টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

টেকনাফে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের দামী গাড়ি ও বাড়ি :মাসে হাজার কোটি টাকার ইয়াবা

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই, ২০১৩
  • ৫০২ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

1374341214.সাখাওয়াত হোসেন,ইনকিলাব::::পাঠকদের সুবিধার্থে হুবহু কপি তুলে ধরা হল। দাবী ও অভিযোগ ইনকিলাব কর্তৃপ বরাবর। উক্ত সংবাদে টেকনাফ নিউজ ডটকম কোনভাবে দায়ী নয় । মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পথে দেদারসে ঢুকছে ভয়ংকর মাদক : সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে সর্বগ্রাসী ইয়াবা ব্যবসা। ইয়াবাই এই অঞ্চলের মানুষের এখন একমাত্র ব্যবসা। মিয়ানমার থেকে সীমান্তপথে প্রতিমাসে আসছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ভয়ংকর মাদক ইয়াবা। বাংলাদেশে পাচারের জন্য মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে ৩৭টি ইয়াবা কারখানা। এ সব কারখানা থেকে প্রতিদিন ৩০ লাখ ইয়াবা টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদীসহ ৪৩টি পয়েন্ট দিয়ে আসছে। বাংলাদেশে প্রতিটি ইয়াবা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ইয়াবা পাচারের এ সিন্ডিকেট  নিয়ন্ত্রণ করছে টেকনাফের স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাসহ ২৫ থেকে ৩০জন মাদক ব্যবসায়ী। স্থানীয়রা মৎস্য আহরণ এবং লবণ ব্যবসা বাদ দিয়ে যোগ দিচ্ছে ইয়াবা পাচার চক্রে। জড়িত হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও। পাল্টে যাচ্ছে টেকনাফ ও উখিয়ার মানুষের জীবনযাত্রা। এ অঞ্চলের নানা বয়সী ৫ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে এখন মাদক ব্যবসায় জড়িত। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে সর্বগ্রাসী ইয়াবা ব্যবসা। ফলে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির স্থানীয় কর্মকর্তারা ইয়াবার ভয়াবহ ছোবল থেকে সমাজকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ সুযোগে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনেকেই এ অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন বা মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয় দিচ্ছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলা পুলিশ মাদক প্রতিরোধের চেয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতেই বেশি আগ্রহী। ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে প্রতিবেদন পাঠানো হলেও তা আর কখনো আলোর মুখ দেখে না। দেশের যুব সমাজ ও স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ধ্বংসের সুদূরপ্রসারী নীল নকশা তৈরি করে পরিকল্পিতভাবে একটি চক্র হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ইয়াবা ব্যবসার এই কাঁচা টাকা দিয়ে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহসহ দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম যুব সমাজকে অন্ধকারের পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ভয়াবহ ইয়াবার ছোবল থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় ইয়াবার ভয়ংকর ছোবল শুধু মারাত্মক সমস্যা নয়, বড় ধরনের সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়াবে। গত কয়েকদিন টেকনাফ ও উখিয়া ঘুরে এবং অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কঠোর হস্তে দমনের ক্ষমতা দিতে হবে। রাজনৈতিকভাবে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কোন শেল্টার দেয়া যাবে না এটি সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোন প্রকার তদ্বিরে নয়, পেশাদার সৎ কর্মকর্তাদের ওই অঞ্চলে দায়িত্ব দেয়া এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনা তৈরির মধ্যমেই ইয়াবা প্রতিরোধ করতে হবে।  আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, মাদকের ব্যাপারে কোন প্রকার ছাড় নয়। মাদক ব্যবসায়ী পুলিশের কাছে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবেই চিহ্নিত। এদের কঠোর হস্তে দমনের জন্য সারাদেশের পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দেশের যুব সমাজকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে হলে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশ মাদক ব্যবসায়ীদের কঠোর হস্তে দমন করছে এবং আগামীতেও করবে। এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, পুলিশের কোন সদস্য বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা বা অন্য কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।  অনুসন্ধানকালে বেশ কয়েকজন লবণ ব্যবসায়ী ও টেকনাফের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই এলাকায় এখন আগের মতো কেউ লবণ উৎপাদন নিয়ে কাজ করেন না। মাছ আহরণে আগের মতো উদ্যোগ নেই। ইয়াবাই এই অঞ্চলের মানুষের এখন একমাত্র ব্যবসা। যুবক শ্রেণী ছাড়াও স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী এমনকি গৃহবধূরাও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চলছে এই মাদক ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের বিরুদ্ধেও। শুধু তাই নয়, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির স্থানীয় সদস্যরা যা উদ্ধার করছেন তা অতি সামান্য। আর ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ইয়াবার শতকতা ১০ ভাগ দেখানো হয়। বাকী ৯০ ভাগ আবার গোপনে বিক্রি করা হয় মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে। এমনকি লাখ লাখ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের পর সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে ছেড়ে দেয়া হয়। এই সুযোগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কতিপয় স্থানীয় সংবাদকর্মীও ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।  গত ১৭ জুলাই রাতে টেকনাফের নাজিরপাড়া থেকে পুলিশ ৩ লাখ পিচ ইয়াবাসহ ইয়াবা ব্যবসায়ী সৈয়দ হোসেন মেম্বারের ভাইকে আটক করে। পরে থানায় নেয়া হলে ওসি ইয়াবা রেখে ওই মাদক ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দেয়। খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক গেলে পুলিশ তাদের সাথে বেশ কিছু সময় কথা বললে তারা চলে আসেন। যা তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। গত ৯ জুলাই বাহারছড়া ইউনিয়নে ইয়াবা ব্যবসায়ী রতনকে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতার করে। পরে ২ হাজার ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে ৪জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর-১৬। গত ১৭ জুলাই টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপে ৪ নম্বর স্যুইজগেটে ৩ ইয়াবা মহিলা মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৭০ হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ ও বিজিবি। পরে ২০ হাজার উদ্ধার দেখানো হয়। গত ১৭ জুলাই বিজিবি টেকনাফ ১ নম্বর স্যুইজ গেট থেকে ৩০হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে। পরে দেখানো হয় ১৩হাজার ৬৫২ পিচ। একই দিনে পুলিশের এসআই ইয়াসিনের নেতৃত্বে ৩০হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে পরে দেখানো হয় ১৪হাজার।  টেকনাফের নিলা ইউনিয়নের বাসিন্দা জাফর আলম জানান, মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় গত এক বছর যাবত তিনি এলাকায় যেতে পারছেন না। মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে কেউ ইয়াবাসহ ধরা পড়লে তার নাম ব্যবহার করে। টেকনাফের বাসিন্দা সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির ছাত্র মোঃ গিয়াস উদ্দিন বলেন, টেকনাফে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকা খচর করে বাড়ি করছে। মাদক ব্যবসায়ীরা দামি গাড়ি ব্যবহার করছে। প্রশাসন এসব দেখে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। কোথায় থেকে কোটি কোটি টাকা আসছে তা দেখার জন্য টেকনাফে কোন সরকার বা প্রশাসন নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আগে টেকনাফের মানুষ লবণ চাষ, চিংড়ি ছাষ বা মাছ ধরার কাজ করতো। এখন সবাই ইয়াবা ব্যবসায়ী। টেকনাফ সদরের সিমেন্ট ব্যবসায়ী মুক্তার আহমেদ জানান, তিনি শহরে রড সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। পরে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা তাকে ইয়াবা ব্যবসায় সহযোগিতা করতে বলে। রাজি না হওয়ায় মানব পাচার মামলায় জড়িয়ে দেয়া হয় তাকে। বর্তমানে তিনি টেকনাফ ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মুক্তার জানান। উখিয়া-

 

টেকনাফের সংসদ সদস্য স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি গত রাতে দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, তিনি বা তার পরিবারের কোন সদস্য ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত নন। রাজনৈতিকভাবে তাকে ও তার পরিবারকে হেয় করতে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, মায়ানমার থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বাংলাদেশে আসছে। এই মাদক বন্ধের জন্য তিনি সংসদেও কথা বলেছেন। কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা ইয়াবা ব্যবসা করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। সকলেই এদের চিনে। কিন্তু গ্রেফতারের পর জামিন পেয়ে আবার একই কাজ করছে।

উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, টেকনাফের প্রায় সবাই ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। ইয়াবা ব্যবসা দিন দিন বাড়ছে। তিনি বলেন, আমরা মাদকের বিরুদ্ধে এক সাথে কাজ করতে চাই। সে জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইয়াবা ধরার জন্য সবাই (আইন-শৃংখলা বাহিনী) আগ্রহী। এক লাখ ধরলে দেখানো হয় ২০ হাজার। বন্ধের কোন উদ্যোগ নেই। ইয়াবা ব্যবসায় যারা গডফাদার তারা বহাল তবিয়তে বলে ওই রাজনীতিবিদ মন্তব্য করেন। বিজিবির ৪২ ব্যাটালিয়নের সিও লেঃ কর্নেল জাহিদ হাসান জানান, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করে মামলা দায়ের করা হলেও কোন শাস্তি হচ্ছে না। গ্রেফতারের পর জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই ধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। বিজিবি চেষ্টা সত্ত্বেও  নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বিজিবি টেকনাফে ২৪ ঘন্টা দায়িত্ব পালন করছে। নাফ নদী পুরোটাই ওপেন। সীমান্তে কাঁটাতারের ব্যবস্থা নেই। আমরা নিজস্ব গোয়েন্দার মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।  এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিজিবির কোন সদস্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতা তৈরি বা ইয়াবা উদ্ধারের পর মাদক ব্যবসায়ীদের ছেড়ে দিয়ে এমন কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। বিজিবি এ ধরনের কাজের সাথে জড়িত থাকার কোন সুযোগ নেই। তবে কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দিনকে দিন বাংলাদেশে ইয়াবার চাহিদা বাড়ছে। শুধুমাত্র এ দেশে চোরাইপথে পাচারের জন্য মায়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় ৩৭টি ইয়াবা কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। ওই ৩৭টি কারখানা থেকে প্রতি দিন ৩০ লাখ ইয়াবা টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদীসহ ৪৩টি পয়েন্ট দিয়ে আসছে। বিভিন্ন ধরনের ইয়াবার মধ্যে এস ওয়াই, জিপি, এনওয়াই, ডব্লিউ ওয়াই, গোল্ডেন, আর-২ ও চম্পা জনপ্রিয়। এ সব পয়েন্টে মধ্যে রয়েছে—মায়ানমারের মংডু ও আকিয়াব ইত্যাদি শহর থেকে সমুদ্র ও নাফ নদী পার হয়ে ফিশিং বোট, লবণের কার্গো বোট ও অন্যান্য কাঠের বোটের মাঝিদের মাধ্যমে ইয়াবা আসে। টেকনাফ স্থল বন্দরের বিভিন্ন বৈধ আমদানী পণ্যের ভিতর দিয়ে এবং স্থল বন্দরে পণ্য বোঝাই আগত কার্গো ও অন্যান্য বোটের মায়ানমার ক্রুদের মাধ্যমে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের গরু আনার করিডোর দিয়ে বোটে করে শ্রমিক/মাঝি-মাল্লার মাধ্যমে এছাড়া টেকনাফের জালিয়াপাড়া, নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, বরইতলী, হ্নীলা, সাবরাং নয়াপাড়া ইত্যাদি এলাকার নাফ নদী পাড় হয়ে ইয়াবা টেকনাফে আসে। সমুদ্র পথে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া চ্যানেল হয়ে লবণের ও অন্যান্য জলযানের মাধ্যমে চোরাই পথে ইয়াবা চট্টগ্রাম পৌঁছায়, তাছাড়া টেকনাফ হতে সরাসরি বাসে কক্সবাজার বা ঢাকা বাহকের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে কক্সবাজার হতে এসএ পরিবহনের মালামালের মাধ্যমে চট্টগ্রাম/ঢাকা প্রেরণ করা হয়। মায়ানমারে বাংলাদেশ হতে জ্বালানি তেল, ওষুধ, সারসহ বিভিন্ন পণ্য চোরাই পথে পাচার করে বিনিময়ে উল্লেখিত ইয়াবাসহ অন্যান্য পণ্য আনা হয়। টেকনাফে ট্রানজিট ঘাটে ও অন্যান্য স্থানে সাধারণত বোরকা পরা মহিলাদের ইয়াবা পাচার কাজে ব্যবহার করা হয়। উল্লিখিত মহিলারা সীমান্ত এলাকার আশপাশে বসবাস করে থাকে। সীমান্ত এলাকার বসবাসকারী হিসেবে ১২ ঘণ্টার ট্রানজিট পাস নিয়ে এপার-ওপার গমনাগমনের সুযোগে চোরাচালানিরা উক্ত মহিলাদেরকে অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার করে থাকে। ট্রানজিট ঘাটে মহিলা পুলিশ বা আনসার না থাকায় সহজেই বোরকা পরিহিত মহিলারা ইয়াবা আনার সুযোগ পায়। ইয়াবা আকারে ছোট হওয়ায় মানব দেহের বিভিন্ন জায়গা, সিগারেটের পেকেট, দিয়াশলাইয়ের বাক্স, মোবাইল চার্জার, মোবাইল ইত্যাদির মাধ্যমে পাচার হয়ে থাকে। উঠতি বয়সের বিভিন্ন তরুণ, ভিআইপি ও বিত্তশালীরা, বোরকা পরিহিত মহিলা, আলখেল্লা পরিহিত ধর্মীয় লেবাসধারী লোক ইয়াবা পাচারে বাহক হিসেবে নিয়োজিত। ইয়াবা বাহক মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার অথবা পাবলিক বাস যোগে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকায় সরবরাহ করে থাকে। মাঝে মাঝে কুরিয়ার সার্ভিস (এসএ পরিবহন)কেও এ কাজে ব্যবহার করা হয় বলে জানা যায়। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দা রমজান আলী ওরফে একটেল রমজান এবং শুক্কুর ওরফে বার্মাইয়া শুক্কুর (প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ভাই) এর মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসা জোরদার হয়। বর্তমানে এই দু’জন ইয়াবা ব্যবসায়ী শত শত কোািট টাকার মালিক। যা ওপেন সিক্রেট। তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। পরবর্তী সময়ে ইয়াবা ব্যবসা ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। মায়ানমারের বৌদ্ধভিক্ষু, রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের একটি অংশও ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছে। এদের অনেকেই একাধিকবার গ্রেফতার হলেও পরে জামিনে বেরিয়ে আসে। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের জামিন করানো এবং আইনÑশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলে ছাড়িয়ে আনার জন্য কাজ করে গডফাদাররা। যারা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত রয়েছে। প্রভাবশালী ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে, টেকনাফের মোসতাক পিতা-জাফর আহমেদ, দিদার হোসেন পিতাজাফর আহমেদ, মৌলবী বোরহান পিতা মৌলভী হান্নান, জাহেদ হোসেন ওরফে জাক্কু পিতা আবেদিন, শুক্কুর ও মজিবর পিতা এজহার কোম্পানী, একরাম পিতা আব্দুর সাত্তার, আনোয়ার পিতা সিদ্দিক, নূর মোহাম্মদ পিতা আবুল কাশেম, আয়ুব পিতা আলী আহমেদ, নূর কামাল পিতা আমিন, ইয়াদু পিতা আব্দুর রশিদ, মোহাম্মদ আলী, হোছন আলী আহমেদ, রাশেদুল করিম, পিতা হাকিম আলী, জাহেদুল ইসলাম পিতা জহির আহমেদ, সাহাদাত হেসেন পিতা মনির, রমজান অঅলী, ছৈয়দ করিম, সাইফুল ইসলাম ওরফে মগা সুইবনি, আব্দুল করিম অন্যতম। অসংখ্যবার ছোট মাঝারী ইয়াবার চালান বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারের রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে ইয়াবার বিরাট মার্কেট তৈরী হয়েছে, অর্থাৎ যুব সমাজের বিরাট একটি অংশ ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছে যা একটি দেশের জন্য অশনি সংকেত। ইয়াবা কি? ইয়াবা একটি মেথামফেটামাইন মিশ্রিত ড্রাগ । ইয়াবা শব্দটি এসেছে থাইল্যান্ড থেকে। ইয়াবাকে বাংলা অর্থ উত্তেজক ওষুধ বা পাগলা ওষুধ, যা সেবন করলে মানুষের অতি মাত্রায় উত্তেজক করে তুলে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইয়াবাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন: ইন্ডিয়াতে বলে ভুলভুলাইয়া, ফিলিপাইনে ও ইন্দোনেশিয়ায় বলে শাবু,উত্তর থাইল্যান্ডে এর নাম চাকোস, সাউথ আফ্রিকায় বলে টিংকু, ব্রাজিলে বলে বালা ইত্যাদি। বাংলাদেশে কোন কোন এলাকায় ইয়াবাকে ‘‘বাবা”ও বলে। ইয়াবা তৈরী করা হয় ২৫-৩৫ মি: গ্রা: মেথামফেটামাইন ও ৪৫-৬৫ মি: গ্রা: ক্যাফেইন এর সংমিশ্রণে। কোনো কোনো সময় ১০-১৫% হেরোইন ও মিশিয়ে থাকে। ইয়াবা সাধারণত উজ্জ্বল লাল, গোলাপী, কমলা ও সবুজ ইত্যাদি রঙের হয়ে তাকে। এটি স্বাদে হালকা মিষ্টি এবং বিভিন্ন ফ্লেভারে তৈরী করা হয়, যেমন: আংগুর, কমলা, ভেনিলা ইত্যাদি। ট্যাবলেট-এর গায়ে সাধারণত খোদাই করে জ অথবা ডন লেখা থাকে। এই ট্যাবলেট আকারে ছোট হওয়ায় একই সাথে অনেকগুলো ট্যাবলেট সহজেই বহন করা যায়। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইয়াবা তৈরী হয় মায়ানমারে। বর্তমানে মায়ানমার থেকেই ইয়াবার সবচেয়ে বড় বড় চালান সীমান্ত পথে অবৈধ ভাবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারীরা পাচার করছে। বিগত ৪০/৪৫ বছর ধরে থাইল্যান্ডে ইয়াবার উৎপাদন ও ব্যবহার হলেও পরবর্তীতে এটি বর্ডার হয়ে মায়ানমারে পাচার হতে থাকে। একটি সময় থাইল্যান্ডের বিভিন্ন তেল ষ্টেশনে এই ইয়াবা বিক্রি হত। তখন মূলত ট্রাক ড্রাইভাররা ইয়াবা সেবন করে দীর্ঘ পথ না ঘুমিয়ে গাড়ী চালাত। কিন্তু দেখা গেছে সে সময় রাস্তায় প্রচুর দুর্ঘটনা সংঘটিত হত। ফলে ১৯৭০ সালে থাইল্যান্ডে সরকারী ভাবে ইয়াবা ব্যান্ড করা হয়। এ সময় অনেক ইয়াবা ব্যবসায়ীকে হত্যাও করে স্থানীয় প্রশাসন।  ১৯৯৯/২০০০ সালের দিকে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পথে দেদারসে ঢুকছে ভয়ংকর মাদক : সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে সর্বগ্রাসী ইয়াবা ব্যবসা। ইয়াবাই এই অঞ্চলের মানুষের এখন একমাত্র ব্যবসা। সাখাওয়াত হোসেন টেকনাফ থেকে ফিরে : মিয়ানমার থেকে সীমান্তপথে প্রতিমাসে আসছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ভয়ংকর মাদক ইয়াবা। বাংলাদেশে পাচারের জন্য মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে ৩৭টি ইয়াবা কারখানা। এ সব কারখানা থেকে প্রতিদিন ৩০ লাখ ইয়াবা টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদীসহ ৪৩টি পয়েন্ট দিয়ে আসছে। বাংলাদেশে প্রতিটি ইয়াবা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ইয়াবা পাচারের এ সিন্ডিকেট  নিয়ন্ত্রণ করছে টেকনাফের স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাসহ ২৫ থেকে ৩০জন মাদক ব্যবসায়ী। স্থানীয়রা মৎস্য আহরণ এবং লবণ ব্যবসা বাদ দিয়ে যোগ দিচ্ছে ইয়াবা পাচার চক্রে। জড়িত হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও। পাল্টে যাচ্ছে টেকনাফ ও উখিয়ার মানুষের জীবনযাত্রা। এ অঞ্চলের নানা বয়সী ৫ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে এখন মাদক ব্যবসায় জড়িত। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে সর্বগ্রাসী ইয়াবা ব্যবসা। ফলে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির স্থানীয় কর্মকর্তারা ইয়াবার ভয়াবহ ছোবল থেকে সমাজকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ সুযোগে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনেকেই এ অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন বা মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয় দিচ্ছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলা পুলিশ মাদক প্রতিরোধের চেয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতেই বেশি আগ্রহী। ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে প্রতিবেদন পাঠানো হলেও তা আর কখনো আলোর মুখ দেখে না। দেশের যুব সমাজ ও স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ধ্বংসের সুদূরপ্রসারী নীল নকশা তৈরি করে পরিকল্পিতভাবে একটি চক্র হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ইয়াবা ব্যবসার এই কাঁচা টাকা দিয়ে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহসহ দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম যুব সমাজকে অন্ধকারের পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ভয়াবহ ইয়াবার ছোবল থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় ইয়াবার ভয়ংকর ছোবল শুধু মারাত্মক সমস্যা নয়, বড় ধরনের সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়াবে। গত কয়েকদিন টেকনাফ ও উখিয়া ঘুরে এবং অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কঠোর হস্তে দমনের ক্ষমতা দিতে হবে। রাজনৈতিকভাবে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কোন শেল্টার দেয়া যাবে না এটি সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোন প্রকার তদ্বিরে নয়, পেশাদার সৎ কর্মকর্তাদের ওই অঞ্চলে দায়িত্ব দেয়া এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনা তৈরির মধ্যমেই ইয়াবা প্রতিরোধ করতে হবে।  আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, মাদকের ব্যাপারে কোন প্রকার ছাড় নয়। মাদক ব্যবসায়ী পুলিশের কাছে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবেই চিহ্নিত। এদের কঠোর হস্তে দমনের জন্য সারাদেশের পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দেশের যুব সমাজকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে হলে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশ মাদক ব্যবসায়ীদের কঠোর হস্তে দমন করছে এবং আগামীতেও করবে। এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, পুলিশের কোন সদস্য বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা বা অন্য কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।  অনুসন্ধানকালে বেশ কয়েকজন লবণ ব্যবসায়ী ও টেকনাফের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই এলাকায় এখন আগের মতো কেউ লবণ উৎপাদন নিয়ে কাজ করেন না। মাছ আহরণে আগের মতো উদ্যোগ নেই। ইয়াবাই এই অঞ্চলের মানুষের এখন একমাত্র ব্যবসা। যুবক শ্রেণী ছাড়াও স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী এমনকি গৃহবধূরাও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চলছে এই মাদক ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের বিরুদ্ধেও। শুধু তাই নয়, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির স্থানীয় সদস্যরা যা উদ্ধার করছেন তা অতি সামান্য। আর ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ইয়াবার শতকতা ১০ ভাগ দেখানো হয়। বাকী ৯০ ভাগ আবার গোপনে বিক্রি করা হয় মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে। এমনকি লাখ লাখ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের পর সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে ছেড়ে দেয়া হয়। এই সুযোগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কতিপয় স্থানীয় সংবাদকর্মীও ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।  গত ১৭ জুলাই রাতে টেকনাফের নাজিরপাড়া থেকে পুলিশ ৩ লাখ পিচ ইয়াবাসহ ইয়াবা ব্যবসায়ী সৈয়দ হোসেন মেম্বারের ভাইকে আটক করে। পরে থানায় নেয়া হলে ওসি ইয়াবা রেখে ওই মাদক ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দেয়। খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক গেলে পুলিশ তাদের সাথে বেশ কিছু সময় কথা বললে তারা চলে আসেন। যা তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। গত ৯ জুলাই বাহারছড়া ইউনিয়নে ইয়াবা ব্যবসায়ী রতনকে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতার করে। পরে ২ হাজার ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে ৪জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর-১৬। গত ১৭ জুলাই টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপে ৪ নম্বর স্যুইজগেটে ৩ ইয়াবা মহিলা মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৭০ হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ ও বিজিবি। পরে ২০ হাজার উদ্ধার দেখানো হয়। গত ১৭ জুলাই বিজিবি টেকনাফ ১ নম্বর স্যুইজ গেট থেকে ৩০হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে। পরে দেখানো হয় ১৩হাজার ৬৫২ পিচ। একই দিনে পুলিশের এসআই ইয়াসিনের নেতৃত্বে ৩০হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে পরে দেখানো হয় ১৪হাজার।  টেকনাফের নিলা ইউনিয়নের বাসিন্দা জাফর আলম জানান, মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় গত এক বছর যাবত তিনি এলাকায় যেতে পারছেন না। মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে কেউ ইয়াবাসহ ধরা পড়লে তার নাম ব্যবহার করে। টেকনাফের বাসিন্দা সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির ছাত্র মোঃ গিয়াস উদ্দিন বলেন, টেকনাফে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকা খচর করে বাড়ি করছে। মাদক ব্যবসায়ীরা দামি গাড়ি ব্যবহার করছে। প্রশাসন এসব দেখে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। কোথায় থেকে কোটি কোটি টাকা আসছে তা দেখার জন্য টেকনাফে কোন সরকার বা প্রশাসন নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আগে টেকনাফের মানুষ লবণ চাষ, চিংড়ি ছাষ বা মাছ ধরার কাজ করতো। এখন সবাই ইয়াবা ব্যবসায়ী। টেকনাফ সদরের সিমেন্ট ব্যবসায়ী মুক্তার আহমেদ জানান, তিনি শহরে রড সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। পরে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা তাকে ইয়াবা ব্যবসায় সহযোগিতা করতে বলে। রাজি না হওয়ায় মানব পাচার মামলায় জড়িয়ে দেয়া হয় তাকে। বর্তমানে তিনি টেকনাফ ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মুক্তার জানান। উখিয়া-টেকনাফের সংসদ সদস্য স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি গত রাতে দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, তিনি বা তার পরিবারের কোন সদস্য ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত নন। রাজনৈতিকভাবে তাকে ও তার পরিবারকে হেয় করতে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, মায়ানমার থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বাংলাদেশে আসছে। এই মাদক বন্ধের জন্য তিনি সংসদেও কথা বলেছেন। কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা ইয়াবা ব্যবসা করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। সকলেই এদের চিনে। কিন্তু গ্রেফতারের পর জামিন পেয়ে আবার একই কাজ করছে।  উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, টেকনাফের প্রায় সবাই ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। স্থানীয় এমপি যদি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিতেন তাহলে ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না কেন। ইয়াবা ব্যবসা দিন দিন বাড়ছে। তিনি বলেন, আমরা মাদকের বিরুদ্ধে এক সাথে কাজ করতে চাই। সে জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইয়াবা ধরার জন্য সবাই (আইন-শৃংখলা বাহিনী) আগ্রহী। এক লাখ ধরলে দেখানো হয় ২০ হাজার। বন্ধের কোন উদ্যোগ নেই। ইয়াবা ব্যবসায় যারা গডফাদার তারা বহাল তবিয়তে বলে ওই রাজনীতিবিদ মন্তব্য করেন। বিজিবির ৪২ ব্যাটালিয়নের সিও লেঃ কর্নেল জাহিদ হাসান জানান, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করে মামলা দায়ের করা হলেও কোন শাস্তি হচ্ছে না। গ্রেফতারের পর জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই ধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। বিজিবি চেষ্টা সত্ত্বেও  নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বিজিবি টেকনাফে ২৪ ঘন্টা দায়িত্ব পালন করছে। নাফ নদী পুরোটাই ওপেন। সীমান্তে কাঁটাতারের ব্যবস্থা নেই। আমরা নিজস্ব গোয়েন্দার মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।  এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিজিবির কোন সদস্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতা তৈরি বা ইয়াবা উদ্ধারের পর মাদক ব্যবসায়ীদের ছেড়ে দিয়ে এমন কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। বিজিবি এ ধরনের কাজের সাথে জড়িত থাকার কোন সুযোগ নেই। তবে কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দিনকে দিন বাংলাদেশে ইয়াবার চাহিদা বাড়ছে। শুধুমাত্র এ দেশে চোরাইপথে পাচারের জন্য মায়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় ৩৭টি ইয়াবা কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। ওই ৩৭টি কারখানা থেকে প্রতি দিন ৩০ লাখ ইয়াবা টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদীসহ ৪৩টি পয়েন্ট দিয়ে আসছে। বিভিন্ন ধরনের ইয়াবার মধ্যে এস ওয়াই, জিপি, এনওয়াই, ডব্লিউ ওয়াই, গোল্ডেন, আর-২ ও চম্পা জনপ্রিয়। এ সব পয়েন্টে মধ্যে রয়েছে—মায়ানমারের মংডু ও আকিয়াব ইত্যাদি শহর থেকে সমুদ্র ও নাফ নদী পার হয়ে ফিশিং বোট, লবণের কার্গো বোট ও অন্যান্য কাঠের বোটের মাঝিদের মাধ্যমে ইয়াবা আসে। টেকনাফ স্থল বন্দরের বিভিন্ন বৈধ আমদানী পণ্যের ভিতর দিয়ে এবং স্থল বন্দরে পণ্য বোঝাই আগত কার্গো ও অন্যান্য বোটের মায়ানমার ক্রুদের মাধ্যমে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের গরু আনার করিডোর দিয়ে বোটে করে শ্রমিক/মাঝি-মাল্লার মাধ্যমে এছাড়া টেকনাফের জালিয়াপাড়া, নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, বরইতলী, হ্নীলা, সাবরাং নয়াপাড়া ইত্যাদি এলাকার নাফ নদী পাড় হয়ে ইয়াবা টেকনাফে আসে। সমুদ্র পথে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া চ্যানেল হয়ে লবণের ও অন্যান্য জলযানের মাধ্যমে চোরাই পথে ইয়াবা চট্টগ্রাম পৌঁছায়, তাছাড়া টেকনাফ হতে সরাসরি বাসে কক্সবাজার বা ঢাকা বাহকের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে কক্সবাজার হতে এসএ পরিবহনের মালামালের মাধ্যমে চট্টগ্রাম/ঢাকা প্রেরণ করা হয়। মায়ানমারে বাংলাদেশ হতে জ্বালানি তেল, ওষুধ, সারসহ বিভিন্ন পণ্য চোরাই পথে পাচার করে বিনিময়ে উল্লেখিত ইয়াবাসহ অন্যান্য পণ্য আনা হয়। টেকনাফে ট্রানজিট ঘাটে ও অন্যান্য স্থানে সাধারণত বোরকা পরা মহিলাদের ইয়াবা পাচার কাজে ব্যবহার করা হয়। উল্লিখিত মহিলারা সীমান্ত এলাকার আশপাশে বসবাস করে থাকে। সীমান্ত এলাকার বসবাসকারী হিসেবে ১২ ঘণ্টার ট্রানজিট পাস নিয়ে এপার-ওপার গমনাগমনের সুযোগে চোরাচালানিরা উক্ত মহিলাদেরকে অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার করে থাকে। ট্রানজিট ঘাটে মহিলা পুলিশ বা আনসার না থাকায় সহজেই বোরকা পরিহিত মহিলারা ইয়াবা আনার সুযোগ পায়। ইয়াবা আকারে ছোট হওয়ায় মানব দেহের বিভিন্ন জায়গা, সিগারেটের পেকেট, দিয়াশলাইয়ের বাক্স, মোবাইল চার্জার, মোবাইল ইত্যাদির মাধ্যমে পাচার হয়ে থাকে। উঠতি বয়সের বিভিন্ন তরুণ, ভিআইপি ও বিত্তশালীরা, বোরকা পরিহিত মহিলা, আলখেল্লা পরিহিত ধর্মীয় লেবাসধারী লোক ইয়াবা পাচারে বাহক হিসেবে নিয়োজিত। ইয়াবা বাহক মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার অথবা পাবলিক বাস যোগে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকায় সরবরাহ করে থাকে। মাঝে মাঝে কুরিয়ার সার্ভিস (এসএ পরিবহন)কেও এ কাজে ব্যবহার করা হয় বলে জানা যায়। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দা রমজান আলী ওরফে একটেল রমজান এবং শুক্কুর ওরফে বার্মাইয়া শুক্কুর (প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ভাই) এর মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসা জোরদার হয়। বর্তমানে এই দু’জন ইয়াবা ব্যবসায়ী শত শত কোািট টাকার মালিক। যা ওপেন সিক্রেট। তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। পরবর্তী সময়ে ইয়াবা ব্যবসা ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। মায়ানমারের বৌদ্ধভিক্ষু, রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের একটি অংশও ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছে। এদের অনেকেই একাধিকবার গ্রেফতার হলেও পরে জামিনে বেরিয়ে আসে। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের জামিন করানো এবং আইনÑশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলে ছাড়িয়ে আনার জন্য কাজ করে গডফাদাররা।

যারা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত রয়েছে। প্রভাবশালী ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে, টেকনাফের মোসতাক পিতা-জাফর আহমেদ, দিদার হোসেন পিতাজাফর আহমেদ, মৌলবী বোরহান পিতা মৌলভী হান্নান, জাহেদ হোসেন ওরফে জাক্কু পিতা আবেদিন, শুক্কুর ও মজিবর পিতা এজহার কোম্পানী, একরাম পিতা আব্দুর সাত্তার, আনোয়ার পিতা সিদ্দিক, নূর মোহাম্মদ পিতা আবুল কাশেম, আয়ুব পিতা আলী আহমেদ, নূর কামাল পিতা আমিন, ইয়াদু পিতা আব্দুর রশিদ, মোহাম্মদ আলী, হোছন আলী আহমেদ, রাশেদুল করিম, পিতা হাকিম আলী, জাহেদুল ইসলাম পিতা জহির আহমেদ, সাহাদাত হেসেন পিতা মনির, রমজান অঅলী, ছৈয়দ করিম, সাইফুল ইসলাম ওরফে মগা সুইবনি, আব্দুল করিম অন্যতম। অসংখ্যবার ছোট মাঝারী ইয়াবার চালান বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারের রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে ইয়াবার বিরাট মার্কেট তৈরী হয়েছে, অর্থাৎ যুব সমাজের বিরাট একটি অংশ ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছে যা একটি দেশের জন্য অশনি সংকেত। ইয়াবা কি? ইয়াবা একটি মেথামফেটামাইন মিশ্রিত ড্রাগ । ইয়াবা শব্দটি এসেছে থাইল্যান্ড থেকে। ইয়াবাকে বাংলা অর্থ উত্তেজক ওষুধ বা পাগলা ওষুধ, যা সেবন করলে মানুষের অতি মাত্রায় উত্তেজক করে তুলে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইয়াবাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন: ইন্ডিয়াতে বলে ভুলভুলাইয়া, ফিলিপাইনে ও ইন্দোনেশিয়ায় বলে শাবু,উত্তর থাইল্যান্ডে এর নাম চাকোস, সাউথ আফ্রিকায় বলে টিংকু, ব্রাজিলে বলে বালা ইত্যাদি। বাংলাদেশে কোন কোন এলাকায় ইয়াবাকে ‘‘বাবা”ও বলে। ইয়াবা তৈরী করা হয় ২৫-৩৫ মি: গ্রা: মেথামফেটামাইন ও ৪৫-৬৫ মি: গ্রা: ক্যাফেইন এর সংমিশ্রণে। কোনো কোনো সময় ১০-১৫% হেরোইন ও মিশিয়ে থাকে। ইয়াবা সাধারণত উজ্জ্বল লাল, গোলাপী, কমলা ও সবুজ ইত্যাদি রঙের হয়ে তাকে। এটি স্বাদে হালকা মিষ্টি এবং বিভিন্ন ফ্লেভারে তৈরী করা হয়, যেমন: আংগুর, কমলা, ভেনিলা ইত্যাদি। ট্যাবলেট-এর গায়ে সাধারণত খোদাই করে জ অথবা ডন লেখা থাকে। এই ট্যাবলেট আকারে ছোট হওয়ায় একই সাথে অনেকগুলো ট্যাবলেট সহজেই বহন করা যায়। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইয়াবা তৈরী হয় মায়ানমারে। বর্তমানে মায়ানমার থেকেই ইয়াবার সবচেয়ে বড় বড় চালান সীমান্ত পথে অবৈধ ভাবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারীরা পাচার করছে। বিগত ৪০/৪৫ বছর ধরে থাইল্যান্ডে ইয়াবার উৎপাদন ও ব্যবহার হলেও পরবর্তীতে এটি বর্ডার হয়ে মায়ানমারে পাচার হতে থাকে। একটি সময় থাইল্যান্ডের বিভিন্ন তেল ষ্টেশনে এই ইয়াবা বিক্রি হত। তখন মূলত ট্রাক ড্রাইভাররা ইয়াবা সেবন করে দীর্ঘ পথ না ঘুমিয়ে গাড়ী চালাত। কিন্তু দেখা গেছে সে সময় রাস্তায় প্রচুর দুর্ঘটনা সংঘটিত হত। ফলে ১৯৭০ সালে থাইল্যান্ডে সরকারী ভাবে ইয়াবা ব্যান্ড করা হয়। এ সময় অনেক ইয়াবা ব্যবসায়ীকে হত্যাও করে স্থানীয় প্রশাসন।  ১৯৯৯/২০০০ সালের দিকে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পথে দেদারসে ঢুকছে ভয়ংকর মাদক : সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে সর্বগ্রাসী ইয়াবা ব্যবসা। ইয়াবাই এই অঞ্চলের মানুষের এখন একমাত্র ব্যবসা। সাখাওয়াত হোসেন টেকনাফ থেকে ফিরে : মিয়ানমার থেকে সীমান্তপথে প্রতিমাসে আসছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ভয়ংকর মাদক ইয়াবা। বাংলাদেশে পাচারের জন্য মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে ৩৭টি ইয়াবা কারখানা। এ সব কারখানা থেকে প্রতিদিন ৩০ লাখ ইয়াবা টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদীসহ ৪৩টি পয়েন্ট দিয়ে আসছে। বাংলাদেশে প্রতিটি ইয়াবা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ইয়াবা পাচারের এ সিন্ডিকেট  নিয়ন্ত্রণ করছে টেকনাফের স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাসহ ২৫ থেকে ৩০জন মাদক ব্যবসায়ী। স্থানীয়রা মৎস্য আহরণ এবং লবণ ব্যবসা বাদ দিয়ে যোগ দিচ্ছে ইয়াবা পাচার চক্রে। জড়িত হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও। পাল্টে যাচ্ছে টেকনাফ ও উখিয়ার মানুষের জীবনযাত্রা। এ অঞ্চলের নানা বয়সী ৫ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে এখন মাদক ব্যবসায় জড়িত। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে সর্বগ্রাসী ইয়াবা ব্যবসা। ফলে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির স্থানীয় কর্মকর্তারা ইয়াবার ভয়াবহ ছোবল থেকে সমাজকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ সুযোগে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনেকেই এ অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন বা মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয় দিচ্ছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলা পুলিশ মাদক প্রতিরোধের চেয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতেই বেশি আগ্রহী। ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে প্রতিবেদন পাঠানো হলেও তা আর কখনো আলোর মুখ দেখে না। দেশের যুব সমাজ ও স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ধ্বংসের সুদূরপ্রসারী নীল নকশা তৈরি করে পরিকল্পিতভাবে একটি চক্র হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ইয়াবা ব্যবসার এই কাঁচা টাকা দিয়ে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহসহ দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম যুব সমাজকে অন্ধকারের পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ভয়াবহ ইয়াবার ছোবল থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় ইয়াবার ভয়ংকর ছোবল শুধু মারাত্মক সমস্যা নয়, বড় ধরনের সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়াবে। গত কয়েকদিন টেকনাফ ও উখিয়া ঘুরে এবং অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কঠোর হস্তে দমনের ক্ষমতা দিতে হবে। রাজনৈতিকভাবে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কোন শেল্টার দেয়া যাবে না এটি সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোন প্রকার তদ্বিরে নয়, পেশাদার সৎ কর্মকর্তাদের ওই অঞ্চলে দায়িত্ব দেয়া এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনা তৈরির মধ্যমেই ইয়াবা প্রতিরোধ করতে হবে।  আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার দৈনিক

মাসে হাজার কোটি টাকার ইয়াবা

মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পথে দেদারসে ঢুকছে ভয়ংকর মাদক : সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে সর্বগ্রাসী ইয়াবা ব্যবসা। ইয়াবাই এই অঞ্চলের মানুষের এখন একমাত্র ব্যবসা। সাখাওয়াত হোসেন টেকনাফ থেকে ফিরে : মিয়ানমার থেকে সীমান্তপথে প্রতিমাসে আসছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ভয়ংকর মাদক ইয়াবা। বাংলাদেশে পাচারের জন্য মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে ৩৭টি ইয়াবা কারখানা। এ সব কারখানা থেকে প্রতিদিন ৩০ লাখ ইয়াবা টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদীসহ ৪৩টি পয়েন্ট দিয়ে আসছে। বাংলাদেশে প্রতিটি ইয়াবা ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ইয়াবা পাচারের এ সিন্ডিকেট  নিয়ন্ত্রণ করছে টেকনাফের স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাসহ ২৫ থেকে ৩০জন মাদক ব্যবসায়ী। স্থানীয়রা মৎস্য আহরণ এবং লবণ ব্যবসা বাদ দিয়ে যোগ দিচ্ছে ইয়াবা পাচার চক্রে। জড়িত হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও। পাল্টে যাচ্ছে টেকনাফ ও উখিয়ার মানুষের জীবনযাত্রা। এ অঞ্চলের নানা বয়সী ৫ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে এখন মাদক ব্যবসায় জড়িত। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে সর্বগ্রাসী ইয়াবা ব্যবসা। ফলে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির স্থানীয় কর্মকর্তারা ইয়াবার ভয়াবহ ছোবল থেকে সমাজকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ সুযোগে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনেকেই এ অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন বা মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয় দিচ্ছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জেলা পুলিশ মাদক প্রতিরোধের চেয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতেই বেশি আগ্রহী। ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়ের কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে প্রতিবেদন পাঠানো হলেও তা আর কখনো আলোর মুখ দেখে না। দেশের যুব সমাজ ও স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ধ্বংসের সুদূরপ্রসারী নীল নকশা তৈরি করে পরিকল্পিতভাবে একটি চক্র হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ইয়াবা ব্যবসার এই কাঁচা টাকা দিয়ে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহসহ দেশের ভবিষ্যত প্রজন্ম যুব সমাজকে অন্ধকারের পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ভয়াবহ ইয়াবার ছোবল থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এখনই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় ইয়াবার ভয়ংকর ছোবল শুধু মারাত্মক সমস্যা নয়, বড় ধরনের সামাজিক ব্যাধি হয়ে দাঁড়াবে। গত কয়েকদিন টেকনাফ ও উখিয়া ঘুরে এবং অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার বাড়াতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কঠোর হস্তে দমনের ক্ষমতা দিতে হবে। রাজনৈতিকভাবে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কোন শেল্টার দেয়া যাবে না এটি সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোন প্রকার তদ্বিরে নয়, পেশাদার সৎ কর্মকর্তাদের ওই অঞ্চলে দায়িত্ব দেয়া এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনা তৈরির মধ্যমেই ইয়াবা প্রতিরোধ করতে হবে।  আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, মাদকের ব্যাপারে কোন প্রকার ছাড় নয়। মাদক ব্যবসায়ী পুলিশের কাছে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবেই চিহ্নিত। এদের কঠোর হস্তে দমনের জন্য সারাদেশের পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দেশের যুব সমাজকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে হলে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশ মাদক ব্যবসায়ীদের কঠোর হস্তে দমন করছে এবং আগামীতেও করবে। এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, পুলিশের কোন সদস্য বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা বা অন্য কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।  অনুসন্ধানকালে বেশ কয়েকজন লবণ ব্যবসায়ী ও টেকনাফের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই এলাকায় এখন আগের মতো কেউ লবণ উৎপাদন নিয়ে কাজ করেন না। মাছ আহরণে আগের মতো উদ্যোগ নেই। ইয়াবাই এই অঞ্চলের মানুষের এখন একমাত্র ব্যবসা। যুবক শ্রেণী ছাড়াও স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী এমনকি গৃহবধূরাও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চলছে এই মাদক ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের বিরুদ্ধেও। শুধু তাই নয়, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির স্থানীয় সদস্যরা যা উদ্ধার করছেন তা অতি সামান্য। আর ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ইয়াবার শতকতা ১০ ভাগ দেখানো হয়। বাকী ৯০ ভাগ আবার গোপনে বিক্রি করা হয় মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে। এমনকি লাখ লাখ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের পর সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে ছেড়ে দেয়া হয়। এই সুযোগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কতিপয় স্থানীয় সংবাদকর্মীও ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।  গত ১৭ জুলাই রাতে টেকনাফের নাজিরপাড়া থেকে পুলিশ ৩ লাখ পিচ ইয়াবাসহ ইয়াবা ব্যবসায়ী সৈয়দ হোসেন মেম্বারের ভাইকে আটক করে। পরে থানায় নেয়া হলে ওসি ইয়াবা রেখে ওই মাদক ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দেয়। খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক গেলে পুলিশ তাদের সাথে বেশ কিছু সময় কথা বললে তারা চলে আসেন। যা তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। গত ৯ জুলাই বাহারছড়া ইউনিয়নে ইয়াবা ব্যবসায়ী রতনকে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতার করে। পরে ২ হাজার ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে ৪জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর-১৬। গত ১৭ জুলাই টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপে ৪ নম্বর স্যুইজগেটে ৩ ইয়াবা মহিলা মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৭০ হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ ও বিজিবি। পরে ২০ হাজার উদ্ধার দেখানো হয়। গত ১৭ জুলাই বিজিবি টেকনাফ ১ নম্বর স্যুইজ গেট থেকে ৩০হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে। পরে দেখানো হয় ১৩হাজার ৬৫২ পিচ। একই দিনে পুলিশের এসআই ইয়াসিনের নেতৃত্বে ৩০হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে পরে দেখানো হয় ১৪হাজার।  টেকনাফের নিলা ইউনিয়নের বাসিন্দা জাফর আলম জানান, মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় গত এক বছর যাবত তিনি এলাকায় যেতে পারছেন না। মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে কেউ ইয়াবাসহ ধরা পড়লে তার নাম ব্যবহার করে। টেকনাফের বাসিন্দা সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির ছাত্র মোঃ গিয়াস উদ্দিন বলেন, টেকনাফে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকা খচর করে বাড়ি করছে। মাদক ব্যবসায়ীরা দামি গাড়ি ব্যবহার করছে। প্রশাসন এসব দেখে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। কোথায় থেকে কোটি কোটি টাকা আসছে তা দেখার জন্য টেকনাফে কোন সরকার বা প্রশাসন নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আগে টেকনাফের মানুষ লবণ চাষ, চিংড়ি ছাষ বা মাছ ধরার কাজ করতো। এখন সবাই ইয়াবা ব্যবসায়ী। টেকনাফ সদরের সিমেন্ট ব্যবসায়ী মুক্তার আহমেদ জানান, তিনি শহরে রড সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। পরে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা তাকে ইয়াবা ব্যবসায় সহযোগিতা করতে বলে। রাজি না হওয়ায় মানব পাচার মামলায় জড়িয়ে দেয়া হয় তাকে। বর্তমানে তিনি টেকনাফ ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মুক্তার জানান। উখিয়া-টেকনাফের সংসদ সদস্য স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি গত রাতে দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, তিনি বা তার পরিবারের কোন সদস্য ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত নন। রাজনৈতিকভাবে তাকে ও তার পরিবারকে হেয় করতে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, মায়ানমার থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বাংলাদেশে আসছে। এই মাদক বন্ধের জন্য তিনি সংসদেও কথা বলেছেন। কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা ইয়াবা ব্যবসা করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। সকলেই এদের চিনে। কিন্তু গ্রেফতারের পর জামিন পেয়ে আবার একই কাজ করছে।  উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, টেকনাফের প্রায় সবাই ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। স্থানীয় এমপি যদি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিতেন তাহলে ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না কেন। ইয়াবা ব্যবসা দিন দিন বাড়ছে। তিনি বলেন, আমরা মাদকের বিরুদ্ধে এক সাথে কাজ করতে চাই। সে জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইয়াবা ধরার জন্য সবাই (আইন-শৃংখলা বাহিনী) আগ্রহী। এক লাখ ধরলে দেখানো হয় ২০ হাজার। বন্ধের কোন উদ্যোগ নেই। ইয়াবা ব্যবসায় যারা গডফাদার তারা বহাল তবিয়তে বলে ওই রাজনীতিবিদ মন্তব্য করেন। বিজিবির ৪২ ব্যাটালিয়নের সিও লেঃ কর্নেল জাহিদ হাসান জানান, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করে মামলা দায়ের করা হলেও কোন শাস্তি হচ্ছে না। গ্রেফতারের পর জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই ধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। বিজিবি চেষ্টা সত্ত্বেও  নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বিজিবি টেকনাফে ২৪ ঘন্টা দায়িত্ব পালন করছে। নাফ নদী পুরোটাই ওপেন। সীমান্তে কাঁটাতারের ব্যবস্থা নেই। আমরা নিজস্ব গোয়েন্দার মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।  এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিজিবির কোন সদস্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতা তৈরি বা ইয়াবা উদ্ধারের পর মাদক ব্যবসায়ীদের ছেড়ে দিয়ে এমন কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। বিজিবি এ ধরনের কাজের সাথে জড়িত থাকার কোন সুযোগ নেই। তবে কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দিনকে দিন বাংলাদেশে ইয়াবার চাহিদা বাড়ছে। শুধুমাত্র এ দেশে চোরাইপথে পাচারের জন্য মায়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় ৩৭টি ইয়াবা কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। ওই ৩৭টি কারখানা থেকে প্রতি দিন ৩০ লাখ ইয়াবা টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদীসহ ৪৩টি পয়েন্ট দিয়ে আসছে। বিভিন্ন ধরনের ইয়াবার মধ্যে এস ওয়াই, জিপি, এনওয়াই, ডব্লিউ ওয়াই, গোল্ডেন, আর-২ ও চম্পা জনপ্রিয়। এ সব পয়েন্টে মধ্যে রয়েছে—মায়ানমারের মংডু ও আকিয়াব ইত্যাদি শহর থেকে সমুদ্র ও নাফ নদী পার হয়ে ফিশিং বোট, লবণের কার্গো বোট ও অন্যান্য কাঠের বোটের মাঝিদের মাধ্যমে ইয়াবা আসে। টেকনাফ স্থল বন্দরের বিভিন্ন বৈধ আমদানী পণ্যের ভিতর দিয়ে এবং স্থল বন্দরে পণ্য বোঝাই আগত কার্গো ও অন্যান্য বোটের মায়ানমার ক্রুদের মাধ্যমে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের গরু আনার করিডোর দিয়ে বোটে করে শ্রমিক/মাঝি-মাল্লার মাধ্যমে এছাড়া টেকনাফের জালিয়াপাড়া, নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, বরইতলী, হ্নীলা, সাবরাং নয়াপাড়া ইত্যাদি এলাকার নাফ নদী পাড় হয়ে ইয়াবা টেকনাফে আসে। সমুদ্র পথে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া চ্যানেল হয়ে লবণের ও অন্যান্য জলযানের মাধ্যমে চোরাই পথে ইয়াবা চট্টগ্রাম পৌঁছায়, তাছাড়া টেকনাফ হতে সরাসরি বাসে কক্সবাজার বা ঢাকা বাহকের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে কক্সবাজার হতে এসএ পরিবহনের মালামালের মাধ্যমে চট্টগ্রাম/ঢাকা প্রেরণ করা হয়। মায়ানমারে বাংলাদেশ হতে জ্বালানি তেল, ওষুধ, সারসহ বিভিন্ন পণ্য চোরাই পথে পাচার করে বিনিময়ে উল্লেখিত ইয়াবাসহ অন্যান্য পণ্য আনা হয়। টেকনাফে ট্রানজিট ঘাটে ও অন্যান্য স্থানে সাধারণত বোরকা পরা মহিলাদের ইয়াবা পাচার কাজে ব্যবহার করা হয়। উল্লিখিত মহিলারা সীমান্ত এলাকার আশপাশে বসবাস করে থাকে। সীমান্ত এলাকার বসবাসকারী হিসেবে ১২ ঘণ্টার ট্রানজিট পাস নিয়ে এপার-ওপার গমনাগমনের সুযোগে চোরাচালানিরা উক্ত মহিলাদেরকে অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার করে থাকে। ট্রানজিট ঘাটে মহিলা পুলিশ বা আনসার না থাকায় সহজেই বোরকা পরিহিত মহিলারা ইয়াবা আনার সুযোগ পায়। ইয়াবা আকারে ছোট হওয়ায় মানব দেহের বিভিন্ন জায়গা, সিগারেটের পেকেট, দিয়াশলাইয়ের বাক্স, মোবাইল চার্জার, মোবাইল ইত্যাদির মাধ্যমে পাচার হয়ে থাকে। উঠতি বয়সের বিভিন্ন তরুণ, ভিআইপি ও বিত্তশালীরা, বোরকা পরিহিত মহিলা, আলখেল্লা পরিহিত ধর্মীয় লেবাসধারী লোক ইয়াবা পাচারে বাহক হিসেবে নিয়োজিত। ইয়াবা বাহক মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার অথবা পাবলিক বাস যোগে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকায় সরবরাহ করে থাকে। মাঝে মাঝে কুরিয়ার সার্ভিস (এসএ পরিবহন)কেও এ কাজে ব্যবহার করা হয় বলে জানা যায়। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দা রমজান আলী ওরফে একটেল রমজান এবং শুক্কুর ওরফে বার্মাইয়া শুক্কুর (প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ভাই) এর মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসা জোরদার হয়। বর্তমানে এই দু’জন ইয়াবা ব্যবসায়ী শত শত কোািট টাকার মালিক। যা ওপেন সিক্রেট। তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। পরবর্তী সময়ে ইয়াবা ব্যবসা ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। মায়ানমারের বৌদ্ধভিক্ষু, রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের একটি অংশও ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছে। এদের অনেকেই একাধিকবার গ্রেফতার হলেও পরে জামিনে বেরিয়ে আসে। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের জামিন করানো এবং আইনÑশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলে ছাড়িয়ে আনার জন্য কাজ করে গডফাদাররা। যারা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত রয়েছে। প্রভাবশালী ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে, টেকনাফের মোসতাক পিতা-জাফর আহমেদ, দিদার হোসেন পিতাজাফর আহমেদ, মৌলবী বোরহান পিতা মৌলভী হান্নান, জাহেদ হোসেন ওরফে জাক্কু পিতা আবেদিন, শুক্কুর ও মজিবর পিতা এজহার কোম্পানী, একরাম পিতা আব্দুর সাত্তার, আনোয়ার পিতা সিদ্দিক, নূর মোহাম্মদ পিতা আবুল কাশেম, আয়ুব পিতা আলী আহমেদ, নূর কামাল পিতা আমিন, ইয়াদু পিতা আব্দুর রশিদ, মোহাম্মদ আলী, হোছন আলী আহমেদ, রাশেদুল করিম, পিতা হাকিম আলী, জাহেদুল ইসলাম পিতা জহির আহমেদ, সাহাদাত হেসেন পিতা মনির, রমজান অঅলী, ছৈয়দ করিম, সাইফুল ইসলাম ওরফে মগা সুইবনি, আব্দুল করিম অন্যতম। অসংখ্যবার ছোট মাঝারী ইয়াবার চালান বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারের রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে ইয়াবার বিরাট মার্কেট তৈরী হয়েছে, অর্থাৎ যুব সমাজের বিরাট একটি অংশ ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছে যা একটি দেশের জন্য অশনি সংকেত। ইয়াবা কি? ইয়াবা একটি মেথামফেটামাইন মিশ্রিত ড্রাগ । ইয়াবা শব্দটি এসেছে থাইল্যান্ড থেকে। ইয়াবাকে বাংলা অর্থ উত্তেজক ওষুধ বা পাগলা ওষুধ, যা সেবন করলে মানুষের অতি মাত্রায় উত্তেজক করে তুলে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইয়াবাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন: ইন্ডিয়াতে বলে ভুলভুলাইয়া, ফিলিপাইনে ও ইন্দোনেশিয়ায় বলে শাবু,উত্তর থাইল্যান্ডে এর নাম চাকোস, সাউথ আফ্রিকায় বলে টিংকু, ব্রাজিলে বলে বালা ইত্যাদি। বাংলাদেশে কোন কোন এলাকায় ইয়াবাকে ‘‘বাবা”ও বলে। ইয়াবা তৈরী করা হয় ২৫-৩৫ মি: গ্রা: মেথামফেটামাইন ও ৪৫-৬৫ মি: গ্রা: ক্যাফেইন এর সংমিশ্রণে। কোনো কোনো সময় ১০-১৫% হেরোইন ও মিশিয়ে থাকে। ইয়াবা সাধারণত উজ্জ্বল লাল, গোলাপী, কমলা ও সবুজ ইত্যাদি রঙের হয়ে তাকে। এটি স্বাদে হালকা মিষ্টি এবং বিভিন্ন ফ্লেভারে তৈরী করা হয়, যেমন: আংগুর, কমলা, ভেনিলা ইত্যাদি। ট্যাবলেট-এর গায়ে সাধারণত খোদাই করে জ অথবা ডন লেখা থাকে। এই ট্যাবলেট আকারে ছোট হওয়ায় একই সাথে অনেকগুলো ট্যাবলেট সহজেই বহন করা যায়। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইয়াবা তৈরী হয় মায়ানমারে। বর্তমানে মায়ানমার থেকেই ইয়াবার সবচেয়ে বড় বড় চালান সীমান্ত পথে অবৈধ ভাবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারীরা পাচার করছে। বিগত ৪০/৪৫ বছর ধরে থাইল্যান্ডে ইয়াবার উৎপাদন ও ব্যবহার হলেও পরবর্তীতে এটি বর্ডার হয়ে মায়ানমারে পাচার হতে থাকে। একটি সময় থাইল্যান্ডের বিভিন্ন তেল ষ্টেশনে এই ইয়াবা বিক্রি হত। তখন মূলত ট্রাক ড্রাইভাররা ইয়াবা সেবন করে দীর্ঘ পথ না ঘুমিয়ে গাড়ী চালাত। কিন্তু দেখা গেছে সে সময় রাস্তায় প্রচুর দুর্ঘটনা সংঘটিত হত। ফলে ১৯৭০ সালে থাইল্যান্ডে সরকারী ভাবে ইয়াবা ব্যান্ড করা হয়। এ সময় অনেক ইয়াবা ব্যবসায়ীকে হত্যাও করে স্থানীয় প্রশাসন।  ১৯৯৯/২০০০ সালের দিকে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

বলেন, মাদকের ব্যাপারে কোন প্রকার ছাড় নয়। মাদক ব্যবসায়ী পুলিশের কাছে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবেই চিহ্নিত। এদের কঠোর হস্তে দমনের জন্য সারাদেশের পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দেশের যুব সমাজকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে হলে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশ মাদক ব্যবসায়ীদের কঠোর হস্তে দমন করছে এবং আগামীতেও করবে। এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, পুলিশের কোন সদস্য বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা বা অন্য কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।  অনুসন্ধানকালে বেশ কয়েকজন লবণ ব্যবসায়ী ও টেকনাফের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই এলাকায় এখন আগের মতো কেউ লবণ উৎপাদন নিয়ে কাজ করেন না। মাছ আহরণে আগের মতো উদ্যোগ নেই। ইয়াবাই এই অঞ্চলের মানুষের এখন একমাত্র ব্যবসা। যুবক শ্রেণী ছাড়াও স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী এমনকি গৃহবধূরাও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চলছে এই মাদক ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের বিরুদ্ধেও। শুধু তাই নয়, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির স্থানীয় সদস্যরা যা উদ্ধার করছেন তা অতি সামান্য। আর ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ইয়াবার শতকতা ১০ ভাগ দেখানো হয়। বাকী ৯০ ভাগ আবার গোপনে বিক্রি করা হয় মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে। এমনকি লাখ লাখ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারের পর সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে ছেড়ে দেয়া হয়। এই সুযোগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কতিপয় স্থানীয় সংবাদকর্মীও ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।  গত ১৭ জুলাই রাতে টেকনাফের নাজিরপাড়া থেকে পুলিশ ৩ লাখ পিচ ইয়াবাসহ ইয়াবা ব্যবসায়ী সৈয়দ হোসেন মেম্বারের ভাইকে আটক করে। পরে থানায় নেয়া হলে ওসি ইয়াবা রেখে ওই মাদক ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দেয়। খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক গেলে পুলিশ তাদের সাথে বেশ কিছু সময় কথা বললে তারা চলে আসেন। যা তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। গত ৯ জুলাই বাহারছড়া ইউনিয়নে ইয়াবা ব্যবসায়ী রতনকে ৫০ হাজার ইয়াবাসহ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতার করে। পরে ২ হাজার ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে ৪জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর-১৬। গত ১৭ জুলাই টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপে ৪ নম্বর স্যুইজগেটে ৩ ইয়াবা মহিলা মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৭০ হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ ও বিজিবি। পরে ২০ হাজার উদ্ধার দেখানো হয়। গত ১৭ জুলাই বিজিবি টেকনাফ ১ নম্বর স্যুইজ গেট থেকে ৩০হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে। পরে দেখানো হয় ১৩হাজার ৬৫২ পিচ। একই দিনে পুলিশের এসআই ইয়াসিনের নেতৃত্বে ৩০হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে পরে দেখানো হয় ১৪হাজার।  টেকনাফের নিলা ইউনিয়নের বাসিন্দা জাফর আলম জানান, মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় গত এক বছর যাবত তিনি এলাকায় যেতে পারছেন না। মাদক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট পরিকল্পিতভাবে কেউ ইয়াবাসহ ধরা পড়লে তার নাম ব্যবহার করে। টেকনাফের বাসিন্দা সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির ছাত্র মোঃ গিয়াস উদ্দিন বলেন, টেকনাফে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকা খচর করে বাড়ি করছে। মাদক ব্যবসায়ীরা দামি গাড়ি ব্যবহার করছে। প্রশাসন এসব দেখে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। কোথায় থেকে কোটি কোটি টাকা আসছে তা দেখার জন্য টেকনাফে কোন সরকার বা প্রশাসন নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আগে টেকনাফের মানুষ লবণ চাষ, চিংড়ি ছাষ বা মাছ ধরার কাজ করতো। এখন সবাই ইয়াবা ব্যবসায়ী। টেকনাফ সদরের সিমেন্ট ব্যবসায়ী মুক্তার আহমেদ জানান, তিনি শহরে রড সিমেন্টের ব্যবসা করতেন। পরে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা তাকে ইয়াবা ব্যবসায় সহযোগিতা করতে বলে। রাজি না হওয়ায় মানব পাচার মামলায় জড়িয়ে দেয়া হয় তাকে। বর্তমানে তিনি টেকনাফ ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মুক্তার জানান। উখিয়া-টেকনাফের সংসদ সদস্য স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি গত রাতে দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, তিনি বা তার পরিবারের কোন সদস্য ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত নন। রাজনৈতিকভাবে তাকে ও তার পরিবারকে হেয় করতে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, মায়ানমার থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বাংলাদেশে আসছে। এই মাদক বন্ধের জন্য তিনি সংসদেও কথা বলেছেন। কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা ইয়াবা ব্যবসা করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। সকলেই এদের চিনে। কিন্তু গ্রেফতারের পর জামিন পেয়ে আবার একই কাজ করছে।  উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, টেকনাফের প্রায় সবাই ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। স্থানীয় এমপি যদি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় না দিতেন তাহলে ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না কেন। ইয়াবা ব্যবসা দিন দিন বাড়ছে। তিনি বলেন, আমরা মাদকের বিরুদ্ধে এক সাথে কাজ করতে চাই। সে জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইয়াবা ধরার জন্য সবাই (আইন-শৃংখলা বাহিনী) আগ্রহী। এক লাখ ধরলে দেখানো হয় ২০ হাজার। বন্ধের কোন উদ্যোগ নেই। ইয়াবা ব্যবসায় যারা গডফাদার তারা বহাল তবিয়তে বলে ওই রাজনীতিবিদ মন্তব্য করেন। বিজিবির ৪২ ব্যাটালিয়নের সিও লেঃ কর্নেল জাহিদ হাসান জানান, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করে মামলা দায়ের করা হলেও কোন শাস্তি হচ্ছে না। গ্রেফতারের পর জামিনে বেরিয়ে এসে আবার একই ধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। বিজিবি চেষ্টা সত্ত্বেও  নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বিজিবি টেকনাফে ২৪ ঘন্টা দায়িত্ব পালন করছে। নাফ নদী পুরোটাই ওপেন। সীমান্তে কাঁটাতারের ব্যবস্থা নেই। আমরা নিজস্ব গোয়েন্দার মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।  এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিজিবির কোন সদস্য ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতা তৈরি বা ইয়াবা উদ্ধারের পর মাদক ব্যবসায়ীদের ছেড়ে দিয়ে এমন কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। বিজিবি এ ধরনের কাজের সাথে জড়িত থাকার কোন সুযোগ নেই। তবে কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দিনকে দিন বাংলাদেশে ইয়াবার চাহিদা বাড়ছে। শুধুমাত্র এ দেশে চোরাইপথে পাচারের জন্য মায়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় ৩৭টি ইয়াবা কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। ওই ৩৭টি কারখানা থেকে প্রতি দিন ৩০ লাখ ইয়াবা টেকনাফ সীমান্তের নাফ নদীসহ ৪৩টি পয়েন্ট দিয়ে আসছে। বিভিন্ন ধরনের ইয়াবার মধ্যে এস ওয়াই, জিপি, এনওয়াই, ডব্লিউ ওয়াই, গোল্ডেন, আর-২ ও চম্পা জনপ্রিয়। এ সব পয়েন্টে মধ্যে রয়েছে—মায়ানমারের মংডু ও আকিয়াব ইত্যাদি শহর থেকে সমুদ্র ও নাফ নদী পার হয়ে ফিশিং বোট, লবণের কার্গো বোট ও অন্যান্য কাঠের বোটের মাঝিদের মাধ্যমে ইয়াবা আসে। টেকনাফ স্থল বন্দরের বিভিন্ন বৈধ আমদানী পণ্যের ভিতর দিয়ে এবং স্থল বন্দরে পণ্য বোঝাই আগত কার্গো ও অন্যান্য বোটের মায়ানমার ক্রুদের মাধ্যমে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের গরু আনার করিডোর দিয়ে বোটে করে শ্রমিক/মাঝি-মাল্লার মাধ্যমে এছাড়া টেকনাফের জালিয়াপাড়া, নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, বরইতলী, হ্নীলা, সাবরাং নয়াপাড়া ইত্যাদি এলাকার নাফ নদী পাড় হয়ে ইয়াবা টেকনাফে আসে। সমুদ্র পথে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া চ্যানেল হয়ে লবণের ও অন্যান্য জলযানের মাধ্যমে চোরাই পথে ইয়াবা চট্টগ্রাম পৌঁছায়, তাছাড়া টেকনাফ হতে সরাসরি বাসে কক্সবাজার বা ঢাকা বাহকের মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে কক্সবাজার হতে এসএ পরিবহনের মালামালের মাধ্যমে চট্টগ্রাম/ঢাকা প্রেরণ করা হয়। মায়ানমারে বাংলাদেশ হতে জ্বালানি তেল, ওষুধ, সারসহ বিভিন্ন পণ্য চোরাই পথে পাচার করে বিনিময়ে উল্লেখিত ইয়াবাসহ অন্যান্য পণ্য আনা হয়। টেকনাফে ট্রানজিট ঘাটে ও অন্যান্য স্থানে সাধারণত বোরকা পরা মহিলাদের ইয়াবা পাচার কাজে ব্যবহার করা হয়। উল্লিখিত মহিলারা সীমান্ত এলাকার আশপাশে বসবাস করে থাকে। সীমান্ত এলাকার বসবাসকারী হিসেবে ১২ ঘণ্টার ট্রানজিট পাস নিয়ে এপার-ওপার গমনাগমনের সুযোগে চোরাচালানিরা উক্ত মহিলাদেরকে অর্থের বিনিময়ে ব্যবহার করে থাকে। ট্রানজিট ঘাটে মহিলা পুলিশ বা আনসার না থাকায় সহজেই বোরকা পরিহিত মহিলারা ইয়াবা আনার সুযোগ পায়। ইয়াবা আকারে ছোট হওয়ায় মানব দেহের বিভিন্ন জায়গা, সিগারেটের পেকেট, দিয়াশলাইয়ের বাক্স, মোবাইল চার্জার, মোবাইল ইত্যাদির মাধ্যমে পাচার হয়ে থাকে। উঠতি বয়সের বিভিন্ন তরুণ, ভিআইপি ও বিত্তশালীরা, বোরকা পরিহিত মহিলা, আলখেল্লা পরিহিত ধর্মীয় লেবাসধারী লোক ইয়াবা পাচারে বাহক হিসেবে নিয়োজিত। ইয়াবা বাহক মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার অথবা পাবলিক বাস যোগে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকায় সরবরাহ করে থাকে। মাঝে মাঝে কুরিয়ার সার্ভিস (এসএ পরিবহন)কেও এ কাজে ব্যবহার করা হয় বলে জানা যায়। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দা রমজান আলী ওরফে একটেল রমজান এবং শুক্কুর ওরফে বার্মাইয়া শুক্কুর (প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ভাই) এর মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসা জোরদার হয়। বর্তমানে এই দু’জন ইয়াবা ব্যবসায়ী শত শত কোািট টাকার মালিক। যা ওপেন সিক্রেট। তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে। পরবর্তী সময়ে ইয়াবা ব্যবসা ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং হাজার হাজার স্থানীয় বাসিন্দা এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। মায়ানমারের বৌদ্ধভিক্ষু, রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের একটি অংশও ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছে। এদের অনেকেই একাধিকবার গ্রেফতার হলেও পরে জামিনে বেরিয়ে আসে। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের জামিন করানো এবং আইনÑশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলে ছাড়িয়ে আনার জন্য কাজ করে গডফাদাররা। যারা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত রয়েছে। প্রভাবশালী ইয়াবা ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে, টেকনাফের মোসতাক পিতা-জাফর আহমেদ, দিদার হোসেন পিতাজাফর আহমেদ, মৌলবী বোরহান পিতা মৌলভী হান্নান, জাহেদ হোসেন ওরফে জাক্কু পিতা আবেদিন, শুক্কুর ও মজিবর পিতা এজহার কোম্পানী, একরাম পিতা আব্দুর সাত্তার, আনোয়ার পিতা সিদ্দিক, নূর মোহাম্মদ পিতা আবুল কাশেম, আয়ুব পিতা আলী আহমেদ, নূর কামাল পিতা আমিন, ইয়াদু পিতা আব্দুর রশিদ, মোহাম্মদ আলী, হোছন আলী আহমেদ, রাশেদুল করিম, পিতা হাকিম আলী, জাহেদুল ইসলাম পিতা জহির আহমেদ, সাহাদাত হেসেন পিতা মনির, রমজান অঅলী, ছৈয়দ করিম, সাইফুল ইসলাম ওরফে মগা সুইবনি, আব্দুল করিম অন্যতম। অসংখ্যবার ছোট মাঝারী ইয়াবার চালান বাংলাদেশে বিভিন্ন এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ইয়াবা পাচারের রেকর্ড পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, বাংলাদেশে ইয়াবার বিরাট মার্কেট তৈরী হয়েছে, অর্থাৎ যুব সমাজের বিরাট একটি অংশ ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছে যা একটি দেশের জন্য অশনি সংকেত। ইয়াবা কি? ইয়াবা একটি মেথামফেটামাইন মিশ্রিত ড্রাগ । ইয়াবা শব্দটি এসেছে থাইল্যান্ড থেকে। ইয়াবাকে বাংলা অর্থ উত্তেজক ওষুধ বা পাগলা ওষুধ, যা সেবন করলে মানুষের অতি মাত্রায় উত্তেজক করে তুলে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইয়াবাকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়, যেমন: ইন্ডিয়াতে বলে ভুলভুলাইয়া, ফিলিপাইনে ও ইন্দোনেশিয়ায় বলে শাবু,উত্তর থাইল্যান্ডে এর নাম চাকোস, সাউথ আফ্রিকায় বলে টিংকু, ব্রাজিলে বলে বালা ইত্যাদি। বাংলাদেশে কোন কোন এলাকায় ইয়াবাকে ‘‘বাবা”ও বলে। ইয়াবা তৈরী করা হয় ২৫-৩৫ মি: গ্রা: মেথামফেটামাইন ও ৪৫-৬৫ মি: গ্রা: ক্যাফেইন এর সংমিশ্রণে। কোনো কোনো সময় ১০-১৫% হেরোইন ও মিশিয়ে থাকে। ইয়াবা সাধারণত উজ্জ্বল লাল, গোলাপী, কমলা ও সবুজ ইত্যাদি রঙের হয়ে তাকে। এটি স্বাদে হালকা মিষ্টি এবং বিভিন্ন ফ্লেভারে তৈরী করা হয়, যেমন: আংগুর, কমলা, ভেনিলা ইত্যাদি। ট্যাবলেট-এর গায়ে সাধারণত খোদাই করে জ অথবা ডন লেখা থাকে। এই ট্যাবলেট আকারে ছোট হওয়ায় একই সাথে অনেকগুলো ট্যাবলেট সহজেই বহন করা যায়। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইয়াবা তৈরী হয় মায়ানমারে। বর্তমানে মায়ানমার থেকেই ইয়াবার সবচেয়ে বড় বড় চালান সীমান্ত পথে অবৈধ ভাবে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারীরা পাচার করছে। বিগত ৪০/৪৫ বছর ধরে থাইল্যান্ডে ইয়াবার উৎপাদন ও ব্যবহার হলেও পরবর্তীতে এটি বর্ডার হয়ে মায়ানমারে পাচার হতে থাকে। একটি সময় থাইল্যান্ডের বিভিন্ন তেল ষ্টেশনে এই ইয়াবা বিক্রি হত। তখন মূলত ট্রাক ড্রাইভাররা ইয়াবা সেবন করে দীর্ঘ পথ না ঘুমিয়ে গাড়ী চালাত। কিন্তু দেখা গেছে সে সময় রাস্তায় প্রচুর দুর্ঘটনা সংঘটিত হত। ফলে ১৯৭০ সালে থাইল্যান্ডে সরকারী ভাবে ইয়াবা ব্যান্ড করা হয়। এ সময় অনেক ইয়াবা ব্যবসায়ীকে হত্যাও করে স্থানীয় প্রশাসন।  ১৯৯৯/২০০০ সালের দিকে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT