হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

প্রচ্ছদবিনোদনশিক্ষা

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস: অপসংস্কৃতির চর্চা; সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়

গিয়াস উদ্দিন []

বাঙালির একটি নিজস্ব ঐতিহ্য ও হাজার বছরের ইউনিক সংস্কৃতি রয়েছে। মুসলিম অধ্যুষিত এই বাংলাদেশে ইসলামী আবেগ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ বিরাজমান শত শত বছরজুড়ে। কিন্তু বর্তমান সময়ে আধুনিকতার নামে সেই ইউনিক সংস্কৃতির ভেতরে সজ্ঞানে বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাব আমরা খুব বেশি পরিমাণে লক্ষ্য করছি। তার একটি সংস্করণ হলো বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ যা প্রতিবছর ১৪ই ফেব্রুয়ারীতে পালিত হয় বিশ্বব্যাপী। ভালোবাসা কিন্তু একটি পবিত্র শব্দ। বাবা ছেলেকে বা মেয়েকে ভালোবাসবে। তার নাম ভালোবাসা। এভাবে মা মেয়েকে, ভাই বোনকে, বোন ভাইকে বা বৈধ উপায়ে আরও যা যা আছে। কিন্তু আজকে সেই পবিত্রতার স্তরটাকে তার নির্ধারিত স্থান থেকে ঠেলে দিয়ে নোংরা একটি পরিবেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। সুতরাং সে নির্দিষ্ট দিনের ভালোবাসা কখনও পবিত্র হতে পারে না। তার বরং নোংরামী, নষ্টামী, চরিত্রহীনতা, বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ প্রভৃতি।

চলুন এবার একটু বাংলা একাডেমির অভিধান থেকে ঘুরে আসি ভালোবাসা মানে কি জানি: সেখানে ভালোবাসার মানে আছে-‘ভালোবাসা হলো একটি ক্রিয়াপদ। যার অর্থ কারো প্রতি অনুরক্ত হওয়া, আসক্ত হওয়া, পছন্দ করা, ভক্তি করা। আর বিশেষ্য হিসেবে অনুরাগ, বন্ধুত্ব, শ্রদ্ধা, ভক্তি, প্রীতি, পছন্দ, টান। কিন্তু এই পবিত্র শব্দের সাথে বর্তমানের ক্রিয়াগুলোর কোনো মিল নেই। সেই অর্থে তার অর্থ দাড়ায়: দুইজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষের অবৈধ বিচরণ, অশ্লীলতা, নোংরামী, নষ্টামী, অশ্লীল নাচ গান, অসুস্থ বিনোদন, শঠতা, লালসা, পাশবিকতা, অপবিত্রতা, নির্লজ্জ্বতা, বেহায়াপনা, অপসংস্কৃতির ব্যাপকতা, তরুণ-তরুণীদের চারিত্রিক মারাত্মক অবক্ষয়, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সামাজিক প্রেক্ষাপট ধ্বংস সর্বোপরি চরিত্রহীন বা চরিত্রহীনা হওয়ার এক সহজলভ্য মাধ্যম প্রভৃতি।

বিশ্বভালোবাসা দিবসের উদ্ভব- বেশ কয়েকটি গল্প পাওয়া যায় এই বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এর। তার মধ্যে একটি হলো-

রোমের স¤্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস-এর আমলের ধর্মযাজক সেন্ট ভ্যালেনটাইন ছিলেন শিশুপ্রেমিক, সামাজিক ও সদালাপী এবং খৃষ্টধর্ম প্রচারক। আর রোম স¤্রাট ছিলেন বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজায় বিশ্বাসী। ঐ স¤্রাটের পক্ষ থেকে তাকে দেব-দেবীর পূজা করতে বলা হলে ভ্যালেন্টাইন তা অস্বীকার করায় তাকে কারারূদ্ধ করা হয় স¤্রাটের বারবার খৃষ্টধর্ম ত্যাগের আজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করলে ২৭০ খৃষ্টাব্দের ১৪ই ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রীয় আদেশ লঙ্ঘনের দায়ে ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়।

আর আমাদের দেশে এই দিনটি পালন করা শুরু হয় ১৯৯৩ সাল থেকে। তা আজ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। যা হোক যার কোনো জাতীয় বা ধর্মীয় উৎপত্তির কোনো ভিত্তিই নাই সেটা আবার কেমন করে দিবস হতে পারে?

এবার দেখি ধর্মীয় দিক থেকে তা কেমন:

‘ভালোবাসা’ এক পবিত্র জিনিস যা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর পক্ষ হতে আমরা পেয়েছি। ভালবাসা’ শব্দটি ইতিবাচক। আল্লাহ তা‘আলা সকল ইতিবাচক কর্ম-সম্পাদনকারীকে ভালবাসেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘‘এবং স্বহস্তে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ো না। তোমরা সৎকর্ম কর, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ মুহসিনদের ভালবাসেন।’’(সূরা আল-বাকারা:১৯৫)। ভুলের পর ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং পবিত্রতা অবলম্বন করা এ দুটিই ইতিবাচক কর্ম। তাই আল্লাহ তাওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদেরকেও ভালবাসেন।আল্লাহ বলেন,

‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ তাওবাকারী ও পবিত্রতা অবলম্বনকারীদেরকে ভালবাসেন।’’ (সূরা আল-বাকারা : ২২২)।

তাকওয়া সকল কল্যাণের মূল। তাই আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে খুবই ভালবাসেন। তিনি বলেন,

‘‘আর নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদেরকে ভালবাসেন।’’ (সূরা আল ইমরান :৭৬)।

পবিত্র এ ভালবাসার সাথে অপবিত্র ও নেতিবাচক কোন কিছুর সংমিশ্রণ হলে তা আর ভালবাসা থাকে না, পবিত্রও থাকে না, বরং তা হয়ে যায় ছলনা, শঠতা ও স্বার্থপরতা। আর অমুসলিমদের পদাঙ্ক অনুসরণ তো কেবল তারাই করতে পারে যাদের আল্লাহ্র ব্যাপারে কোনো ভয় নেই; আল্লাহ্ অন্য কোন জীবন-ব্যবস্থা কখনও গ্রহণ করবেন না, তিনি বলেন:

“এবং যে কেউই ইসলাম ছাড়া অন্য কোন জীবন-ব্যবস্থা আকাঙ্খা করবে, তা কখনোই তার নিকট হতে গ্রহণ করা হবে না, এবং আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের একজন ৷” (সূরা আলে ইমরান, ৩:৮৫)

এবং নবী(সা.) বলেছেন, এই উম্মাতের মধ্যে কিছু লোক বিভিন্ন ইবাদতের প্রক্রিয়া ও সামাজিক রীতিনীতির ক্ষেত্রে আল্লাহর শত্রুদের অনুসরণ করবে ৷ আবু সাঈদ আল খুদরী(রা.) বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ(সা.) বলেন:

“তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের অনুসরণে লিপ্ত হয়ে পড়বে, প্রতিটি বিঘৎ, প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্যে [তাদের তোমরা অনুসরণ করবে], এমনকি তারা সরীসৃপের গর্তে প্রবেশ করলে, তোমরা সেখানেও তাদেরকে অনুসরণ করবে ৷” আমরা বললাম, “হে রাসূলুল্লাহ ! তারা কি ইহুদী ও খ্রীস্টান?”  তিনি বললেন: “এছাড়া আর কে?” (বুখারী, মুসলিম)

আজ মুসলিম বিশ্বের বহু স্থানে ঠিক এটাই ঘটছে, মুসলিমরা তাদের চালচলন, রীতিনীতি এবং উৎসব উদযাপনের ক্ষেত্রে ইহুদী ও খ্রীস্টানদের অনুসরণ করছে ৷ টিভি, পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন, স্যাটেলাইট চ্যানেল, ইন্টারনেটের মত মিডিয়ার প্রচারে কাফিরদের অনুসৃত সমস্ত রীতিনীতি আজ মুসলিমদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচেছ এবং এর অনুসরণ ও অনুকরণ সহজতর হয়ে উঠেছে ৷

ভালোবাসা হতে হবে জান্নাতে যাওয়ার জন্য, তাই সেভাবে কাজ করাই হবে প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। অন্যান্য দিবসের মতো বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালনের মধ্য দিয়ে আমরা কি উপকৃত হয়েছি? কেউ কেউ হয়তোবা হ্যাঁ জবাবকে বেছে  নেবেন। কিন্তু অধিকাংশ লোকই মনে করেন, ভালোবাসা দিবস সমাজকে অশ্লীল ও অন্যায়ের দিকে ধাবিত করছে। নৈতিক অবক্ষয় দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অভিভাবকগণ সঠিকভাবে সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দিলে হয়তোবা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির মুখোমুখী হতে হবে না।

ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও গোটা দেশকে ভালোভাবে গড়তে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তা নাহলে ভালোবাসা দিবস পালনের নামে আমাদের সন্তানরা নৈতিক অবক্ষয়ের অতলে হারিয়ে যাবে। সমাজ পতিত হবে বিশৃঙ্খলার অতল গহ্বরে। যার আলামত আমাদের চারপাশে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আজকাল ধর্মের কথা শুনলেই অনেকেই নাক সিটকান। কারণ তাদের কাছে ধর্ম মানেই পশ্চাৎপদতা, মৌলবাদিতা; ধর্ম মানেই সেকেলে বিষয়। তাই তারা নিজেদের এক আধুনিক সভ্য সমাজের অন্তর্ভুক্ত মনে করেন। কিন্তু বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের নামে যে অশ্লীলতার চর্চা চলছে তা বন্ধ না হলে তাদের সেই তথাকথিত সভ্য সমাজটাও পারিবারিক-সামাজিক কলহ এবং অশান্তির আগুনে পুড়ে ছারখার হতে বাধ্য।

অতএব, আসুন- আগে আমরা অভিভাকরা সচেতন হই, সচেতন করি আমাদের সন্তানদের। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালনের নামে আমাদের সন্তানকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে বাঁচাই, সতর্ক হই আমাদের পরিবার ও সমাজকে অশ্লীলতা থেকে বাঁচাতে।

গিয়াস উদ্দিন, সহকারী শিক্ষক, আয়েশা ছিদ্দিকা (রা.) বালিকা আলিম মাদ্রাসা, বাংলাবাজার, কক্সবাজার সদর।

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.