হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

টেকনাফবিনোদন

টেকনাফে ৭০ হাজার মানুষের ঈদের আনন্দ হয়নি

জেড করিম জিয়া, টেকনাফ। “রমজানেরই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ ” কিন্তু এ ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেনি টেকনাফ উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ। নাফনদী ও বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন বিভিন্ন গ্রামের লোকজনের মধ্যে এ নিয়ে কোনো আনন্দ উল্লাসের দেখা যায়নি। কারণ দীর্ঘ জলাবদ্ধতায় তাঁদের সেই আনন্দ জোয়ারের পানিতে ভেসে গেছে। এসব গ্রামের লোকজন প্রায় ছয় বছর ধরে জোয়ার-ভাটায় জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। ঈদের দিনও সকাল থেকে দুপুর একটা পর্যন্ত এসব এলাকার অধিকাংশ বাড়িঘর-রাস্তাঘাট হাঁটু সমান পানিতে ডুবে ছিল।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, অমাবস্যার, টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে টেকনাফ উপজেলার পৌরসভা, সদর ও সাবরাং ইউনিয়নের ২০টি গ্রামে অকালবন্যা ও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়ে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ।

সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে সিডর ও আইলার আঘাতে নাফনদী ও বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন বেড়িবাঁধে বিভিন্ন স্থানে ভাঙ্গনের ফলে প্রতিনিয়ত সংশ্লি­ষ্ট এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এর আগে নাফনদী ও বঙ্গোপসাগরে ঢলের পানি নিষ্কাশন হতো।

সরেজমিনে কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দীর্ঘ জলাবদ্ধতার কারণে ঈদেরদিনও সংশ্লিষ্ট এলাকার লোকজন অসহনীয় দুর্ভোগে সময় কাটাচ্ছে। এ সময় কথা হয় পৌর এলাকার জালিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্বাস উদ্দিন (৫৮) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আর এ বয়সত এনডিল্লা ঈদ আর ন দেখি, এ বারর ঈদ আঁরার লাই কাল অই আইসসে। কিন্তু ঈদর নমাজ পইরতে বানবাসী মানুষত দূর্ভোগত পইয্যে।” (আমার এ বয়সে এমন ঈদ আর দেখেনি। আমাদের জন্য এবারের ঈদ বিপদ হয়ে এসেছে। কিন্তু ঈদের নামাজ আদায় করতে ও সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীকে দূর্ভোগে পোহাতে হয়েছে।)

একই গ্রামের গৃহিনী রমিজা বেগম (৪২) বলেন, “ বিন্নাত তুন অইতে ঘরত জোয়ারর পানি, হেতল্লা ঘরত ছেমাইসহ কিছুই রানদি বার লাই চুলাত অইন দিত ন পারি। পোঁয়াইনদে কওর ও ছেমাইরলা কাঁন্দের, কিন্তু কওর ও ছেমাই কিনিবার লাই যে টিয়া লাগিব সেটা তো হাতে নাই ”। (সকাল থেকে ঘরে জোয়ারের পানি, ঈদের খাবার বলতে সেমাইসহ কিছুই রান্না করার জন্য চুলায় আগুন দেওয়া সম্ভব হয়নি। ঘরের ছেলে-মেয়েরা ঈদের খাবার ও কাপড়ের জন্য কান্নাকাটি করছে। কাপড় ও সেমাই কিনতে যে টাকা লাগবে, সেটা তো হাতে নাই, এটা ছেলে-মেয়েদের কোনো ভাবে বুঝাতে পারছি না।”

সদর ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া গ্রামের চাষী আজিজুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন,“কৃষিপ্রধান গ্রামের ফসলের ক্ষেতগুলোতে বুকসমান পানি জমে রয়েছে। ঘরে ফসল না উঠলে গ্রামের কৃষকরা পথে বসে যায়। তাই এ বছর নিজের পরিবারসহ প্রতিবেশীদের কেউ আপনজনদের এ ঈদে কোনো নতুন জামা-কাপড় কিনে দিতে পারেনি। ঈদের দিনও আমাদের ভাগ্যে সেমাই-চিনি জুটেনি।”

সাবরাং ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়া গ্রামের মোকতার আহমদ,কবির আহমদ, নুর আহমদসহ কয়েকজন বলেন, পশ্চিমপাড়ার ঈদগাহে চার গ্রামের মানুষ ঈদের নামাজ পড়ে আসছেন যুগ যুগ ধরে। বর্তমানে ওই স্থান পানিতে তলিয়ে যাবার পাশাপাশি অধিকাংশ বসতবাড়ি সাগরের কবল গ্রামে বিলিন হয়ে যাওয়াই এবার ৫কিলোমিটার দূরে ঈদের নামাজ পড়েছেন সড়কের ওপর। অনেকে নামাজ পড়তে আসতে পারেননি। বাড়িতে ছিল না ঈদের দিনের জন্য আলাদা কোনো খাবার। চাল সংগ্রহ করতে পারলেও রান্না করার মতো তরিতরকারি এমনকি জ্বালানি কাঠ জোগাড় করতে পারেননি।

একই গ্রামের বাসিন্দা উমর আলী, বদিউল আলম ও স্থানীয় ইউপি সদস্য নুরুল আমিনসহ অনেকে বলেন, জোয়ারে পানিতে তাদের বসতবাড়ি ধসে পড়েছে অনেক আগেই। প্রায় পাচঁ সপ্তাহ ধরে তাঁরা পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন। আশপাশের কয়েকটি গ্রাম চার-ছয় ফুট পানির নিচে থাকায় কোন মাঠই ঈদের জামাত অনুষ্ঠানের উপযোগী নেই। ওই এলাকার অনেকে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন উঁচু জায়গায় বা বেড়িবাঁধে নামাজ পড়েছেন। ঈদ উদ্যাপনের কথা চিন্তায়ও আসেনি। প্রায়ই জায়গা পানিতে তলিয়ে থাকায় নামাজ পড়ার মতো জায়গা নেই বললেই চলে। অনেকে দুঃখে ঈদের নামাজও পড়তে আসেননি।

সাবরাং ইউনিয়নের উত্তরপাড়া গ্রামের আমির হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন,“স্থানীয় এমপি, চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা আমাদের দূর্ভোগ দেখে গেছে অনেকবার। সে সময় তাঁরা বলেছিলেন, জোয়ারের পানি আসা বন্ধ হয়ে যাবে! কিন্তু গত ছয়বছর ধরে পানি এসে আমাদের সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। ”

টেকনাফ পৌরসভার মেয়র (প্যানেল-২) আব্দুল্লাহ মনির জানান, এ ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় ধনি-গরিব ও মধ্যবিত্ত সবাইকে এক কাতারে এনে দিয়েছে। জোয়ারের পানি ঈদের আনন্দ ¤¬ান করে দিয়েছে। বাঁধের পার্শ্ববর্তী স্থানের লোকজন ঘর-বাড়ি ফেলে জোয়ার-ভাটার সময় বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়ে আসছে।

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শফিক মিয়া জানান, তাঁর এলাকার ২০গ্রামের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ এখনো পানিবন্দী। লোকজন এলাকায় কোনো ফসল করতে পারেনি। জলাবদ্ধতার কারণে এলাকাগুলো কোমড় সমান পানিতে ডুবে রয়েছে। এতে করে এলাকাবাসীদের দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নিবার্হী প্রকৌশলী মাঈন উদ্দিন বলেন, “সম্প্রতি সময়ে সরেজমিনে জলাবদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করেছি। শুষ্ক মৌসুমে বেড়িবাঁধ নিমাণ করে এলাকাবাসীর দূর্ভোগ মুক্ত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করছি।

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.