টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

বেপরোয়া স্বর্ণ পাচারকারীরা

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৩
  • ১৬১ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

উৎপল রায়: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন স্বর্ণ চোরাকারবারিদের নিরাপদ রুট। বিমান, সিভিল এভিয়েশন ও নিরাপত্তাকর্মীদের যোগসাজশে ঢুকছে অবৈধ চালান। মাঝে-মধ্যে দু-একটি ধরা পড়লেও পাচার হয়ে যাচ্ছে বেশির ভাগ স্বর্ণের চালান। কখনও বাহক (ক্যারিয়ার) ধরা পড়লেও মূল হোতাদের টিকিটিও ছুঁতে পারে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিমানবন্দরের শুল্ক কমিশনার জাকিয়া সুলতানা বলেন, স্বর্ণ চোরাচালানের  ঘটনা উদ্বেগজনকহারে বেড়ে যাওয়ায় কাস্টমস বিভাগের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা সদস্যদের আরও তৎপরতা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুরো বিমানবন্দরকে কঠোর নজরদারিতে রাখতে বলা হয়েছে।  সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, স্বর্ণ পাচারকারীদের সঙ্গে বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী সিভিল এভিয়েশন, শুল্ক বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থার এর শ্রেণীর প্রভাবশালী কর্মকর্তা জড়িত। তাদের গোপন নির্দেশনা মোতাবেক বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে বড় বড় স্বর্ণের চালান বিমানবন্দর দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। পাচারকারী সিন্ডিকেটের প্রলোভনে পড়ে বিমানবালা, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী ও যাত্রীবেশী পাচারকারীরা স্বর্ণের চালান বহন করে থাকে। আর্মড পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অন্যতম। বিমানবন্দরের যাত্রী ও তাদের লাগেজ চেকিংয়ে কোন কোন কর্মকর্তা চরম উদাসীনতার পরিচয় দিয়ে থাকেন। অনেক সন্দেহভাজনকে চেকিং ছাড়াই বের করে দেন তারা। সমপ্রতি স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বেশ কয়েকটি স্বর্ণের বড় চালান ধরা পড়ায় তোলপাড় শুরু হয় বিমানবন্দর এলাকায়। এসব ঘটনায় দু’একজন আটক বা গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। সূত্র জানায়, গত ৬ই জুলাই কুয়েত থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট (নম্বর ০৪৪)-এর ১৬ নম্বর আসনের নিচ থেকে ২৫ কেজি ৩১০ পয়েন্ট ৮৮ গ্রাম ওজনের ২১৭টি স্বর্ণের বার (বিস্কুট সদৃশ) উদ্ধার করা হয়। এর আনুমানিক মূল্য প্রায় ৯ কোটি টাকা। এ ঘটনায় কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা যায়নি। ১৯শে জুলাই সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে আসা মিজানুর রহমান ওরফে রিপন নামে এক যাত্রী বিমানবন্দরের আগমনী ক্যানোপি-২ এলাকা অতিক্রম করার সময় সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে আটক করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)-এর নিরাপত্তা কর্মীরা। এ সময় তার ব্যাগ তল্লাশি করে ৪০০ গ্রাম স্বর্ণের বার, দামি মোবাইলসহ প্রায় কোটি টাকার মালামাল উদ্ধার করে তাকে আটক করা হয়। ২৯শে জুলাই দুবাই এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে (ইকে ৫৮৬) আসা মিজানুর রহমান নামে অপর এক যাত্রীর লাগেজ স্ক্যানিং করার পর ১৭টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা। একই দিন রাত ৯টায় ড্রাগন এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজে আসা এক যাত্রীর লাগেজ স্ক্যানিং করার সময় ৫২টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। ১৯শে আগস্ট ৮ কেজি সোনাসহ দীপক কুমার আচার্য্য নামে এক ভারতীয় নাগরিককে আটক করেন এপিবিএন-এর নিরাপত্তাকর্মীরা। গত ৩০শে আগস্ট ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের মাস্কট-দুবাই-ঢাকার একটি ফ্লাইটে আসা ১৮ কেজি ওজন স্বর্ণের আরও একটি চালান ধরা পড়ে। তবে আটক করা যায়নি কাউকে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্মরণকালের আলোচিত ও সর্ববৃহৎ সোনা চোরাচালান ধরা পড়ে গত ২৪শে জুলাই। এদিন নেপাল থেকে আসা (ডিসি-১০) ফ্লাইটে এ চালানটি এসেছিল। উড়োজাহাজের কার্গো হোলের ভেতরে ১৫টি কাপড়ের ব্যাগে মোড়ানো অবস্থায় ১২৪ কেজি ২২১ গ্রাম ওজনের ১০৬৫টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। এর আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫৪ কোটি টাকা। এই ঘটনায় নড়েচড়ে বসে বিমান কর্তৃপক্ষ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) এম এ মোমিনকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে এ কমিটি পাচারকারীদের বিষয়ে বেশি দূর এগুতে পারেন নি। তার আগেই তদন্ত কাজ থেমে গেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানন, ১২৪ কেজি সোনা বিমানবন্দরের যে এরিয়ায় ধরা পড়েছিল সেই এরিয়াটি ‘প্যানেল বক্স’ নামে পরিচিত। এখানে বিমানের পাইলট ও সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া কারও প্রবেশের  অনুমতি নেই। বিমানের প্রকৌশলী ছাড়া প্যানেল বক্সের ঢাকনা খোলাও অসম্ভব। তারা বলছেন বিমানের নিজস্ব লোকজন ছাড়া এত বড় স্বর্ণের চালান আনা সম্ভব নয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৮ই আগস্ট দুবাই থেকে আসা একটি ফ্লাইটে ৩০ কেজি ও ২১শে আগস্ট বিজি মাস্কট ফ্লাইটে ৮ কেজি সোনার বার আসার তথ্য ছিল বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আর্মড পুলিশ ব্যাটলিয়নের কাছে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থাও নিয়েছিলেন এপিবিএন-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কিন্তু বিমানবন্দরের শুল্ক বিভাগ ও সিভিল এভিয়েশন সংস্থার কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা চোরাচালানিদের কাছে তথ্য ফাঁস করে দেন। ফলে হাত ফসকে বেরিয়ে যায় আরেকটি বড় চালান। আইন বিশেষজ্ঞরা জানান, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(খ) ধারানুযায়ী সোনা চোরাচালানকারীর সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন (৩০ বছর) সশ্রম কারাদণ্ড। জানা গেছে সাজা দূরে থাক, স্বর্ণ চোরাচালানিরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর এক-দু’মাসেই জামিনে বেরিয়ে আসে অদৃশ্য শক্তির ইশারায়। নতুন করে আবারও তারা শুরু করে তাদের ‘স্বর্ণ বাণিজ্য’। নিরাপদ ও অবাধ হিসেবে চোরাকারবারিরা ব্যবহার করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)’র একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুবাই প্রবাসী বাংলাদেশী একটি চক্র হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মাধ্যমে স্বর্ণ চোরাচালান করে। ভারত, পাকিস্তান, হংকং, সিঙ্গাপুর সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এদের নেটওয়ার্ক বিস্মৃত। তাদের  সহযোগিতা করে বিমানবন্দর ও বিমানের দেখভালে নিয়োজিতরা। বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ ও ২-এ ৪ জন, কার্গোতে ৮ জনসহ ১২ জন শুল্ক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করেন। এ, বি ও সি এই তিন শিফটে তারা কাজ করেন। এর মধ্যে ‘সি’ শিফট সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ। এই বিভাগের সহকারি কমিশনার ৩ জন, অতিরিক্ত কমিশনার ১ জনসহ অন্তত ৬ জন শুল্ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিমানবন্দরে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ দীর্ঘ দিন ধরে। এদের সহযোগিতা করে সিভিল এভিয়েশন ও গোয়েন্দা বিভাগের আরও কিছু কর্মকর্তা। পাশাপাশি বিভিন্ন উড়োজাহাজের পাইলট, ইঞ্জিনিয়ার, কেবিন ক্রুরাও চোরাকারবারিদের সহযোগিতা করে থাকে। বিমানবন্দরের ট্রানজিট এরিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। আন্তর্জাতিক এরিয়া হিসেবেও তা পরিচিত। স্বর্ণ চোরাচালানের জন্য এটিই এখন ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা। কোন ফ্লাইট যাত্রা বিরতি দিলে তারা স্বর্ণের ব্যাগ, লাগেজ নিয়ে ট্রানজিট এরিয়ায় অপেক্ষা করে। একসময় সুযোগ বুঝে তা আগে থেকেই নির্ধারিত ও নিজস্ব লোকজনের হাতে ধরিয়ে দিয়েই সটকে পড়ে। বাকি কাজ (টার্মিনাল পার করা) করে দেয় শুল্ক ও গোয়েন্দা শাখা, সিভিল এভিয়েশনের অসাধু কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এছাড়া উড়োজাহাজ ল্যান্ড করার পর তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করার জন্য নিয়ে আসা হয় কার্গো এরিয়ার হ্যাঙ্গার গেটে। আর তখনই উড়োজাহাজ থেকে স্বর্ণ নামানোর কাজটি সেরে দেয় সেখানকার কর্মচারীরা। পাচারকৃত স্বর্ণ কখনও রাখা হয় বোর্ডিং ব্রিজের পাশে ওয়াশরুমে। সেখান থেকে দেয়া হয় গ্রীন অথবা রেড সিগন্যাল। এরপর সময় ও সুযোগ বুঝে বিমানবন্দরের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সহায়তায় তা টার্মিনালের বাইরে নিয়ে আসা হয়। কাজ সফল হলে সংশ্লিষ্টদের দেয়া হয় চালানের বড় একটি অংশ। বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, যাত্রীরা উড়োজাহাজ থেকে নেমে ‘এন্ট্রি পয়েন্ট’ পার হয়ে আসেন এপ্রোন এরিয়ায়। সেখান থেকে ইমিগ্রেশনের কাজ সম্পন্ন করে বোর্ডিং এরিয়া পার হয়ে আসেন কনভেয়ার বেল্টে। বেল্ট এরিয়াতে হলেই যাত্রী ও তাদের লাগেজ স্ক্যানিং করা হয়। যাত্রী ছাড়াও উড়োজাহাজ সংশ্লিষ্ট পাইলট, প্রকৌশলী, কেবিন ক্রু, কর্মচারীদের স্ক্যানারের সম্মুখীন হওয়া বাধ্যতামূলক। অভিযোগ রয়েছে শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা অনেক সময় স্ক্যানিং মেশিনে যাত্রীদের ব্যাগ, লাগেজ ও শরীর স্ক্যানিং করতে দেন না। শুধু তাই নয় নিরাপত্তা কর্মীরা কারও লাগেজ,  ব্যাগ ও শরীর চেক করতে চাইলে তারা তা ‘চেক ব্যাক’ (সার্চ না করেই ফেরত) করে দেন। আর এভাবেই চোরাকারবারিরা সহজেই স্বর্ণ বহন করে কাস্টমসের ঝামেলা এড়িয়ে গ্রীন চ্যানেল, কনফোর্স হল পার হয়ে যান। একসময় বিমানবন্দরের ক্যানোপি অতিক্রম করে নির্বিঘ্নে টার্মিনালের বাইরে চলে আসেন। একই সঙ্গে বিমানের কেবিন ক্রুরা শরীরের স্পর্শকাতর ও গোপন স্থানসহ জুতা, মোজার ভেতরে সহজেই বহন করে নিয়ে আসে স্বর্ণসহ বৈদেশিক মুদ্রা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আর্মড পুলিশ ব্যাটলিয়ন (এপিবিএন)-এর জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ পরিদর্শক মো. মোতাজ্জের হোসেন মানবজমিনকে বলেন, বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালানরোধে আমাদের আন্তরিকতার কোন কমতি নেই। কিন্তু সর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে করার কিছুই নেই। তাছাড়া বেশির ভাগ সময় সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা আমরা পাই না। যদি তা পেতাম তাহলে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরকে চোরাচালানমুক্ত রাখা সম্ভব হতো। বিগত দু’তিন বছরে স্বর্ণের যত চালান বিমানবন্দরে ধরা পড়েছে তা এপিবিএন দায়িত্ব গ্রহণের পর। আমাদের যদি পূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে এ সফলতা আরও বাড়বে। এপিবিএন-এর একজন অতিরিক্ত পুলিশ পরিদর্শক ক্ষোভের সঙ্গে মানবজমিনকে বলেন, ২০১০ সালের জুন মাস থেকে এপিবিএন বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় কাজ করছে। এখন পর্যন্ত তাদের স্থায়ী করা হয়নি। তারপরও এই সময়ের মধ্যে পুরো বন্দরের পরিবেশ পাল্টে দিয়েছি আমরা। কিন্তু শুল্ক ও সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তারা আমাদের সেভাবে সহযোগিতা করেন না। বরঞ্চ তাদের দাপটের কাছে আমরা অসহায়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম সরকার বলেন, সোনা পাচারকারীরা এত ঊর্ধ্বে যে কেউ এতো উপরে হাত দিতে পারে না। বিষয়টি যদিও কাস্টমসের দায়িত্ব তারপরও ধরা পড়ার ঘটনায় কেউ না কেউ ভূমিকা রাখছে। আবার পাচারেও কারও কারও ভূমিকা আছে। তারপরও আমরা এবিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’। নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে বিমানবন্দরকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে। বিমানবন্দরে শুল্কবিভাগসহ নিরাপত্তায় নিয়োজিত সবাই যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন তাহলে সোনা চোরাচালান রোধ করা সম্ভব বলে মনে করি।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT