প ৮ ইষ্টে বাসিন্দা। পিতার নাম পিতাঃ মোঃ জমির হোসেন। আবুবক্করের নির্দেশমতো ক্যাম্পের, ব্লক- এ- ৪২, ক্যাম্প -৮ ওয়েষ্ট এর হেডমাঝি আবু তাহের, ব্লক -বি-১৬, ক্যাম্পের ৮ ইষ্ট এর হেড মাঝি, মোঃ সেলিমসহ আরও কয়েকজন,ক্যাম্পের ৮ ওয়েষ্টে ৮৩ জন মাঝি এবং ক্যাম্প ৮ ইষ্টে ৮৯ জন প্রত্যেক মাঝির কাছ ধার্য্যকৃত জনপ্রতি ১ থেকে ৫হাজার টাকা করে চাঁদা তুলে আবুবক্করের কাছে জামা দিয়েছেন দাবি করেছে একটি সূত্র।

ছদ্ম নাম মুহাম্মদ ক্যাম্পের ৮ ওয়েষ্টের ব্লকের মাঝি তিনি।টাকা না থাকায় বাধ্য হয়ে সে নিজের ব্যবহারের মোবাইল বিক্রি করে এক হাজার টাকা দিয়েছেন বলে অনেকের কাছে বলেছেন।

বিষয়টি ক্যাম্পের মাঝিদের জিঙ্গেসাবাদ করলে মূলহোতাসহ বের হয়ে আসবে।এরই মধ্যে ক্যাম্পের মাঠ পর্যায়ে কাজ করা গোয়েন্দা সংস্থাকে অবগত করা হয়েছে বলে একটি সূত্রে নিশ্চিত করেছেন ।

(নেপথ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনী)

ধারণা করা হচ্ছে, সামনে গাম্বিয়ার আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার মামলার রায়কে কেন্দ্র করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাঁদের নিয়ন্ত্রিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরসা বা আল- ইয়াকিনকে ব্যবহারে করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিরতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছে।
যা তদন্ত করলে বের হয়ে আসবে বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি ক্যাম্পের ভিতরে ও সীমান্তে আরও বেশি গোয়েন্দা নজরদারি ও আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে বিশ্লেষক ও সচেতন নাগরীক সমাজ। এ ছাড়াও ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়মিত মিয়ানমারে যাতায়াত বন্ধের তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।

বিষয়টি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার নজরে আনা হয়েছে।গোয়েন্দা শাখার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের সকল গোয়েন্দা সংস্থা একমত আরসা- আল-ইয়াকিনের কোন অস্থিত্ব নেই। এসব মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সৃষ্টি। তাঁরা মূলতো সেনাবাহিনীর হয়ে কাজ করে। তিনি বলেন,মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাঁদের নিয়ন্ত্রিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন গুলোকে দিয়ে বাংলাদেশ থেকে হামলার নাটক সাজিয়ে বিশ্বকে বোঝাতে চায় বাংলাদেশের মদদে এসব করা হচ্ছে।আল-ইয়াকিন দাবিদার ও চাঁদা আদায়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন এ দেশের মাটিতে বসে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সুযোগ কাউকে দেয়া হবে না।


সর্বশেষ সংবাদ