হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

প্রচ্ছদফিচারবিশেষ সংবাদসীমান্ত

ভাসছে মানবতা কাঁদছে মা (২য় পর্ব)

Shahid-244x300শহীদুল্লাহ শহীদ::::

(২য় পর্ব)

এই যে আমাদের এই গরীব ও অদক্ষ গরীব মানুষগুলো হয়তো মানুষের তৈরি আইনের বিচারে অবাধ্য। কিন্তু তারা চুরি, ডাকাতি কিংবা অন্য কোন অপরাধ করার জন্য অথৈ সাগর পাড়ি দেয়নি। ওরা কেউ ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার না। কিংবা সেইটা হওয়ার কল্পনাও কোন জন্মে করেনি। কিংবা দেশ তাদের সেই রকম করে তোলার সামর্থ্যও রাখেনি। এদের অস্ত্র শুধু শক্ত দুটো হাত। যে হাতে শুধু দেশ কেন, শ্রমের ন্যায্য মূল্যের বিনিময়ে এরাই গড়ে দেবে নতুন পৃথিবী। আর তাদের কষ্টার্জিত অর্থ তো আর ভারতে যেতো না? আসতো আমাদের নিজের দেশেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বারবারই রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ এর রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা গর্ব করেই বলেন প্রতিনিয়ত। আবার সেই রেকর্ড আমাদের এই প্রবাসীরাই দিন দিন নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। আমি নিশ্চিত, সরকার রিজার্ভের রেকর্ড এর পরিমাণ উল্লেখ করে মুচকি হাসেন। কিন্তু কত শতাংশ দক্ষ আর শতকরা কতভাগ অদক্ষ প্রবাসীরা পাঠান? নিশ্চয় সেই হিসাব আমার মনে হয়না সরকারের কোন একটা অংগ দিতে পারবে। মোট রেমিট্যান্সের আনুমানিক অর্ধেকেরও বেশী নানা চ্যানেলে দেশে পাঠান আমাদের চলমান শ্রমবাজারে নানানভাবে অবস্থা11265481_806861276099855_2699439340371288156_nনকারী এই অদক্ষ, কিন্তু ঐদেশে অবৈধ তথাকথিত অবৈধ অদক্ষ শ্রমিকরাই। কারণ দেখুন, কোন ডাক্তার/ ইঞ্জিনিয়ার কিংবা সার্টিফিকেটধারী কোন প্রশিক্ষিত কর্মী একমাত্র ইউরোপ, আমেরিকা ছাড়া বাংলাদেশের মূল শ্রমবাজারে অবৈধভাবে নাই এ কথা নির্দ্ধিধায় বলতে পারি। আর মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের মূল শ্রমবাজারে যারা বৈধভাবে বসবাস করেন এদের মোটা একটা অংশ পরিবার পরিজন নিয়েই থাকেন। আমার নিজের এই জাতীয় আত্মীয় আছেন। বৈধভাবে বর্তমানে প্রবাসে পরিবার পরিজন নিয়ে ২০ বৎসর পর্যন্ত থাকছেন। আলহামদুলিল্লাহ, ওখানে কেন জানি বাচ্চা-কাচ্চা একটু বেশিই থাকে। বলতে চাচ্ছি বাসা ভাড়া, বাচ্চাদের স্কুলিং, চিকিৎসা সব মিলিয়ে মাসের শেষান্তে আয় বনাম ব্যয় প্রায় সমান সমান। আরব আমিরাতে মাসাধিককাল বেড়ানোর সুবাদে আমি এসব খুঁটিনাটিই বেশী জানতে চেয়েছি। তবুও ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে তা কখনো শতকরা হারের দুই অংক ছুঁবে না। এখন বলতে পারেন, তাহলে রিজার্ভ-এর এই রেকর্ড হচ্ছে কাদের টাকায়? চ্যালেঞ্জ অবৈধ বলে আমরা যাদের ওখানকার এম্বেসী কিংবা কনস্যুলেটে যাদের কোন প্রবেশাধিকার নাই, যারা কিনা এক প্রকার কোন একটা দেশের, না অবস্থানকারী দেশের কিংবা নিজ দেশের কোন প্রকার প্রটেকশন পায় না কিংবা উভয় দেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার চাদরের বাইরে থেকেই প্রবাসে শ্রম দিয়ে যাচ্ছে বৎসরের পর বৎসর এই কৃতিত্ব তাদেরই। যেহেতু অবৈধ তাই ফ্যামিলি দেশেই। এ জাতীয় প্রবাসিরা স্বল্প খরচে জীবন যাপন করে কোনমতে আর আয়ের বৃহৎ অংশটাই দেশে পাঠিয়ে দেয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের তো লজ্জা হওয়া উচিত এদের অবৈধ বলার ক্ষেত্রে। তারাই আসল বীর। তারাই দেশ কিংবা পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে যাচ্ছে বৎসরের পর বৎসর। রাষ্ট্র-র তো লজ্জা হওয়া উচিত, একদিকে বলবেন অবৈধ আর মাস শেষান্তে সেই অবৈধ প্রবাসীর পাঠানো টাকা গ্রহণ করেন। যদি বলি মাননীয় অর্থমন্ত্রী, প্রবাসে যাদের আপনারা অবৈধ তক্মা দেন আর উল্টো দিকে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স অকাতরে গ্রহণ করেন এইটা কোন রীতি!! যদি বলি এই মানুষগুলো কেউ আপনার কিংবা আমারই রক্তের আত্মীয়। বৎসরের পর বৎসর এই জাতীয় অবৈধ প্রবাসীর টাকা গ্রহণ করতে মাননীয় মন্ত্রী আপনাদের একবিন্দু প্রতিদান দেওয়ার কি কিছুই নাই? ভাগ্যহত মানুষগুলো কে বৈধ করার ক্ষেত্রে আপনি কিংবা আপনার সরকার দায়িত্বপ্রাপ্ত তা ভুলেই যান। একবারও ব্যর্থতা স্বীকারও করেন না। এই প্রবাসী মানুষগুলোকে বৈধতা না দিতে পারার দায়ে কি আপনাদের নিতে হবে না? মাননীয় অর্থমন্ত্রী, এইতো আগামী মাসেই বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। দুঃখ হয় যাদের পাঠানো রিজার্ভ রেকর্ড এর উপর ভর করে নিশ্চয় বিশাল এক বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। আপনার ঐদিনের নতুন লেদার ব্যাগে অনেক শ্রেণি পেশার মানুষের জন্য সুবিশাল প্যাকেজ থাকবে। কিন্তু প্রবাসী এই বীরদের জন্য আপনার ঐ ব্যাগে সামান্যটুকু জায়গাও থাকবে না। এটা আগাম বলেই দেওয়া যায়। মাননীয় অর্থমন্ত্রী, থাইল্যান্ড পড়েছে মানবপাচার সূচকের টায়ার-৩ ঝুঁকিতে। আমার মনে হয় আমাদের অর্থমন্ত্রীর জন্য। কারণ, তার বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেস্টনী জাতীয় দারুণ সব শিরোনামে হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ থাকে। সুন্দর বর্ণনা ও থাকে। যেমন, প্রান্তিক জনপদে কর্মসংস্থান, দারিদ্র বিমোচন ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন সময় হয়েছে ভেবে দে11108674_1130678020281252_1604514563222018316_nখার? কারণ মালেশিয়া সহ আরো অনেক দেশে মানুষের এই মৃত্যু যাত্রা প্রমাণ করেছে অর্থমন্ত্রীর সামাজিক নিরাপত্তার জালে বড় বড় ফাঁক আছে। বাংলাদেশও কি একদিন এই সূচকে ধরা খাবে? থাই সরকারের মত?
আপনার বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ কিংবা ট্যাক্স-ভ্যাট ফ্রি ষ্টাম্পের নানান আজগুবি নামে প্রণোদনা দেওয়ার তালিকা ইতিমধ্যে ফাইনাল হয়েছে, আর আপনার দেওয়া সুবিধাভুগি এরাই দেশ থেকে টাকা অবৈধ পথে পাচার করে বিদেশে। প্রচলিত আইন যাই বলুক আপনারা দেশপ্রেমিকের মূল্যই দিতে জানেন না। যারা বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স পাঠায় তারা অবৈধ তক্মা নিয়ে জীবন পার করে আর আপনাদের বিশেষ সুরক্ষা সুবিধা নিয়ে যারা উল্টো দেশ থেকে টাকা বাইরে পাচার করে তাদেরকে চোর ঘোষণা না দিয়ে দিচ্ছেন লাল পাসপোর্ট, ভি.আই.পি মর্যাদা।
হলমার্ক- থেকে শেয়ার মার্কেট শুভংকরের ফাঁকি আর মানি লন্ডারিংকারীরা বাহাবা পায়। দেখেন কোমরে সুরক্ষা রশি বেঁধে শেরপাদের বগলদাবা হয়ে হিমালয়ের চুঁড়ায় উঁকি ঝুঁকি মেরে সেলফি-টেলফি তুলে মহানায়ক বনে যায়। মিলছে কত মেডেল, হিমালয় বিজয়ী বীর উপাধী। পড়ে যাওয়ার ভয়ে- ইয়া মোটা রশি বেঁধে পাহাড়ে উঠছেন। তাতে দেশের কি হলো বুঝিনা। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র, বিদেশ থেকে যারা টাকার স্রোত দেশে পাঠাচ্ছে তাদের ন্যূনতম সম্মান নেই। এই অশিক্ষিত কিন্তু অসীম সাহসী সন্তানরা সাগর- মহাসাগর পাড়ি দেয় শুধু টাকার স্রোতকে মাতৃভূমি মুখি করার জন্য। এতবড় দেশপ্রেমের পরিচয় আর কে দিয়েছে, দিচ্ছে? স্যার, বাংলাদেশের সেই ভাগ্যবিতাড়িত, স্বপ্ন বিলাসি যুবক মালাক্কা বিজয়ীরা আপনার সরকারে সামান্য এক বোতল খাবার পানিরও যোগ্য হয়নি। দেখুন, ওরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কেউ নয়। ওদের হাত শ্রমিকের ছিলো। ঐসব গরীবের হাত আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার মত তত লম্বা ছিলনা। তাইতো দিনের পর দিন গহীন সাগরে ভেসেই গেলো, খাদ্য নাই, উপাস থেকে কংকাল বনলো। পানীয় জল নাই, বোতলে প্রশ্রাব জমিয়ে তাই পান করে বাঁচতে চেয়েছে তবুও পেছনে ফেরার চিন্তা করেনিÑ হয় মৃত্যু না হয় শ্রমের উপর্যুক্ত মজুরী। একটু সামান্য স্বচ্ছলতা এইতো ছিলো স্বপ্ন। ওরা চোরও না ঋণ খেলাপিও না। চাকুরির দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেনি। হরতালও করেনি। শুধু স্বপ্ন দেখেছিলো সুন্দর একটি আগামী দিনের। অনেকের সেই স্বপ্ন মালাক্কা প্রণালীতে সলিল সমাধি হলো। আপনারা ব্যাংকক যান মাস্তি করতে আর গরীবরা গেলো মরতে। এটাই কপাল স্যার। মনে হয়, গরীবের জন্মই হয়েছে ফুলস্টপ হয়ে। যেখানে বসিয়ে দেন, নড়াচড়া নাই। আর নড়তে গেলেই তো মরতে হবে মালাক্কার গভীর স্রোতে।
ইতিমধ্যে নিশ্চয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত তথ্য জেনেছেন বাংলাদেশী বোট-মানবদের প্রকৃত তথ্য। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড কিংবা মালেশিয়া উপকূলে মোট ক’জন বাংলাদেশী কংকাল দেহ নিয়ে কোন রকমে প্রাণে বেঁচে মাতৃভূমির সুরক্ষার আশায় প্রহর গুনছেন। আমার কেন জানি আশংকা হয় সাগর/ মহাসাগরে হয়তো কিছু মানুষ আজো ভাসছে। বঙ্গোপসাগর পাড়ের দেশ হয়ে মালাক্কা প্রণালী উপকূলের সকল দেশ এখন মানবিক সাহায্য প্রদানের ক্ষেত্রে মোটামুটি ঐক্যমতে পৌঁছাতে পেরেছে। এই সুযোগে বাংলাদেশের উচিত হবে এই প্রক্রিয়ায় একটা রোল প্লে করা। কারণ মালেশিয়ামুখি প্রত্যেক নৌকা বা ভেসেলে বাংলাদেশীরা সহযাত্রী এটা প্রমাণিত। তাই কেউ যদি এখনো ভাসমান অবস্থায় থাকে ওরা রোহিঙ্গা আর আমাদের দায়িত্বে পড়েনা এই ভেবে আগের মত চুপ মেরে থাকলে আরো মা-এর কান্না আমাদের সামনেও শুনতে হতে পারে। আমার মনে বারবার একটা আশংকা এখনো ঘোরপাক খেয়েই যাচ্ছে। বারবার কেন জানি মনে হয়েছে ভাসমান মানুষের মাঝে, থাই জংগলে বাংলাদেশীর উদ্ধার, শত নয় হাজার বাংলাদেশী ভাসমান ইত্যকার বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক সময়ে তথ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগই দেওয়া হয়নি। কারণ বঙ্গবন্ধুর কন্যা, দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তিনি। আর তার প্রিয় নাগরিক একজনও সাগরে ডুবে, জংগলে নিষ্ঠুর মৃত্যু বরণ করবে এই বেদনার কথা প্রথমেই তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বুঝার কথা। তিনি শুধু প্রধানমন্ত্রীই নন, তিনি নিজেই তো একজন মা, øেহময়ী মা!! আর নিকটজন এর অপমৃত্যুর বা হারানোর বেদনা কত গভীর, কত বেদনা বিধুর হতে পারে তা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বেশী কেউ বুঝতে পারার কথা নয়। প্রাত্যহিক রুটিন এর ব্যস্ততার মাঝেও জনসমক্ষেই যখন পিতা বঙ্গবন্ধু, মা, ভাই, ভাবি, প্রিয় চাচা কিংবা ফুটফুটে ভাইটির নির্মম হত্যার স্মৃতি তাঁকে কিভাবে নাড়া দেয় তা আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি। একসঙ্গে নিজ পরিবারের ১৫ সদস্য একযোগে নিহত!! ২টি বোন বিদেশ বিভুঁই-এ। শেষবারের জন্য মুখটি দেখার সুযোগ ছিলোনা! আমি শুধু ভাবি, ঠিক ঐ সময়ে উনার চেহারাই আমি কল্পনা করি!! আজ যখন প্রিয় সন্তানের ছবি বুকে নিয়ে হারানো সন্তানের জন্য বিলাপ করে যান তখন আমার মনটা শুধু পেছনে ১৯৭৫-এর ১৫ আগষ্টের কালো রাতে ফিরে যায়। আজ যে মা অঝোর ধারায় কাঁদছে, কেঁদেই যাচ্ছে। আমি জানিনা বাংলাদেশের জেলা উপজেলা টেকনাফ থেকে ক্ষুদ্র একজন মানুষের ভাবনা, অনূভূতি এই লিখাটি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষিত হয় কিনা। আমাদের কক্সবাজারে চার সাংসদের কেউ একজন স্ব-উদ্যোগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও করতে পারেন চাইলে। কারণ এক্ষনি আমি যে মা-দের কান্নার কথা বলতে যাচ্ছি এই কান্নাতো ৭৫ এর আগষ্টে শেখ হাসিনা-শেখ রেহেনা দুই বোনের মা-বাবা হারিয়ে এভাবেই কেঁদে বুক ভাসিয়ে ছিলেন। এ কান্না তো উনাদের কান্নারই পুনরাবৃত্তি!! এই অভাগা মা-বাবা যে মৃত সন্তানের কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে দোয়া করার সুযোগে যে জীবনেও পাবেন না। ৭৫-এর হায়েনারা নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে জাতির পিতার বাংলাদেশে। নিষ্ঠুর রাক্ষুসে মালাক্কা প্রণালী গরীব মায়ের আশা ভরসার প্রতিক প্রিয় সন্তানকে গিয়ে খেয়েছে!! নিজ উদরে ধারণ করা সন্তান হারানোর এই বেদনা, ও বুক ফাঁটা কান্না আর ৭৫-এর ১৫ আগষ্ট এর কালো রাত্রির কান্না যে একও অভিন্ন। ৭৫ এর কান্না যে এখনও থামেনি- তার প্রমাণ শেখ হাসিনা নিজেই দিয়ে যাচ্ছেন। তিন তিন বার প্রধানমন্ত্রীর আসনে, যার ঈশারায় বাংলাদেশ একাত-ওকাত হবে, তিনি আজো চোখের পানি লুকাতে পারেননি। হয়ত শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পারবেনও না। সদ্য বুকের ধন হারানো মা’ দের কান্না ও যেন থামেনি। হয়তো কোনদিন থামবেও না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, কর্মব্যস্ততার মাঝে খেয়াল করলেই দেখতে পাবেন পুরা বাংলার এই গরীব মা-গুলো কাঁদছে। কক্সবাজার উপকূল থেকে পাহাড়ী জনপদ, চট্টগ্রাম থেকে সূদুর সিলেট/ ফেঞ্জুগঞ্জ যশোর থেকে বৃহত্তর খুলনা উপকূল। একটু কান পাতলেই শুনতে পাবেন অসহায় গরীব মা’রা ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠছেন। বুকে জড়িয়ে আছেন প্রিয় সন্তানের মুখের ছবিখানা। সাংবাদিকের ক্যামেরা দেখলেই শীর্ণ বুক থেকে ছবিখানা বের করছেন। মা জানেনা সন্তান-এর মৃত্যু কি সাগরের গভীরে হলো না গহীন জংগলে কোন গণকবরে, নাকি এখনো কোন ক্যাম্পে বন্দী আছে মুক্তির আশায়?
এ কান্না কিন্তু আজকেই শুরু হয়নি। মালেশিয়া গমনের ঐ মালাক্কা প্রণালী দিয়ে স্বপ্ন যাত্রার শুরুর অবস্থা থেকেই। কারণ সব স্বপ্ন সফল হয়নি। অনেকের হয়ত লক্ষ্যে পৌঁছে প্রিয় মাকে খুশি করতে পেরেছে কিন্তু অনেকের সলিল সমাধি হচ্ছে সাগরে কিংবা বনে কিংবা টর্চার ক্যাম্পে। স্বপ্ন যাত্রার-আজ পর্যন্ত বয়স যত এই হতভাগী মা’দের কান্নার বয়সও তত। প্রথমে এই কান্না ‘উপকূলের মা’-রাই শুরু করেছেন। বুকের ধন হারার কান্না কেউ শুনেনি বা শুনতে পায়নি। সেই মায়ের কান্না, মালেশিয়া যাত্রার পরিধি যতই বেড়েছে, আরো মা-রা ঐ হারানো ধনের মায়ের কান্নার দলে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছে। এভাবে কবে অভাগা মা-রা সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে উপকূল ছাড়িয়ে পুরো বাংলাদেশ ছাড়িয়ে পড়েছে। আর বাংলা মায়ের এই কান্নায় আল্লাহর আরশ কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আর অন্যদিকে মানবতা সাগরে ভাসতে থাকলো। স্থলে মা’ কাঁদেন- আর ভাসমান ছেলে হয়ত প্রাণ বাঁচাতে বোতলে নিজের প্রশ্রাব পান করে মা- কে স্মরণে রাখছেন।
শত নয় বাংলার হাজার মা-ই কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়েই যাচ্ছেন। “ছোট্টু” নামটি উচ্চারণেই বুঝা যায় কোন এক মায়ের প্রিয় ছোট সন্তান!! এই ছোট্ট সন্তানটি বায়না ধরেছে সচ্ছলার, মা’র সম্মুখে হাসি ফুটানোর। মা-এর না শুনেনি। যাত্রা ও করলো মা’র চোখের জ্বলে ভর করে। আজ-কাল করতে করতে আজ মালাক্কার কোন এক উপকূল থেকে খবর আসলো সাগরেই এই মার সন্তানের সলিল সমাধি হয়েছে। নির্বাক মা। আইন ও চেনেনা, বুঝেও না। মালাক্কা প্রণালীর নাম স্বপ্নেও শুনেনি। প্রয়োজনও হয়নি। সন্তান হারিয়ে এই মায়ের দু’নয়নেই যেন ভর করেছে রাক্ষুসে মালাক্কা প্রণালী। বাড়ীর সদর দোয়ারে দাঁড়িয়ে দু’ চোখে মালাক্কার তীব্র স্রোত, দুঃখিনী মায়ের দু’হাত প্রসারিত যে কাউকে দেখলেই চিৎকার দিয়ে বিলাপের সুরে বলেই যাচ্ছে আঞ্চলিক ভাষায় “আঁর চুট্টো খড়ে, তোয়ারা দেইখ্য নে? আর ছুট্টোরেÑ আর বুকত ফিরাই দ” “ও আর যাদু, আর যাদু খড়ে” এই বিলাপ থামেনা, চলতে থাকে। অবিরত কান্নার ফাঁকে ফাঁকেই এই মা তার অজান্তেই ডান পায়ে জোরে জোরে মাটিতে আঘাত করছে, করেই যাচ্ছে। এই মা হয়ত আমাদের সমাজের কপালেই ছুঁড়ে মারছেন ঐ লাথি!! মা দেন দু’হাত আকাশ পানে ছড়িয়ে আল্লাহর আরশ ছুঁয়ে দাড়িয়েই আছেন। দৃষ্টি তার দিগন্তে স্থির আর অবিরত চলছে ছুট্টো নাম জপ, “আল্লাহ ও আল্লাহ আর ছুট্টো খড়ে?”। এই বিলাপ থামেনা কে দেবে এই সন্তান হারা গরীব অভাগী মা-র প্রশ্নের উত্তর? আর কারই বা এমন শক্তি আছে ছুট্টোর মায়ের বুকের গভীরে জ্বলন্ত অদৃশ্য আগ্নেয়গিরি থামাতে? এভাবে চলছে ভাগ্যাহত স্বপ্নবিলাসী ছুট্টুদের অভাবী মা’দের চির ক্রন্দন। এই ভাবে করেই রাক্ষুসী মালাক্কা প্রণালী তীব্র স্রোত বাংলাদেশের অনেক মায়ের চোখে ভর করেছে। প্রতিদিন কোন না কোন জেলার কোন না কোন মা এই বিলাপে যোগ হচ্ছে!!! আরো অনেক মা এখানে সেখানে সন্তানের খোঁজ করে বেড়াচ্ছে। টাকা নয়, পয়সা নয়, কিছুই চায়না। এ মা’রা শুধু পরম মমতায় সন্তানের মুখখানা শেষ বার দেখার আকাংখাই করছে বিলাপ-এর সুরে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শুধু আপনি নন, আপনার সাথে কান্নার মিছিলে এইসব মা যোগ হয়েছে। জানি পুরো পৃথিবী দিলেও এদের ক্রন্দন থামানো যাবে না। শুধু অনুরোধ একটাই-এই অসহায় জনম দুঃখিনি বাংলার বাকী মা’দের প্রিয় সন্তান-এর ভাগ্যে যেন এমন না ঘটে। কান্নার মিছিলে যেন আর কোন মা-এর যোগ না হয় সেই ব্যবস্থাই করবেন। ন্যূনতম কর্মসংস্থানÑএর ব্যবস্থা কিংবা বৈধ উপায়ে এদের সন্তানগুলোকে প্রবাসে যাওয়ার বৈধ পাইপ লাইন তৈরী হলে এ মা-দের মুখে কান্নার বদলে ভূবন ভূলানো হাসিই দেখবেন। আর যদি তাই করতে পারেন দেখবেন ৭৫ থেকে বয়ে বেড়ানো নিজ-কান্নার ভার অনেকটাই হাল্কা হবে নিশ্চিত। দেখবেন স্বস্থি পাবেন। শান্তি পাবেন। কারণ আপনার সংসদ সদস্য মমতাজের কণ্ঠে “মায়ের কান্দন জগত জীবন……….?” এই গানের করুণ আর্তি, আমাকে নয়, অনেককেই কাঁদায়, চোখ ভিজিয়ে যায়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি চাইলে পারবেন!! কারণ সব কান্না সবাই বুঝেনাÑ কিংবা বুঝেও বুঝেনা অথবা কান্না বুঝার ক্ষমতাই নাই কারো কারো। প্রান্তিক জনপদের ক্ষুদ্র একজন মানুষ হিসেবে, আমাদের কি বা করার আছে!! অপ্রিয় শুনালেও বলতে হচ্ছে, এই মৃত্যুর জন্য কারা দায়ী দেখার প্রয়োজন আছে বলেই আমি মনে করি!! শ্রমিক আছে কিন্তু তার বাজার নাই, কেন নাই তা পর্যালোচনার দরকার। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে আমার কাছে আনজুমান মফিদুল ইসলামই মনে হচ্ছে। সফলতার মাঝে শুধু দেখছি কাজের মেয়ে সরবরাহের ঠিকাদারিই পেলো!!! আর যে বাজারটা মিট্মিট্ জ্বলছে সেই বাজার-এ অতো টাকা খরচ করে যাওয়ার ক্ষমতা ঐ গরীবদের নাই। ইতিমধ্যে আমরা এ প্রসঙ্গে আপনার বক্তব্য জেনেছি। শুধু দালাল ও যাত্রীর সাজা হলেই কি সবকিছুর শেষ হলো? সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির নামে হাজার হাজার কোটি টাকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করে অন্য দিকে যাচ্ছে কিনা তা কি দেখার বিষয় নয়? নতুন করে হয়ত পর্যালোচনা করার সময় এসে গেছে। দেখা দরকার আছে এইসব মানুষের এই যাত্রার পেছনে অন্য কোন কারণ আছে নাকি!!!
পরিশেষে লেখাটি শেষ করবো। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ওবামাকে ধন্যবাদ না দিলে অসম্পূর্ণই থাকছে। কারণ তিনিই থাই সরকারকে বাধ্য করেছেন আইনী ব্যবস্থা নিতে। তখন কেঁচো খুঁড়তে সাপ নয়, রীতিমত কিং কোবরা বের হলো। অবশেষে বাংলাদেশসহ পাশের সব দেশের ঘুম ভাঙলো। ধন্যবাদ আমেরিকা, ধন্যবাদ ওবামা।
শহীদুল্লাহ শহীদ

শহীদুল্লাহ শহীদ::০১৭৫৩৫০০৫৮০
E-mail: shahidcox11@gmail.com
লেখক :একটি বেসরকারী সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা
সূত্র : বিভিন্ন ওয়েবসাইট

www.hotelbeachway.com

 

২য় পর্বের পাদটীকাঃ

যারা প্রথম পর্ব পড়ে যারা কমেন্ট করেছেন সবাইকে ধন্যবাদ। বিশেষ করে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। প্রবাসী ভাইদের অনেককে প্রতিউত্তর দিতে পারিনি, তাই দুঃখ প্রকাশ করছি।
বিশেষ ধন্যবাদ হোটেল বীচ ওয়ে/www.hotelbeachway.com কলাতলীকে কাগজ-কলম দিয়ে অনেক সহযোগিতা করার জন্য। সুন্দর মনোরম পরিবেশের এই হোটেলটির সামান্য প্রচারনা না করলে অকৃতজ্ঞতাই হবো। কারণ আমার অনাকাংখিত সব জ্বালাতন সহ্য করেছে এই হোটেল কর্তৃপক্ষ। ফ্রন্ট ম্যানেজার, বয়, রেষ্টুরেন্ট, নাইটগার্ড সবাইকে সালাম ও ধন্যবাদ।
ভাল হউক আর মন্দ হউক, পাঠকের মন্তব্য লেখালেখির উন্নতির পূর্বশর্ত।

==========================================

 

 

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.