টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

দেশজুড়ে প্রতারণার ফাঁদ

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : শনিবার, ১১ আগস্ট, ২০১২
  • ৩৭৯ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

গোলাম মওলা……সরকারের কঠোর নজরদারির অভাবে দেশের সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একাধিক প্রতারক চক্র। অসাধু চক্রগুলো এমএলএম, মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটিসহ বিভিন্ন ধরনের নামে-বেনামে জেঁকে বসেছে ব্যাংকিং খাতসহ দেশের আর্থিক খাতের ওপর। কৌশলে গড়ে তোলা হয়েছে নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে ভেড়ানোর জন্য নানারকম প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করা হয়েছে। দেয়া হয়েছে অধিক মুনাফা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার আশ্বাস। শ্রম ও সময় খাটিয়ে সর্বস্ব খুইয়েছেন অনেকে। সরল বিশ্বাসে এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে নিঃস্ব হয়েছেন লাখ লাখ বেকার যুবক।
এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর কোন ভূমিকা পালন করতে পারছে না। এতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকিং ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকিং খাতকে শূন্য করে দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা চলে যাচ্ছে বিভিন্ন দেশে। ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে এলসি খুলে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি দেশের বাইরে পাচার করেছে। এছাড়া হুণ্ডির মাধ্যমে পাচার হয়েছে ২০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এসব অর্থের বেশিরভাগ আর ফেরত পাওয়া যাবে না বলে আশংকা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর কঠোর নজরদারি না থাকার কারণে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এছাড়া সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে যারা প্রতারণা করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কার্যকর কোন আইন নেই। তিনি বলেন, অতিলোভের কারণে অনেকে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে। কিন্তু সরকারের উচিত এসব প্রতিষ্ঠানের দিকে লক্ষ্য রাখা। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ বিষয়ে আরও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা উচিত। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে আরও মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির নামে প্রতারণা : মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির নামে অসাধু চক্র প্রতারণার ফাঁদ পেতে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সরকারি বিধিবিধান না মেনে ফাইন্যান্স, সেভিং, ইনভেস্টমেন্ট, মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির অন্তরালে অবৈধভাবে চলছে কোটি কোটি টাকার লেনদেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি না নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান অসহায় সাধারণ মানুষকে অধিক মুনাফা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়ার আশ্বাসের ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোতে ডিপোজিটের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে এবং তারল্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, আইডিয়াল কো-অপারেটিভ সোসাইটি (আইসিএল), অগ্রণী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি, পপুলার ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, কনজারভেটিভ মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, মাদানী ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ইউনিট ফাইন্যান্স অ্যান্ড কমার্স লিমিটেড, অবকাশ কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, ম্যাক্সিম মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, জনতা ফাইন্যান্স অ্যান্ড কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড, প্রিভেইল গ্র“প ও দিগন্ত সেভিং অ্যান্ড ক্রেডিট কো-অপারেটিভ সোসাইটির মতো বেশকিছু প্রতিষ্ঠান জনগণের কাছ থেকে ব্যাংকের চেয়েও দ্বিগুণ মুনাফার লোভ দেখিয়ে হজ আমানত, ডিপিএস, মাসিক মুনাফা, দ্বিগুণ বৃদ্ধি আমানত, শিক্ষা আমানত, আবাসন আমানত, ব্যবসায়িক আমানত, দেনমোহর আমানত, কোটিপতি ডিপোজিট স্কিম, লাখপতি ডিপোজিট স্কিম প্রকল্পের নামে প্রতিদিন মোটা অংকের টাকা লেনদেন করছে।
আলোচিত আইটিসিএল কেলেংকারি : অবৈধভাবে আমানত সংগ্রহের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ইসলামিক ট্রেড অ্যান্ড কমার্স লিমিটেডের (আইটিসিএল) চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেন সিরাজী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। জানা গেছে, ১৯৯৬-৯৭ সালে আইটিসিএল ও ১৯৮৩-৮৪ সালে এসডিএস নামে দুটি এনজিও প্রতিষ্ঠা করেন ইসমাইল হোসেন সিরাজী। দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সিরাজীসহ তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন প্রায় ১শ’ কোটি টাকা আÍসাৎ করেন। এ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ৫০টি মামলা দায়ের হয়। এছাড়াও সারাদেশের বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে কয়েকশ’ মামলা দায়ের করে বিক্ষুব্ধ আমানতকারীরা। গ্রাহকদের টাকা ফেরত না দেয়ায় ২০০২ সালে তিনি গ্রেফতার হন। এসডিএস-আইটিসিএলের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক সমিতির নেতারা অভিযোগ করেন, উচ্চ সুদ দেয়ার লোভ দেখিয়ে এসডিএস ও আইটিসিএল হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে অবৈধভাবে আমানত সংগ্রহ করে। ২০০০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যক্রমকে অবৈধ উল্লেখ করে বন্ধ করে দেয়। এরপর প্রতিষ্ঠান দুটির চেয়ারম্যান ইসমাইল হোসেন সিরাজী ও মহাসচিব আনোয়ার হোসেন খান আÍগোপন করেন। ২০০২ সালের ১৫ জুলাই ইসমাইল হোসেন সিরাজীকে গ্রেফতার করা হয়। ২০০৩ সালের ১ মে মহাসচিব আনোয়ার হোসেন খান ঢাকা থেকে গ্রেফতার হন। প্রায় দুই হাজার আমানতকারী তাদের বিরুদ্ধে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন থানায় অভিযোগ করেন। এগুলোর মধ্যে ৫০টি অভিযোগ মামলা হিসেবে নেয়া হয়। ২০০৮ সালের ২৫ জুন টাঙ্গাইল জেলা ও দায়রা জজ চৌধুরী মুনীর উদ্দীন মাহফুজ ওই মামলাগুলোয় ইসমাইল হোসেন সিরাজী ও আনোয়ার হোসেন খানের জামিন মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে আদালত গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেয়ার বিষয়ে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেন। আনোয়ার হোসেন খান আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেলেও সিরাজী ছাড়া পাননি। সিরাজীর জামিনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই আরও দু’জন আমানতকারী আলীম চাকলাদার ও আলমগীর হোসেন মামলা করেন।
যুবকের সম্পত্তি বিক্রি ঠেকাতে মামলা করার উদ্যোগ : যুবকের সম্পত্তি বিক্রি ঠেকাতে মামলা করার সুপারিশ করেছে কমিশন। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা আহ্বান করা হবে। এজন্য প্রস্তুতি চলছে। যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক) কমিশন চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, এ ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে আমি আশাবাদী। সূত্র জানায়, যুবকের ৫৫ হাজার ৭৭ শতাংশ জমি ও এক হাজার ৬৪৩ শতাংশ জমির ওপর বেশ কয়েকটি বাড়ি, মার্কেট ও শিল্প প্লট রয়েছে। কমিশন বলছে, যুবকের উদ্যোক্তারা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এসব সম্পত্তি বিক্রি ও হস্তান্তর করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আÍসাৎ করছে। ইতিমধ্যে গ্রাহকদের টাকায় কেনা অনেক মূল্যবান সম্পত্তি অন্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরের বিষয়ে এখনই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে যুবকের দুই লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের জন্য কোন সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে না। রফিকুল ইসলাম জানান, যুবক নীতিনির্ধারকরা নিজ অথবা তাদের পরিচিতদের নামে এসব সম্পত্তির কিছু অংশ কিনেছিল। যুবক যাতে এসব সম্পত্তি বিক্রি করতে না পারে, তার প্রতিকার চেয়ে দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়েরের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে যুবক কমিশন। এর আগে, কমিশন যাতে যুবকের সম্পত্তি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করাসহ সম্পত্তি ক্রোক বা বিক্রি করতে পারে সেজন্য ১৯৫৬ সালের দ্য কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট সংশোধনের জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব করে। তবে আইন সংশোধনের প্রয়োজন নেই বলে জানায় আইন মন্ত্রণালয়। ওই মন্ত্রণালয়ের মতামতে বলা হয়, যুবকের গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের উদ্দেশ্যে কমিশন সরকারের কাছে কোন সুপারিশ পেশ করলে সরকার উপযুক্ত এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে মামলা দায়েরের মাধ্যমে ওই সুপারিশ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। যুবক কমিশন ২৩ জুলাই প্রতিবেদনে বলেছে, যুবক সংস্থার অবৈধ ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে দেশের বিভিন্ন স্তরের নারী-পুরুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতি মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছে ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ওই অশুভ চক্র গ্রাহকদের অর্থে-স্বার্থে খরিদ করা সম্পত্তি বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বিক্রি বা হস্তান্তর করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আÍসাৎ করছে। এখনই তাদের এ বিক্রি বা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার বিষয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। নতুবা ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের জন্য কোন সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে না। যুবকের সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা বা সম্পত্তি ক্রোক বা বিক্রি ইত্যাদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কোন সুযোগ বা ক্ষমতা এ কমিশনের নেই। শুধু উপযুক্ত এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতই তা করতে পারেন।
যুবক কমিশন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলায় যুবকের ৩৩টি হাউজিং প্রকল্পসহ সেন্টমার্টিনে ৫৫ হাজার ৭৭ শতাংশ জমি রয়েছে। এর মধ্যে সেন্টমার্টিনে জমির পরিমাণ ৭৯৬ শতাংশ। যুবকের বাড়ি ও শিল্প প্লটের মধ্যে ঢাকার ৫৪ পুরানা পল্টনে ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ জমির ওপর বিকে টাওয়ার, নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুরে ৮৭৮ শতাংশ শিল্প প্লট, ফেনীতে ৩৬ শতাংশ জমির ওপর অ্যাপার্টমেন্ট, খুলনা সদরে ৩৩ শতাংশ জমির ওপর বাড়ি, বরিশালের হেমায়েত উদ্দিন মোড়ে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ জমির ওপর ভেনাস শপিং সেন্টার, পটুয়াখালীর বাউফলে ২১ শতাংশ জমির ওপর বাড়ি, ঢাকার ৫৩/১ পুরানা পল্টনে ২১ দশমিক ৫ শতাংশ জমির ওপর বাড়ি, চাঁদপুরের গুনরাজদিতে ৩০ শতাংশের ওপর বাড়ি, ঢাকার ৪৩০ তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ শিল্প প্লট ও গ্রিনফিল্ড ল্যান্ডসহ (টিবিএলের কাছে) সারাদেশে ৫৩৮ শতাংশ জমির ওপর ফোন টাওয়ার থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যুবকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমনÑ যুবক মেডিকেল সার্ভিসেস, যুবক এগ্রোবায়োটেক, ইউনিক স্টক ম্যানেজমেন্ট, ইউনিক বুট অ্যান্ড তারপোলিন ইন্ডাস্ট্রিজ, জালালাবাদ ফার্মাসিউটিক্যালস, সুইফট ট্রাভেলস, ক্রাউন লেদার কমপ্লেক্স, রাজশাহী এগ্রোফিশারিজ কমপ্লেক্স, লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ, যুবক সিরামিক, মেঘনা সি ফুডস, বিচ হ্যাচারি, যুবক ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট, যুবক হ্যাচারি অ্যান্ড নার্সারির হালনাগাদ তথ্য ও সংঘস্মারক কমিশনে জমা দিতে যুবক সংস্থাকে নির্দেশ দেয়ার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের ব্যবসা থেকে সতর্ক থাকতে জনসাধারণকে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছে। এসব কোম্পানি যে কাজ করছে তা বেদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪৭-এর লংঘন। তাছাড়া বাংলাদেশে সংগৃহীত তহবিল বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া বিদেশে স্থানান্তর ও বিনিয়োগ বাংলাদেশ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০০৯-এর আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ৯ জানুয়ারি শেয়ারবাজারের ভয়াবহ পতনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অন্যান্য কারণের পাশাপাশি ইউনিপের মতো এমএলএম কোম্পানিকে দায়ী করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী। এমএলএমের নামে বিভিন্ন কোম্পানি দেশব্যাপী ব্যাপক প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে জিজিএনসহ বেশ কয়েকটি এমএলএম প্রতিষ্ঠান প্রতারণার দায়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। সম্প্রতি গ্রেট ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি এমএলএম কোম্পানির কর্মকর্তারা প্রায় ২৫০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। উল্লেখ্য, যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এমএলএম কোম্পানির সংখ্যা ৭০টি। ২০০২ সালে ছিল ১৬টি এবং ২০০৬ সালে দেশে এমএলএম কোম্পানি ছিল ২৪টি।
ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে এলসি খুলে হলমার্কের প্রতারণা : সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন (বর্তমানে রূপসী বাংলা) শাখা থেকে ৬টি গ্র“প ৩ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা আÍসাৎ করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশের ধারণা করা হচ্ছে। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের এক নিরীক্ষা ও পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক থেকে অর্থ বের করে নেয়ার ক্ষেত্রে হলমার্ক ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে। প্রাথমিকভাবে এগুলো ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংক থেকে হলমার্কের নেয়া দুই হাজার ৭৩১ কোটি টাকার মধ্যে শিল্পের যন্ত্রপাতি ও চলতি মূলধনজাতীয় ঋণও আছে। তবে এ অথের্র ৮০-৮৫ ভাগই নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে স্থানীয় ঋণপত্র (এলসি) খুলে বের করে নেয়া হয়েছে। বাস্তবে পণ্য আদান-প্রদান না করেই কাগুজে আদান-প্রদান করে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে নেয় এ প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হলমাকের্র হিসাব থেকে সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের নামে খোলা একটি চলতি হিসাবে টাকা স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকে টাকাগুলো ‘সুচতুরভাবে’ বের করে নেয় হলমার্ক গোষ্ঠী। আনোয়ারা স্পিনিং মিলস, ম্যাক্স স্পিনিং মিলস, স্টার স্পিনিং মিলস ও সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের নামে খোলা চলতি হিসাবগুলো অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান। এগুলো প্রকৃত অর্থে হলমাকের্র বেনামি প্রতিষ্ঠান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আর হলমাকের্র এ বিপুল অর্থের বেশিরভাগ অংশই সরিয়ে ফেলা হয় ফেব্র“য়ারি, মার্চ ও এপ্রিল মাসের মধ্যে।
এলসি প্রতারণা রোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা : জুলাই মাসে এলসি প্রতারণা রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করেছে। প্রকৃত ব্যবসায়িক লেনদেন না থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় ও বৈদেশিক মুদ্রায় খোলা ঋণপত্রের বিপরীতে অ্যাকোমোডেশন বিল প্রস্তুতের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে তহবিল সংগ্রহের প্রবণতা বেড়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারিতে এলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়ে একটি সার্কুলার জারি করে। এ বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এ সার্কুলারটি সব তফসিলি ব্যাংকে পাঠানো হয়। সার্কুলারে বলা হয়, অ্যাকোমোডেশন বিল ক্রয় সংক্রান্ত কার্যাদি ব্যাংকের শাখা পর্যায়ে সংঘটিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তা ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয়ের অগোচরে থেকে যাচ্ছে, যার ফলে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, অ্যাকোমোডেশন বিল প্রস্তুতের মাধ্যমে স্বীকৃতি প্রদান ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ব্যাংকের শাখাগুলো ব্যাংকের স্থানীয় ও বৈদেশিক মুদ্রায় সব অভ্যন্তরীণ বিল প্রস্তুত করতে পারবে না। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত শুধু প্রধান কার্যালয় এটি প্রস্তুত করতে পারবে। এছাড়া স্থানীয় ও বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণপত্রের বিপরীতে স্বীকৃতি প্রদানের আগে ক্রয় করা মালামালের প্রকৃত সরবরাহ সরেজমিন যাচাই ছাড়া কোন স্বীকৃতি প্রদান ও মূল্য পরিশোধ করা যাবে না।
দেশে ৭০ এমএলএম কোম্পানি : এমএলএম কোম্পানিগুলো পরিচালনায় কোন আইন না থাকায় দেশে প্রায় ৭০টিরও বেশি কোম্পানি আমানত সংগ্রহসহ অদৃশ্যমান পণ্যের বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে গ্রাহকদের প্রতারিত করছে। এই ৭০ কোম্পানির মধ্যে ডেসটিনির রয়েছে ৭০ লাখ সদস্য। আর গ্লোবাল নিউওয়ে, রেডোনেক্সসহ বাকিগুলোর রয়েছে আরও ১০ লাখের মতো সদস্য। এ ৮০ লাখ সদস্যের পরিবারে যদি তিনজন করে সদস্যও হয়, তাহলে এ কোম্পানিগুলোর শিকার দেশের প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ।
নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারির অভাবে এমএলএম ব্যবসার নামে অসাধু চক্র প্রতারণার ফাঁদ পেতে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ বেকাররা এ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে। রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছাত্রছাত্রী, বেকার ও দেশের নামি-দামি পীর সাহেব পর্যন্ত এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। জানা গেছে, অল্প দিনে বড়লোক বানিয়ে দেয়ার লোভ দেখিয়ে এসব কোম্পানি শুধু দেশের সাধারণ মানুষের কাছ থেকেই অর্থ হাতিয়ে নেয়নি, তাদেও ফেলা ফাঁদে পা দেয়া কাতার, দুবাই, কুয়েত, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত শত শত প্রবাসীও নিঃস্ব হয়েছেন। এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, এ প্রতারণা বাড়ার মূলে রয়েছে ঠিকমতো আইন নেই, আবার যা আছে তার প্রয়োগ নেই। যে কারণে প্রতারণা বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, আইনি দুর্বলতার কারণে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানিগুলো প্রতারণার ব্যবসা করে যাচ্ছে। এ প্রতারণা বন্ধ করতে হলে আইনকে শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষ করে সমবায় আইনটি দুর্বল। এটা করা হয়েছিল সমবায়ের জন্য। তখন এটা মাথায় রেখে করা হয় যে, এগুলো বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান হবে না। কিন্তু সমবায়ের ব্যানারে অনেক প্রতিষ্ঠান বড় হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যে ধরনের টেকনিক্যাল এক্সপার্টিজ দরকার, তা সমবায় অধিদফতরের নেই।
আলোচিত কয়েকটি কোম্পানি : নব্বই দশকের পর থেকেই দেশে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং ব্যবসা আÍপ্রকাশ করে। ’৯৬ থেকে ২০০১ আওয়ামী লীগের শাসনামলে নিউওয়ে, জিজিএন, আইটিসিএল, ডেসটিনি-২০০০ এ ব্যবসায় সাড়া ফেলে। ‘হুণ্ডি কাজল’ যশোর-কুষ্টিয়ায় এ ব্যবসার নতুন রূপ দেয়। রাতারাতি কোটি টাকার মালিক হওয়ার স্বপ্নে হাজার হাজার মানুষ হুণ্ডি কাজলের কাছে অর্থ বিনিয়োগ করে। মাত্র ছয় মাসে দ্বিগুণ অর্থ পাওয়ার লোভে হাজার হাজার মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ‘দ্রুত বিনিয়োগ, দ্রুত আয়’Ñ এই কনসেপ্টে মানুষ তার কাছে অর্থ বিনিয়োগ করতে থাকে। এক সময় প্রতারণার অভিযোগে কাজল গ্রেফতার হয়ে জেলে যায়। কিন্তু হাজার হাজার বিনিয়োগকারী পথে বসেন। ১৯৯৮ সালে ‘নিউওয়ে’ এ ধরনের প্রতারণার ব্যবসা খুলে বসে। তবে তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ২০০২ সালে বিজনাস ডটকম নামে অপর এমএলএম কোম্পানি প্রতারণা ব্যবসা খুলে বসে। নগরীর পান্থপথে তারা অফিস নিয়ে কাজ শুরু করে। কিন্তু কিছুদিন পরই তাদের তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে ডেসটিনি-২০০০ এর যাত্রা শুরু হয় ২০০০ সালের প্রথম দিকে। শুরুতে কোম্পানিতে জয়েনিং বা মেম্বারশিপ ছিল ২ হাজার ৭শ’ টাকা। এ টাকা নেয়া হতো ফরমের মাধ্যমে। শুরুতে প্রতারণাটা ছিল খুব সূক্ষ্ম। ধরার তেমন কেউ ছিল না। প্রথম যিনি জয়েন করবেন তিনি একজন ডিস্ট্রিবিউটর। তিনি ২ জনকে জয়েন করাবেন। ওই ২ জন যখন বামে ২১ জন ডানে ২১ জন জয়েন করাবেন, তখন তার টার্গেট পূর্ণ হবে। তখন তার কমিশন দেয়া হবে ১২ হাজার ৫শ’ টাকা। অথচ কোম্পানির লোকজন তার কাছ থেকে নিয়েছে ৪ লাখ ২২ হাজার ৭শ’ টাকা। এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় ২০০০ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত। পরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরে তিনগুণ লাভ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। সর্বশেষ তারা ট্রি-প্লানটেশন প্রজেক্ট হাতে নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। শুধু তাই নয়, ডেসটিনির অবৈধ ব্যাংকিংয়ের কারণে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে করে তদন্তে নামে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা যায়, ডেসটিনি মানিলন্ডারিং, প্রতারণা ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এর আগে বিসিআই, আইটিসিএল, জিজিএন, যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি (যুবক) এবং সম্প্রতি ইউনিপেটুইউ যেভাবে লাখ লাখ মানুষকে নিঃস্ব করেছে, ডেসটিনির ভূমিকাও একই হতে যাচ্ছে।
কাঠগড়ায় ডেসটিনি : সাবেক সেনাপ্রধান ডেসটিনি গ্র“পের সভাপতি লে. জেনারেল (অব.) হারুন অর রশিদ ও ডেসটিনির এমডি রফিকুল আমীনসহ প্রতিষ্ঠানটির ২২ শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতারণা, আÍসাৎ ও ৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা মানি লন্ডারিংয়ের পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। এছাড়া এ মামলা তদন্তে ৫ সদস্যের দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একইভাবে ডেসটিনি গ্র“প বিষয়ে একটি কমিশন গঠনে কাজও শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ১ আগস্ট তিন হাজার ২৮৫ কোটি টাকা আর্থিক প্রতারণা ও অবৈধভাবে স্থানান্তরের অভিযোগে ডেসটিনি গ্র“পের সভাপতি লে. জেনারেল (অব.) হারুন অর রশিদ ও ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীনসহ প্রতিষ্ঠানটির ২২ শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের দায়ের করা পৃথক দুটি মামলার পর কমিশন গঠনের উদ্যোগ জোরালোভাবে নেয়া হচ্ছে। ১৯৫৬ সালের দ্য কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট অনুসারে এ কমিশন গঠন করা হবে। গ্রাহকদের জমানো অর্থ ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তর, অবৈধভাবে কমিশন গ্রহণসহ ৩ হাজার ২৮৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা মানি লন্ডারিংয়ের অপরাধে দুদকের কলাবাগান থানায় দায়ের করা মামলা দুটি ঢাকার সিএমএম আদালতে পাঠিয়ে দেয় পুলিশ। ডেসটিনি বিষয়ক মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড কর্তৃপক্ষ ডেসটিনি ট্রি প্লানটেশন ও ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির মাধ্যমে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করে। কিন্তু বর্তমানে তাদের পৃথক দুটি অ্যাকাউন্টে ৫৬ লাখ ও চার কোটি ৮৭ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। বাকি টাকা তারা অবৈধভাবে স্থানান্তরের মাধ্যমে আÍসাৎ করেছে। দুদক জানায়, ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেড বিভিন্ন প্যাকেজের মাধ্যমে জনসাধারণের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে কমিশন হিসেবে তা থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা কর্মকর্তা ও এজেন্টদের কাছ থেকে আÍসাৎ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব থেকে স্থানান্তর করা হয়েছে। সে কারণে ২৪ মে ডেসটিনি গ্র“পের সব সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ওইদিন এ সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানিয়ে দেয়। এখনও এসব অ্যাকাউন্ট জব্দ রয়েছে।
ইউনিপেটুইউ : ডেসটিনির প্রতারণার খবর ফাঁস হওয়ার ঠিক আগেই আরেকটি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি ইউনিপেটু অতি মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এ কোম্পানিতে টাকা বিনিয়োগ করে প্রায় ছয় লাখ মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছে। আর মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে এ কোম্পানির লোকজন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যদিও গ্রাহকদের অভিযোগ, ইউনিপেটু গ্রাহকদের আমানতের প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা তছরুপ করেছে। খনি থেকে স্বর্ণ উত্তোলনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি কোম্পানিতে বিনিয়োগের কথা বলে এ কোম্পানি গ্রাহকদের কাছ থেকে এ অর্থ তুলে নেয়। আর গ্রাহকদেও লোভ দেখানো হয়, লগ্নিকৃত অর্থ বছরে দ্বিগুণ আকারে ফেরত দেয়া হবে। ইতিমধ্যে পুলিশ ইউনিপেটু’র কয়েকজন কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করেছে। আর দুই উপদেষ্টা ও কর্মকর্তাসহ নয়জনের বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর কয়েকদিন পর ইউনিপেটুইউ’র কর্মকর্তারা রাজধানীর খিলক্ষেতে নতুন প্রতিষ্ঠান খুলে কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠানের নাম ইউনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড। ইউনিপেটুইউ কার্যক্রম শুরু করেছিল ২০০৯ সালের অক্টোবরে। স্বর্ণ ব্যবসায় বিনিয়োগের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ৬ লাখ গ্রাহক এতে বিনিয়োগ করে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছিল, প্রতি মাসে মূলধন ও লভ্যাংশের ১০ শতাংশ করে ১০ মাসে গ্রাহকদের দ্বিগুণ টাকা দেয়া হবে। তবে বেশিরভাগ গ্রাহকই লভ্যাংশ দূরে থাক, মূলধনই পাননি। গত বছরের ৬ জুন ইউনিপেটুইউর বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক হিসাবে থাকা ইউনিপেটুইউর ৪২০ কোটি টাকা আদালতের নির্দেশে জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইউনিপেটুইউর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সারাদেশে তিন শতাধিক মামলা করেন গ্রাহকরা। পরে ধানমণ্ডির প্রধান কার্যালয় বন্ধ করে দেন কর্মকর্তারা।
এমওয়ে কর্পোরেশন : ধর্মের নামে প্রতারণা : মাসে দ্বিগুণ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ মানুষের রক্ত-ঘামে অর্জিত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এমওয়ে কর্পোরেশন। স্বঘোষিত চরমোনাই পীর সৈয়দ রিদওয়ান বিন ইসহাক প্রতারণামূলক এমএলএম ব্যবসায় নেমেছেন। এমওয়ে কর্পোরেশন নামক একটি এমএলএম কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে ৬ মাসে দ্বিগুণ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ মানুষের রক্ত-ঘামে অর্জিত অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। তিনি চরমোনাই পীরের সুনাম ব্যবহার করে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, শিক্ষিকা এমনকি চরমোনাই পীরের লাখ লাখ মুরিদকে ডিস্ট্রিবিউটর নিয়োগ করেছেন। তাদেও কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার করার নামেও প্রতারণা করছেন। এমওয়ে কর্পোরেশনের নিজস্ব কোন হারবাল প্রডাক্ট না থাকলেও তিনি লতা হারবাল কোম্পানির প্রডাক্টকে নিজের কোম্পানির প্রডাক্ট হিসেবে বিপণন করছেন। এছাড়া কোম্পানির ব্র“সিয়ারে প্রায় ২০-২২টি অলীক প্রজেক্ট দেখিয়ে এসব প্রজেক্টের শেয়ার বিক্রি শুরু করেছেন। তার নামের সঙ্গে চরমোনাই পীরের সাইনবোর্ড থাকায় খুব সহজেই তিনি ধর্মপ্রাণ মানুষকে প্রতারণা করছেন।
শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে রেভনেক্স : ভয়াবহ প্রতারণার মাধ্যমে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি রেভনেক্স বিডি গ্রাহকদের প্রায় শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রেভনেক্স বিডির নিজস্ব কোন পণ্য নেই। অথচ উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় একশ’ কোটি টাকা আÍসাৎ? করেছে। প্রতারিতদের মধ্যে সামরিক বাহিনীর কয়েক হাজার সদস্যও রয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেভনেক্স বিডির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও অন্যান্য বিষয় পরিদর্শন করে প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। প্রতারণার বিষয়টি অধিকতর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি রেভনেক্স গ্রাহকদের হামলার ভয়ে কোম্পানিটি বনানীর কেন্দ্রীয় অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও গা-ঢাকা দিয়েছে। মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানির নামে একশ্রেণীর প্রতারক প্রতিষ্ঠান দেশের সাধারণ মানুষকে স্বল্প সময়ে বিত্তশালী বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছে। এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। এ বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতর (ডিজিএফআই) ২৭ ডিসেম্বর একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। মহাপরিচালকের পক্ষে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ আকবর হোসেন স্বাক্ষরিত বিশেষ গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি সরকারের অর্থমন্ত্রী, এলজিআরডিমন্ত্রী, দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকেও দেয়া হয়। রেভনেক্সের সদস্যসংখ্যা ৭ লাখেরও বেশি। ৬ মাসে দ্বিগুণ লাভ এমন প্রলোভন দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণা করছে রেভনেক্স। এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের কারণে বেসামরিক জনগণের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। রেভনেক্স (বিডি) লিমিটেড গত বছরের ফেব্র“য়ারি থেকে তাদের কার্যক্রম শুরু করে।
৩৫০ কোটি টাকা প্রতারণা করেছে ভিসারেভ : এমএলএম কোম্পানি যুবক, ইউনিপেটু, রেভনেক্স, স্পিক এশিয়া, এমস্টার, গোল্ডেনট্রেডের মতো ভিসারেভ নামের আরেক হায় হায় কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ এনেছেন গ্রাহকরা। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৪৩ লাখ টাকা প্রতারণা করার অভিযোগ এসেছে। তবে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভিসারেভের উদ্যোক্তারা প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। সম্প্রতি প্রতারিত ১৫ ব্যক্তি বাংলাদেশ ব্যাংকে লিখিতভাবে অভিযোগ করেছেন। অভিযোগকারীদের সবাই সিলেটের বাসিন্দা। এ বিষয়ে একটি মামলাও হয়েছে আদালতে। তথ্যমতে, কোম্পানিটি সিলেট ও চট্টগ্রামের ৩০ সহস াধিক বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে বড় অংকের টাকা প্রতারণা করেছে। এসব গ্রাহক সর্বনিু ৩৫ হাজার এবং সর্বোচ্চ কোটি টাকাও বিনিয়োগ করেছেন। বিনিয়োগকারীরা জানিয়েছেন, উদ্যোক্তারা প্রায় সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়ে গেছে। এ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করলে ১০ মাসে টাকা দ্বিগুণ হয়ে যাবেÑ এতে আকৃষ্ট হয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে তারা বিভিন্ন অংকের টাকা বিনিয়োগ করে। ২০১০ সালের নভেম্বরে এখানে কোম্পানির অ্যাকাউন্টে টাকা জমা করেন গ্রাহকরা। ২০১১ সালে মুনাফাসহ অর্থ ফেরত পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গ্রাহকরা কোন টাকাই আর ফেরত পায়নি। পরে দুদক এ ব্যাপারে ২০১১ সালের ফেব্র“য়ারির শেষ দিকে এসে মামলা দায়ের করলে চলতি বছর জানুয়ারিতে আদালত ভিসারেভ ও ইউনিগেট ওয়ে-২ ইউ-এর হিসাব জব্দ করার আদেশ দেন।
৭ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছে গ্লোবাল মানি সুইম : গ্লোবাল মানি সুইম কর্পোরেশন লিমিডেট নামের অন্য একটি এমএলএম কোম্পানি সাধারণ মানুষের প্রায় ৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছে। ৬ মাসে দ্বিগুণ লাভের কথা বলে দেড় মাসেই কেটে পড়েছে কোম্পানিটির সব পরিচালক। এ ঘটনায় একুশে টিভির সাংবাদিক মাহাথীর ফারুকী খান ও তার স্ত্রী সিনথিয়া আলমগীরসহ প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের বিরুদ্ধে রাজধানীর কলাবাগান থানায় একটি মামলা হয়েছে। একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকরা দ্রুত মাহাথীর ফারুকী খান ও তার স্ত্রী সিনথিয়া আলমগীরকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন। বুধবার মনজুরুল ইসলাম (মনজু) বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় মামলাটি করেছেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে মাহাথীর ফারুকী, দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে তার স্ত্রী সিনথিয়া আলমগীরকে। এছাড়া ওয়াকিদুজ্জামান ডাবলু, ওয়াসিম আহমেদ, ইব্রাহিম হাসান সোহাগসহ সব পরিচালককে আসামি করা হয়েছে। জানা গেছে, ৬ মাসে দ্বিগুণ লাভ দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তারা হাজার হাজার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেছে। এ বিষয়ে প্রতারিত গ্রাহক মোঃ শাহ পরাণ যুগান্তরকে বলেন, মাহাথীরের প্রলোভনে পড়ে তিনি ৫৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন মানি সুইমে। তিনি জানান, ৬ মাসে দ্বিগুণ লাভ দেয়ার কথা বলে মাহাথীর তাদের বিনিয়োগ করতে আগ্রহী করে তোলে। এছাড়া একুশে টিভির সাইনবোর্ড উল্লেখ করে মাহাথীর বিনিয়োগকারীদের আস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। কিন্তু দেড় মাস যেতে না যেতে কমিশন দেয়া বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
আউটসোর্সিংয়ের নামে প্রতারণা : ইন্টারনেটভিত্তিক আউটসোর্সিং কাজকেও এখন এমএলএম ব্যবসায় রূপান্তর করেছে অসাধু চক্র। প্রায় ৭-৮টি কোম্পানি এ ব্যবসায় প্রতারণার ফাঁদ পেতে শত শত মানুষকে পথে বসিয়েছে। অন্যদিকে হাতিয়ে নিচ্ছে শত শত কোটি টাকা। সারাদেশে লাখ লাখ মানুষকে ঘরে বসে আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে তারা প্রতারণা করছে। জানা গেছে, ‘পেইড টু ক্লিক’ করেই ডলার ‘ইনকাম’ বা আয়ের লোভনীয় ফাঁদ পেতে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এ কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে উল্লেযোগ্য হলÑ স্কাইল্যান্সার অনলাইন অ্যাডক্লিক, বিডিএস ক্লিক সেন্টার, অনলাইন নেট টু ওয়ার্ক, বিডি অ্যাড ক্লিক, শেরাটন বিডি, ইপেল্যান্সার ইত্যাদি। এরা মূলত এ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে এন্ট্রি ফি বাবদ ১শ’ ইউএস ডলার নিয়ে থাকে। একজন সদস্য ১শ’ ইউএস ডলার দিলে তিনি অনলাইনে প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায় ঢুকে তাদের নির্ধারিত কিছু বিজ্ঞাপনে ক্লিক করেন। এভাবে একজন সদস্য প্রতিদিন ১শ’ ক্লিক করলে তার অ্যাকাউন্টে ১ ডলার জমা পড়ে। এ ডলারের হিসাব শুধু প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে দেখা যায়। ওই সদস্যের নিজের অনলাইন অ্যাকাউন্টে দেখা যায় না। ফলে নিবন্ধনের টাকা উঠাতে সদস্যরা নতুন সদস্য সংগ্রহে নেমে পড়েন। প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী একজন সদস্য নতুন আরেকজন সদস্য সংগ্রহ করলে ১০ শতাংশ কমিশন পেয়ে থাকেন।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT