টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

টেকনাফ-মংডু সীমান্ত বাণিজ্য ১৮ বছরে পর্দাপণ.. বেড়েই চলেছে ঘাটতি

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : শনিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১২
  • ১২৫ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

আয় করেছে ৭১১ কোটি ৯৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৪৩ টাকা। অন্যদিকে এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৭০ কোটি ৭ লাখ ৮৭ হাজার ১৮৮ টাকার পণ্য । ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর টেকনাফ-মংডু সীমান্ত বাণিজ্য শুরু হয়। সীমান্ত চোরাচালান প্রতিরোধ ও রাজস্ব আদায়ের আশা নিয়ে এ বাণিজ্যের যাত্রা। কিন্তু নানা প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা ও চোরাচালানের কারণে তেমন একটা আলো দেখা যায়নি। বরং কাগজপত্রে বাণিজ্যঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪শ’ কোটি টাকা। বাস্তবে যা হবে এর পাঁচগুণ সমপরিমাণ। গত ১৭ বছরের সীমান্ত বাণিজ্যে আমদানির তুলনায় রপ্তানি কম হওয়ায় বিপুল পরিমাণ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য সমপ্রসারণের লক্ষে দু’দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক হলেও রপ্তানিক্ষেত্রে এর সুফল আসছে না। প্রতিবছর দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যঘাটতির পরিমাণ বেড়েই চলছে। মায়ানমারের পণ্য আমদানি বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশী পণ্য রপ্তানি না হওয়ায় এ ঘাটতি মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্ত বাণিজ্যে ঘাটতি কমাতে জরুরি ভিত্তিতে সরকারি উদ্যোগের কথা বলছেন সংশ্ল্লিষ্টরা।

কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ-মায়ানমারের টেকনাফ-মংডু সীমান্ত বাণিজ্য ১৯৯৫-৯৬ থেকে চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছর পর্যন্ত ২ হাজার ৩৯৭ কোটি ৫৭ লাখ ৪৩ হাজার ২৪৭ টাকার ঘাটতিতে দাঁড়ায়। প্রথমত সীমান্ত বাণিজ্যে দু’দেশের অবস্থান কাছাকাছি থাকলেও পরবর্তী অর্থবছর থেকে আমদানি বৃদ্ধি পেলেও রপ্তানি হয়েছে খুব নগণ্য পরিমাণ। ফলে দেশের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। আমদানিক্ষেত্রে যেভাবে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ড্রাফ্‌ট ইস্যু করা হয়, সে ক্ষেত্রে মায়ানমারের ড্রাফ্‌ট আসে খুব কম। যার কারণে ব্যবসায়ীদের পণ্য রপ্তানি করতে অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট মাসে মায়ানমারের পণ্য আমদানি হয় ২৭ কোটি ৫৭ লাখ ৮০ হাজার ৭২৭ টাকার। বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হয় ৫৬ লাখ ২৫ হাজার ৮৩৮ টাকা মূল্যের। এ দু’মাসে ঘাটতি দাঁড়ায় ২৭ কোটি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৮৯ টাকা। সদ্যসমাপ্ত ২০১১-১২ অর্থবছরে মায়ানমারের পণ্য আমদানি হয় ৩২৪ কোটি ৮৫ লাখ ২৭ হাজার ৬১৩ টাকা। বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি হয় ১২ কোটি ৫০ লাখ ৮৭ হাজার ৮০৯ টাকা। এ বছর ঘাটতি দাঁড়ায় ৩১২ কোটি ৩৪ লাখ ৩৯ হাজার ৮০৪ টাকা। ২০১০-১১ অর্থবছরে আমদানি ৩৭৪ কোটি ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। রপ্তানি ১১ কোটি ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা। ঘাটতি ৩৬৩ কোটি ৩০ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছরে আমদানি ২৯৭ কোটি ৩১ লাখ ৫৮ হাজার ৪১৯ টাকা। রপ্তানি ১১ কোটি ৭১ লাখ ৮৯ হাজার ৫১২ টাকা। ঘাটতি ২৮৫ কোটি ৫৯ লাখ ৬৮ হাজার ৯০৭ টাকা। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে আমাদানি ৪৬৩ কোটি ৫৬ লাখ ৩২ হাজার ৭১১ টাকা। রপ্তানি ৮ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার ৭৮৪ টাকা । ঘাটতি ৪৫৫ কোটি ২৯ লাখ ৪১ হাজার ৯২৭ টাকা। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে আমদানি ২৮৭ কোটি ২২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৯ টাকা। রপ্তানি ৭ কোটি ৬৭ লাখ ৪ হাজার ৩৮২ টাকা । ঘাটতি ২৭৯ কোটি ৫৫ লাখ ৩২ হাজার ৩৫৭ টাকা। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে আমদানি ১৯৩ কোটি ৩২ লাখ ৫৮ হাজার ৩১১ টাকা। রপ্তানি ২ কোটি ৩৬ লাখ ৬৮ হাজার ৩৯৫ টাকা। ঘাটতি ১৯০ কোটি ৯৫ লাখ ৮৯ হাজার ৯১৬ টাকা। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে আমদানি ১৩৬ কোটি ৮৬ লাখ ৪১ হাজার ৯১ টাকা। রপ্তানি ২ কোটি ৫৯ লাখ ৫৬ হাজার ৪২৫ টাকা। ঘাটতি ১৩৪ কোটি ২৬ লাখ ৮৪ হাজার ৬৬৬ টাকা। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে আমদানি ১২৩ কোটি ৭৮ লাখ ৫৮ হাজার ৪০২ টাকা। রপ্তানি ১ কোটি ৪ লাখ ১৩ হাজার ৪২০ টাকা । ঘাটতি ১২২ কোটি ৭৪ লাখ ৪৪ হাজার ৯৮২ টাকা। ২০০৩-০৪ অর্থবছরে আমদানি ৯২ কোটি ৫৭ লাখ ১০ হাজার ৬১০ টাকা। রপ্তানি ২ কোটি ৪১ লাখ ৮২ হাজার ৭৪২ টাকা। ঘাটতি ৯০ কোটি ১৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৬৮ টাকা। ২০০২-০৩ অর্থবছরে আমদানি ৫৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ৮৩২ টাকা। রপ্তানি ১ কোটি ৮৯ লাখ ২১ হাজার ৩৭৬ টাকা। ঘাটতি ৫৫ কোটি ৭৪ লাখ ৯৮ হাজার ৪৫৬ টাকা। ২০০১-০২ অর্থবছরে আমদানি ১৩ কোটি ৯৭ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭১ টাকা। রপ্তানি ৯৯ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬৭ টাকা। ঘাটতি ১২ কোটি ৫৭ লাখ ৬৫ হাজার ৪ টাকা। ২০০০-০১ অর্থবছরে আমদানি ৩০ কোটি ২৯ লাখ ৬০ হাজার ৮৩৪ টাকা। রপ্তানি ১৭ লাখ ৪৫ হাজার ৪৯৭ টাকা। ঘাটতি ৩০ কোটি ১২ লাখ ১৫ হাজার ৩৩৭ টাকা। ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে আমদানি ১১ কোটি ৭ লাখ ২৩ হাজার ১২০ টাকা। রপ্তানি ৪৭ লাখ ৩৯ হাজার ৩৬৫ টাকা। ঘাটতি ১০ কোটি ৫৯ লাখ ৮৩ হাজার ৭৫৫ টাকা। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে আমদানি ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৬১ হাজার ৫২৯ টাকা। রপ্তানি ৭৪ লাখ ১০ হাজার ৯৭৩ টাকা। ঘাটতি ৩ কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার ৫৫৬ টাকা। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে আমদানি ৪ কোটি ২৭ লাখ ২১ হাজার ৩১ টাকা। রপ্তানি ২ কোটি ২৭ লাখ ৪০ হাজার ৭৮০ টাকা। ঘাটতি ১ কোটি ৯৯ লাখ ৮০ হাজার ২৫১ টাকা। ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে আমদানি ৪ কোটি ২৮ লাখ ৩৫ হাজার ৮৪৪ টাকা। রপ্তানি ১ কোটি ৮১ লাখ ৯৯ হাজার ৩৮৬ টাকা। ঘাটতি ২ কোটি ৪৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪৫৮ টাকা। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে আমদানি ১ কোটি ৯৭ লাখ ৮৬ হাজার ৯১৩ টাকা। রপ্তানি ১ কোটি ৩৮ লাখ ৬৪ হাজার ৬৩৭ টাকা। ঘাটতি ৫৯ লাখ ২২ হাজার ২৭৬ টাকা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র মায়ানমারের সাথে চোরাচালান প্রতিরোধ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে সীমান্ত বাণিজ্য চালু হয়। এ বাণিজ্যে প্রথম দিকে দু’দেশের অবস্থান কাছাকাছি থাকলেও পরবর্তী বছরগুলোতে ঘাটতির পরিমাণ বাড়তে থাকে। বৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি চোরাচালান বেড়ে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্তরক্ষী বিজিবি কর্তৃক প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার চোরাইপণ্য আটক হলেও সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান থেমে নেই। এ উপজেলার চোরাকারবারিরা বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে চোরাইপণ্য আদান-প্রদান করছে। একটি সূত্র দাবি করেছে, কয়েকজন চোরাকারবারি ট্রানজিট যাত্রীদের ভাড়াটিয়া হিসেবে ব্যবহার করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পণ্য আনা-নেয়া করছে। তাছাড়া সীমান্তের কতিপয় গডফাদারের নেতৃত্বে অবৈধ হুন্ডি ও ইয়াবার রমরমা ব্যবসা চলছে। এ ইয়াবা ও হুন্ডির টাকা চোরাই পথে মায়ানমারে পাচার হচ্ছে। এসব অশুভ প্রভাবের কারণে সীমান্ত বাণিজ্যে ধস নেমেছে।

সীমান্ত বাণিজ্যের আওতায় যে সকল পণ্য আমদানি হয়, তা হলো- হিমায়িত মাছ, শুঁটকি, বিভিন্ন প্রকার কাঠ, আচার, বড়ই, সুপারি, হলুদ, মরিচ, তেঁতুল, তৈরি পোশাক, ব্যাটারি, পিভিসি পাইপ, প্রাকৃতিক গাম, সিপ্রং, মুলি বাঁশ, গোলপাতা, বেত, বিভিন্ন প্রকারের ডাল, বিচি, জিরা, ধন্যা, আদা, সেনেকা মাটি, স্যান্ডেল, ছাতা, তরমুজ, তুলা, গাম বুট, গরু-ছাগলের চামড়া, গরু, মহিষ, ছাগল ইত্যাদি। যে সব পণ্য রপ্তানি হয়, তা হচ্ছে- রড, সিমেন্ট, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি, অক্স পেনিস, এলুমিনিয়াম সামগ্রী, ময়দা, ওষুধ, চুল, ছাতা, গার্মেন্টস কাপড় ও গেঞ্জি, টিউবওয়েল সেট ইত্যাদি। এ পণ্যসমূহ বৈধ পথ বাদ দিয়ে চোরাই পথ দিয়ে আনা নেওয়া করায় ১৭ বছরে বাণিজ্য ঘাটতি বিপুল পরিমাণে দাঁড়িয়েছে। এ বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে সরকারি উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সীমান্ত ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসান জানান, বাংলাদেশী যে সব পণ্য চোরাই পথে পাচার হয়, সেগুলো যদি সরকার বৈধ পথে যাওয়ার ব্যবস্থা করে, তাহলে বাণিজ্য ঘাটতি থেকে অনেকটা বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে। এছাড়া এলসি পদ্ধতি চালু হলেই কেবল বাণিজ্য ভারসাম্য ফিরে আসতে পারে । এক্ষেত্রে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

টেকনাফ স্থল বন্দরের কাস্টমস সুপার কাজী আবুল হোসাইন বলেন, সীমান্ত বাণিজ্যে আমদানির পাশাপাশি রপ্তানি বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। বর্তমানে আগের তুলনায় রপ্তানি অনেকটা বৃদ্ধিও পেয়েছে। তবে বাণিজ্য ঘাটতি থেকে বেরিয়ে আসতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT