টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!
শিরোনাম :
টেকনাফ সমিতি ইউএই’র নতুন কমিটি গঠিতঃ ড. সালাম সভাপতি -শাহ জাহান সম্পাদক বৌ পেটানো ঠিক মনে করেন এখানকার ৮৩ শতাংশ নারী ইউপি চেয়ারম্যান হলেন তৃতীয় লিঙ্গের ঋতু টেকনাফে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ৭ পরিবারের আর্তনাদ: সওতুলহেরা সোসাইটির ত্রান বিতরণ করোনা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কঠোর বিধি, জনসমাবেশ সীমিত করার সুপারিশ হেফাজত মহাসচিব লাইফ সাপোর্টে জাদিমোরার রফিক ৫ কোটি টাকার আইসসহ গ্রেপ্তার মিয়ানমার থেকে দীর্ঘদিন ধরে গবাদিপশু আমদানি বন্ধ: বিপাকে করিডোর ব্যবসায়ীরা টেকনাফ পৌরসভা নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করলেন যাঁরা বাহারছরা ইউপি নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করলেন যাঁরা

যে গণহত্যা যুক্তরাষ্ট্র ভুলে গেলেও ভোলেনি বাংলাদেশ

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৬
  • ৮০ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
টেকনাফ নিউজ ডেস্ক []

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক প্রকাশনায় বলা হয়েছে, এটি এমন এক গণহত্যা যা যুক্তরাষ্ট্র ভুলে গেলেও বাংলাদেশ ভুলতে পারেনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সে সময় লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল।তবে শীতল যুদ্ধভিত্তিক ভূ-রাজনীতি এ দেশের অরক্ষিত মুসলমানদের আরো ঝুঁকিতে ফেলেছিল।

স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট যুক্তরাষ্ট্র সরকার পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। এর অধীন ৯টি গবেষণা কেন্দ্র, ১৯টি জাদুঘর এবং বিশ্বজুড়ে ১৮০টিরও বেশি সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।বাংলাদেশে গণহত্যা নিয়ে স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের নিবন্ধের শুরুতেই সাবেক মার্কিন কূটনীতিক আর্চার কে ব্লাডের প্রসঙ্গ টানা হয়েছে। কূটনীতিক ব্লাড ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল লিখেছিলেন, ‘আমাদের সরকার গণতন্ত্রের অবনমনকে নিন্দা জানাতে ব্যর্থ  হয়েছে। আমাদের সরকার নৃশংসতার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে…আমাদের সরকার যা করেছে তাকে অনেকেই নৈতিক দেউলিয়াত্ব হিসেবে বিবেচনা করবে। ’

আর্চার কে ব্লাড তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রক্তাক্ত হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ পর ওই মন্তব্য করেছিলেন। ওই হত্যাযজ্ঞই বাংলাদেশ সৃষ্টির পথ দেখায় বলে স্মিথসোনিয়ানের নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রুয়ান্ডার গণহত্যা, হলোকাস্ট বা যুগোশ্লাভিয়া ভাঙতে হত্যাযজ্ঞের মতো ৪৫ বছর আগে বাংলাদেশে গণহত্যা বিষয়ে বিশ্ববাসী তেমন একটা জানে না। অনেকে এটাও জানে না যে বাংলাদেশে ওই গণগত্যায় ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল। সিরিয়ার আলেপ্পোতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা করা উচিত নাকি উচিত নয়—এসব নিয়ে বিতর্কের মধ্যে অতীতকালে গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র কী ব্যবস্থা নিয়েছিল তা অনুধাবন করা আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

স্মিথসোনিয়ানের নিবন্ধে বলা হয়েছে, পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে হাজার মাইলের বেশি ভৌগোলিক দূরত্ব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে আলাদা হওয়ার পথ দেখিয়েছিল। দেশের শিল্পখাতে মোট বিনিয়োগের মাত্র ২৫ শতাংশ আর আমদানির ৩০ শতাংশ পেত পূর্ব পাকিস্তান। অথচ দেশের মোট রপ্তানিতে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগ ছিল ৫৯ শতাংশ। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে নিম্নশ্রেণির মনে করত। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে না নেওয়ার মধ্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি তাদের অনীহার আরো প্রমাণ মেলে। ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ভোলায় প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে তিন লাখ মানুষের মৃত্যু এ অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তোলেছিল। সে সময় দুর্যোগ মোকাবিলায় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দও ছিল চাহিদার তুলনায় অনেক কম।

ফরাসি সাংবাদিক পল ড্রেফুস সে সময়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, বছরের পর বছর ধরে পশ্চিম পাকিস্তান সেরা জিনিসগুলো নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য কিছুই রাখেনি।পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা শুরু করার পর ১৯৭০ সালে প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছিল। পাকিস্তানের অনেক নেতার মতো পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ভোটারদের স্বাধীনতা সীমিত করে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ভোটারদের মতামতের চেয়ে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের মোড়কে সামরিক বাহিনীকে সব কিছুর নিয়ন্ত্রক হিসেবে রাখতে ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।

সত্তরের নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩৮টি আসনে ভোটাররা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করেছিল। অন্যদিকে জনবহুল পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসনের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন।

স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের নিবন্ধে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ফলে ইয়াহিয়া হতাশ হয়েছিলেন এবং দেশের স্থিতিশীলতার নামে জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকতে দেরি করে সামরিক আইন জারি করেছিলেন। শেখ মুজিবের ডাকে পূর্ব পাকিস্তানে তখন বিক্ষোভ-ধর্মঘট ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধ এড়ানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে ১৬ থেকে ২৪ মার্চ ঢাকায় শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়ার মধ্যে বৈঠক চলে। ২৫ মার্চ রাতে মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে কয়েক মাস ধরে পূর্ব পাকিস্তানে আসা ৬০ থেকে ৮০ হাজার পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে বাঙালি নিধনের অভিযান শুরু করে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের এশিয়ান স্টাডি সেন্টারের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো লিসা কার্টিসের মতে, নিহতের সংখ্যা পাঁচ লাখ থেকে ৩০ লাখেরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। সংখ্যা নিয়ে রাজনীতিও হয়েছে। লিসা কার্টিস বলেন, ‘নিহতের সংখ্যা যাই হোক না কেন, বাঙালি জনগণের বিরুদ্ধে স্পষ্টতই বড় ধরনের নৃশংসতা চালানো হয়েছিল। ’

লিসা কার্টিস আরো বলেন, ‘আমাদের স্বীকার করতে হবে যে পাকিস্তানি বাহিনীর যে নৃশংসতার মাত্রা আমরা বাইরে থেকে দেখেছি, বাস্তবে তা আরো অনেক ভয়াবহ ছিল। ’স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের নিবন্ধে বলা হয়েছে, ৯ মাসব্যাপী গণহত্যার মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ধারণা দিয়েছিল যে দুই লাখ বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছে। পাকিস্তান সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া অস্ত্র দিয়েই পাকিস্তানি সেনারা বর্বর ও জঘন্য হামলা চালিয়েছে।

১৯৭১ সালের মে মাসে ১৫ লাখ শরণার্থী ভারতে আশ্রয় চেয়েছিল। নভেম্বর নাগাদ সে সংখ্যা এক কোটিতে দাঁড়িয়েছিল। যুদ্ধ শেষে গর্ভপাতে সহায়তা করতে অস্ট্রেলীয় চিকিৎসক জেফরি ডেভিসকে ঢাকায় এনেছিল জাতিসংঘ। জেফরি ডেভিসের মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণের শিকার বাঙালি নারীর সংখ্যা দুই থেকে চার লাখ বললেও তা বাস্তব সংখ্যার চেয়ে সম্ভবত অনেক কম।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও এ দেশকে এর জন্য অবিশ্বাস্য চড়া মূল্য দিতে হয়েছে।স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের নিবন্ধে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি বাহিনী অপারেশন সার্চলাটের নামে বাংলাদেশে যে নৃশংসতা, নিমর্মতা চালিয়েছিল সে ব্যাপারে সারা বিশ্বই অবগত ছিল। ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানি বাহিনীর ওই হামলাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। সে সময় ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড এবং ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিং—উভয়েই প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রতি পাকিস্তানকে সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু নিক্সন প্রশাসন তাঁদের সেই আহ্বান অগ্রাহ্য করেছিল এবং তাঁদের ফিরিয়ে নিয়েছিল। গণহত্যা সংঘটিত হচ্ছে জেনেও একে গুরুত্ব না দেওয়ার পেছনে শীতল যুদ্ধভিত্তিক উত্তেজনা ও সমীকরণ ছিল। নিক্সন ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানকে এ অঞ্চলে তাঁদের সবচেয়ে কাছের মিত্র মনে করতেন। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে অস্ত্র দিয়েছিল এবং চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার কাজে পাকিস্তানকে ব্যবহার করেছিল।

এ ছাড়া তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতাও এ ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করেছিল বলে মনে করে স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি সই করে ভারত শীতল যুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছিল।

নিক্সন ও কিসিঞ্জার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক অভিযান বা এ নিয়ে আমেরিকানদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত ছিলেন না। তবে তাঁরা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরো জোরদার হওয়ার সম্ভাবনায় ভীত ছিলেন।নিক্সন বলেছিলেন, ‘বিয়াফরা (নাইজেরিয়ার আরেকটি গণহত্যা সৃষ্টিকারী যুদ্ধ) কিছু ক্যাথেলিককে আন্দোলিত করেছে। তবে আপনারা জানেন, আমার মনে হয় বিয়াফরা পাকিস্তানের চেয়ে বেশি মানুষকে আন্দোলিত করেছে। কারণ পাকিস্তানের লোকজন কৃষ্ণকায় মুসলমান। ’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্যারি জে ব্রাস লিখেছেন, ‘সর্বোপরি, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, বিচারের চেয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। ’হ্যারিটেজ ফাউন্ডেশনের লিসা কার্টিসের মতে, স্বাধীনতা অর্জন সত্ত্বেও বাংলাদেশ তার রক্তাক্ত ইতিহাসকে পেছনে ফেলে আসতে সংগ্রাম করেছে। বিদেশে বড় ধরনের গণহত্যার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বুঝতে বাংলাদেশে গণহত্যা নিয়ে আরো গবেষণা হওয়া উচিত।

লিসা কার্টিস প্রশ্ন রাখেন, ‘আমরা কি একে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধের পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখব? মূল্যবোধ ও জাতীয় স্বার্থ মিলে কি আরো জোরালো প্রতিক্রিয়া প্রাপ্য ছিল?’এই প্রশ্নের উত্তর এখন অনেকটাই অতীতকালের বিষয়। কারণ এখন আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া যাবে না।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT