হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

ধর্ম ও দর্শনফিচার

রোজার আধুনিক মাসায়েল

* রোজা 11242201_859429840803258_3632881070483978997_nরেখে দিনের বেলায় কয়লা চিবিয়ে বা মাজন দ্বারা দাঁত মাজা মাকরুহ এবং এর কিছু অংশ যদি কণ্ঠনালির নিচে চলে যায়, তবে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। কাঁচা বা শুকনা মিসওয়াক দিয়ে দাঁত মাজা জায়েজ। এমনকি যদি নিমের কাঁচা ডালের মিসওয়াক করা হয় এবং তার তিক্ততার স্বাদ মুখে অনুভূত হয়, তবুও মাকরুহ হবে না। বেহেশতি জেওর : ৩/১৩, মারাকিউল ফালাহ : ২১০)।

* রোজা অবস্থায় ফুকাহায়ে আহনাফ মিসওয়াক করার অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু টুথপেস্ট ও টুথ পাউডারের অবস্থা এ থেকে ভিন্ন। এর মধ্যে অনেক স্বাদ অনুভব হয়। তাই টুথপেস্ট ও টুথ পাউডারকে মিসওয়াকের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। মিসওয়াকের সুন্নত আদায় করার জন্য এগুলোর প্রয়োজনও হয় না। এ জন্য কোনো বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এগুলো ব্যবহার করা মাকরুহ। অবশ্য ওজরবশত করা যেতে পারে। (জাদিদ ফেকহি মাসায়েল : ১/১০২)।

* রোজার মধ্যে দাঁত তোলা অথবা দাঁতের ওষুধ লাগানো জায়েজ আছে। তবে প্রয়োজন ছাড়া এ কাজ মাকরুহ, যদি রক্ত অথবা ওষুধ পেটের ভেতরে চলে যায় এবং থুথুর চেয়ে বেশি পরিমাণে হয় অথবা থুথুর সমান হয় অথবা তার স্বাদ অনুভব হয়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে। তবে এতে শুধু কাজা ওয়াজিব হবে।

* রোজার মধ্যে হুক্কা খেলে রোজা ভেঙে যায়। তবে এর ফলে কেবল কাজা আবশ্যক হবে। আর কোনো কোনো অবস্থায় কাফ্ফারা ও কাজা উভয়টা আবশ্যক হবে। যেমন- যদি সে এটা উপকারী মনে করে খায়। এ বিধান বিড়ি-সিগারেট ইত্যাদির বেলায়ও প্রযোজ্য। (রাদ্দুল মুহতার : ২/১৩৩, ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম : ২/৪১৯)।

* ইনজেকশন দ্বারা যেসব বস্তু শরীরে প্রবেশ করানো হয়, তা সাধারণত রগের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক অথবা পাকস্থলীতে পৌঁছানো হয় আর এমন একটি রাস্তা দিয়ে তা অতিক্রম হয়, যা তার প্রকৃত রাস্তা। ফিকহের কিতাবসমূহের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত সামনে রেখে এ কথা অনুভব হয় যে ফুকাহায়ে কিরামে এ ধরনের অবস্থাকে রোজা ভঙ্গকারী আখ্যায়িত করেনি।

এমনিভাবে যেরূপ জখম পাকস্থলী ও মস্তিকে পৌঁছার জন্য প্রচলিত মাধ্যমে রাস্তা ও প্রবেশদ্বার সৃষ্টি করেছে, এতে ওষুধ ঢালা রোজা ভঙ্গের কারণ হবে। এর বিপরীত (প্রচলিত মাধ্যম ছাড়া) জখমে ওষুধ ঢালা রোজা ভঙ্গের কারণ হবে না। চাই তা যে ধরনের জখমই হোক না কেন। আসলে যেটা দেহের অভ্যন্তর ভাগে পৌঁছে যায়, যাতে ওষুধ অপ্রচলিত মাধ্যমে পাকস্থলী অথবা মস্তিষ্কে পৌঁছে গেছে তার দ্বারা রোজা ভাঙবে না। হেদায়াহ প্রথম খণ্ডের ২০০ পৃষ্ঠায় মুফসিদাতে সাওমের মধ্যে বর্ণিত আছে, যদি পেট অথবা মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে পৌঁছানো মাধ্যমে প্রচলিতভাবে জখমের ওষুধ দ্বারা চিকিৎসা করা হয়, এরপর ওষুধ পেট অথবা মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে পৌঁছে যায়, তাহলে ইমাম আজম (রহ.)-এর মতে, রোজা ভেঙে যাবে। আর এভাবে তরল ওষুধ পৌঁছতে পারবে। সারকথা হলো, ইনজেকশনের মাধ্যমে অপ্রচলিতভাবে চাই রক্ত ঢোকানো হোক অথবা ওষুধ ঢোকানো হোক, তা রোজা ভঙ্গের কারণ হবে না। কেননা গ্লুকোজ ইত্যাদির বৈশিষ্ট্য এটাই- তা রগের মাধ্যমে পৌঁছে যায়। পাকস্থলী অথবা মস্তিষ্কের কোনো প্রবেশদ্বারের মাধ্যমে পৌঁছানো হয় না, এ জন্য রোজা ভাঙবে না। (জাদিদ ফিকহি মাসায়েল : ১/৯৬)।

* রোজা অবস্থায় ইনহেলার ব্যবহার করলে রোজা ভেঙে যায়। তাই সেহরির শেষ সময় ও ইফতারের প্রথমে ইনহেলার ব্যবহার করলে যদি তেমন অসুবিধা না হয়, তবে রোজা অবস্থায় ইনহেলার ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা জরুরি; কিন্তু অসুস্থতা বেশি হওয়ার কারণে যদি দিনের বেলায়ও ব্যবহার করা জরুরি হয়, তাহলে তখন ব্যবহার করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে করণীয় হলো-

১. ওই ওজরে দিনের বেলা ইনহেলার ব্যবহার করলেও অন্যান্য পানাহার থেকে বিরত থাকবে।

২. পরবর্তী সময়ে রোগ ভালো হলে এর কাজা করে নেবে।

৩. আর ওজর যদি আজীবন থাকে, তাহলে ফিদয়া আদায় করবে। (সুরা বাকারা : ১৮৪, রদ্দুল মুখতার : ২/৩৯৫)।

* হস্তমৈথুন কিংবা স্ত্রীকে স্পর্শ করার দ্বারা বীর্যপাত ঘটালে রোজা ভেঙে যাবে। তবে এ কারণে কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে না; বরং শুধু একটি রোজা কাজা করে নিলেই আদায় হয়ে যাবে। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি : ১:২০২ পৃষ্ঠা; ফতোয়ায়ে রাহিমিয়া : ৭:২৯৩ পৃষ্ঠা)।

* রমজানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে সফরের কারণে কোনো ব্যক্তির রোজা যদি ২৭ বা ২৮টি হয়ে যায় অর্থাৎ ২৭-২৮টি রোজা রাখার পর সে দেশে ঈদের চাঁদ উদিত হয়ে যায়, তাহলে তার কর্তব্য হলো, ওই দেশের লোকের মতো সেও রোজা ছেড়ে দেবে এবং সবার সঙ্গে ঈদ করবে। পরবর্তী সময়ে আরো দুই বা একটি রোজা কাজা করে নেবে। (ফতোয়ায়ে রাহিমিয়া ৭/২১৫; ফাতওয়া লাজনাতিদ দাইমা ১০/১২৭)। তদ্রূপ এক দেশ থেকে আরেক দেশে সফরের কারণে কারো রোজা যদি ৩০টির বেশি হয়ে যায়। যেমন- কেউ রমজানের শুরুতে সৌদি আরব ছিল, সেখানে বাংলাদেশের এক-দুই দিন আগেই রোজা শুরু হয়েছে। এরপর শেষের দিকে বাংলাদেশে এলো। তার রোজা ৩০টি হলেও বাংলাদেশে ঈদের চাঁদ দেখা যায়নি। এ ক্ষেত্রে তার দায়িত্ব হলো রমজানের সম্মানার্থে রোজা রাখা এবং লোকদের সঙ্গে একত্রে ঈদ করা। (ফতোয়ায়ে রাহিমিয়া ৭/২১৫)।

* রোজা অবস্থায় বিমানে পশ্চিম দিকে সফর করার কারণে যদি দিন বড় হয়ে যায়, তাহলে তার অবস্থানস্থলে যখন সূর্যাস্ত হবে তখনই ইফতার করবে, এর আগে ইফতার করা বৈধ হবে না। অবশ্য রোজা রাখা বেশি কষ্টকর হয়ে গেলে তার জন্য রোজা ভেঙে ফেলার অনুমতি আছে। তবে পরবর্তী সময়ে এ রোজাটি কাজা করে নিতে হবে।

* রোজা অবস্থায় কানের ভেতর তেল, ড্রপ বা অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা যাবে। এর দ্বারা রোজা ভাঙবে না। তদ্রূপ কানের ভেতর পানি চলে গেলেও রোজা ভাঙবে না।

* নাকে ড্রপ, স্প্রে ইত্যাদি ব্যবহারের পর তা যদি গলার ভেতরে চলে যায়, তাহলে রোজা ভেঙে যাবে, অবশ্য গলায় না গেলে বা স্বাদ অনুভূত না হলে রোজা ভাঙবে না। (মাজাল্লাতু মাজমাইল ফিকহিল ইসলামী, দশম সংখ্যা ২/৪৫৪)।

* অক্সিজেন নিলে রোজা ভাঙবে না (ফিকহুল নাওজাজিল ২/৩০০)।

* ইনজেকশন, ইনস্যুলিন ও স্যালাইন নিলে রোজা ভাঙবে না, অবশ্য গ্লুকোজজাতীয় ইনজেকশন অর্থাৎ যেসব স্যালাইন ও ইনজেকশন খাদ্যের কাজ দেয়, রোজা অবস্থায় মারাত্মক অসুস্থতা ছাড়া নেওয়া নাজায়েজ। (আলাতে জাদিদা কি শরয়ী আহকাম ১৫৩)।

* নাইট্রোগি্লসারিন অ্যারোসল জাতীয় এ ওষুধটি হার্টের রোগীরা ব্যবহার করেন। ডাক্তারের মতে, ওষুধটি জিহ্বার নিচে ২-৩ ফোঁটা দেওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে শিরার মাধ্যমে রক্তের সঙ্গে মিশে যায়। এ হিসেবে এ ওষুধ ব্যবহার করার পর গলায় ওষুধ না গেলে বা এর স্বাদ না পৌঁছলে রোজা ভাঙবে না (ফিকহুল নাওয়াজিল ২/২৯৯)।

* রোজা অবস্থায় রক্ত দেওয়া-নেওয়া দুটিই জায়েজ। এর কারণে রোজা ভাঙবে না। তাই ডায়ালিসিসের কারণে রোজা ভাঙবে না। তবে রক্ত দেওয়ার কারণে দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে রোজা অবস্থায় রক্তদান মাকরুহ। (ফিকহুল নাওয়াজিল ২/৩০০)।

লেখক : খতিব, স্টেশন জামে মসজিদ,

ঝাউতলা, চট্টগ্রাম

 

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.