টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

রামুতে প্রধানমন্ত্রী- বিএনপির এমপির উস্কানিতেই এই হামলা

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৯ অক্টোবর, ২০১২
  • ১২৪ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রামুতে সংঘটিত সহিংস ঘটনার জন্য স্থানীয় বিএনপি দলীয় এমপিকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, ঘটনার রাত সাড়ে ১১টায় যখন স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান, প্রশাসন ও নেতৃবৃন্দ উত্তেজিত জনতাকে ঠাণ্ডা করে তখন রাত ১২টায় স্থানীয় এমপি ঘটনাস্থলে এসে আধাঘণ্টা অবস্থান করেন। সেই সময় তিনি উস্‌কানিমূলক বক্তব্য দেন। তার বক্তব্যের পর পরই হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ শুরু হয়। অথচ বিরোধীদলীয় নেতা এই ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করছেন। তিনি বলেন, দেশের মানুষ সুখে থাকলে, শান্তিতে থাকলে বিরোধী দলের সহ্য হয় না। তিনি বলেন, আমরা জঙ্গিবাদ দমনে সফল হয়েছি। খাদ্যে নিরাপত্তা নিয়ে এসেছি। অথচ তারা ক্ষমতায় এসে জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটিয়েছিল, গোপাল কৃষ্ণ মুহুরী ও বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হত্যা করেছিল। তারা আবারও দেশকে ২০০১ সালে ফিরিয়ে নিতে চায়। তাই তারা হীন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশকে পিছিয়ে নিতে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। বাংলাদেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা হচ্ছে। তিনি খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যিনি নিজেই দুর্নীতিবাজ, যারা কালো টাকা সাদা করেছেন, তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললে হাসি পায়। খালেদা জিয়ার দুই ছেলের মানিলন্ডারিং মামলার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজেদের দুর্নীতি আড়াল করার জন্য বিরোধী নেত্রী অন্যকে দুর্নীতিবাজ বলেন। এটা যেন চোরের মায়ের বড় গলা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রামুতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে শতবছরের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধপল্লী যারা ধ্বংস করেছে তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে। সহিংস ঘটনায় জড়িতদের কোন মতেই ছাড় দেয়া হবে না। দোষী ব্যক্তিদের অবশ্যই খুঁজে বের করা হবে। সরকার এরই মধ্যে বেশ কিছু তথ্য পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী কারও কাছে কোন তথ্য থাকলে তা দিয়ে সরকারকে তদন্তে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ঘটনার পর কারা হুমকি দিয়েছে, তাদেরও খুঁজে বের করা হবে। যারা ঘটনার মদত দিয়েছে তাদেরও চিহ্নিত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, রামুতে এসেও শুনেছি এখনও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের হুমকি-ধমকি দেয়া হচ্ছে। এরা কারা? এদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সভায় বক্তব্য শুরুর একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তার পাশে দাঁড়ানো বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি ও কমলাপুর ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের মহাধ্যক্ষ শুদ্ধানন্দ মহাথেরোকে বক্তব্য দিতে অনুরোধ করেন। বৌদ্ধ ধর্মগুরু বলেন, ভয়াবহ তাণ্ডবলীলায় আমরা হতবাক, আমাদের কিছু বলার নেই। তিনি বলেন, সেই দিন আমার জীবনও বিপন্ন হয়েছিল। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি আমি। স্বাধীনতার ৪০ বছর পর এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হবো ভাবিনি। তিনি সবার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে বলে মন্তব্য করেন। বৌদ্ধ ধর্মগুরুর বক্তব্য শেষে আবারও ডায়াসে যান প্রধানমন্ত্রী। তিনি রামুর সহিংসতাকে বর্বরোচিত উল্লেখ করে বলেন, দেশে সব ধর্মের মানুষের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। সংবিধান স্বীকৃত এই অধিকার চর্চায় কোন প্রতিবন্ধকতা বরদাশত করা হবে না। এসময় তিনি সম্প্রীতি রক্ষায় এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে না পারে- সেজন্য সব ধর্মের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সর্বধর্মীয় শান্তি কমিটি গঠনের আহ্বান জানান। তিনি সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হলে অন্যান্য দেশে বাংলাদেশী মুসলিমরাও আক্রান্ত হতে পারে।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আমি এখানে এসেছি। এখানে যা ঘটেছে তা সহ্য করা যায় না। ইসলাম শান্তির ধর্ম। কোআন শরীফে বলা আছে- যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে। এরকম একটা জঘন্য কাজ (হামলা) কোন মুসলমান করতে পারে না। যারা এটা করেছে তারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করে না, তারা মানবতায় বিশ্বাস করে না।
প্রধানমন্ত্রী জানান, যেসব বৌদ্ধমন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে তাদের পাশে দাঁড়ানো সকলের কর্তব্য। তিনি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধবিহার ও বসতবাড়ি পুনঃনির্মাণ করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, সরকারি অর্থে পুড়ে যাওয়া ১২টি বৌদ্ধবিহারের সংস্কার করা হবে। বৌদ্ধবিহারগুলোর সংস্কারের জন্য যা যা করা দরকার, সরকারের পক্ষ থেকে তা করা হবে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর ভাণ্ডার থেকে এক কোটি ৩৪ লাখ আর বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে দুই কোটি ৪৮ লাখ নগদ টাকা (মোট তিন কোটি ৮২ লাখ ৪৬ হাজার টাকা) ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তা দেন। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের গৃহনির্মাণের জন্য ৩০৭ বান টিন, ৩৫.৬২ টন চাল, ২৪৬টি কম্বল, ১০৭ বান্ডিল কাপড়চোপড় ও স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ২৯ সেট বইও দেন।
রামুতে পৌঁছানোর পর শেখ হাসিনা গত ২৯শে সেপ্টেম্বর রাতে ওই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ মন্দিরগুলো পরিদর্শন করেন। তিনি একে একে সীমা বৌদ্ধ বিহার, লাল চিং, সাদা চিং বিহারে যান এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তিনি রামু খিজারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সমপ্রীতি সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। সম্প্রীতি সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বীর বাহাদুর এমপি, এ্যাথিন রাখাইন এমপি, কক্সবাজার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমদ চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এড. একে আহমদ হোসাইন, সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা সালাউদ্দিন মোহাম্মদ তারেক প্রমুখ। বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অনুদানের চেক ও ত্রাণ বিতরণ করেন।
অনুষ্ঠান শেষে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজারে ফিরে যান প্রধানমন্ত্রী। দুপুরে কক্সবাজার সার্কিট হাউজে জেলার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিকাল ৪টায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন প্রধানমন্ত্রী।
রামুতে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন কমলাপুর ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের মহাধ্যক্ষ শুদ্ধানন্দ মহাথেরো, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ ও আমীর হোসেন আমু, যুগ্ম সাধারণ সমপাদক মাহাবুবুল আলম হানিফ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, জাসদের সাধারণ সমপাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া, ন্যাপের সাধারণ সমপাদক এড. এনামুল হক, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের আহ্বায়ক ওয়াাজেদুল ইসলাম, গণ আজাদী লীগের সভাপতি হাজী আবদুস সামাদ, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সমপাদক নুরুর রহমান সেলিম প্রমুখ।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক
অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির যে কোন চেষ্টা ঠেকাতে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি রক্ষায় সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে কমিটি গঠনের পরামর্শও দেন তিনি। গতকাল দুপুরে কক্সবাজার সার্কিট হাউজে জেলার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি।
ঈদুল আজহা ও দুর্গাপূজার আগে বৌদ্ধ বিহারের হামলার মতো সামপ্রদায়িক সন্ত্রাস যেন না ঘটে, সেজন্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। সব ধর্মের মানুষদের নিয়ে সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সামনে অনেক খেলা হতে পারে। আপনাদের সতর্ক থাকতে হবে।
গত ২৯শে সেপ্টেম্বর রামুতে বৌদ্ধ বিহারের হামলা পরিকল্পিত দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই ধরনের ঘটনা অনভিপ্রেত। এটি একটি গর্হিত অপরাধ। এ ধরনের কাজ ইসলাম সমর্থন করে না। এই ঘটনা আমাদের ধর্মের বাইরে। যারা এখনও রামুর বৌদ্ধদের হুমকি দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতেও কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।
সভায় চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ সিরাজুল হক খান, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জসিমউদ্দিন, পুলিশ সুপার সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, রামুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবী চন্দ্র ২৯শে সেপ্টেম্বরের ঘটনা এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি নওশের আলী প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, হামলায় জড়িত বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT