মেরিন ড্রাইভে কাজ হয়েছে ২৫%  : ভোগান্তির সোয়া ২ মাস : ঘোষণা ছিল সংস্কারের জন্য ৩ মাস

প্রকাশ: ৮ এপ্রিল, ২০১৯ ১১:১০ : অপরাহ্ণ

টেকনাফ নিউজ ডেস্ক::

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে ভোগান্তির সোয়া ২ মাসে কাজ হয়েছে ২৫%
নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না হাজারো শিক্ষার্থী
হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কক্সবাজার-টেকনাফ সমুদ্রতীরবর্তী মেরিন ড্রাইভে যান চলাচল এখন নির্ভর করে সামুদ্রিক জোয়ারভাটার মর্জির উপর। সাগরে ভাটা থাকলেই কেবল মেরিন ড্রাইভ সচল, জোয়ার থাকলে শহরের সাথে বিচ্ছিন্ন। মেরিন ড্রাইভের সাথে শহরের একমাত্র সংযোগ সড়কটি সংস্কারের জন্য গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকে পৌর কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে রাখায় গত সোয়া ২ মাস ধরে চলছে এ ভোগান্তি। এরফলে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক ছাড়াও কলাতলীর দক্ষিণ অংশের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ চরম দূর্ভোগে পড়ছেন।
কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র গত জানুয়ারি মাসের শেষদিকে এক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকে চলতি এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৩ মাসের জন্য কলাতলীর গ্রামীণ সড়কটি সংস্কারের জন্য বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। যথারীতি ২ ফেব্রæয়ারি থেকে সড়কটি বন্ধ করে দেয়া হলে শহরের সাথে মেরিন ড্রাইভ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরে সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগ মেরিন ড্রাইভের বেইলি হ্যাচারি পয়েন্ট থেকে সমুদ্র সৈকতে ওঠানামার একটি বিকল্প পথ তৈরি করে। একইভাবে কলাতলী পয়েন্টেও মাটি দিয়ে একই ধরনের পথ তৈরি করে। কিন্তু সমুদ্র সৈকত ধরে সনাতনী উপায়ে যানবাহন চলাচল নির্ভর করছে এখন সমুদ্রের জোয়ার ভাটার মর্জির উপর। প্রতিদিন দুইবার সামুদ্রিক জোয়ারের সময় ৪/৫ ঘন্টা করে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। ফলে শহরের একাংশের হাজার হাজার মানুষ ও শত শত যানযাহন সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এছাড়া সমুদ্র সৈকতে চলাচল করতে গিয়ে সামুদ্রিক জোয়ারের ধাক্কায় প্রতিদিন দূর্ঘটনাও ঘটছে। এ অজুহাতে যাত্রীবাহী অটোরিক্সা ও ই-বাইকগুলো গাড়ীভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসায়ী সমাজ ও স্কুলগামী শিশু শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা।
স্থানীয়রা জানান, কলাতলীর দক্ষিণে মেরিন ড্রাইভের ২ কিলোমিটারের মধ্যে দু’টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও কোনো হাইস্কুল নেই। তাই ওই অংশের বেশিরভাগ শিশুকে ওই সড়কটি পার হয়ে কলাতলী উত্তর অংশের স্কুলে আসতে হয়।
কলাতলী সৈকত কিন্ডার গার্টেন স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র ও দরিয়ানগর এলাকার বাসিন্দা আহমদ আসরার ও একই স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র আহমদ আবরার জানায়, আগে স্কুলে যাতায়াত করতে তাদের প্রতিজনকে ভাড়া দিতে হত ৫ টাকা করে ১০ টাকা। আর এখন দিতে হয় চারগুণ বা ২০ টাকা করে ৪০ চল্লিশ টাকা। এছাড়া ঠিকমত গাড়ি পাওয়া যায় না কিংবা জোয়ারভাটার কারণে ঠিকসময়ে স্কুলে পৌঁছা যায়না বলে গত সোয়া ২ মাস ধরে নিয়মিত স্কুলে যাতায়াত করতে পারছে না।
কলাতলী হাইস্কুল ও সৈকত কেজি স্কুলের শিক্ষকরা জানান, রাস্তা বন্ধ করার পর থেকে অসংখ্য শিশু স্কুলে অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. ইসমাইল সওদাগর বলেন, কলাতলী সড়কটি সংস্কারের পর থেকেই কলাতলীর দক্ষিণ অংশের ব্যবসায়ী সমাজ চরম লোকসানের মুখে পড়েছে। জিনিসপত্রের দাম বেশি পড়ায় ক্রেতাদের সাথে নিত্য বাকবিতন্ডা হচ্ছে।
একইভাবে মেরিন ড্রাইভের অর্ধশতাধিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলো আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে বলে জানান হিমছড়ির পর্যটন ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন।
কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সমুদ্রের তীর ধরে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি গত প্রায় ২ বছর আগে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। তবে ১৯৯১-৯২ সালে সড়ক প্রকল্পটি গ্রহণের পর থেকেই নির্মাণ কাজ শুরু হয়। কিন্তু মেরিন ড্রাইভের স্টার্টিং পয়েন্ট কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে বেইলি হ্যাচারি মোড় পর্যন্ত প্রায় ১৩শ’ মিটার সড়ক বিগত ২০০০ সালে সামুদ্রিক ভাঙনে বিলীন হয়ে গেলে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে সড়ক যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০০৫-০৬ সালে কলাতলী গ্রামের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া সংকীর্ণ সড়কটিকে সামান্য প্রশস্ত করে মেরিন ড্রাইভের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি সংস্কার না হওয়ায় সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়লে পৌর কর্তৃপক্ষ সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এ পথে বর্তমানে হাজার হাজার পর্যটক ছাড়াও প্রতিদিন সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলাচলকারী দেশের ও বিদেশের ভিভিআইপিসহ স্থানীয় অধিবাসীরা চলাচল করেন। বিশেষ করে কলাতলী ও এর দক্ষিণ অংশ দরিয়ানগর, হিমছড়িসহ বিশাল এলাকার সাথে শহরের একমাত্র সড়ক যোগাযোগ মাধ্যম হওয়ায় এসব এলাকার হাজার হাজার অধিবাসীকে পড়তে হচ্ছে চরম দূর্ভোগের মুখে। অথচ তিন মাসের জন্য সড়কটি বন্ধ করা হলেও গত ২ মাস ৮ দিনে কাজ হয়েছে মাত্র এক চতুর্থাংশ।
তবে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, বার বার প্রকল্পের ডিজাইন পরিবর্তন এবং সড়কের ড্রেইন নির্মানে এলাকাবাসীর জমি না ছাড়ার কারণে প্রকল্পের কাজে এ ধীরগতি। তবে আগামী তিনমাসের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।
কক্সবাজার পৌরসভা সূত্র জানায়, ইউজিআইআইটি প্রকল্পের অধীনে অন্য আরো দুটি সড়কের সংস্কার কাজসহ প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি সংস্কারের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
সহকারী প্রকৌশলী টিটন দাশ জানান, পৌরসভার নিয়ম অনুযায়ী ৩৬৫দিনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হয়। কিন্তু ড্রেনের জন্য জমি নিয়ে জটিলতা এবং বার বার ডিজাইন পরিবর্তনের কারণে সঠিক সময়ে কাজটি শেষ করা যাচ্ছেনা।
তিনি বলেন, এ প্রকল্পে প্রথমে ছিল শুধুমাত্র ১হাজার ৫০০ মিটার কার্পেটিং সড়ক। পরবর্তীতে এটিকে কার্পেটিং থেকে আরসিসি ঢালাই সড়ক করা হয়। এরমধ্যে প্রকল্পের কাজ শুরু করা হলে এলাকাবাসীর কাছ থেকে দাবি আসে সড়কের পাশে ড্রেন নির্মাণের। ড্রেনের জন্য জায়গা বের করতে গেলেই জটিলতা শুরু হয়। এনিয়ে এলাকাবাসীর অনেকের সঙ্গে পৌর কর্তৃপক্ষের বিরোধ দেখা দেয়। এসব কারণে মূলত সংস্কার কাজে ধীরগতি চলছে।
প্রকৌশলী টিটন দাশ জানান, এখন পর্যন্ত প্রকল্পের মাত্র ২৫ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী দুই-তিনমাসের মধ্যে শতভাগ কাজ শেষ করা যাবে বলে তিনি আশা করেন।


সর্বশেষ সংবাদ