হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

জাতীয়প্রচ্ছদ

জোর যার মুল্লুক তার!

প্রভাষ আমিন :: সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলছিল বেশ কয়েকদিন ধরেই। গত রোববার দুপুর থেকে শিক্ষার্থীরা পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করছিল। পদযাত্রা শেষে বিকেলে তারা শাহবাগে অবস্থান নেয়। তাদের অবস্থানের কারণে শাহবাগে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অনেক লোক একসাথে জড়ো হলে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে তারা আইন হাতে তুলে নেয়নি। বরং পুলিশকে তারা ফুল দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছিল। কিন্তু পুলিশের মনে ছিল অন্য চিন্তা।

তারা ফুল নেয়নি। তারা অপেক্ষা করছিল। সন্ধ্যার পর তারা টিয়ার গ্যাস, লাঠি আর আর্মার্ড কার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর। শান্ত, নিরীহ আন্দোলনকে অশান্ত করে তোলার দায় অবশ্যই পুলিশের। তারা কি জানে না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের লাঠি-গুলি-টিয়ার গ্যাস দিয়ে দমিয়ে রাখা যায় না। বরং যত বাধা দেবেন, ততই তারা রুখে দাড়াবে। রোববারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পুলিশী আগ্রাসন রুখে দাড়ায় শিক্ষার্থীরা। তারা যেভাবে প্রতিরোধ গড়েছে তা আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে তিন দশক আগে আমাদের যৌবনে।

এরশাদ পতনের আগে-পরে এমন অনেক ছাত্র জাগরণে মাঠে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে। আমার রক্তও টগবগ করছিল। আমি নিশ্চিত, ৩০ বছর আগে হলে, এই আন্দোলনের সামনের কাতারে থাকতাম আমিও। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন এবং শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনে সামনের কাতারে থেকে নিজের যৌবনকে মহিমান্বিত করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার।

এ আমার সারাজীবনের অর্জন। এখন যারা কোটা সংস্কারের আন্দোলনে সাহসের সাথে লড়ছেন, তারাও নিশ্চয়ই ২০ বছর পরে নিজেকে নিয়ে গৌরব করবেন। আন্দোলনের অনেক ছবি ছাপা হয়েছে বিভিন্ন মাধ্যমে। তবে একটি ছবি দেখে নিজেই অনুপ্রাণিত হয়েছি।

এখনকার তরুণরা ফেসবুকে ব্যস্ত, তারুণ্য অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছে; এমন ধারণায় প্রবল ধাক্কা দিয়েছে ছবিটি। পেছনে ধোঁয়ায় অন্ধকার। একটি ছেলে এক হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছে শত শত পুলিশের সামনে। যে কোনো আন্দোলনে সাহস জোগানোর চিরকালীন ছবি হয়ে থাকবে এটি। ছবিটি যতবার দেখেছি, ততবার ভেবেছি, ইশ আমি কেন সেখানে থাকতে পারলাম না।

কোটা সংস্কারের আন্দোলনটি যৌক্তিক না অযৌক্তিক সেটা নিয়ে পরে আলোচনা করছি। কারো কাছে যৌক্তিক মনে হবে, কারো কাছে অযৌক্তিক। এটা সব আন্দোলনের ক্ষেত্রেই সত্যি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনও তো কারো কারো কাছে অযৌক্তিক মনে হয়েছে। তবে যৌক্তিক হোক আর অযৌক্তিক; আন্দোলন করার অধিকার সবারই আছে।

শিক্ষার্থীদেরও অধিকার আছে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করার। পাশ করার পর চাকরির বাজারে গিয়ে ধাক্কা খাওয়া তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় কোটা সংস্কারের আন্দোলনটি শতভাগ যৌক্তিক।

চাকরির বাজারে গিয়ে আপনি যখন দেখবেন, আপনার চেয়ে পিছিয়ে থাকা কেউ কোটা সুবিধার কারণে আপনাকে পাশ কাটিয়ে কাঙ্খিত চাকরিটি পেয়ে যাচ্ছে; অবশ্যই আপনি ক্ষুব্ধ হবেন, আপনার মধ্যে বঞ্চনার বোধ তৈরি হবে। সাদা চোখে দেখলে, সবাই সমান। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে মুক্তবাজার অর্থনীতির এই সময়ে সবার জন্য সমান অধিকার। কোনো বৈষম্য থাকবে না, কোনো কোটা থাকবে না। উন্মুক্ত বাজারে যে যোগ্য সেই টিকে থাকবে, সেই চাকরি পাবে। শুনতে খুব ভালো শোনায়।

মনে হয়, এরচেয়ে যৌক্তিক আন্দোলন আর হতে পারে না। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের মনে যাই থাক, তারা অবশ্য কোটা সংস্কারের দাবি করছেন। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে মোট ৫৫ শতাংশ কোটা আছে। আন্দোলনকারীদের দাবি কোটা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার। আমি আগেই বলেছি, ৩০ বছর আগে হলে আমি অবশ্যই এই আন্দোলনের সামনের কাতারেই থাকতাম। পড়াশোনা শেষ করেও চাকরি না পাওয়ার হতাশা, বেশি নাম্বার পাওয়ার পরও চাকরি না পাওয়ার বঞ্চনা নিশ্চয়ই আমাকে মাঠে নামিয়ে আনতো। ২৫ বছর পড়াশোনা শেষে যখন গোটা পরিবার সন্তানের চাকরির জন্য পথ চেয়ে বসে থাকে, তখন এই বঞ্চনা নিয়ে ঘরে বসে থাকা সত্যি কঠিন।

তাই তাদের অবস্থান বিবেচনায় এই আন্দোলনকে আমার কাছে শতভাগ যৌক্তিকই মনে হয়েছে। কিন্তু ২৫ বছর বয়সী একটি ছেলের আবেগ, বিবেচনা আর ৫০ বছর বয়সী মানুষের বিবেচনা নিশ্চয়ই এক হবে না। পরিণত বয়সের বন্ধুদেরও যখন দেখি কোটা সংস্কারের নামে আসলে প্রায় কোটা বাতিলের (৫৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি আসলে বাতিলের দাবিরই নামান্তর) দাবির সাথে একাত্মতা পোষণ করছেন; বুঝতে পারি আমাদের বিবেচনায় বড় ঘাটতি আছে।

আবার অনেকে যখন ঢালাওভাবে কোটা সংস্কারের আন্দোলনকারীদের স্বাধীনতা বিরোধী জামাত-শিবির বলে উড়িয়ে দিতে চান, তখনও বুঝি আমাদের বিবেচনায় বড় ঘাটতি আছে। একটি মহল সুকৌশলে কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। চাকরিবঞ্চিত তরুণ প্রজন্মের মনে সুকৌশলে মুক্তিযুদ্ধবিদ্বেষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম ব্যক্তিগত বঞ্চনা ও ক্ষোভ থেকে বুঝে না বুঝে সেই ফাঁদে পা দিচ্ছে।

রাজপথে স্লোগান উঠছে মুৃক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে। কিন্তু আমি জানি, আন্দোলনকারীদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের। ছাত্রলীগ, বাম সংগঠনের অনেকেও আছেন এই আন্দোলনের সাথে। ২০১৩ সালের আন্দোলনের সময় ঠেকাতে মাঠে ছিলেন, ছাত্রলীগের এমন অনেকে এবার আন্দোলনের সামনের কাতারে। বিভিন্ন হল শাখার ছাত্রলীগ নেতারা পদত্যাগ করে আন্দোলনে সামিল হয়েছেন বলেও শুনেছি। তাই তাদেরকে ঢালাও স্বাধীনতা বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা অন্যায়।

এভাবে আসলে তাদেরকে ঢেলে দেয়া হবে। তাদের দরদ দিয়ে বোঝাতে হবে, পুলিশ দিয়ে নয়। আন্দোলনকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় আন্দোলনকে যৌক্তিক মনে হলেও, আমি এখনও বিশ্বাস করি বাংলাদেশের মত বৈষম্যপূর্ণ সমাজে কোটা ব্যবস্থার দরকার আছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী কোটা বাতিলের ঘোষণার পরও আমি বিশ্বাস করি একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে কোটা পদ্ধতি অপরিহার্য।

আমি আগেও লিখেছি, কোটা বৈষম্য সৃষ্টি করতে নয়, বৈষম্য দূর করতে করা হয়েছে। কোটাবিহীন একটি সমাজের স্বপ্ন আমরা দেখি। কিন্তু সেই সমাজ এখনও আসেনি, আসলেও অনেক সময় লাগবে। যতদিন না আসবে ততদিন কোটা ব্যবস্থা থাকতেই হবে। কোটাবিহীন সমাজ হয় চরম সভ্য, নয় প্রাক সভ্য। মেধা যার, চাকরি তার হলো জোর যার, মুল্লুক তার’ এর আধুনিক সংস্করণ। কোনো আধুনিক, কল্যাণ রাষ্ট্র কোটামুক্ত হতে পারে না।

কোটা না থাকলে বৈষম্য প্রকট হবে। বৈষম্য দূর করতেই যৌক্তিক কোটা থাকতে হবে। রাষ্ট্র সমান অধিকারের কথা বলবে না, রাষ্ট্র ন্যায্য অধিকারের কথা বলবে। যদি সমান অধিকারের কথাই বলা হয়, তাহলে সমাজের অগ্রসর অংশ, সবসময়ই এগিয়ে থাকবে। পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠি কখনোই অগ্রসর অংশকে কখনোই ধরতে পারবে না। রাষ্ট্র তো সবাইকে ১০ টাকা দেবে না। যার এক টাকা লাগবে তাকে এক টাকা দেবে; যার ১৮ টাকা লাগবে তাকে ১৮ টাকাই দেবে।

সমাজের অনগ্রসর ও বঞ্চিত অংশকে ন্যায্য অধিকার দিতেই কোটা ব্যবস্থার প্রচলন। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর ধরে নিচ্ছি কাল থেকে আর কোটা থাকবে না। চমৎকার, মুক্ত বাংলাদেশ। নিশ্চয়ই সবাই খুশি এবার। কিন্তু একবার ভেবে দেখুন, কোটা না থাকলে ঢাকার ২০টি সেরা স্কুলের ছাত্ররাই পাবে ৯০ ভাগ চাকরি।

দিনাজপুরের প্রান্তিক কৃষকের ছেলেমেয়েরা বা রাঙামাটির প্রকৃতির সন্তানেরা কিন্তু তাদের সাথে লড়াইয়ে টিকতে পারবে না। সারাদেশে, সব মানুষের মধ্যে সমভাবে চাকরি সুবিধা বন্টন করার সুযোগটি আর থাকলো না। বারবার বলা হয়, কোটার মাধ্যমে প্রশাসনকে মেধা শূন্য করা হচ্ছে। কিন্তু এটা খুব ভুল। কোটা পেতে হলেও সবাইকে লিখিত পরীক্ষায় উতরাতে হয়। কোটা না থাকলে এখন ঢাকাকেন্দ্রিক মাথামোটা ‘মেধাবী’ প্রশাসন গড়ে উঠবে।

কোটা সংস্কারের আন্দোলনটি দেখেশুনে একে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। আন্দোলনকারীদের দাবি শুনে মনে হচ্ছিল, তাদের ভাগ্য আটকে রেখেছে মুক্তিযোদ্ধারাই। এ আন্দোলনে মুক্তিযোদ্ধাদের এমন ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে, এমন ভাষায় তাদের নিয়ে স্লোগান দেয়া হয়েছে; যা ছাপার অযোগ্য।

জীবন বাজি রেখে যারা দেশকে স্বাধীন করেছে, এভাবেই আমরা তাদের প্রতিদান দিচ্ছি। আন্দোলনকারীদের কথা শুনে মনে হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা এ দেশের মানুষ নয়, তাদের চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা নেই, অধিকার নেই। কোটার কারণে যেন একদম অযোগ্য কাউকে চাকরি দিয়ে দেয়া হচ্ছে। প্রিলিমিনারি এবং লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যারা ভাইবার পর্যায়ে যান, তারা কিন্তু সবাই কাছাকাছি মানের মেধাবী, যে কেউ চাকরি পেতে পারেন।

সে পর্যন্ত যাওয়ার পরই কিন্তু কোটা প্রয়োগ করা হয়। তাই কোটা থাকলেই দেশ মেধাশূন্য হয়ে যাবে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা সব চাকরি নিয়ে নিচ্ছে; এমন প্রচারণা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এখন আর ৩০ শতাংশ কোটায় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা নাতিদের পাওয়া যায় না। যত জন পাওয়া যাবে, তারা চাকরি পাবে। বাকি আসনগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে পূরণ করা হবে। এই সিদ্ধান্ত তো হয়েই গেছে।

যাক, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর এখন নিশ্চয়ই সবাই খুশি। আমি নিশ্চিত, প্রধানমন্ত্রী অন্য সব কোটা রেখে খালি মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করলেই আন্দোলনকারীরা চুপ করে যেতো। আসল লক্ষ্য সেটাই। যেন মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করে অন্যায় করেছে। তাদের সন্তানদের কোটার দরকার নেই। ৭৫এর পর ২১ বছর তারা বঞ্চিত ছিল। আবারও বঞ্চিত থাকবে। কিন্তু মেধার জোরে যখন একজন যুদ্ধাপরাধীর সন্তান, স্বাধীনতা বিরোধী চেতনার ছেলে চাকরি পাবে, চৌকস আমলা হবে; দেশটা কিন্তু তার মতই চালাবে। ভুলে যাবেন না, গোলাম আযমের ছেলেও কিন্তু মেধাবী। মুক্তিযোদ্ধা কোটা শুধু যে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দেয়ার জন্য করা, তা নয়।

সরকারি প্রশাসনে যাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দেশপ্রেমিক মানুষ বেশি করে আসতে পারে, সে জন্যও কোটা দরকার। দেশবিরোধী একটি ছেলে মেধাবী হলেই কি আমি তাকে সচিব হওয়ার সুযোগ দিয়ে দেবো? রাজপথ দখল করে, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের বাজে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো আবারও। অনেকবারই আমরা দেখেছি, সংগঠিত শক্তি গায়ের জোরে অন্যায় দাবিও আদায় করে নেয়। আমি নিশ্চিত কোটা নিয়ে গণভোট হলে ৯৫ ভাগ মানুষ কোটার বিপক্ষে ভোট দেবে।

কিন্তু সংখ্যগরিষ্ঠতাই আপনার দাবির যৌক্তিকতা প্রমাণ করে না। রাষ্ট্রকে তারুণ্যের আবেগের সাথে পাল্লা দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে চলে না। রাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে নয়, ন্যায্যতা দিয়ে দাবির যৌক্তিকতা নির্ধারণ করবে। রাষ্ট্র যৌক্তিকভাবে অনগ্রসর, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াবে; দাঁড়াতেই হবে। কিছু অবুঝ ছেলে নিছক ব্যক্তিগত লাভালাভের স্বার্থে আন্দোলন করলেই তা মেনে নিতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।

প্রভাষ আমিনসাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান : এটিএন নিউজ।
probhash2000@gmail.com

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.