হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

টেকনাফপ্রচ্ছদরোহিঙ্গা

প্রত্যাবাসন পর্যবসিত, ৪ দফা দাবীতে রোহিঙ্গাদের সংবাদ সম্মেলন !

হাফেজ মুহাম্মদ কাশেম, টেকনাফ … শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন পর্যবসিত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের দেয়া শর্ত পুরণ না হওয়ায় তালিকাভুক্ত কোন রোহিঙ্গাই স্বদেশে ফিরতে রাজী হননি। ফলে বাংলাদেশ সকল প্রস্ততি সম্পন্ন করার পরও পূর্ব নির্ধারিত ২২ আগস্ট বহুল প্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হয়নি। এ নিয়ে পর পর ২ বার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ভেস্তে গেল। বৃহষ্পতিবার ২২ আগস্ট টেকনাফের কেরুনতলী এবং বালুখালীর তুমব্রæ পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারের অনুমোদিত ৯৩৩ পরিবারের ৩ হাজার ৪৫০ রোহিঙ্গাদের মধ্যে ১ম দফায় ৩০০ জন রোহিঙ্গা ফেরৎ যাওয়ার কথা ছিল।
জানা যায়, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হলেও রোহিঙ্গাদের দেয়া শর্ত পূরণ না হওয়ায় তালিকাভুক্ত কোন রোহিঙ্গাই স্বদেশে ফিরতে রাজী হয়নি। ফলে পূর্বনির্ধারিত ২২ আগস্ট বহুল প্রত্যাশিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হওয়ায় পর পর দুই বার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ভেস্তে গেছে।
২২ আগস্ট বৃহস্পতিবার সরেজমিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টেকনাফ জাদিমোরা শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে দেখা যায়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের শালবাগান ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরের সামনে রোহিঙ্গা শিবিরের প্রবেশ মুখে টেকনাফ-কক্সবাজার আঞ্চলিক সড়কের পশ্চিম পাশে প্রত্যাবাসন প্রত্যাশী রোহিঙ্গাদের বহন করার জন্য প্রধান সড়কের পাশে ৫টি মাইক্রোবাস, ৩টি বাস ও ২ ট্রাক ও লেদা ক্যাম্পের পাশে আরও দুটি বাস প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এছাড়া টেকনাফ সদর ইউনিয়নের কেরুণতলী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঘাটেও আনসার বাহিনী সদস্যদের ডিউটি করতে দেখা গেছে। পুরো টেকনাফে আইনশৃংখলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা বলয় স্থাপন করা হয়েছিল।
বৃহষ্পতিবার ৩য় দিনের মতো জাদিমোরা শালবাগান ক্যাম্প ইনর্চাজের অফিসে স্থাপিত সাক্ষাৎকার কেন্দ্রে হাতে ফাইল নিয়ে আজও নানান বয়সের নারী পুরুষেরা সাক্ষাৎকার দিতে আসছেন। আবার অনেকে সাক্ষাৎকার দিয়ে ঘরে ফিরে যাচ্ছেন। তবে অন্য দিনের তুলনায় আজকের চিত্র ছিল ভিন্ন।
ক্যাম্প ইনর্চাজের পাশে কয়েকটি বøকে গিয়ে দেখা যায় রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসন নিয়ে কানাঘুষা করছে। আবার কোন কোন ঘরের দরজায় তালা দেওয়াও দেখা যায়। পাশে থাকা লায়লা ও রশিদা বেগম নামে দুই রোহিঙ্গা নারীর কাছে ঘরে তালিকা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা জানান আজ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা আছে, যাদের নাম তালিকায় আছে তাদের অনেকে জোর করে পাঠানোর ভয়ে ঘরে তালা দিয়ে পালিয়ে গেছে।
এদিকে টেকনাফের শালবাগান ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২০ আগস্ট মঙ্গলবার থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত মোট ৩৩৯ পরিবারের সাক্ষাৎকার সম্পন্ন হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং রোহিঙ্গা ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশণারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের সমন্বয়ে ১০টি দল শালবাগানের বিভিন্ন বøকের ঘরে ঘরে প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম থাকা রোহিঙ্গাদের সিআইসি কার্যালয়ে আসার জন্য বলা হচ্ছে। ইউএনএইচসিআর এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা সাক্ষাতকার দিতে রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে গিয়ে উৎসাহিত করছেন। তবে সাক্ষাৎকার দেয়া রোহিঙ্গা পরিবারের প্রধানগণ সকলেই শর্ত পুরণ ছাড়া স্বদেশে ফিরতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন। শর্তগুলো হচ্ছে এনভিসি কার্ড নয় সরাসরি নাগরিকত্ব প্রদান, ভিটে-বাড়ি ও জমি-জমা ফেরত, আকিয়াব জেলায় আশ্রয় শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের নিজ বাড়ীতে ফেরত, মিয়ানমারের মাব্রাই দীর্ঘদিন ধরে বন্দি এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাদের মুক্তি, হত্যা, ধর্ষনের বিচার, অবাধ চলাফেরা করার সুযোগ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে এগিয়ে নিতে জাতিসংঘ উদ্বাস্ত বিষয়ক হাইকমিশণ (ইউএনএইচসিআর) ও সরকারের পক্ষ থেকে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের কাছে লিফলেট বিতরণ করেছে। লিফলেটে স্বদেশ ফিরে গিয়ে কোথায়, কিভাবে রাখা হবে এবং পরবর্তীতে কি কি করণীয় সে সম্পর্কে ধারণা রয়েছে।
বেলা সাড়ে ১১টায় শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো.আবুল কালাম, চীনা প্রতিনিধিদলের ২জন, মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলের ১জন ও বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১জনসহ সরকারী বিভিন্ন কর্মকর্র্তারা জাদিমোরা শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে ক্যাম্প ইনচার্জের কার্যালয়ে আসেন। এসময় তাঁরা ক্যাম্পে স্থাপিত সাক্ষাৎকার কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। এরপর প্রত্যাবাসন তালিকাভুক্ত কয়েকজন নারী পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন। রোহিঙ্গারা তাঁদেরকে শর্ত জুড়িয়ে দিয়ে মিয়ানমারের ফেরত যাওয়ার আশ্বস্থ করেন।
দুপুর ১২টায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে কক্সবাজারের ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দেওয়া শর্ত পূরণ না হলে তাঁদের একজনও স্বদেশে ফিরতে চাননা। বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও শর্তবিহীনভাবে রোহিঙ্গারা ফেরত যাওয়ার মতো একজনকেও পাওয়া যায়নি এবং কোনক্রমে শর্ত পূরণ না হলে রোহিঙ্গাদের একজনও স্বদেশে ফিরতে চাননা। প্রত্যাবাসনের তৎপরতা শুরু হলে মিয়ানমারে নাগরিকত্ব, স্বাধীনভাবে চলার নিরাপত্তা, ফেলে আসা সম্পত্তি ফেরত ও নিরাপত্তা নজরদারির শর্ত দিয়েছিলেন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। মিয়ানমার থেকে পাঠানো তালিকায় ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার নামের তালিকা বাংলাদেশ সরকারকে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার প্রথম থেকে বলে আসছিল কোনো রোহিঙ্গা নাগরিককে জোর করে মিয়ানমারে পাঠানো হবেনা। তাই আজও তাঁদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে। আজ (বৃহষ্পতিবার ২২ আগস্ট) দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৯৫ পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শর্তবিহীনভাবে স্বদেশে ফেরত যাওয়ার মতো একজনকেও পাওয়া যায়নি। তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য আজ যে নির্ধারিত সময় ছিল, তাতে সরকার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছে। কোনো রোহিঙ্গা নাগরিক যদি বিনা শর্তে দেশে যেতে চান, তাহলে তাঁদের স্বদেশে ফেরত পাঠানো হবে’।

রোহিঙ্গাদের সংবাদ সম্মেলন :
অপরদিকে দুপুর দেড়টার দিকে জাদিমোরা শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে ই-বøকের রোহিঙ্গা আরাকান সোসাইটি নামে কিছু রোহিঙ্গা নেতারা ৪ দফা দাবী দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। এসময় লেদা, নয়াপাড়া, শালবাগান রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরের বøকের দল নেতা (মাঝি), ইমাম ও আরাকান সোসাইটি সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ উল্লাহ, ইমাম মোহাম্মদ ইব্রাহীম সংবাদ সম্মেলনে চার দফা দাবী তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। দাবীগুলো হচ্ছে (১) রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে (২) নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে (৩) জমি-জমা ফেরত দিতে হবে (৪) মিয়ানমারে রোহিঙ্গা শিবিরে থাকা ১ লাখ ২৮ হাজার রোহিঙ্গাদের মুক্ত করে স্ব স্ব গ্রামে বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি ১৩৬ প্রজাতির মত রোহিঙ্গাদেরও চলাফেরার স্বাধীনতা দিতে হবে। ##

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.