টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

মন্তব্য প্রতিবেদন ঈদ সবার জন্য আনন্দ বয়ে আনে না ঈদ শুভেচ্ছায় নতুন সংস্কৃতি!

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : শনিবার, ১০ আগস্ট, ২০১৩
  • ১১৪ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

আনছার হোসেন: ঈদের দিন সকাল বেলা চ্যানেল আইয়ের মানিক ভাইয়ের ফোনে আমার ঘুম ভাঙ্গলো। রাতে একটু দেরিতে ঘুমিয়েছিলাম বলে ঘুম ভাঙ্গতেও একটু দেরিই হলো। মানিক ভাই ‘ঈদ মোবারক’ জানিয়ে প্রথমেই জানতে চাইলেন, আমি ঈদের নামাজ কোথায় পড়বো। আমি বললাম, ‘বাড়ির কাছের মসজিদেই ঈদের নামাজ পড়বো।’ তারপর তিনি জানতে চাইলেন, ‘তোমার ওখানে ঈদের জামাত ক’টায়।’ আমি স্বাভাবিক ভাবেই জানালাম, সকাল সাড়ে ৯টায়! তিনি শুনে আশ্চর্য হয়েই বললেন, ‘এতো দেরি কেন?’ আমি তাকে বললাম, জানি না! তিনি অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন …! ঘুম ভাঙ্গা আধো জাগরনে মানিক ভাইকে জানানো হলো না ‘কেন ঈদের জামাত সাড়ে ৯টায়’। এবার সবার কাছে বলি, সাধারণত শহরের ঈদের মূল জামাতগুলো সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে হয়ে গেলেও আমি ছোটকাল থেকেই দেখে আসছি, আমাদের মহল্লায় (উত্তর নুনিয়াছড়া, বর্তমানে পৌরসভার ২ নাম্বার ওয়ার্ড) ঈদুল ফিতরের নামাজটা সব বছরই একটু দেরিতেই হয়। মুরব্বিরা বসে ঠিক করেন, সময়টা একটু দেরিতে! কেন দেরিতে ঈদ জামাত করা হয়, তার সঠিক জবাব পাওয়া না গেলেও ছোট বেলা থেকেই দেখে আসছি, ঈদের দিন সকাল বেলাতেও কারো কারো বাজারে দৌঁড়াতে হয়। আমার বাবাকে ছোট বেলায় দেখেছি, সামর্থে পোষাতে না পেরে ঈদের দিন ভোরে বাজারে যেতে! বাজার থেকে ফিরে গোসল সেরে আমাদের খুশি করেই ঈদের জামাতের যেতেন। শুধু আমার বাবা নয়, পাড়ার অনেকেই শেষ মুহুর্তের কেনাকাটার জন্য ঈদের দিন সকালে বাজারে ছুটতেন। তবে আমি যতটুকু উপলব্ধি করেছি, মনে হয় না তারা ইচ্ছাকৃত ভাবেই শেষ মুহুর্তের কেনাকাটা বাকি রেখে দিতেন। আসলে সবই সামর্থের বিষয়। এখনও মানুষকে সামর্থের কিনারা করার জন্য হয়তো ঈদের আগের দিন ‘চাঁদ রাত’ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়! আমি পুরোদস্তুর সাংবাদিকতা করলেও ঈদের বাজারে তেমন একটা যাই না। আমি কোলাহলে থাকতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি না। তাই অনেক সাংবাদিক যেমন ঈদের বাজার নিয়ে রিপোর্টিং করে আমি আমার কর্মজীবনে খুব কমবারই ঈদ কেনাকাটার রিপোর্টিং করেছি! যা-ও ক’বার করেছি তাও পরিচিত কোন ব্যবসায়ী কিংবা বন্ধুর আবদারে করেছি। এবারের রমজানের শেষ দিকে, বিশেষ করে ২৭-২৮ রমজানের দিকে ঈদ মার্কেটিংয়ে গিয়েছিলাম একান্তই সাংসারিক প্রয়োজনেই। কী দেখলাম! পুরো বাজারজুড়ে মানুষের ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই’ উপস্থিতি। মার্কেটগুলোতে কারো সাথে ধাক্কা না লেগে হাঁটারও উপায় নেই। মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, শেষ মুহুর্তে কেন এতো মানুষ! শেষ সময়ের দুইদিনে আমি যাদের দেখলাম, আমি তাদের চেহারাগুলো ভালো করে দেখলাম! অধিকাংশই ভাঙ্গাচোরা মুখ! উসকো খুসকো চুল! চেহারায় কান্তির চিহ্ন! হাসিমাখা মুখও ছিল খুবই কম। আসলে এরা নি¤œবিত্ত, নি¤œ-মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি। যাদের কাড়ি কাড়ি টাকা আছে তারা আগেই তাদের কেনাকাটা সেরে নিয়েছেন। হয়তো তারা এই সব মার্কেটেই আসেননি! চলে গেছেন ঢাকা-চট্টগ্রামের বড় কোন মার্কেটে! কিন্তু এখন যারা কুলে ছোট্ট শিশু নিয়ে বাজারে ঘুরছেন, এরা আমাদের সমাজেরই পোড়খাওয়া মানুষ। যারা দিনে এনে দিনে খায়, সামর্থ না থাকায় এতোদিন মার্কেটের দিকেই মুখ ফেরাতে পারেননি তারা! হয়তো শেষ মুহুর্তে ধার-দেনা করে শিশুদের পরিবারের অন্য সদস্যদের আবদার মেটাতেই উ™£ান্তের মতো খুঁজে ফিরছেন! যারা বলেন, দেশের মানুষ অভাবে নেই, আসলে তারাই অভাবে নেই। ‘তারা’ অভাবে নেই বলেই বুঝতে পারেন না, কারা অভাবে আছে! আমার আশপাশেই জানি, শত শত অভাবি মানুষ, কর্মসংস্থান না থাকায় দিনের খাবারটাও যোগাড় করতে পারেন না। তাদের খোঁজ তো কেউ নেয় না। যেখানে ত্রাণের ‘কার্ড’ও ৩০০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়, আর সেই ‘কার্ড’ও পায় স্বচ্ছল বিত্তশালীরা! আমি জানি না, দেশটা আসলে কোথায় আছে! বেশ কয়েকমাস ধরে আমাদের এলাকা শুনছি, রিলিফের কার্ড দেয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি কার্ডের দাম ৩০০ টাকা। আর ৩০০ টাকায় কেনা কার্ড হাতবদল হলে তা হয়ে যাচ্ছে ৫০০ টাকা। কিসের রিলিফ! খোঁজ নিয়ে জানা গেল, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি তেল, চাল ও অন্যান্য নিত্যপণ্য দেবে অসহায় গরীবদের। কিন্তু সেই কার্ড বিক্রি হচ্ছে নগদ মূল্যে। এলাকারই কতিপয় নারী-পুরুষ প্রতিটি কার্ড ১০০ টাকা দরে রেডক্রিসেন্ট থেকে কিনে আনে। এলাকায় এনে সেই কার্ড ২৫০-৩০০ টাকায় বিক্রি করেন। তাও আবার যে যতো কিনতে পারেন! জনপ্রতিনিধি ও তাদের ভাই-বোন আর আত্মীয়স্বজনরাই এই কার্ড বিক্রিতে এগিয়ে! আর কার্ড কিনে নিচ্ছে মধ্যবিত্ত ও স্বচ্ছল মানুষেরাই! তাহলে রিলিফ হলো কোত্থেকে! দুঃখিত, মানিক ভাই! ঈদ আনন্দ বয়ে আনলেও তা সবার জন্য আনন্দের হয়ে আসে না! যারা রমজান মাসের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেও তাদের বাচ্চা কিংবা পরিবারের সদস্যদের একটি জামা কিনে দিতে পারে না, ঈদ কী তাদের জন্য আনন্দ বয়ে আনে! সেই সকল মানুষের শেষ চেষ্টার সময় হিসেবে আমাদের এলাকায় ঈদের জামাত হয় একটু দেরিতে! এতে আমরা দুঃখিত নই! এবার ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। মানিক ভাই ঈদের সকালে ফোন দিয়েছিলেন মূলতঃ একটি বিষয় জানতে, ‘কিভাবে অনেকগুলো নাম্বারে একসাথে ঈদ মেসেজ পাঠানো যায়’। মোবাইলে ঈদ মেসেজ পাঠানো একটি নতুন সংস্কৃতি! যখন মোবাইল ছিল না, তখন ঘরে ঘরে গিয়ে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় হতো। যখন মোবাইল আসলো তখন মোবাইলেই ঈদ শুভেচ্ছা সেরে নেয়া হয়। সেই গন্ডিটা আরও একটু ছোট করে এখন চলছে ‘মোবাইল মেসেজ’ ও ই-মেইল সংস্কৃতি! আমিও বেশ ক’বছর এসএমএস দিয়ে ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছি। কিন্তু বিগত ৩টা বছর একটা মেসেজও আমি কাউকে দিইনি। কেননা, এটি ‘দায় সারানো’ ঈদ শুভেচ্ছা! কেউ কাউকে দেখলো না, কেউ কারো কথা শুনলো না! মাত্র ১৬০ অক্ষরের ছোট একটি মেসেজ দিয়েই শুভেচ্ছা বিনিময় শেষ! ইদানিং দেখছি, ই-মেইলেও ঈদ শুভেচ্ছার প্রচলন হয়েছে! একটি ভার্সূয়াল কার্ড বানিয়ে এক কিকে সবার শুভেচ্ছা পাঠানো সারা! প্রযুক্তি যেমন আমাদের এগিয়েছে, তেমনি মানবিকতা বোধ থেকে অনেকটাই পিছিয়ে নিয়ে গেছে। আমরা এখন ‘ডিজিটালে’র পাল্লায় ঘুরপাক খাচ্ছি! আমি মনে করি, আমরা ডিজিটাল হতে চায়, তবে মানবিক বোধ বজায় রেখে! তা না হলে আমরা মানুষ হলাম কেন! আল্লাহর রাসূল (স.) বলে গেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশিদের খবর নিল না সে পুরোপুরি মুমিন নয়।’ হাদিসে বাড়ির চতুর্পাশের ৪০ ঘরের খবর রাখতে বলা হয়েছে। আমরা কী সবচেয়ে কাছে প্রতিবেশির খবরটা এখন রাখি! ১০ জুলাই ২০১৩

লেখক ঃ আনছার হোসেন, দৈনিক সৈকতের নির্বাহী সম্পাদক ও বার্তা প্রধান এবং দৈনিক আমার দেশ’র কক্সবাজার প্রতিনিধি।

 

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT