হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

প্রচ্ছদফিচার

মাদক ও মানবপাচার রোধে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান জরুরি

তুষার কণা খোন্দকার::

সমুদ্রপথে মানব ও dfghfdমাদকপাচারের ভয়াবহ বর্ণনা পত্রিকার পাতায় ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কক্সবাজার জেলার সার্বিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে। মনে হচ্ছে, কক্সবাজার জেলা মানব, মাদক ও অস্ত্রপাচারকারীদের অভয়ারণ্য। ভয়ংকর সব অপরাধের ফিরিস্তি দিতে গিয়ে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যাও বারবার সামনে চলে আসছে। মাদক ও মানবপাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই রোহিঙ্গা নয়, তবে রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ সব ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত এতে কোনো সন্দেহ নেই। পুলিশের রিপোর্টেও এর সত্যতা উঠে এসেছে। কক্সবাজার জেলার টেকনাফ, উখিয়া, রামু ও বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়িতে তারা ব্যাপক সংখ্যায় ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় রাজনীতিক, পুলিশ ও প্রশাসনের অন্যান্য শাখার সহযোগিতা নিয়ে রোহিঙ্গারা অনায়াসে বাংলাদেশি সেজে স্থানীয় সরকার ও জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে তুলছে। সেই সঙ্গে তারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নির্ধারিত শ্রমবাজারে ভাগ বসাচ্ছে। স্থানীয় রাজনীতিক ও গডফাদাররা রোহিঙ্গাদের দিয়ে অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করেন, স্থানীয় প্রশাসন তাদের ব্যবহার করে নিজেরাও ভাগ্য গড়ার কাজে ব্যস্ত আছে, এসব তথ্য কারো অজানা নয়। কিন্তু এই রোহিঙ্গা সমস্যা সৃষ্টি করা ও এই সমস্যাকে জটিল থেকে জটিলতর করে তোলার দায়ভার কি শুধু স্থানীয় রাজনীতিক ও স্থানীয় প্রশাসনের? কেন্দ্রীয় সরকারের কি কিছুই করার ছিল না কিংবা নেই?

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান করার সদিচ্ছা নিয়ে কোনো সরকার কি আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে দেখেছে? বিএনপি-জামায়াত সরকার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে নারাজ থাকবে- এটাকে আমরা সহজে মেনে নিই। কারণ বিএনপি ক্ষমতায় এলে রোহিঙ্গা সমস্যার জন্ম হয়, এ কথা সবাই জানে। ১৯৯১ সালে নাফ নদীর কিনারে বাংলাদেশ অংশে ‘আহলান ওয়া সাহলান’ লিখে ব্যানার ঝুলিয়ে দিয়ে রোহিঙ্গাদের এপারে ডেকে আনা হয়েছিল। রোহিঙ্গারা নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে ঢুকতে না ঢুকতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার তাদের ত্রাতা হিসেবে এ দেশে ছুটে এসেছিলেন। অর্থাৎ রোহিঙ্গা সমস্যা যেন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা ছিল না। ভাব দেখে মনে হয়েছিল, সমস্যাটি ছিল ইউএনএইচসিআরের একান্ত নিজস্ব সমস্যা। ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সঙ্গে জুটিয়ে নিয়েছিল পশ্চিমা দুনিয়ার কিছু এনজিও। তাদের সহযোগী হিসেবে ছিল রাবেতা আল আলম আল ইসলাম, আল মারকাজুল ইসলাম ও আরো এই ধরনের মোট ৩৩টি এনজিও। মোটকথা, রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সব দরজা বন্ধ করে দেওয়ার সব অপপ্রয়াস ১৯৯১ সালেই শুরু হয়েছিল।

রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার সুদীর্ঘ সময়ের স্থায়িত্ব দেখে মনে হয় যেন রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা বাংলাদেশের অস্তিত্বের অংশ। কিন্তু এই সমস্যা প্রায় মিটে গিয়েছিল। প্রত্যাবাসন কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর আড়াই লাখ শরণার্থীর মধ্যে দুই লাখ ৩০ হাজার শরণার্থীকে মিয়ানমার সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে ফেরত নিয়েছিল। প্রত্যাবাসিত শরণার্থীরা যাতে মিয়ানমারে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে সে জন্য জাতিসংঘের সহযোগী সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে শরণার্থী হাইকমিশনও মিয়ানমারে কাজ শুরু করেছিল। রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি কতটুকু আন্তরিক ছিল সে বিষয়ে ফের মনে প্রশ্ন জাগে। দুই লাখ ৩০ হাজার শরণার্থী প্রত্যাবাসিত হওয়ার পর সামান্য ২১ হাজার শরণার্থীর জন্য কুতুপালং ও নয়াপাড়া শরণার্থী শিবির দুটি খোলা রাখার কোনো যুক্তি না থাকলেও বাংলাদেশ সরকার শরণার্থী হাইকমিশনকে নাখোশ করে ক্যাম্প দুটি বন্ধ করার কোনো জোরালো উদ্যোগ কখনো নেয়নি। ক্যাম্প দুটি খোলা রাখার কারণে প্রতিবেশী মিয়ানমারের কাছে আমাদের দিক থেকে একটি ভুল বার্তা গেছে। তারা ধরে নিয়েছে আমরা রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান চাই না। আমরা সমস্যা জিইয়ে রেখে পশ্চিমা দুনিয়াকে খুশি করার কাজে যত আগ্রহী, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করে প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর বিষয়ে আমাদের তেমন আগ্রহ নেই।

শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে ধাপে ধাপে কত ধরনের নিষ্ঠুর খেলা খেলেছে সেটা বর্ণনা করে শেষ করার নয়। শরণার্থীরা যখনই তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসিত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে তখনই শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন তাদের সামনে লোভের টোপ ফেলে বাংলাদেশে তাদের আটকে রেখেছে। তারা বলেছে, কুতুপালং ও নয়াপাড়া ক্যাম্পে আটকে পড়া শরণার্থীরা পরিত্যক্ত ও রাষ্ট্রহীন নাগরিক। তাদের তৃতীয় কোনো দেশে আশ্রয় দেওয়ার জন্য তারা ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার কাছে আবেদন করেছে। ইউএনএইচসিআরের আবেদনে সাড়া দিয়ে এত বছরে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা সর্বসাকল্যে কয়েক শ রোহিঙ্গা পরিবার তাদের দেশে আশ্রয় দিয়েছে। সেই সামান্য কয়েকটি পরিবারের উন্নত দেশে ঠাঁই পাওয়ার কেচ্ছা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করার ফলে কানাডা-আমেরিকা যাওয়ার লোভে আরো শরণার্থী এসে বাংলাদেশে ভিড় জমিয়েছে। অবস্থা দেখে মিয়ানমারের শাসক থেন সেইন বলেছেন, ‘ইউরোপ-আমেরিকা যদি রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে আশ্রয় দিতে চায়, তাহলে সেটা তারা খোলাখুলি বলুক। আমরা জাহাজ ভরে তাদের সেই দেশে পাঠিয়ে দেব।’ সব কিছু দেখেশুনে মনে হয়, রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের কোনো সমস্যা নয়। এটি শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন ও হাইকমিশনের অর্থদাতা পশ্চিমা দুনিয়ার সমস্যা।

এই সমস্যা স্থায়ীভাবে জিইয়ে রাখার জন্য শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন কত ফিকিরের না আশ্রয় নিয়েছে। নব্বইয়ের দশকে অনেক সরকারি কর্মকর্তা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার বিনিময়ে অনেক রকম ব্যক্তিগত ফায়দা নিয়েছেন। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রশাসনের কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার লক্ষ্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীসংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার অতিরিক্ত সাবসিস্টেন্স অ্যালাউন্স নামে মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়া হতো। এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ নিয়মিত এই অর্থ ভোগ করত। রোহিঙ্গারা বন উজাড় করে ফেলছিল অজুহাতে বন বিভাগ প্রতিবাদী হয়ে উঠলে ইউএনএইচসিআর বন বিভাগকে খুশি করার লক্ষ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রকল্প প্রস্তাব ছাড়াই বনায়নের জন্য দ্রুত বিশেষ অর্থ বরাদ্দ দিয়েছিল। বনায়নের লক্ষ্যে প্রাপ্ত থোক বরাদ্দের পাঁচ কোটি টাকা খরচ করে কক্সবাজার জেলার কোথাও একটি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল কি না সে তথ্য কক্সবাজারের সাধারণ মানুষ ভালো করে জানে। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণ রোহিঙ্গাদের অত্যাচারে মারমুখী হয়ে উঠলে জাতিসংঘের শরণার্থী কমিশন অ্যাসিস্ট্যান্স ফর বাংলাদেশি ভিলেজেস (এবিভি) নামে প্রকল্প উপহার দিয়ে স্থানীয় সুবিধাভোগী সৃষ্টি করার কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছিল।

রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি করার লক্ষ্যে ইউএনএইচসিআর তাদের প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগী নাম দিয়ে ৩৩টি এনজিওকে সঙ্গে নিয়েছিল। এনজিওগুলো তাদের দাতাদের হাত থেকে অর্থ সাহায্য পাওয়ার মেয়াদ যত দূর সম্ভব দীর্ঘ করে তুলতে চায়। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বেলায়ও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। তারা নিজ স্বার্থে দেশে ও বিদেশে এই বলে জিগির তুলেছিল যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বল প্রয়োগে প্রত্যাবাসন করা হচ্ছে, যা শরণার্থীদের মানবাধিকারের লঙ্ঘন। স্বার্থসংশ্লিষ্ট এনজিওগুলোর তরফ থেকে নির্বিচারে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ সরকারকে বিশ্বদরবারে বারবার হেয় করার পরও অদৃশ্য কারণে সরকার এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং সরকারের উঁচু পর্যায়ের প্রশ্রয় পেয়ে এনজিওগুলো শরণার্থীদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসিত না হওয়ার জন্য রীতিমতো প্ররোচনা দিয়েছে। শরণার্থী প্রত্যাবাসনসংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় সভায় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বারবার বিষয়টি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পক্ষে মিয়ানমার সরকারের সামনে কোনো জোরালো প্রস্তাব তুলে ধরতে পারেনি।

জাতিসংঘের শরণার্থী কমিশন তাদের নিজেদের কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যাকে দীর্ঘমেয়াদি রূপ দিতে চেয়েছিল। তাদের সে কাজে তারা শতভাগ সাফল্য দাবি করতে পারে। কিন্তু শরণার্থী হাইকমিশনের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কী অর্জন করেছে? রোহিঙ্গা সমস্যা জিইয়ে রেখে বাংলাদেশ তার নিকটতম প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছে। সেই সঙ্গে বাড়তি অর্জন হিসেবে পেয়েছে মানব-মাদক-অস্ত্রপাচার রোধে ব্যর্থতার গ্লানি। এত কিছুর পরও আলোচনার দরজা বন্ধ হয়ে গেছে বলে মনে হয় না। আন্তরিকতার সঙ্গে উদ্যোগ নিলে দুই প্রতিবেশী দেশ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে পারে। আমাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশ সরকার দেশি-বিদেশি মধ্যস্বত্বভোগীদের বাধা দূর করে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য অচিরে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করবে এবং ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করবে।

– See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/sub-editorial/2015/07/23/247589#sthash.yJZCme6H.dpuf

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.