টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

নিয়ন্ত্রণহীন রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ : রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এই সন্ত্রাসী কারা

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৯
  • ১৬৩৫ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

টেকনাফ নিউজ ডেস্ক::  ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় দিয়ে মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে বাংলাদেশ। এখন রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা দেশের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ। এ জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। তবে এ সংকট সমাধানে বলার মতো তেমন অগ্রগতি এখনও হয়নি। ফলে তাদের আশ্রয়, খাবার, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার জন্য ব্যয় করতে হচ্ছে বিপুল অর্থ। সেই সঙ্গে মোকাবেলা করতে হচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। তবে দিন যত যাচ্ছে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। বাড়ছে অপরাধ। ছিনতাই, অপহরণ, খুনের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গাদের একটি চক্র। এরই মধ্যে এ চক্রটি ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত। তাদের উৎপাতে ধৈর্য হারাচ্ছে স্থানীয়রা। উচ্ছৃঙ্খল রোহিঙ্গাদের বেপরোয়া আচরণে স্থানীয়রা পড়েছে হুমকির মুখে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ভণ্ডুল করতেই ক্যাম্পে এই ‘সন্ত্রাসী চক্র’ তৈরি করেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী।

নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা নিরীহ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দিতে বাংলাদেশ বহুমুখী সমস্যার মুখে রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও। তবে আশ্রয় নেওয়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে গোপনে সক্রিয় ‘সন্ত্রাসী চক্র’ এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েকটি ঘটনা এরই মধ্যে সমালোচিত হচ্ছে।

মো. খালেদ নামে এক রোহিঙ্গা গত বৃহস্পতিবার ফেসবুকে এক ভিডিওতে হুমকি দিয়েছে, ‘রোহিঙ্গাদের কোনো ক্ষতি করলে, জোর করে দেশে ফেরত পাঠালে বাংলাদেশ সরকারের সব দপ্তর এক রাতেই ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’ সে প্রধানমন্ত্রীকেও হুমকি দিয়ে বলেছে, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর অন্যায্য কোনো আচরণ হলে ছাড় দেওয়া হবে না।’ গত ২২ ফেব্রুয়ারি টেকনাফে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় দুর্ধর্ষ  রোহিঙ্গা ডাকাত নুরুল আলম (৩০)। টেকনাফের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা শিবিরের আনসার ক্যাম্পে হামলা, অস্ত্র লুট ও কমান্ডার হত্যার মূল হোতাও ছিল এই নুরুল। সে না থাকলেও তার বাহিনীর দাপট মোটেও কমেনি। তারা পরের দিনই এই হত্যার বদলা হিসেবে রোহিঙ্গা পল্লী চিকিৎসক মো. হামিদকে খুন করে। এ ঘটনার মাত্র তিন দিন পর নয়াপাড়া ক্যাম্পে মোহাম্মদ জয়নাল (২২) নামে আরও একজনকে হত্যা করেছে একদল রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী। জয়নাল ছিল এই ক্যাম্পের নিরাপত্তা কর্মী। পুলিশের সোর্স সন্দেহে তাকেও হত্যা করা হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

টেকনাফে নয়াপাড়া নিবন্ধিত শরণার্থী ক্যাম্পের পুলিশ পরিদর্শক আবদুস সালাম জানান, ক্যাম্পের এইচ ব্লকে আবদুল হাকিমের দোকানের সামনে দুর্বৃত্তরা জয়নালকে ধরে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে তাকে হত্যা করে পালিয়ে যায়। হামলাকারীরা চিহ্নিত ডাকাত নুরুলের লোকজন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রোহিঙ্গা জানান, নয়াপাড়া ক্যাম্পের পেছনের পাহাড়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের দুটি গ্রুপ আস্তানা গেড়েছে। দিনে পাহাড়ে আর রাতে ক্যাম্পে চষে বেড়ায় তারা। আবদুল হাকিম ও মো. হাসান এই দুই গ্রুপের নেতা। খুন, ধর্ষণ, ইয়াবা কারবার, মানব পাচার, অপহরণ- এমন কোনো অপরাধ নেই যা তারা করছে না। গত মাসে তাদের হাতে খুন হয়েছেন ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মাস্টার মোহাম্মদ ইলিয়াছ। এর আগে একই ক্যাম্পে মোহাম্মদ ইয়াসের নামে এক রোহিঙ্গা তরুণকে গুলি করে মারা হয়।

উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলায় জার্মানির দুই সাংবাদিক আহত হওয়ার ঘটনায় একদল রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী জড়িত ছিল। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে, অর্থ ও মূল্যবান মালপত্র ছিনিয়ে নেওয়াই ছিল এই হামলার উদ্দেশ্য।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাধারণ রোহিঙ্গাদের অনেকে জানান, তারা আশ্রয় শিবিরে এমন মানবেতর জীবন কাটাতে চান না। স্বদেশে ফিরতে চান। এ রকম রোহিঙ্গার সংখ্যাই ক্যাম্পে বেশি। তবে গজিয়ে ওঠা সন্ত্রাসীদের ভয়ে তারা মুখ খুলতে পারেন না। এই সন্ত্রাসী চক্রটি প্রত্যাবাসনের বিরুদ্ধে। প্রত্যাবাসনের পক্ষে কথা বলায় বালুখালী ক্যাম্পের হেড মাঝি আরিফ উল্লাহকে গত বছর ১৮ জুন গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরে এই রোহিঙ্গা নেতার পরিবারের সদস্যরা ভয়ে টেকনাফের লেদায় পালিয়ে যান।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের জানান, রোহিঙ্গাদের জনপ্রিয় নেতা আরিফ উল্লাহ প্রত্যাবাসনের পক্ষে থাকায় তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে অপরাধ দিন দিন বাড়ছে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে প্রত্যাবাসনের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী গোপনে কাজ করছে। ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের মধ্যে একটি দালাল গ্রুপ তৈরি করে দিয়েছে তারা। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা গোপনে এই কাজে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। একটি সূত্র দাবি করেছে, মিয়ানমারের অর্থে চালিত রোহিঙ্গাদের এই সন্ত্রাসী চক্রটি প্রত্যাবাসনের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে। কেউ মিয়ানমারে ফিরতে চাইলে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে কয়েকজনকে তারা হত্যাও করেছে। এমন কি রোহিঙ্গাদের ভাষানচরে না যাওয়ার জন্যও উস্কানি দিচ্ছে তারা।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ১০ মাসে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী চক্রের হাতে ২৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এ সময়ে ক্যাম্প থেকে উদ্ধার হয়েছে ২৩টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ মাদক।

এ ব্যাপারে উখিয়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আন্দোলনের নেতা মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গারা এখন দেশের জন্য বিষফোড়া। তাদের কারণে এখন চরম বিপদে রয়েছে প্রায় ২ লাখ স্থানীয় মানুষ। দিন দিন রোহিঙ্গারা সহিংস হয়ে উঠছে। কথায় কথায় তারা স্থানীয় লোকজনের ওপর চড়াও হচ্ছে।

কক্সবাজার পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের নেতা অ্যাডভোকেট আয়াছুর রহমান বলেন, আশ্রয় শিবিরে রোহিঙ্গাদের একটি সন্ত্রাসী চক্র অবৈধ অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। এই অস্ত্র স্থানীয়দের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আসলে কত সময় লাগবে, তা নিয়ে সবাই উদ্বেগে রয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের জন্য সর্বোচ্চ মানবিকতা দেখানো হচ্ছে। এরপরও আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে থাকলে সরকার কঠোর হতে বাধ্য হবে।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ ইকবাল হোসেন বলেন, যতই দিন যাচ্ছে, রোহিঙ্গাদের আচার-আচরণে ততই পরিবর্তন আসছে। তারা বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। তবে এসব ঝুঁকি মাথায় রেখেই দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT