টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!
শিরোনাম :

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তরিক নয় মিয়ানমার

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৭
  • ৪৩৯ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
টেকনাফ নিউজ ডেস্ক **

রোহিঙ্গাদের সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য মিয়ানমার বিশেষ দূত পাঠালেও এর ‘স্থায়ী সমাধানের’ বিষয়ে দেশটির আন্তরিকতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন কূটনীতিকেরা। তাঁদের মতে, বিশেষ দূত সমস্যার স্থায়ী সমাধানের বার্তা নিয়ে আসেননি, তিনি এসেছিলেন রোহিঙ্গা বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে ও বুঝতে। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এ নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকায় তা কিছুটা প্রশমনের চেষ্টাও ছিল মিয়ানমারের।সু চির বিশেষ দূত রোহিঙ্গা প্রসঙ্গটিকে সরিয়ে রেখে অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বললেও বাংলাদেশ এতে সাড়া দেয়নি। বাংলাদেশ বলেছে, রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হলে দুই দেশের মধ্যে আস্থা বাড়বে, এতে নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার পথও তৈরি হবে।

গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সফরে আসেন মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চির বিশেষ দূত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী চাও টিন। বুধবার তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। একই দিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এর আগে তিনি পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠক করেন। গতকাল শুক্রবার তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন।বাংলাদেশের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক মনে করেন, ঢাকা ছেড়ে ইয়াঙ্গুন যাওয়ার সময় সু চির বিশেষ দূত বাংলাদেশের অবস্থানে বিস্মিত হয়েছেন। তাঁর ধারণা ছিল, নতুন আসা ৬৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়ার প্রস্তাব দিলে বাংলাদেশ রাজি হবে। এটি হলে এই সফরেই এসব রোহিঙ্গার পরিচয় যাচাইয়ের কমিটি করে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু বাংলাদেশ তো তাঁর প্রস্তাবে রাজি হয়ইনি, উল্টো এ দেশে আশ্রয় নেওয়া সব রোহিঙ্গাকেই ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছে সব বৈঠকেই।ইয়াঙ্গুনে কর্মরত এক কূটনীতিকের মতে, অতীতের মতো রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আলোচনার প্রস্তাবে বাংলাদেশকে রাজি করানোর আশায় ছিল মিয়ানমার। সব রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ যেভাবে বলেছে, অতীতে কখনো এতটা জোরালোভাবে বলেনি।

বুধ ও বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের বিশেষ দূতের সঙ্গে বিভিন্ন আলোচনায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত রোহিঙ্গা প্রশ্নে তিনটি বিষয় জানতে ও বুঝতে চাও টিনকে ঢাকায় পাঠান সু চি। এগুলো হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে এবার বাংলাদেশের অবস্থান কতটা জোরালো, বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ আরও সোচ্চার হতে চায় কি না এবং আংশিকভাবে অর্থাৎ নতুন আসা রোহিঙ্গাদের (প্রায় ৬৫ হাজার) ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার প্রস্তাবে রাজি করানো।

সু চির দূতকে সব আলোচনাতেই বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের অব্যাহত অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত নানা সমস্যা সৃষ্টি করেছে। তাই সমস্যাটি সমাধানের জন্য সামগ্রিক উপায়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। অর্থাৎ সব রোহিঙ্গাকেই ফিরিয়ে নিতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রশ্নে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের চাপ বাড়ানো বা কমানোর প্রশ্নে সু চির বিশেষ দূতকে বলা হয়েছে, এখানে বাংলাদেশের চাপ বাড়ানো বা কমানোর কোনো সুযোগ নেই। সমস্যাটির সমাধানের জন্য বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া সে দেশের সব নাগরিককে ফিরিয়ে নিতে হবে, সমস্যার মূলে যেতে হবে। নিজের নাগরিকদের জন্য এই দায়িত্ব পালন না করলে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে গণতান্ত্রিক সরকারের তফাৎ কোথায়, সেই প্রশ্ন চাও টিনের কাছে তুলেছে বাংলাদেশ।সু চির বিশেষ দূত ঢাকায় এসে আংশিকভাবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেন। এই প্রস্তাবে রাজি হলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের অনিবন্ধিত প্রায় তিন লাখ নাগরিককে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি চিরতরে পাশ কাটানোর পথ প্রশস্ত হতো বলে মনে করেন কূটনীতিকেরা।জানা গেছে, বুধবার পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হকের সঙ্গে আলোচনায় সু চির বিশেষ দূতের কাছে ২০১৩ সালে দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিবদের বৈঠকের সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গটি তোলা হয়েছিল। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, বাংলাদেশ ‘রোহিঙ্গা’ এবং মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ‘বাঙালি’ শব্দটি ব্যবহার করবে না। বাংলাদেশ ওই সিদ্ধান্ত মেনে চললেও মিয়ানমার তা মানেনি। সম্প্রতি রাখাইনের পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি কমিশনের প্রতিবেদনেও একাধিকবার বাঙালি শব্দটি ব্যবহার করেছে মিয়ানমার। একপর্যায়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, যেহেতু মিয়ানমার তিন বছর আগের ওই সিদ্ধান্ত মানছে না, তাই বাংলাদেশেরও রোহিঙ্গা শব্দটি বলতে কোনো বাধা নেই। এরপর বুধবার আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শব্দই ব্যবহার করেছে। অন্য আলোচনাগুলোতেও এই শব্দ ব্যবহার করা হয়।

গত অক্টোবরে রাখাইনের সীমান্তচৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের ওপর সশস্ত্র বাহিনীর নির্যাতন শুরু হলে তাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জোরালোভাবে তুলে ধরলেও বিষয়টি অন্যভাবে দেখানোর চেষ্টা করছে মিয়ানমার। দেশটি ওই ঘটনায় বাংলাদেশকে জড়িয়ে অপপ্রচারও করেছে। আলোচনার একপর্যায়ে সু চির বিশেষ দূত এই অভিযোগ অস্বীকার করলে জাতিসংঘে মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধির একটি চিঠির অনুলিপি তাঁকে দেওয়া হয়। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি হাউ ডো সোয়ান সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের মিশনপ্রধানকে রাখাইনের পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে তিনি বাংলাদেশকে জড়িয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে চিঠিটি পেয়ে কিছুটা অবাক হন চাও টিন। রাখাইনের পরিস্থিতি বাংলাদেশে কীভাবে প্রভাব ফেলছে তা যে মিয়ানমার মানতে চায় না, সেটি তাঁকে বৈঠকে স্পষ্ট করেই বলা হয়। একপর্যায়ে তাঁকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ যা বলছে তা নিয়ে কোনো সংশয় থাকলে তিনি গোপনে হেলিকপ্টারে চড়ে সেখানকার অবস্থা দেখে আসতে পারেন।দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে মিয়ানমার যে আন্তরিক নয়, সেটি বাংলাদেশ সফরে আসা সু চির দূতের বক্তব্য ও দেশটির মনোভাবে স্পষ্ট। মিয়ানমারের সরকারি দৈনিক দ্য গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার-এর গতকাল শুক্রবারের প্রধান খবরে বলা হয়েছে, ৯ অক্টোবর সীমান্তচৌকিতে হামলার পর বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া মিয়ানমারের লোকজনের পরিচয় যাচাই করে তাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দুই দেশ আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। খবরের সূত্র হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তির কথা বলা হলেও মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গতকাল এ ধরনের কোনো বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়নি।অথচ বৃহস্পতিবার এই সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূতের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশে মিয়ানমারের নিবন্ধিত শরণার্থী, অনিবন্ধিত মিয়ানমারের নাগরিক এবং নবাগতদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়ে একটি কর্মকৌশল ঠিক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশ একটি সমন্বিত ও সামগ্রিক কর্মপন্থা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে। দুই পক্ষই এ নিয়ে খুব শিগগির আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT