হটলাইন

01787-652629

E-mail: teknafnews@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদ

জাতীয়প্রচ্ছদ

গণিতে বড় ধাক্কা

টেকনাফ নিউজ ডেস্ক **

মাধ্যমিকে বেড়েছে পাসের হার, তবু কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে অনেক শিক্ষার্থীরই মন ভালো নেই। গণিতের ‘কঠিন প্রশ্নে’ ধরাশায়ী হতে হয়েছে এবার তাদের। সবচেয়ে নাজুক অবস্থা মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখার ছাত্রছাত্রীদের। অঙ্ক মেলাতে না পারায় এ দুই শাখার শিক্ষার্থীদের ফেলের হার সবচেয়ে বেশি। সার্বিক পাসের হার এবং জিপিএপ্রাপ্তিতেও এর ধাক্কা লেগেছে।

এ বছর ফলের দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা সিলেট শিক্ষা বোর্ডের প্রায় ২৫ শতাংশ পরীক্ষার্থীই ফেল করেছে গণিতে। একই বিষয়ে ফেল করেছে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ১৯ ভাগ, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ১৫ ভাগ, চট্টগ্রাম বোর্ডের ১৪ ভাগ ও দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের ১৩ ভাগ ছাত্রছাত্রী। এসব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা বলছেন, গণিতের প্রশ্ন পদ্ধতি সৃজনশীল হওয়ায় সারাদেশে এ বিষয়ে ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর মতো উপযুক্ত ও দক্ষ শিক্ষকের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এর সঙ্গে জিপিএ নির্ধারণে চতুর্থ বিষয়ের নম্বর যোগ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের অনেকেই কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে ব্যর্থ হয়েছে।

দেখা গেছে, গতবারের চেয়ে মাধ্যমিকে এবার পাসের হার সাড়ে চার শতাংশ বাড়লেও সর্বোচ্চ ফল জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে ধস নেমেছে। সারাদেশের জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী কমেছে পাঁচ হাজার ৩৫ জন। ছয় বছরের মধ্যে এবারই প্রথম আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের জিপিএ ৫ প্রাপ্তি লাখের নিচে নেমে এসেছে। কেবল ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেই গত বছরের চেয়ে এ বছর জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী কমেছে ১১ হাজার ৮৯৮ জন।

মাধ্যমিকে এবার সারাদেশে ফেল করেছে তিন লাখ ৭৮ হাজার ৬৫০ জন। বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করার মূল কারণ, গণিতের ফল খারাপ। মাধ্যমিকের চৌকাঠ পেরোতে না পারা এসব কিশোর-কিশোরীর মধ্যে প্রায় দুই লাখই মানবিক বিভাগের। প্রতিটি বোর্ডেই গণিতে ফল খারাপ করেছে মূলত মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার ছাত্রছাত্রীরা যথাক্রমে ৯৪.৭২ ও ৮৩.০৩ ভাগ পাস করলেও মানবিকে তা মাত্র ৭৪.৩২ ভাগ। এর ফলে মানবিক বিভাগের ফল বিপর্যয় ঘটেছে। যার ধাক্কা লেগেছে সার্বিক পাসের হারে। এ বছর মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য ছাত্রছাত্রীরা কড়াকড়ির কারণে বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। এ রকম ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখ। পর্যবেক্ষকদের মতে, এরা কোনোভাবে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারলে অকৃতকার্যের হার আরও বাড়ত।

শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা বলছেন, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগই গ্রামাঞ্চলের। শহরাঞ্চলে বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থী বেশি। তৃণমূল পর্যায়ে যোগ্য শিক্ষকের সংকট রয়েছে। তাই আগামীতে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে আরও বেশি যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। তারা বলছেন, তা না হলে শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলের মধ্যে শিক্ষার বৈষম্য বাড়তেই থাকবে। ফল বিশ্নেষণে দেখা গেছে, এবার সাধারণ আটটি শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরিতে পাসের হার গতবারের চেয়ে চার দশমিক ৪৩ ভাগ বেড়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে গণিতের ফল ভালো হওয়ায় সেখানে এবার পাসের হার বেড়েছে ১২.১৪ শতাংশ।

বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা বলেন, ইংরেজির প্রশ্ন ‘ভালো’ হওয়ায় সারাদেশেই এবার এ বিষয়ের ফল ইতিবাচক হয়েছে। বোর্ড চেয়ারম্যানরাও এ কথার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। সব বোর্ডেই এবার ইংরেজিতে পাসের হার ৯০ শতাংশের বেশি। পাসের হারে দেশের শীর্ষে থাকা রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে এ বিষয়ে পাসের হার তাক লাগানোর মতো- ৯৮ দশমিক ১৬ ভাগ। একইভাবে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৯৭ দশমিক ৩৫ ভাগ ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে তা ৯৬ দশমিক ৯৩ ভাগ। রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান এবং আইসিটি বিষয়েও পাসের হার ৯০ শতাংশের কমবেশি।

এবারের ফলে সারাদেশে জয়জয়কার মেয়েদের। পাসের হার ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তি, দু’দিকে তারাই সেরা। অবশ্য পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার দিক থেকে ছেলেরা এগিয়ে আছে। পাসের হারে সব বোর্ডের শীর্ষে রাজশাহী, সবচেয়ে পিছিয়ে সিলেট। জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে ঢাকা বোর্ডই সেরা।

এবারের মাধ্যমিকের ফল প্রসঙ্গে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক সমকালকে বলেন, তাদের বোর্ডে পাসের হার ও জিপিএ ৫ সামান্য কমলেও সার্বিক ফল ভালো। গণিতে সর্বাধিক ১৪ দশমিক ৭৯ ভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। এর মধ্যে মানবিকের শিক্ষার্থীই বেশি। অন্যান্য বোর্ডের মতো ঢাকা বোর্ডেও একই অনুপাতে গণিতে ফেল করা সম্পর্কে তিনি বলেন, ঢাকা মহানগরের শিক্ষার্থীরা খারাপ করেনি। তবে এ বোর্ডের অধীন অন্যান্য জেলার প্রান্তিক জনপদে গণিতের ফল খারাপ হয়েছে।

বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস সমকালকে বলেন, তাদের পাসের হার ও জিপিএ ৫ দুটোই বেড়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এখানে শিক্ষার গুণগত মান বেড়েছে। এ বোর্ডে সর্বাধিক ১৮ দশমিক ৩৬ ভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে গণিতে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গণিতে প্রশ্ন কঠিন হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। দ্বিতীয় সর্বাধিক ৬ দশমিক ৭৬ ভাগ ফেল করেছে ইংরেজিতে। অন্যান্য বিষয়ের ফল স্বাভাবিক বলে জানান তিনি।

সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কবির আহমদ সমকালকে বলেন, তাদের বোর্ডে গণিতে সর্বাধিক ২৪ দশমিক ৭২ ভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। তার দাবি, গণিতের প্রশ্ন এ বোর্ডে কঠিন হয়েছে। তিনি বলেন, সিলেটে মানবিকের শিক্ষার্থী সবচেয়ে বেশি। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এক লাখ ১৩ হাজার ১৭১ শিক্ষার্থীর মধ্যে মানবিকের ৭৯ হাজার ২১৫ জন। তাদের মধ্যে ৬৩ দশমিক শূন্য ৫ ভাগ শিক্ষার্থী গণিতে ফেল করেছে। এর প্রভাব বোর্ডের সামগ্রিক ফলের ওপর পড়েছে। তিনি বলেন, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী যদি মানবিকের অর্ধেকও হতো, তাহলে এত ফেল হতো না।

চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহেদা ইসলাম সমকালকে বলেন, তাদের পাসের হার বাড়লেও জিপিএ ৫ কিছুটা কমেছে। এ বোর্ডেও গণিতে সর্বাধিক ১৩ দশমিক ৫৭ ভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণিতের প্রশ্ন কিছুটা কঠিন ছিল বলে মনে হয়েছে। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে খুব একটা সমস্যা না হলেও এর প্রভাব মানবিকের শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ে। এ ছাড়া সারাদেশে, বিশেষত পাহাড়ি জেলাগুলোতে, গণিতে দক্ষ শিক্ষকেরও অভাব রয়েছে। প্রশিক্ষিত শিক্ষক বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তোফাজ্জুর রহমান সমকালকে বলেন, এ বোর্ডে পাসের হার গতবারের চেয়ে বেশি হলেও জিপিএ ৫ কমেছে। সবচেয়ে বেশি ১২ দশমিক ৬১ ভাগ অকৃতকার্য হয়েছে গণিতে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জানিয়েছেন, গণিতের প্রশ্ন এবার তুলনামূলক কঠিন হয়েছে। অন্যদিকে গণিতে গ্রাম পর্যায়ে সৃজনশীলে প্রশিক্ষিত দক্ষ শিক্ষক এখনও নেই। গণিতে খারাপ ফল হওয়ার এটি একটি স্থায়ী কারণ বলে জানান তিনি।

Leave a Response

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.