হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

কক্সবাজারসাহিত্য

“ডান্ডা সাংবাদিকতা-কাটপেস্ট সাংবাদিকতা”

pic-25-150x191;p90'মঈনুল হাসান পলাশ ॥এক.গেলো রোববারের সুতো ধরে আজকের লেখার প্রথম অংশ টানছি। বলেছিলাম, লেখালেখি আমার অস্তিত্বে মিশে আছে। লেখালেখি এমন একটা ব্যাপার, যেটা শিখিয়ে-পড়িয়ে কাউকে তৈরী করা যায় না,যদি না নিজের মধ্যে তার জন্য টান থাকে।আমার যতো লেখালেখি আর এই সংক্রান্ত প্রচেষ্টা- তার অনেকটাই জেদের বশে। প্রথম জেদের কাহিনীটা আজ বলবো।সময়টা ছিলো ১৯৯২ সাল। প্রজন্মের প্রত্যাশা- নামে কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের একটা প্রকাশনা বের করার জন্য দায়িত্ব পড়লো ওই কমিটির কয়েকজন দায়িত্বশীলের উপর। তাদের সাথে আমিও যোগ দিলাম। সম্পাদনার কাজ চললো চট্টগ্রাম শহরে। সেই ম্যাগাজিনের লেখাগুলোর সম্পাদনা করে দিলাম। এমনকী প্রকাশনার নামটাও ছিলো আমার দেয়া। সম্পাদকীয়টিও লিখে দিয়েছিলাম,যা ছাপা হয়েছিলো প্রকাশনার সম্পাদকের নামে। জেলা ছাত্রলীগের সেই ম্যাগাজিনে ছাপানোর জন্য একটা ছোট গল্প লিখেছিলাম। প্রকাশনার দায়িত্ব পাওয়া আমার ২ বন্ধুকে লেখাটা দিয়ে আমি চট্টগ্রাম থেকে চলে এলাম কুমিল্লায়। পড়াশুনার সুবাদে আমাকে কুমিল্লায় অবস্থান করতে হতো। যাই হোক, প্রায় এক মাস পরে কক্সবাজার এলাম। অনেক আগ্রহ নিয়ে ম্যাগাজিনটা দেখলাম। তারপর মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। আমার ঘনিষ্ঠ ২ বন্ধু, যাদেরকে আমি ম্যাগাজিনটা ছাপাতে সর্বোত সহযোগিতা করেছিলাম, যাদের হাতে আমার লেখা ছোট গল্পটা গছিয়ে দিয়ে কুমিল্লায় চলে এসেছিলাম,তারাই আমাকে চরম অবজ্ঞা-অবমূল্যায়ন করে লেখাটা ফেলে দিলো। আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। ওই দুজন তখন ইনিয়ে-বিনিয়ে বললো, তমুকের একটা লেখা ছাপানোর জন্য বাদ দিতে হয়েছে। আমার কষ্টটা প্রচন্ড জেদে রুপ নিলো। আমি তাদের তখন বলেছিলাম,“ছাত্রলীগের ম্যাগাজিনে আমার লেখা ছাপানোর জায়গা হয় নি। একদিন আমি ঢাকার পত্রিকায় লেখা ছাপিয়ে তোমাদেরকে দেখাবো!!!”
এক বছর বাদে ১৯৯৩ সালে সেই সময়কার সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে আমার লেখা প্রথম ছাপা হয়। সেটাই ছিলো কোনো স্বীকৃত পত্রিকায় আমার লেখার স্বীকৃতি। এরপর আরো কয়েকদফায় যায়যায়দিনে আমার লেখা ছাপা হয়েছিলো। পরে ১৯৯৫-তে যায়যায়দিনের সহযোগী প্রকাশনা সাপ্তাহিক মৌচাকে ঢিল-এ আমার লেখা নিয়মিত ছাপানো হতো। তবে এসব লেখা ছিলো মূলতঃ ব্যাঙ্গাত্মক মানে স্যাটায়ার। যাইহোক, আমার ২ পন্ডিত বন্ধুকে ওইসব ছাপানো লেখা দেখিয়ে প্রমাণ দিয়েছিলাম, ছাত্রলীগের ম্যাগাজিনে আমার লেখা স্বীকৃতি না পেলেও জাতীয় পত্রিকা ঠিকই স্বীকৃতি দিয়েছে! ওই ২ পন্ডিত তখন চুপসে গিয়েছিলো। যায়যায়দিন-মৌচাকে ঢিলে লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৭ সালের ১৪ মার্চ ঢাকায় যায়যায়দিনের প্রথম লেখক সম্মেলনে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। ওইদিন লেখালেখির প্রথম প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম সাপ্তাহিক যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমানের কাছ থেকে। ওটাই ছিলো আমার জীবনে এই পর্যন্ত লেখালেখির প্রথম এবং একমাত্র প্রশিক্ষণ। সেদিন প্রশিক্ষণ শেষে শফিক রেহমানের কাছ থেকে পেয়েছিলাম লেখকের স্বীকৃতি-“লেখক সম্মাননা সনদ”!
দুই.
আজকের লেখার শিরোনামটা খুব স্থুল হয়ে গেছে। আসলে ব্যাপারটাই যে স্থুল। স্থুল ব্যাপারের সিরিয়াস শিরোনাম দেয়ার তো উপায় নেই। লেখালেখিই সাংবাদিকতার প্রাণ। মানে, সংবাদ সংগ্রহ, ব্যাকরণ মেনে সেই সংবাদ গঠন ও তার পাঠযোগ্য এবং অনেকক্ষেত্রে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন। আসলে লেখালেখি ছাড়া সাংবাদিকতা ভাবাই যায় না। একজন সাংবাদিকের মুন্সিয়ানা, পরিতৃপ্তি সর্বোপরি মান প্রতিফলিত হয় তার লেখায়। অথচ লেখালেখির বালাই নেই, তারপরও সাংবাদিকতা! ভাবতে কেমন বিদঘুটে লাগে বৈকি। হালে এমন প্রজাতির সাংবাদিক(!) সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে লেখালেখির জ্ঞান দরকার নেই, মুন্সিয়ানা তো দুরে থাক! প্রযুক্তির কল্যাণে ব্যাঙের ছাতার মতো টেলিভিশন চ্যানেল আর মশা-মাছির মতো নিউজ পোর্টাল মানে অন লাইন নিউজ পেপার।
ফলে সৃষ্টি হয়েছে সাংবাদিকতার নতুন ধারা। “ডান্ডা সাংবাদিকতা” ও “কাটপেস্ট সাংবাদিকতা”।
মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে দৌড়ানোকে অনেকে ব্যঙ্গ করে বলছেন “ডান্ডা সাংবাদিকতা”। অবশ্যই যার-তার পক্ষে এই সাংবাদিকতা রপ্ত করা সম্ভব নয়। প্রযুক্তি জ্ঞান এবং ভিজুয়াল সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ ছাড়া তো এখানে ডান্ডা নিয়ে দৌড়ানোর মানে হয় না। তবে কক্সবাজারে ডান্ডা সাংবাদিকতার বর্তমান হাল-হকিকত জেনে রীতিমতো মায়া হয়।
কোনো অনুষ্ঠানের ফুটেজ নেয়ার পর “ক্যাসেট“ পাঠানোর খরচ পেতে “কায়েন্ট” এর পেছন পেছন ডান্ডা নিয়ে দৌড়ানোর দৃশ্য এখন কক্সবাজারে খুবই পরিচিত দৃশ্য। মনে পড়ে বেশ কয়েক বছর আগে যখন দেশে এতো ডান্ডার ছড়াছড়ি ছিলো না, তখন অভিনব কায়দায় “কায়েন্ট”কে জব্দ করতেন কতিপয় ডান্ডাবাজ। ফুটেজ তুলে,ক্যাসেট পাঠানোর টাকাও আদায় করা হয়েছে। এবার তো টিভি চ্যানেলে দেখাতে হবে! আর চ্যানেল যে সেই ফুটেজ চালাবে, তার তো গ্যারান্টি নেই। ফলে “কায়েন্ট”কে তো ঠান্ডা করতে হবে। তাই একটা অভিনব কৌশল অবলম্বন করা হতো। একদম সকালে কায়েন্টকে ফোন করতেন সংশ্লিষ্ট ডান্ডাবাজ! খুব নাটকীয় ভঙ্গিতে তখন কায়েন্টকে বলা হতো-“আপনার অনুষ্ঠান তো আমার চ্যানেলে দেখিয়েছে!”
কায়েন্ট তখন হন্তদন্ত হয়ে জানতে চাইতেন,“ভাই কখন, কখন দেখাইছে???”
ডান্ডাবাজের স্মার্ট জবাব,“কেনো, ভোর ৫ টার নিউজে দেখাইছে, আপনি দেখেন নাই!!!”
ডান্ডা সাংবাদিকের আরেকটা কাহিনী বলি। এটা শোনা কাহিনী, তাই সত্য-মিথ্যা জানি না।
একবার এক ডান্ডা সাংবাদিক তার ডান্ডাসমেত কক্সবাজারের এক শীর্ষস্থানীয় শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চেম্বারে গেলেন। ডান্ডাটা ডাক্তারের টেবিলের উপর রাখলেন ওই সাংবাদিক। অতঃপর তার সমস্যার সমাধান করালেন। এরপর ফিস দেয়া-নেয়ার পালা।
ওই শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অবশ্য কক্সবাজারের অনেক বিশিষ্ট ও প্রতাপশালী সাংবাদিককে পুষতে পারার ক্ষমতাধারী। তাই এইসব ডান্ডাবাজ তার কাছে কিছুই না। তবুও ডান্ডাকে সম্মান করে তিনি ফিস নিলেন না। তবে কক্সবাজারের তাবৎ সাংবাদিককে তিনি কয়েকশ টাকা দিয়ে মাপলেন ওই ডান্ডা সাংবাদিকের কল্যাণে।
হালে ডান্ডা সাংবাদিকেরা সিন্ডিকেট গড়েছে বলে খবর পাই। অর্থাৎ এখন টিভি চ্যানেলের কাভারেজ পেতে চাইলে ডান্ডা সাংবাদিকদের সিন্ডিকেট এর সাথে প্যাকেজ ডিল করতে হয়। ব্যাপারটা খারাপ নয়, অন্ততঃ কায়েট এর পেছন পেছন ভিক্ষুকের মতোন ঘুরার চেয়ে ভালো তো!
শেষ করবো কাটপেস্ট সাংবাদিকতার কিছু কথা বলে। ইন্টারনেট প্রযুক্তির কল্যাণে আর মশা-মাছির সংখ্যার সাথে পাল্লা দিয়ে দেশে নিউজ ওয়েব সাইট পয়দা হওয়ায় অভিনব কাটপেস্ট সাংবাদিকতার প্রচলন হয়েছে। দেশে এতো নিউজ ওয়েব সাইট, সাংবাদিক পাবে কই? তাই একই সাংবাদিক ৫০টা ওয়েব সাইটে একই নিউজ পাঠায়। এমন অশরীরী ক্ষমতা অর্জন শুধু কাটপেস্ট সাংবাদিকতার কারণেই সম্ভব।
যা বলতে চাইছিলাম,সব কিছু এখন যেমন সস্তা হয়ে গেছে, তেমনি সাংবাদিকতা করাও সহজ হয়ে গেছে। এখন সাংবাদিক হতে গেলে লেখালেখির দক্ষতার তাই খুব বেশী প্রয়োজন নেই!
লেখকঃ সম্পাদক ও প্রকাশক-দৈনিক সমুদ্রকন্ঠ।