হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

টেকনাফপ্রচ্ছদ

প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত, বাড়ছে সংকট

আবু তাহের ও আবদুর রহমান কক্সবাজার **
রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণ, নিরাপত্তা ও উগ্রপন্থি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়া ঠেকানো নিয়ে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেও নিজ দেশে তাদের প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশের আর্থিক সহায়তাও কমে আসছে। ফলে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সংকট আরও গভীরতর হচ্ছে।

রাখাইন থেকে বাংলাদেশে নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থীর স্রোত শুরু হয় ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। এর পর থেকে সাত লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ঠাঁই নেয় বাংলাদেশে। আগে থেকেই এ দেশে ছিল বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। লাখ লাখ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে যে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, পটুয়াখালীসহ ৫০ জেলায় এখন রোহিঙ্গাদের অবস্থান রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বয় গ্রুপ আইএসসিজির কর্মকর্তা সৈকত বিশ্বাস বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে চরম ক্ষতির শিকার হয়েছে স্থানীয় লোকজন। তাদের পুনর্বাসনে ব্যাপক কর্মসূচি নিতে হবে। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের দ্বারা পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। টাকার অঙ্কে এই ক্ষতি নিরূপণ করা যাবে না।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে এ রকম নানা উদ্বেগের মধ্যেই আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব শরণার্থী দিবস। দিবস উপলক্ষে উখিয়া ও টেকনাফের কয়েকটি রোহিঙ্গা শিবিরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। প্রতিবছর ২০ জুন আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। চলতি বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘স্টেপস উইথ রিফিউজিস’ বা ‘শরণার্থীদের সঙ্গে পথচলা’।

শরণার্থী দিবসে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের ২ নম্বর ব্লক থেকে একটি র‌্যালি বের করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে ওই ক্যাম্পে আলোচনা সভা, খেলাধুলাসহ রয়েছে নানা কর্মসূচি। রোহিঙ্গাদের জন্য অন্যতম বড় দাতা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলারের এসব কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এসব কর্মসূচিতে রোহিঙ্গাদের তেমন উৎসাহ নেই। নিজ দেশের বাইরে এভাবে অনিশ্চিত জীবনযাত্রায় রোহিঙ্গারাও হতাশ। রোহিঙ্গার জন্য তহবিল সংকটে এখানে কর্মরত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও উদ্বিগ্ন। তহবিল বরাদ্দের জন্য বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে অব্যাহতভাবে ধরনা দিয়ে যাচ্ছে তারা।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা কত :বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির এখন কক্সবাজারে। এ জেলায় চার দফায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। তবে এখন এখানে ঠিক কত রোহিঙ্গা অবস্থান করছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিচ্ছে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র জোসেফ ত্রিপুরা বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা এখন ৯ লাখ ১০ হাজার। অবশ্য গতকাল বুধবার জেনেভা থেকে প্রকাশিত ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে এখন অবস্থান করছে ৯ লাখ ছয় হাজার ৬০০ রোহিঙ্গা।

তবে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, বর্তমানে নতুন ও পুরনো মিলিয়ে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা রয়েছে। এদিকে, বহিরাগমন বিভাগ ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নতুন ও পুরনো মিলিয়ে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৪ রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করা হয়েছে। তবে বর্তমানে সে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

বাড়ছে অপরাধ :সর্বশেষ রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘ তিন বছর হতে চলছে। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে দেড় বছর আগে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্রমে বাড়ছে। দিন যতই গড়াচ্ছে বিশ্বের বিশাল এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাড়ছে অস্থিরতা। বাড়ছে খুনখারাবি থেকে শুরু করে নানা অপরাধ। স্থানীয় লোকজনও ধৈর্য হারাচ্ছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একাধিক অপরাধী গ্রুপ সক্রিয় হয়েছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ১০ মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২৭টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় উদ্ধার হয়েছে ১৬টি অস্ত্র। উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ মাদক। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন জানান, বিশাল রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা পুলিশের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দেড় হাজার সদস্য রাত-দিন ব্যস্ত রয়েছেন রোহিঙ্গাদের সালিশ বিচার করতে। এখানে পুলিশ সদস্যদের কষ্টের সীমা নেই।

নিয়ন্ত্রণে নেই জন্মহার :উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গা ছেলেমেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ব্যাপক হারে বাল্যবিয়ে ঠেকাতে কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। এ অবস্থায় এখানে শিশু জন্মহারও অস্বাভাবিক বেশি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের জন্মহার কত- এ নিয়ে কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে জরিপ নেই। তবে বেসরকারি একটি সংস্থার মতে, এখানে প্রতিবছর অর্ধলক্ষ শিশু জন্ম হচ্ছে।

তহবিল সংকটে উদ্বেগ :কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তা মারিন ডিন জানিয়েছেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গার জন্য যে বরাদ্দ রয়েছে, তা দিয়ে আগামী তিন মাস পর্যন্ত খাবার ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। এ সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা পাওয়া না গেলে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। চলতি বছর রোহিঙ্গাদের জন্য ৯২ কোটি ডলার সাহায্য চেয়েছে জাতিসংঘ।

সুত্র-সমকাল

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.