হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

কক্সবাজারপ্রচ্ছদস্বাস্থ্য

নিজেই রোগী পেকুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

ইমরান হোসাইন = পেকুয়া উপজেলার সাত ইউনিয়নের প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসার সেবার কথা বিবেচনা করে সৌদি সরকারের অর্থায়নে পেকুয়ায় ৩১শষ্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল প্রতিষ্টা করেন সরকার। প্রতিষ্টার তিন চার বছরের মধ্যে এই হাসপাতালে যারা চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন তারা এখনো বহাল রয়েছেন। হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সসহ অন্যান্য ৫৯টি পদের মধ্যে ৪৭টি পদে জনবল আছে। কিন্তু এলাকাবাসী ও রোগীদের অভিযোগ, তাদের বেশীর ভাগই নিজেদের বাসা বাড়িতে চিকিৎসা বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

ডাক্তারদের জন্য হাসপাতালে আবাসনের ব্যবস্থা থাকলেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার তো দূরের কথা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নিজেও হাসপাতালের আবাসিকে থাকেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে হাসপাতালে গিয়ে সরকারী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। হাসপাতাল থেকে রোগীদের বিনামূল্যের ওষুধ ঠিকমত দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ এলাকাবাসীর। ডাক্তার ওষুধ লিখে দেওয়ার পর প্রত্যেক রোগীকে বাহির থেকে ওষুধ কিনে আনতে হয়।

হাসপাতালের নিজস্ব জেনারেটর ব্যবস্থা না থাকার ফলে রাতে যখন বিদ্যুৎ থাকেনা তখন পুরো হাসপাতাল ভূতের বাড়িতে পরিণত হয়। নিজস্ব ল্যাব না থাকার ফলে রোগীদেরকে বিভিন্ন পরীক্ষা করার জন্য ডাক্তারদের পছন্দের প্রাইভেট ডায়াগনষ্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনতে হয়। ফলে পরীক্ষা করিয়ে আসতে আসতে রোগীদের জীবনের অবস্থা আরও সঙ্কটাপন্ন হয়ে যায়।

রোগীদেরকে নি¤œমানের খাবার সরবারহ করা হয়, তাই রোগীরা বাধ্য হয়ে বাড়ী থেকে খাবার আনেন। রোগীদের সাথে নার্সদের সম্পর্ক অনেক তফাৎ। নার্সরা রোগীদের সেবা দেওয়ার পরির্বতে মালিক কর্মচারীর ভূমিকায় অবর্তীণ হন। হাসপাতালে নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে বিশেষ করে মহিলারা এবং রোগীরা রাত্রের বেলায় তাদের সরঞ্জাম নিয়ে চরম আতঙ্কে থাকেন।

উপজেলার শীলখালী ইউনিয়নের সবুজ পাড়া থেকে আড়াই বছর বয়সের বাচ্চা নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন শাহ আলম। তার ছেলের শ্বাস কষ্টের রোগ রয়েছে। হাসপাতালে বাচ্চাকে ভর্তি করানোর পর ডাক্তার আর তার ছেলেকে দেখতে আসেনি। শুধু সকালে একবার এসে দেখে যায়। দিনের পর সারারাত চলে গেলেও ডাক্তারের দেখা মেলেনা একবারও। শাহ আলম ক্ষোভের সাথে বলেন, খেটে খাওয়া মানুষ আজ দুইদিন যাবত হাসপাতালে পড়ে আছি ছেলের চিকিৎসার জন্য। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর ডাক্তার একবার দেখেই শেষ। আর দেখতে আসেননি। তিনি আরো বলেন, বাচ্চার শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে, ডাক্তার ডাকতে গেলে বলেন, ডাক্তার জরুরী বিভাগে কর্তব্যরত রয়েছেন আপনি নার্সকে দেখান। নার্সের কাছে গেলে চিকিৎসা তো দূরের কথা ভাল ব্যবহারও পাওয়া যায় না।

রোকসানা বেগম উপজেলার সদরের বাইম্যাখালী থেকে ডায়রিয়া আক্রান্ত এক বছর বয়সী বাচ্চাকে নিয়ে আসেন হাসপাতালের জরুরী বিভাগে। কিন্তু আসার দুই ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও তিনি জরুরী বিভাগের চিকিৎসকের দেখা পাননি। জরুরী বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত চিকিৎসক তখন খেলা দেখা নিয়ে ব্যস্ত। পরবর্তীতে তিনি ফিরে যাওয়ার সময় জরুরী বিভাগের পিয়ন ডাক্তারকে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার ছেলেকে দেখান।

উপজেলার রাজাখালী ইউনিয়নের পালাকাটা এলাকা থেকে স্ত্রীকে ডাক্তার দেখাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান আবুল খায়ের। তিনি বলেন, হাসপাতালে পর্যাপ্ত ডাক্তার নেই। ফলে বর্হিবিভাগের রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছে না। সরকারী হাসপাতালে যে পরিমাণ সুযোগ সুবিধা পাওয়ার কথা তা আমরা পাচ্ছি না। হাসপাতালের ভিতরে অনেক গরম। বিদ্যুৎ থাকলেও ফ্যান গুলো দুর্বল হওয়ার কারণে গরম কোন ভাবে কাটছেনা। তিনি আরো বলেন, সরকারী হাসপাতালে সব আছে নেই শুধু রক্ষণাবেক্ষণ আর সংস্কার। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

উপজেলা ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ মুজিবুর রহমান নিজেও হাসপাতালের আবাসিক ভবনে রাত্রে থাকেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি রাত্রে পাশ্ববর্তী পেকুয়া বাজারস্থ তার নিজস্ব প্রাইভেট ক্লিনিকে থাকেন। আর সকাল বিকেল এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত তিনি সেখানেই রোগী দেখেন। ফলে সবসময় হাসপাতালটি ডাক্তারশূণ্য থাকে।

চিকিৎসা যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার সেখানে এই সেবা যেন সাধারণ গরীব দুঃখী মানুষের জন্য সোনার হরিণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার সংকট থাকার কারণে দিনের পর দিন মানুষ সরকারী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকারী হাসপাতাল গুলোতে সচ্ছল পরিবারের কোন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেনা। শুধু খেঁটে খাওয়া দিন মজুর, নি¤œ আয়ের অস্বচ্ছল পরিবারের লোকজন চিকিৎসা নামের এ সোনার হরিণকে খুঁজতে আসে। উপজেলাতে বড় ধরণের কোন দূর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়ার জন্য জরুরী বিভাগে থাকে না পর্যপ্ত চিকিৎসক। এছাড়াও হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য কোন ল্যাব না থাকাতে জরুরী বিভাগের রোগীদের বিভিন্ন প্রাইভেট ডায়াগনষ্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনতে হয়। এতে ডাক্তারদের সাথে চুক্তিবদ্ধ পছন্দের ডায়াগনষ্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনতে বলা হয় অন্যথায় রিপোর্টে ভাল কিছু আসে নাই বলে রিপোর্ট দেখে না। রোগী যখন হাসপাতালের জরুরী বিভাগে চিকিৎসার জন্য যায় তখন রোগীর অবস্থা থাকে আশংকাজনক।

অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালের চিকিৎসকদের সাথে উপজেলার বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালের যোগসাজশ রয়েছে। সেসব প্রাইভেট হাসপাতালের মালিক সরকারী হাসপাতালের খোদ টিএইসও এবং আরএমও। তারা অধিকাংশ সময় জরুরী বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের এখানে ভালো পরীক্ষার জন্য যন্ত্রাংশ, ডাক্তার নেই বলে তাদের প্রাইভেট হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। চিকিৎসকরা তাদের জরুরী সেবা না দিয়ে বলেন, আগে যে পরীক্ষাগুলো দিয়েছি সেগুলো করিয়ে আনেন। রিপোর্ট দেখে তারপর চিকিৎসা শুরু করব। স্বাস্থ্য কমপেক্সের জরুরী বিভাগে নেই পর্যাপ্ত যন্ত্রাংশ। ফলে রোগীদের প্রতিনিয়ত পোহাতে হচ্ছে যন্ত্রণা। আরো অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালের রোগীদেরকে সরকারী ভাবে যে খাওয়া দেওয়া হয় তা নি¤œমানের। খাবার তৈরী করার সময় তরকারীতে নি¤œ মানের মসলা, পামওয়েল তেল ব্যবহার, কম দামী চাউলের ভাত রান্না করা হয় বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন পেকুয়া উপজেলা শাখার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকার চলে। আর সরকার সে টাকায় জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে। কিন্তু পেকুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গুটি কয়েক চিকিৎসক জনগণকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। উপজেলা স্বাস্থ্য পরিচালনা কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্যসহ সংশিষ্ট সকলে যদি স্বাস্থ্য কমপেক্স সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখতেন তাহলে এই অবস্থা হত না বলেও জানান তিনি।

পেকুয়া-চকরিয়ার সাংসদ মোহাম্মদ ইলিয়াছ পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেক্সের নানা সমস্যা সম্পর্কে দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রাণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে হাসপাতালের ডাক্তারের শূন্য পদ, এ্যাম্বুলেন্স, জেনারেটরসহ নানা সমস্যার কথা উল্লেখ্য করে একটি আবেদন দিয়েছি। খুব শীঘ্রই এসব খাতে বরাদ্দ আসবে। ডাক্তারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আগামী মাসিক সভায় উপস্থিত হয়ে এসব বিষয় খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.