হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

প্রচ্ছদস্বাস্থ্য

চিকিৎসকদের দরজায় তালা অনেকে মশগুল আড্ডায়

টেকনাফ নিউজ ডেস্ক:: সকাল ৯টা। বৃষ্টি ঝরছে। এই বৈরী আবহাওয়ায়ও শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের আউটডোরে রোগীর প্রচণ্ড ভিড়। পাশের জেলাগুলো থেকেও রোগীরা এসেছে। টিকিট কেটে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসকের দেখা পেতে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘ লাইনে। কিন্তু চিকিৎসকের চেম্বারের দরজায় ঝুলছে তালা।

মর্জিনা বিবির বয়স ৬০-এর ওপরে। চোখে কম দেখেন। এখন রাতদিন চোখ দিয়ে পানি পড়ে। বহির্বিভাগের চেয়ারে শুয়ে তিনি জানতে চাইলেন ‘বাবা, ডাক্তার কি আসপি না। হামি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থেকে আচ্চি বারে। একুন ডাক্তার দেকাপার না পারলে বাঁচমুই না। ’

ঘড়ির কাঁটায় ১০টা। দু-একজন চিকিৎসক এসে তাঁদের নেমপ্লেট লাগানো চেম্বারে বসতে শুরু করেছেন। পর্দা সরিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখা গেল সহকর্মীদের সঙ্গে খোশগল্পে মশগুল তাঁরা। বুঝতেই পারছেন না বাইরে রোগীরা অধীর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।৯টা থেকে বহির্বিভাগের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মাগফুর মো. তালেবুল ফেরদৌসের কক্ষের দরজা খোলা। ভেতরে লাইট জ্বালানো। ফ্যানও ঘুরছে। হঠাৎ করে দেখলে মনে হবে ডাক্তার সাহেব আশপাশেই আছেন। কিন্তু সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তিনি অফিসেই আসেননি। বাইরে লম্বা লাইন দেওয়া রোগীরা বুঝতে পারছে না ডাক্তার আছেন, না নেই। শাজাহানপুর থেকে আসা আইয়ুব আলী নামের এক রোগী বললেন, ‘পিয়ন এসে চেম্বার খোলার পর থেকে অপেক্ষায় আছি। ডাক্তারের দেখা নেই। ’ এই কথোপকথনের মধ্যেই ঝড়ের গতিতে ঢুকলেন তরুণ চিকিৎসক তালেবুল। পেছন পেছন একগাদা কাগজে সই করানোর জন্য ঢুকলেন হাসপাতালের একজন কর্মচারী। আরো আধাঘণ্টা পর ১১টায় প্রথম রোগীর ডাক পড়ল। এক রোগীর জন্য সময় দুই মিনিট।

ডা. মাগফুর মো. তালেবুল ফেরদৌস বললেন, ‘৯টায় ডিউটি ঠিক আছে। কিন্তু রাস্তায় জ্যাম ও বৃষ্টি। এ কারণে দেরি। এটি এমন কোনো বিষয় নয়। ’

শনিবার কর্মদিবসের শুরু সকাল ৯টা থেকে ২টা পর্যন্ত সরেজমিন ঘুরে দেখা হয় উত্তরবঙ্গের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বহির্বিভাগ।

দেখা গেল ঈদের আমেজ এখনো চলমান সেখানে। সব কিছুই ঢিলেঢালা। এ কারণে রোগীর প্রচণ্ড চাপ থাকলেও চিকিৎসকের উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। অভিযোগ পাওয়া গেছে, এখনো বেশ কয়েকজন চিকিৎসক কর্মস্থলে যোগ দেননি। হাসপাতালের একজন চিকিৎসক এ প্রতিবেদককে জানান, সাধারণত খুব সিরিয়াস না হলে ঈদের পরপরই তেমন একটা রোগী আসে না। তারা হয়তো ধরেই নিয়েছে, ঈদের পরপরই ডাক্তার পাওয়া যাবে না। চিকিৎসকরাও এই সুযোগটা নেন।

শনিবারও ছুটিতে ছিলেন বগুড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মাসুদ আহসান। উপপরিচালক ডা. রেজাউল আলম জুয়েল জানান, বহির্বিভাগে সব চিকিৎসকই থাকার কথা। কারা নেই সেটি জানতে হবে। আর সহকারী পরিচালক ডা. কামরুল আহসান জানান, সবাই ছিলেন। সেবাও দেওয়া হয়েছে। তবে কক্ষে তালা ঝুলতে দেখা এমন বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের নাম জানালে তাঁরা কেন অনুপস্থিত সেই বিষয়টি তিনি রেজিস্টার দেখে বলতে পারবেন বলে জানান।

চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও ফ্যাকো সার্জন ডা. শাহীন সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চেম্বারে বসেননি। পরে জানা যায় তিনি ওয়ার্ডে রাউন্ডে আছেন। তালা ঝুলতে দেখা যায় সার্জারি বিশেষজ্ঞ  ডা. বেলাল উদ্দিন আকন্দ, কিডনি-মলমূত্র ও পুরুষাঙ্গ বিশেষজ্ঞ ডা. এম এ বাতেন, গাইনি অ্যান্ড অবস ডা. নিভা রানী দাস, নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ ডা. শফিউল আলম, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. জাহাঙ্গীর আলম, মেডিসিন অফিসার ডা. মামুনুর রেজা, সহকারী অধ্যাপক ও লিভার মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সাদেকুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার এবং চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সুদর্শন কুমার তালুকদারের চেম্বারে। এ ছাড়া বাইরে রোগীর প্রচণ্ড ভিড় রেখে ভেতরে যাঁরা আলাপে মশগুল ছিলেন, তাঁদের মধ্যে আছেন চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মতিয়ার রহমান মতিন, ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এস এম আতিকুল ইসলাম ও মেডিসিন অফিসার ডা. এম এ নোমান। আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার শারমিন জাহান খানের চেম্বারের সামনে দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা গৃহবধূ তাসলিমা আক্তার মৌ বলেন, ‘এগুলো ফাজলামি ছাড়া আর কিছুই না। বাইরে রোগীর দীর্ঘ লাইন। চিকিৎসক তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে ব্যস্ত। যেন আমাদের সময়ের কোনো মূল্যই নেই। ’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বগুড়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, গতকাল শনিবার পর্যন্ত অনেক চিকিৎসক কর্মস্থলে যোগ দেননি। এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য চেয়ে হাসপাতাল প্রশাসনের পদধারী বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

শজিমেক বহির্বিভাগের ফটকে চার-পাঁচজন সিকিউরিটি পাহারায় ছিলেন। দেখা গেল অল্প দূরে জটলা করে রয়েছেন বিভিন্ন ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিরা। বোঝা গেল তাঁদের উদ্দেশ্য চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা নয়, বরং বহির্বিভাগের চিকিৎসকরা কী ওষুধ লিখে দিচ্ছেন সেটি চেক করা। তাঁরা দেখছেন চিকিৎসকের দেওয়া ব্যবস্থাপত্রে নিজ কম্পানির ওষুধের নাম লেখা হয়েছে কি না। রোগীর প্রেসক্রিপশন কেড়ে নিয়ে ছবি তোলেন কেউ কেউ। ভাঙা পা নিয়ে এক্স-রে কক্ষে গিয়ে সেবা না পেয়ে ফিরে আসেন মহাস্থান থেকে আসা নাসির উদ্দিন। পরে তিনি দালালদের সহায়তায় ৪০০ টাকা দিয়ে হাসপাতালের বাইরে থেকে এক্স-রে করিয়ে নেন। এক্স-রে রুমে গিয়ে দেখা গেল সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুপুর ১টা পর্যন্ত আসেননি। রনি নামের একজন সহকারী ১০০ থেকে ২০০ টাকা নিয়ে এক্স-রে করাচ্ছেন। তবে সেটিও ঠিকভাবে না হওয়ায় রোগীরা বাইরে দালালদের দ্বারস্থ হচ্ছে।

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.