নিখুঁত তারুণ্য ও সিরাতে রাসুল

প্রকাশ: ২০ জুন, ২০২০ ৩:০৯ : অপরাহ্ণ

ফারুক আজিজ::   যৌবনে মানুষের শক্তি থাকে হিমালয়ের মতো, চিন্তার শক্তি হয় উচ্চমান ঢেউয়ের মতো,অনুভূতির মাত্রা থাকে ক্ষুরধার তলোয়ারের মতো। ইলম অর্জনের যাত্রা থাকে ক্লান্তহীন উটের মতো, আমলের ময়দানে শক্তি থাকে প্রথম সারির খেলোয়াড়ের মতো। কিন্তু টগবগের এই শক্তি বিপথেও যেতে পারে আবার সুপথেও প্রবাহিত হতে পারে। কারণ শক্তির ধর্ম-ই যেদিকে সুযোগ পাবে সেদিকেই প্রবাহমান নদীর মতো প্রবাহিত হবে।

যদি মানুষ নিজের যৌবন ও তারুণ্যকে দমিয়ে রেখে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে তবে তার পুরো জীবন হয়ে ওঠে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আদর্শস্বরূপ। যে যুবক সমাজে বিদ্যমান চকচকে মরীচিকা হতে নিজেকে দূরে রাখতে পারে তাহলে সেই যুবক হয়ে ওঠবে সমাজের জন্যে ইতিবাচক জ্বলন্ত উদাহরণ।

হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সা. বলেন, যে যুবক কোন বৃদ্ধকে বয়স্ক হওয়ার কারণে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে, আল্লাহ তায়ালা সে যুবকের বৃদ্ধাবস্থায় এমন যুবককে নিযুক্ত করে দেন যে তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে। যেমন আরবি ভাষায় একটি প্রবাদ বেশ প্রচলিত,
كما تدين تدان
যে যার সাথে যেমন আচরণ করবে পরবর্তীতে সেই আচরণের শিকার হবে। বাংলাতে বলা হয়, যেমন কর্ম তেমন ফল।

শেখ সাদী রাহ. কতো সুন্দর করে বলেছেন,
در جوانی توبہ کردن شیوۂ پیغمبری
যৌবনে তওবা করা নবীদের স্বভাব। যৌবনে পাপাচার হতে মুক্ত থেকে পুণ্যের পথে চলতে পারা নবীদের স্বভাবের একটি। নবীদের সিরাত তথা জীবনী অধ্যয়ন করলে পরিলক্ষিত হয় যে, তাদের যৌবনকাল হতেই ছিলো নিখুঁত ও স্বচ্ছ; রাসুল সা. নবুওয়াত প্রাপ্তির পরে শত্রুরাও তাঁর যৌবন কাল নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলতে পারে নি; আমানত ও সত্যবাদিতার কারণে তিনি ছিলেন আরবের প্রবাদ পুরুষ।

নবুওয়াতের পূর্বে চল্লিশ বছর পর্যন্ত স্বজাতির সাথে থেকেছেন; আমানত ও সত্যাবাদিতার সার্টিফিকেট অর্জন করে নিয়েছেন। যার প্রভাব নবুওওয়াতের পরেও বিশালাকারে পড়েছে। কাফির তথা শত্রুরা নবী হিসেবে না মানলেও আমানত ও সত্যাবাদীতার মূল উপমা রাসুলকেই মনে করতো। রাসুল সা. এর চাচা আবু তালিবের ভাষ্য, আমি আমার ভাতিজাকে কখনো মিথ্যা বলতে দেখি নি, বখাটে ছেলেদের সাথে রাস্তার মোড়ে আড্ডা দিতে দেখি নি।

বর্তমানের যুব সমাজের সকল দোষ আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যায়। তারুণ্যকে সঠিক পথে ব্যয় না করে চোরাবালিতে নিমজ্জিত করে দেয়। সে জন্যে বর্তমানের তারুণ্যকে আজ সমাজের মুরব্বিরা নেতৃত্ব দিতে ভয় পায় ও সম্মতি দেয় না। অথচ রাসুল সা.যৌবনে হাজরে আসওয়াদ কা’বা শরীফে লাগানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন সমাজের মুরব্বিদের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার নিমিত্তে৷

যৌবনে রাসুল সা. ভালোবাসা ও সহমর্মিতার অন্যন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। মানুষের কষ্ট লাগবে সেবার জন্যে এগিয়ে যেতেন। একবার এক বৃদ্ধ নিজের বোঝা বহন করতে গিয়ে হেলিয়ে যাচ্ছেন, বখাটেরা বৃদ্ধের অবস্থা দেখে তাচ্ছিল্য- ভরে হাসছিলো কিন্তু রাসুল সা. এগিয়ে গিয়ে তার বোঝা নিজে বহন করে দিয়েছেন এবং বখাটেদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, বৃদ্ধের কষ্ট দেখে তাচ্ছিল্য করা যুবকদের স্বভাব হতে পারে না। তারুণ্যের আবেদন হলো, তার বোঝা তুলে দেয়া বা বহন করে দেয়া।

রাসুল সা. এর পুরো যৌবন কেটেছে বৃদ্ধ, শিশু ও রোগাক্রান্তদের সেবায়। রাসুলের এই অবস্থা দেখে মক্কার অনেকে সরদার-ই বলতেন, সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে হয়ে কেনো গরীব ও অসহায়দের সাথে চলাফেরা ও উঠাবসা? উত্তরে রাসুল সা. বলেছেন, আমার দাদা হাসেমও সরদার ছিলেন। কিন্তু তিনিও মানুষের সেবা-ই করতেন। মানুষের সেবার মাঝে অনুভুত হয় প্রকৃত সুখ ও শান্তি।

ইয়াতিমদের সাথে তিনি ভালোবাসার কর্ম-ই করে যেতেন, একবার মক্কার রাস্তায় এক ইয়াতিমকে জীর্ণ কাপড়ে কান্না করতে দেখে জিজ্ঞেস করেছেন কান্নার কারণ! উত্তরে ইয়াতিম জীর্ণ কাপড় ও ক্ষুধার অভিযোগ করলে তিনি খাবার ও কাপড়ের ব্যবস্থা করে দেন। রাসুলের সেই কর্মে বর্তমানের যুবকদের জন্যে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যা দিয়ে তরুণ ও যুবকেরা সমাজে নেতৃত্বের গুণ অর্জনে সহায়ক হতে পারবে।

যৌবনে হালাল ব্যবসায় হাত দিয়ে ব্যবসার গুরুত্বও শিখিয়েছেন। যখন পরিবারের হাল ধরতে হবে তখন হালাল ব্যবসা ইত্যাদি করে পরিবার পরিজনের জন্যে রিযিকের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব নিয়েছেন। হযরত খাদিজা রা. এর ব্যবসার হাল ধরেন। সততার গুণ দিয়ে ব্যবসায় ভালো মুনাফা পেয়ে যেমন প্রশংসিত হয়েছেন তেমনি নিজের চরিত্র দিয়ে জয় করেছেন হযরত খদিজার মন।

এভাবেই রাসুলের যৌবণের গুণের কারণেই হযরত খাদিজার মতো ধনবতী মহিলার সাথে বিবাহে আবদ্ধ হন। তরুণ সমাজ যদি রাসুলের জীবনী অধ্যয়ন করে সেই অনুযায়ী নিজের জীবনকে অতিবাহিত করে, সমাজ-ই তরুণ প্রজন্মকে দায়িত্ব দিতে এগিয়ে আসবে। অথচ বর্তমানের তরুণ ও যুবক শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ডিপ্রেশনের ভোগা এক জনগোষ্ঠী। কারণ আমরা-ই রাসুলের সিরাত পাঠে মনোযোগী না হয়ে বর্তমানের চকচকে আবরণের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সৃষ্টি করেছি এই ডিপ্রেশন রোগ।

ফারুক আজিজ
বি.এ. অনার্স ও এম. এ মাস্টার্স) – চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ফাযিলঃ- জামেয়া ইসলামীয়া পটিয়া।


সর্বশেষ সংবাদ