টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

টেকনাফ উপজেলার ৭ শতাধিক ইয়াবা পাচারকারী বেপরোয়া

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২৬ জুলাই, ২০১৩
  • ২৪০ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

401776_1015রমজানের ঈদকে টার্গেট করে সীমান্ত এলাকা উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ৭ শতাধিক ইয়াবা পাচারকারী বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। গত কয়েক বছরে এ দুই উপজেলায় অসংখ্য লোক ইয়াবা পাচারের কালো টাকায় কোটিপতি হয়ে সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের দেখাদেখি এক সময় যারা এ কাজের বিরোধীতা ও ঘৃণা করত তাদেরও উল্লেখযোগ্য একটি অংশ মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়ে নব্য কোটিপতির তকমা লাগিয়ে গাড়ী বাড়ী, শান শওকতের মালিক হতে অনৈতিক প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। ইয়াবার মত মাদকের ভয়াবহতায় এখানকার আগামী প্রজন্ম মেধাশূণ্য ও কলংকিত হতে চললেও সরকারের সংশ্লিষ্টদের মাথা ব্যাথা নেই। স্থানীয়ভাবে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি এক্ষেত্রে অনেকটা ভূমিকা রাখলেও পুলিশ সহ অন্যান্য দায়িত্বশীল সংস্থার মাদক পাচাররোধে ভূমিকা রহস্যাবৃত। এহেন অবস্থায় সীমান্ত এলাকার প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে ইয়াবা পাচারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদের দেখাদেখি অনেক নিু মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্র-যুবক-তরুণ ও মহিলাদের প্রতিযোগীতা দিয়ে মাঠে নেমে ইয়াবার কালো টাকায় রঙ্গিন স্বপ্ন বুনছে। উখিয়া ও টেকনাফে বৈধ অবৈধভাবে অবস্থানকারী প্রায় দেড় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা ইয়াবা সহ বিভিন্ন ব্রান্ডের মাদক পাচারে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। উঠতি বয়সের আগামী প্রজন্মের দায়িত্বশীলদের এ ধরনের আচরণ দেখে মধ্য ও নিুমধ্যবিত্ত পরিবারের সচেতন অভিভাবকরা তাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় জীবন অতিবাহিত করছে। পাশ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে চোরাই পথে আসা টানা মোটর সাইকেল, প্রাইভেট কার, আধুনিক মডেলের মাইক্রো বাস, জীপ সহ বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক যানবাহন ইয়াবা পাচারে নিরাপদ মাধ্যম হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। উখিয়া-টেকনাফে প্রায় সহস্রাধিক অত্যাধুনিক রেজিষ্ট্রেশন বিহীন অবৈধ মোটর সাইকেল কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক ও মেরিন ড্রাইভ রোড ব্যবহার করে ইয়াবা পাচারে জড়িত রয়েছে অসংখ্য লোক। থাইল্যান্ড থেকে মিয়ানমার, মিয়ানমার থেকে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তের অন্তত ৩৫টি পয়েন্ট দিয়ে কক্সবাজার হয়ে ভয়াবহ এ মরণ নেশাটি ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন সময় ৬৯ জন ইয়াবা পাচারকারীকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য টেকনাফ থানা পুলিশের নিকট তালিকা পৌঁছালেও ইয়াবা ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী হওয়ায় প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করছে। এসব ইয়াবা ও মাদক পাচার কাজে এদেশীয় সিন্ডিকেট ছাড়াও উগ্রপন্থী রোহিঙ্গারা কুতুপালং ও নয়াপাড়া শরনার্থী শিবিরে ইয়াবা, গাঁজা, মাদক মজুদ করে বিক্রয় করার অভিযোগ উঠেছে। উখিয়ার কুতুপালং ও টেকনাফের নয়াপাড়া শরনার্থী ক্যাম্প ভিত্তিক শতাধিক বোরকা পরিহিত রোহিঙ্গা মহিলা ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছে। সীমান্তের চেক পোষ্ট গুলোতে মহিলা পুলিশ না থাকায় পাচারকারী মহিলাদের সনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করেছেন। কক্সবাজারের সীমান্ত অঞ্চল সহ সর্বত্রে হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে যৌন উত্তেজক ইয়াবা ট্যাবলেট সহ রকমারি মাদক দ্রব্য। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে মাঝে মধ্যে ইয়াবা ও মাদকের চালান ধরা পড়লেও গডফাদারেরা রয়ে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের আর্ন্তজাতিক চোরাচালান সিন্ডিকেট এখন অস্ত্র ব্যবসার পাশাপাশি অধিক হারে মাদক ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এ সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের অধিকাংশের বাড়ী ঢাকা, যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফেনী, কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তে। মূলত তিন শতাধিক সদস্যের একাধিক সিন্ডিকেট উল্লেখিত স্থানসমূহে অবস্থান করে সীমান্ত এলাকার মাদক পাচার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের অনেকেই ইতিমধ্যে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছে। এদের অধিকাংশ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ও ব্যবসায়ীদের আশির্বাদপুষ্ট। তাদের অনুসরণ করে স্থানীয় যুব ছাত্র সমাজ রাতারাতি অগাধ কালো টাকা নামক সোনার হরিণ ধরার আশায় ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত হয়ে ধ্বংসের পথে ধাবিত হচ্ছে। টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ, কালার পাড়া, নয়াপাড়া, সাবরাং, জালিয়া পাড়া, নাইটং পাড়া, জাদিমুরা, হ্নীলা, মৌলভী বাজার, উনচিপ্রাঙ্ক, হোয়াইক্যং, উলুবনিয়া, তুলাতলী, উখিয়ার আঞ্জুমান পাড়া, পালংখালী, রহমতের বিল, ধামনখালী, বালুখালী, কাটা পাহাড়, ডেইলপাড়া, করইবনিয়া, দরগাহবিল সহ ৩৫টি পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমার থেকে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমান ইয়াবা ট্যাবলেট পাচারকারী ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাজারজাত হয়ে আসছে। শুধুমাত্র বাংলাদেশের মাদকের বাজারকে লক্ষ্য করে পাশ্ববর্তী মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে ৭টি কারখানায় কোটি কোটি পিস ইয়াবা উৎপাদন হয়ে থাকে বলে নির্ভরযোগ্য সুত্রে জানা গেছে। ইয়াবার বিশাল বাজার রয়েছে দেশের অভিজাত এলাকা, নামিদামী হোটেল ও নিষিদ্ধ পল্লীতে। দেশের বাজারে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। সাংকেতিক নামের কারণে এসব চালান ধরাও কঠিন। দেশে কমলা, লাল ও লেবু কালারের ইয়াবার প্রচলন রয়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে দেখা যায়, চলতি বছরের গত ৬ মাসে সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে ৪ লক্ষ ৬৫ হাজার পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট, ১০৬ কেজি গাঁজা, ২৫ হাজার বোতল বিদেশী মদ, ৫শ ক্যান বিদেশী বিয়ার, ১২শ লিটারের মত খোলা মদ জব্দ করেছে। তৎমধ্যে টেকনাফ ৪২ বিজিবি সদস্যরা সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ লাখ পিছ ইয়াবা, ৬৫ কেজি গাঁজা, সাড়ে বার হাজার বোতল বিদেশী মত, তিন শতাধিক ক্যান বিয়ার, সাড়ে সাতশ লিটার খোলা মদ উদ্ধার করে। এ সময় বিজিবি’র পক্ষ থেকে টেকনাফ থানায় ১০১ জন আসামী সহ ১৫৬টি মামলা করা হয়। কক্সবাজার ১৭ বিজিবি সদস্যরা উক্ত সময়ে ৩০ হাজার পিছ ইয়াবা, ১৩ কেজি গাঁজা, ৫শ লিটার খোলা মদ, র‌্যাব-৭ কর্তৃক ৩০ হাজার পিছ ইয়াবা, মাদ্রকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ২৫ হাজার পিছ ইয়াবা, ৫০ গ্রাম হিরোইন, ডিবি পুলিশ ২৮ হাজার পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে। বিগত কয়েক বছরের মধ্যে মিয়ানমার সীমান্ত তীরবর্তী কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে নিঃস্ব অনেকে কোটিপতির খাতায় নাম লিখিয়েছে। অনেক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী, রাজমিস্ত্রী, কাঠমিস্ত্রী-জোগালী, রিক্সা, অটোরিক্সা, জীপ, মাইক্রোবাস, ট্রাক চালক, বেকার যুবক, তরুণ, মাঝ বয়সী লোক, গৃহবধু মহিলা সহ অনেক জনপ্রতিনিধি, অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা ইয়াবার কালো টাকায় গাড়ী, বাড়ী, নারী ও অন্য ব্যবসার মালিক হয়েছে। গত ১৬ জুলাই ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে র‌্যাবের হাতে সাড়ে ছয় হাজার পিছ ইয়াবা সহ উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ইয়াবা পাচারকারী ৭নং ওয়ার্ড সদস্য ও উখিয়া যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক কামাল উদ্দিন, তার সহযোগী মো: ইছহাক সহ আটক হয়। চলতি বছরের মার্চে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের উখিয়ার মরিচ্যা বিজিবি চেকপোষ্টে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের দুই মহিলা সদস্য সহ তিন মহিলা বিপুল পরিমাণের ইয়াবা ট্যাবলেট সহ বিজিবির হাতে আটক হয়। ১৭ জুলাই সকালে টেকনাফ-শাহপরীরদ্বীপ সড়কে অটোরিক্সায় অভিযান চালিয়ে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের শিলবনিয়া পাড়ার আবুল হাশেমের স্ত্রী হ্যাপি আক্তার (২২), সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীরদ্বীপ জালিয়াপাড়ার ফরিদের স্ত্রী তৈয়বা খাতুন (৩১) ও আবুল হোসনের স্ত্রী আম্বিয়া খাতুন (৪৫) কে ৩০ হাজার পিছ ইয়াবা সহ টেকনাফ থানা পুলিশ আটক করলে মামলায় ১৪ হাজার পিছ ইয়াবা দেখানো হয়েছে। উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার সর্বত্র প্রায় ৭ শতাধিক লোক বিগত কয়েক বছরে ইয়াবা ব্যবসা বা পাচার করে আলাউদ্দিনের চেরাগের সন্ধান পেয়ে অবৈধ গাড়ী বাড়ি ও বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছে। উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে, রাস্তার পাশে এ ধরনের অবৈধ সম্পদের দৃশ্য চোখে পড়লেও তাদের প্রকৃত সুনির্দিষ্ট আয়ের কোন উৎস না থাকা স্বত্ত্বেও সরকারী বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝেও ইয়াবা ব্যবসা বা পাচারের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে। উল্লেখিত শ্রেণী পেশার লোকজন ছাড়াও এক শ্রেণির ধর্মীয় আলখেল্লা বা লেবাসধারী লোকজনও ইয়াবা ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কক্সবাজার জেলায় মাদকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অবস্থান গ্রহণকারী টেকনাফ ৪২ বিজিবি অধিনায়ক লে: কর্নেল জাহিদ হাসান বলেন, বিজিবি সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে যে কোন ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তৎপর রয়েছে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে উখিয়ার পালংখালী পর্যন্ত দীর্ঘ ৫৬ কিলোমিটার নাফ নদী বেষ্টিত সীমান্ত এলাকা যোগাযোগ ও অন্যান্য অব্যবস্থাপনা স্বত্ত্বেও ঝুঁকি নিয়ে বিজিবি সদস্যরা মাদক আটকের চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ধর্মীয় আলেমওলামা সহ সকলকে মাদকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার কথা থাকলেও এক শ্রেণীর অতি লোভী উল্লেখিত নেতৃবৃন্দ ইতিমধ্যে ইয়াবা পাচার সহ বিভিন্ন মাদক পাচারের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।

 

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Comments are closed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT