হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

টেকনাফপ্রচ্ছদ

মানব পাচারের বিরুদ্ধে টেকনাফ ইউএনও’র ‘জিরো টলারেন্স’

হাফেজ মুহাম্মদ কাশেম, টেকনাফ … বিজিবি ও কোস্টগার্ডের পৃথক দু’টি অভিযানে ৬ জন দালালসহ ৫৩ জন রোহিঙ্গা আটকের পর প্রশাসন তৎপর হয়ে উঠেছে। চোরাইপথে মানব পাচারের বিরুদ্ধে টেকনাফের ইউএনও ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন। ৮ নভেম্বর বৃহষ্পতিবার টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ রবিউল হাসান কাজলের নেতৃত্বে টেকনাফ উপজেলার তুলাতলী ঘাট, মহেশখালীয়াপাড়া ঘাট, খালকাটা ঘাটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে দিনভর পরিচালিত হয়েছে মানাবপাচার বিরোধী অভিযান ও সচেতনতা কার্যক্রম।
এদিকে শীত মৌসুম চলে আসায় সাগর শান্ত থাকার সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সাগরপথে মানবপাচারকারী চক্রগুলো। মানব পাচারকারী দালাল চক্র মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড পৌঁছে দেওয়ার নাম করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে জানা গেছে। মূলতঃ টেকনাফ-উখিয়ায় অশ্রিত রোহিঙ্গাদের টার্গেট করেই জমে উঠেছে এই প্রতারণার খেলা। মঙ্গলবার ৬ নভেম্বর কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের উপকূল থেকে ১৪ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছে বিজিবি। মালয়েশিয়া নেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হয় তাদের কাছ থেকে। দু’দিন ধরে সাগরে এদিক-ওদিক ঘোরানোর পর ‘থাইল্যান্ডের তীরে পৌঁছেছি’ বলে টেকনাফের সৈকতে তাদের নামিয়ে দেয় মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা। ওই ১৪ জনের মধ্যে পাঁচ জন নারীও ছিল। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নিয়েছে পাচারকারীরা। আরও এক লক্ষ ৯০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল।
বুধবার ৭ নভেম্বর ফের সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের চেষ্টাকালে ৩৩ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুকে আটক করেছে কোস্টগার্ড সদস্যরা। এসময় ৬ জন দালালকেও আটক করা হয়। ৩৩ রোহিঙ্গার মধ্যে ১০ জন নারী, ১৪ পুরুষ ও ৯ জন শিশু। তারা উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা বলে জানা গেছে। ৭ নভেম্বর ৩৩ রোহিঙ্গাকে পাচারের চেষ্টার সময় যে ৬ জন দালালকে উদ্ধার করা হয়েছিল তারা স্থানীয়। আটককৃত ৬ দালাল হলেন মহেশখালী গোরকঘাটার মৃত মোজাহের মিয়ার ছেলে আবদুর শুক্কুর মাঝি (৫৫), একই এলাকার তার ভাই আবদুর গফুর (৪৫), মৃত হোসেন আলীর ছেলে রফিকুল আলম (৩৫), মোহাম্মদ শরীফের ছেলে মোহাম্মদ শওকত (৩৮), মোহাম্মদ আবুল হাকিমের ছেলে নাছির উদ্দিন (৩৫), মৃত মোহাম্মদ দলিলুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ জুয়েল (৩৩)।
জানা যায়, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পথে সহস্রাধিক বাংলাদেশী আটক হন। মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়া এসব বাংলাদেশীদের অনেকেই ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় পথেই মারা যান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সেসময় ওই ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সে সময় টেকনাফের কচুবনিয়া ঘাট স্থানীয়দের কাছে ‘মালয়েশিয়া এয়ারপোর্ট’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়। এ ঘাট দিয়ে প্রায়ই মানবপাচার হতো তখন। এরপর মানবপাচার বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অভিযানে নামে এবং জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে। এতে করে সাগরপথে মানবপাচার শূন্যের কোটায় নেমে আসে। তবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর রোহিঙ্গাদের টার্গেট নিয়ে নতুন করে ফের টেকনাফ উপকূল দিয়ে সাগরপথে মানবপাচারের চেষ্টা চালাচ্ছে দালালরা। অনেক রোহিঙ্গার আত্মীয়-স্বজন মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে রয়েছে। প্রবাসী স্বজনের কাছে পৌঁছাতে রোহিঙ্গাদের অনেকেই সাগরপথ বেছে নিয়েছে। আবার অনেকে দালালের খপ্পরে পড়ে এসব কাজে জড়িয়ে পড়ছে। গত বছর ২৫ আগস্টের পর থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এছাড়া আগে থেকেই বাংলাদেশে চার লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছিল। সব মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফে অশ্রিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এখন ১১ লাখের বেশি। এরা কর্মহীন ও অভাব অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাদের প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতে মানবপাচারকারী চক্রগুলো আবারও সাগরপথে মালয়েশিয়ায় চেষ্টা চালাচ্ছে। গত বছরের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার পর শিশু ও নারীদের পাচার এবং বিভিন্ন স্থানে তাদের ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করতে টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কে ১৩টি পয়েন্টে তল্লাশি চৌকি বসানো হয়। এসব চেকপোস্টে সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সদস্যরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
এদিকে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড বাহিনী ঢাকা সদর দপ্তর অপারেশন গোয়েন্দা শাখার সহকারী গোয়েন্দা পরিচালক লেঃ কমান্ডার বিএন আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ৭ নভেম্বর বিকালে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড বাহিনী পূর্ব জোনের অধীনস্থ সিজি স্টেশন টেকনাফ কর্তৃক একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় টেকনাফ থানার অন্তর্গত সেন্টমার্টিনদ্বীপের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে অবৈধভাবে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলার থেকে ২৯ জন রোহিঙ্গা (১৪ জন পুরুষ, ১০ জন মহিলা এবং ৯ জন শিশু) ৪ জন বাংলাদেশিসহ ৬ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়। আটককৃত মালয়েশিয়াগামী রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়েছে। পাচারকারী ব্যক্তি ও ট্রলারটি পরবর্তী আইনানুগ কার্যক্রমের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে’। টেকনাফ-২ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর শরীফুল ইসলাম জোমাদ্দার বলেন, ‘দালালের খপ্পরে পড়ে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাচ্ছিল এমন ১৪ জন রোহিঙ্গাকে ৬ নভেম্বর শাহপরীরদ্বীপ উপকুল থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। এদের মধ্যে পাঁচ জন নারী। মানবপাচারকারীরা আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে সীমান্তে বিজিবির সদস্যরা তৎপর রয়েছে। সাগরপথে মানবপাচার বন্ধ রয়েছে, এটি বন্ধ থাকবে। দালালদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোঃ রবিউল হাসান কাজল বলেন, ‘চোরাইপথে মানব পাচার রোধে প্রশাসন সজাগ এবং পাশাপাশি আইনশৃংখলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। এব্যাপারে জনপ্রতিনিধিগণকেও সতর্ক করা হয়েছে। ৮ নভেম্বর বৃহষ্পতিবার আমি নিজেই আইনশৃংখলা বাহিনীসহ টেকনাফ উপজেলার তুলাতলী ঘাট, মহেশখালীয়াপাড়া ঘাট, খালকাটা ঘাটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে দিনভর মানাবপাচার বিরোধী অভিযান ও সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মানবপাচার বন্ধে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে’। ##

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.