মোবাইল অপারেটর: করোনায় আপদকালীন অফার চাই

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল, ২০২০ ৪:১৯ : অপরাহ্ণ

বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন আর ফটোস্টোরি দেখে বুঝতে পারি উন্নত দেশগুলোতে গত দুই-তিন মাসের অবরুদ্ধ সময়ে ঘরে থেকে বাইরের সঙ্গে যোগাযোগে বারান্দা ও জানালার ব্যবহার বেড়েছে বেশ। আমাদের দেশেও হয়ত তাই, কিন্তু এই সময়ে যোগাযোগের প্রযুক্তি নির্ভরতাও বেড়েছে অনেক।

বাসা থেকে কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ, বন্ধুদের সাথে যোগাযোগে এখন ভিডিও কলই প্রাধান্য পাচ্ছে। সরকারি অনেক জরুরি সভা এখন লাইভ হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমেও কারো মন্তব্য নিতে ভিডিও কল বা লাইভের আয়োজন বেড়েছে। আর এতে বেড়েছে ইন্টারনেট ডেটার ব্যবহার।

দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোও তাই বলছে;  পাশাপাশি এটাও জানলাম মোবাইলে ভয়েস কলের সংখ্যা আগের চেয়ে এই সময়ে কমে এসেছে।
কী কারণ হতে পারে এর?

যেহেতু অনেকে ঘরেই পরিবারের সঙ্গে থাকছেন তাই কাজেকর্মে, বাজারে, বাইরে থেকে ঘন ঘন বাড়িতে ফোন দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে না। জুম, স্ট্রিমইয়ার্ড, হোয়াটঅ্যাপ, ফেইসবুক ব্যবহার করে সহজেই বন্ধুদের কল করে কথা ও ভিডিওতে দেখাদেখি হচ্ছে বলেও ফোন করা হচ্ছে কম।

কিন্তু এর ভিন্ন চিত্রটাও আছে। এই সকালেই কথা হচ্ছিল আনারুলের সাথে। তিনি এটুআইয়ের ই-ফাইলিং সিসটেম নথি সংশ্লিষ্ট একটি সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। নিজের প্রতিদিনের কাজে ইন্টারনেট নির্ভরতা আছে তার। কিন্তু তাই বলে যোগাযোগের জন্য সবার সাথেই ইন্টারনেট কলের সুযোগ কম। যেমন গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের সঙ্গে কথা হয় ফোনেই। বিশেষত বয়স্কদের সাথে। আর আগের চেয়ে এই সময়ে ফোনে কথা বলাটা বেড়েছে তাদের মধ্যে। গ্রাম থেকে ফোনও আসছে ঘন ঘন। তবে ঘন ঘন ও বেশি সময় ধরে ফোনে কথা বলায় কলরেটে ধাক্কা খাচ্ছেন দুই পক্ষই। এদিকে অবরুদ্ধ থাকায় কি ঢাকা কি ঢাকার বাইরে, রিচার্জ করতে ঘন ঘন বাইরে যাওয়া একটু কষ্টকরই।

রিচার্জ করার সমস্যা নিয়ে কথা হলো আরো কয়েকজনের সাথে; এদের সবাই আইটি কোম্পানিতেই কাজ করছেন। ফলে আপদ থাকুন বা না থাকুক, এদের কিন্তু ইন্টারনেট ব্যবহার করা লাগছেই সবসময়। যারা আইটি সার্ভিসে কাজ করেন, তারা জানেন সার্ভার অথবা ডেটাবেজ দুম করে বসে যেতে পারে মাঝরাতেও। ফলে অসময়ের এমন ইনসিডেন্টে ঘরে থেকে কাজ করা বা রিমোট সাপোর্ট দেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে ইন্টারনেট চালু থাকা চাই-ই। আর এখন তো বৈশ্বিক ‘ডিজাস্টার’ চলছে!

ভিডিও কল, ঘরে বসে রিমোট সাপোর্ট দেওয়ার কাজ বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন ইন্টারনেট ফুরাচ্ছে যখন-তখন। আলাপের মাঝপথে কেটে যাচ্ছে ব্রডব্যান্ড সংযোগ। তারপর মোবাইল ডেটা চালু করে পুনরায় সংযোগ করা হলেও কিছুক্ষণ পর তাও ফুরাচ্ছে।

জীবনানন্দ দাশ এসব আগে থেকে বুঝেই যেন বলেছিলেন, ‘ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন‘।

মহামারীর এই সময় কারো জীবন ফুরাচ্ছে, যারা বেঁচে আছেন তাদের কারো ঘরে চাল-ডাল-তেল ফুরাচ্ছে, যারা ঘরে থেকে কাজে সচল আছেন তাদের ইন্টারনেট ডেটা ফুরাচ্ছে, যারা যোগাযোগে আছেন তাদের মোবাইলে টকটাইম ফুরাচ্ছে। এই সময় ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) বলছে, গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল আদায় করা যাচ্ছে না। এমন আরো কিছু কারণ দর্শিয়ে প্রণোদনা প্রস্তাবও করেছে তারা।

অর্থনীতির সব খাতে প্রণোদনার দাবি; কিন্তু বেচারা ইন্টারনেট ডেটা ও মোবাইল টকটাইম গ্রাহকের কথাও তো একটু ভাবতে হবে সবাইকে।

গ্রাহককে প্রথম প্রণোদনা দিতে হবে রিচার্জ করার বা বিল দেওয়ার ক্ষেত্রে। এটি আর্থিক সুবিধা নয়, তবে লেনদেনকে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সহজ ও দ্রুত করার সুবিধাটুকু ফলাও করে দিতে হবে গ্রাহককে।

এমন না যে বিল না দিলেও গ্রাহক ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছে এই সময়। গ্রাহক মোড়ের দোকানে গিয়ে বন্ধ পেয়ে ফিরে আসছে (মাঝে মাঝে ফিরিয়েও দেওয়া হচ্ছে); কোথাও না কোথাও খুঁজেপেতে একটা ব্যবস্থা হিসেবে নগদ-বিকাশ করে বিল চুকিয়ে তারপর মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সচল রাখছে।

গ্রামে বা শহরে যাদের মোবাইলে টকটাইম ফুরাচ্ছে, তারাও একইভাবে শশব্যস্ত হয়ে কোনো না কোনোভাবে রিচার্জ করছেন। কিন্তু এভাবে দু-চারদিন পর পর ডেটা ও টমটাইম রিচার্জ করার জন্য শারীরিক ছুটোছুটি ও মানসিক ধকল ঠিক যায় না ডিজিটাল বাংলাদেশের সঙ্গে।

এই বিল দেওয়ার বিষয়টি কিন্তু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দিয়েও করে ফেলা খুব সহজ ও সম্ভব একটি ডিজিটাল সুবিধা। যারা চাকরিতে আছেন তাদের অধিকাংশের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে; ফলে ডেবিট কার্ডও আছে। যারা অনলাইন শপিং করে অভ্যস্ত, যারা বিশেষত আইটি কোম্পানিতে আছেন তারা ইন্টানেটে ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ড দিয়ে বিল পরিশোধের বিষয়টি বেশ জানেন।

অন্তত এই মানুষগুলো এই দুর্যোগের সময় মোবাইল রিচার্জ করতে, ইন্টারনেটে বিল দিতে এত হয়রানি হবেন তা ভাবতে খারাপ লাগছে। তাছাড়া এটা ঘরের বাইরে বের হওয়ার যৌক্তিক কারণ তৈরি করছে বলে এদের সবার সংক্রমণের ঝুঁকিটাও কিন্তু যৌক্তিক হারে বাড়ছে।

এই সময় ব্রডব্যান্ডের ইন্টারনেট বিল, অপারেটরগুলোর ইন্টারনেট ডেটা কেনার কাজটি অনলাইনে কার্ডে বিল দেওয়ার মধ্যে দিয়ে সহজে করে দেওয়া গেলে গ্রাহকদের জন্যও উপকার তো হবেই; প্রতিষ্ঠানগুলোও নির্ঝঞ্ঝাটে বিল পাবে। একই ভাবে মোবাইল অপারেটরগুলোর টকটাইম কেনার কাজটিও অনলাইনে কার্ডের মাধ্যমে সেরে নিতে পারলে মোবাইলে কথা বলা এই সময় কমবে না; বরং বাড়বেই।

কঠিন এই সময়ে শহরে থাকা একজন যদি অনলাইনে কার্ডে টকটাইম রিচার্জ করে দিতে পারে তার গ্রামে থাকা স্বজনের মোবাইলে তাহলে সেটা দুজনের মনেই স্বস্তি ও ভালোলাগার জন্ম দেবে। অন্তত গ্রাম থেকে এখন ঘন ঘন ফোন দিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা বলতে পারবেন স্বজনরা। আর তাতে নির্ভার থাকতে পারবে শহরে বাস করা পরিবারটিও।

রিচার্জ করার কাজটি ডিজিটাল করার পর এবার একটু খরচের দিকেও তাকাতে হয়। এটি দ্বিতীয় প্রণোদনা এবং এখানে গ্রাহক সামান্য কিছু ছাড় পাওয়ার দাবি করতেই পারেন এই বিশেষ পরিস্থিতিতে।

এর আগে দেশি অপারেটরগুলোর অনেক ধরনের চমকপ্রদ অফার নিয়ে বাহারি নামে প্যাকেজ পেয়েছি আমরা। যেমন, সেহরির সময় এক ধরনের কলরেট, রাতে কথা বলছেন তো এক ধরনের কলরেট, নারীদের জন্য এক ধরনের কলরেট, তরুণদের জন্য এক ধরনের কলরেট, বান্ডল এসএমএস কিনলে এক ধরনের কলরেট।

তাহলে করোনাভাইরাসের কারণে দেশজুড়ে দিনের পর দিন অবরূদ্ধ থাকার এই সময়ে টকটাইম বা কলরেটে গ্রাহকের জন্য নতুন প্যাকেজটি কই? আমি দু-তিনটি অপারেটরের ওয়েবসাইট ঘুরেও এলাম; সেখানে করোনাভাইরাসের এই সময় গ্রাহকদের জন্য বিশেষ কোনো টকটাইম বা কলরেট অফার নেই।

বিপদের এই সময় গ্রাহকদের জন্য এই প্রণোদনাটি এখন একটি জাতীয় দাবি। এতে লোকসান হবে বলেও মনে হয় না; বরং মানুষ মোবাইলে কথা বলায়, মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ চালু রাখায় আরো বেশি উৎসাহী হবেই।

দেশি সবগুলো অপারেটর এই সময় অপেক্ষাকৃত কম কলরেটে একটি আপদকালীন প্যাকেজ অফার করতে পারে গ্রাহকদের। অন্তত আগামী তিন মাসের জন্য এই বিশেষ প্যাকেজ কার্যকর রাখা যেতে পারে; পরে পরিস্থিতি বুঝে আরো তিন মাস।

আমাদের টেলিকম প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তি বিভাগ যথেষ্ট দক্ষ। ফলে শুধু সময়োপযোগী ও মানবিক এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ হলে কারিগরিভাবে এই প্যাকেজ চালু করা যেতে পারে অবিলম্বেই।

অবরুদ্ধ এই সময়ে মোবাইল ইন্টারনেট ও টকটাইম গ্রাহক এবং পাশাপাশি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গ্রাহকদের জরুরি দাবি, আপদকালীন ডেটা-কলরেট প্যাকেজ অফার ঘোষণা হোক গ্রাহকের জন্য।


সর্বশেষ সংবাদ