টেকনাফ নিউজ:
বিশ্বব্যাপী সংবাদ প্রবাহ... সবার আগে টেকনাফের সব সংবাদ পেতে টেকনাফ নিউজের সাথে থাকুন!

কোটিপতি কাজের বুয়া

Reporter Name
  • সংবাদ প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১২
  • ২৮১ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

টেকনাফ নিউজ ডটকম…নাম তার শিউলি চুন্নি। তবে এটিই তার একমাত্র নাম নয়। কখনও হোসনা, কখনও ফারজানা আবার কখনও লাকী নামে ছদ্মনাম ধারণ করে সে। রাজধানীতে তার পরিচয় গৃহকর্মী। কাজের বুয়ার ছদ্মাবরণে সে একের পর এক চুরির ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। অভিনব কৌশলে ভুয়া নাম ঠিকানা ব্যবহার করে শিউলি কাজ নেয় ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বাসায়। কাজ নেয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই সে নগদ টাকা-পয়সা, স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে চম্পট দেয় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে। এভাবেই সে এখন কোটিপতি। গত ৭-৮ বছরে শিউলি প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার স্বর্ণালঙ্কার চুরি করেছে। পুলিশ, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী- সব ধরনের লোকের বাসায় তিনি চুরির ঘটনা ঘটিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে রয়েছে ৪০ থেকে ৪২টি মামলা। চুরির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এর আগে বেশ কয়েকবার জেল খেটেছে। জামিনে বের হয়ে আবারও নেমে পড়ে পুরানো পেশায়। তার রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। প্রতি মাসে ২-৩ বার গাইবান্ধা থেকে ঢাকায় আসে। সেখানে রয়েছে তার সুরম্য বাড়ি। এলাকাবাসী জানে- সে ঢাকায় একটি বিদেশী এনজিওতে চাকরি করে। তার বাসায় রয়েছে ৩ জন কাজের বুয়া। ভাইবোন আত্মীয়-স্বজন এবং স্বামী-সংসার দেখাশুনার দায়িত্ব তার। বিয়ে করেছেন ৪টি। চুরির টাকায় ৩ ভাই-বোনকে বিদেশ পাঠিয়েছেন। ৩৮ বছর বয়সী শিউলির সব স্বামীই বয়সের দিক দিয়ে তার চেয়ে ছোট। তালাক দেয়ার পরও স্বামীর সঙ্গে রয়েছে সব ধরনের সম্পর্ক। সাবেক স্বামীর উদ্দেশ্য- চুরির টাকায় লাভবান হওয়া। রূপনগর থানার একটি চুরির মামলায় রিমান্ডে থাকা অবস্থায় শিউলি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) এসব তথ্য জানিয়েছে। গত ১১ই জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংঘবদ্ধ চক্রের আরও ৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। এরা হলো- শাহীন (২৭), সুজন কুন্ডু ( ২৮) ও মুক্তারুজ্জামান (৩২)। এদের কাছ থেকে ৪০ ভরি চোরাই স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার বেলা ১২টার দিকে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে তাদের সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়।
শিউলি জানায়, মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, রূপনগর এবং শাহ আলীসহ বিভিন্ন এলাকায় শিউলি বেশ কয়েকটি চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে। কাজে যোগ দেয়ার কৌশল সম্পর্কে শিউলি জানায়, প্রথমে বাড়ি টার্গেট করে দারোয়ানের সঙ্গে কথা বলি। কাজের লোকের দরকার হলে তার মোবাইল ফোন নম্বর নিয়ে আসি। কথা বলতে বলতে তার দারোয়ানের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলি। পরে মাধ্যমে ওই বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে চাকরি নিই। সুযোগ বুঝে স্বর্ণ, টাকা-পয়সা নিয়ে পালিয়ে যাই। প্রায় ২৫-৩০টি বাড়িতে চুরি করেছি। চোরাইকৃত স্বর্ণালঙ্কার শাহআলী থানার মুক্তিযোদ্ধা সুপার মার্কেটসহ মিরপুর এলাকার বিভিন্ন মার্কেটের জুয়েলারি দোকানে বিক্রি করি। আমি অশিক্ষিত হওয়ায় দোকানদাররা আমাকে মাপে ও দামে অনেক ঠকায়। ১০ ভরি স্বর্ণ হলে বলে ৪ ভরি হয়েছে। ৫০ হাজার টাকার স্বর্ণের দাম দেয় ১৫-২০ হাজার টাকা করে।
ডিবির এডিসি মসিউর রহমান জানান, মূল্যমান সামগ্রী ছাড়াও গত কয়েক বছরে শিউলি প্রায় ৭০০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার চুরি করেছে। চুরি করেছে লাখ লাখ টাকা। বাসাবাড়ির দারোয়ানদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে সে দীর্ঘদিন ধরে এ কাজ করে আসছে। সর্বশেষ গত ৭ই আগস্ট আমেরিকা প্রবাসী জাহাঙ্গীর আলমের রূপনগরের বাসা থেকে ৪টি করে নেকলেস, কানের দুল, টিকলি, মানতাসা, বালা ও টায়রা এবং নগদ ২ লাখ ২০ হাজার টাকা চুরি করে পালিয়ে যায়। চোরাইকৃত মালামাল ও টাকা-পয়সার অর্ধেক ভাগ দেয়া হয় তার সাবেক স্বামী তারিফ আলীকে। গত ১৩ই জুলাই সে ২০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার মিরপুর শাহআলী থানাধীন মুক্তিযোদ্ধা সুপার মার্কেটের আল হারুন জুয়েলার্সে বিক্রি করে। প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নেয় মাত্র ১৫ হাজার টাকা করে। তিনি জানান, কেবল শিউলিই নয়। এ ধরনের বেশ কয়েকটি চক্র রাজধানীতে সক্রিয়। তাদের ধরতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি জানান, এসব চক্রের অন্যতম প্রধান হলো- মাফিয়া চুন্নি। বাসাবাড়িতে চুরি ছাড়াও মাদক ব্যবসাসহ নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে সে জড়িত। তাকেও পুলিশ খুঁজছে। তিনি বলেন, বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী নিয়োগের সময় সবার উচিত গৃহকর্মীর ছবি, মোবাইল নম্বর (যদি থাকে) অথবা নিকট আত্মীয়ের মোবাইল নম্বর সংরক্ষণ করা।
গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার তৌহিদুল ইসলাম জানান, চুন্নি শিউলি প্রথমে বাবা-মায়ের পছন্দে বিয়ে করে। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় দ্বিতীয় স্বামী তারিফকে বিয়ে করে। তারিফের কুপরামর্শেই সে এ ধরনের কাজে লিপ্ত হয়। বিভিন্ন বাসা থেকে চোরাইকৃত মালামাল সে তারিফের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়। তারিফের পরিবারের সদ্যদের চাপে শিউলি তাকে তালাক দিয়ে তৃতীয় স্বামী ড্রাইভার রুবেলকে বিয়ে করে গোবিন্দগঞ্জে বসবাস শুরু করে। কিন্তু বিয়ের পরও তালাককৃত স্বামী তারিফের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রাখে। ঢাকায় এসে তারিফের যোগসাজশে বুয়ার আড়ালে চুরির কাজ চালিয়ে যায়। তিনি জানান, আগে পল্লবী থানার একটি মামলায় ৬ মাস জেল খেটেছিল চুন্নি শিউলি। পল্লবী থানাধীন আওয়ামী লীগ নেত্রী রীনার বাসা থেকে ৫৬ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, কাজীপাড়ার ফয়সালের মাকে চায়ের সঙ্গে কীটনাশক মিশিয়ে খাইয়ে অজ্ঞান করে ৫৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে বাসা থেকে পালিয়ে যায়। রাজধানীর বিভিন্ন বাসা থেকে সে প্রায় ৭০০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার এবং ২০ লাখ নগদ টাকা চুরি করে বলে গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে শিউলি।
হারুন জুয়েলার্সের আটককৃট ম্যানেজার শাহীন জানায়, তারা দোকানের মালিক হারুনের উপস্থিতিতে দু’দফায় মোট চোরাইকৃত ৪০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার কিনেছে। দোকান মালিকের নির্দেশে ওই স্বর্ণালঙ্কার গলিয়ে নতুন গহনা বানিয়ে বিক্রির জন্য দোকানে রাখা হয়। দামে ও মাপে শিউলিকে ঠকানো হয়েছে বলেও জানায় শাহীন।
রূপনগরের জাহাঙ্গীল আলম, কাজীপাড়ার ফয়সাল এবং পল্লবীর রীনা বেগম জানান, বাসায় কাজ নেয়ার পর মালিকসহ বাসার সব সদস্যদের মন জয় করে ফেলে। সুন্দর আচরণ, কাজের নিপুণতা ও চারিত্রিক বিশ্বস্ততার মাধ্যমে সে এটা করে। তারা জানান, কাজে যোগ দেয়ার পর বাসার ও আলমারির চাবি তার তালাকপ্রাপ্ত স্বামী তারিফের কাছে পাচারের মাধ্যমে ডুপ্লিকেট চাবি তৈরি করে। বাসার মালিক যখন বাসায় তালা মেরে বাহিরে চলে যায় তখন শিউলী তার সাবেক স্বামী তারিফকে তার কোমরে গোপনে সংরক্ষিত মোবাইল ফোনে আসতে বলে। পরে তারিফ ও শিউলী দু’জন মিলে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে বাসার স্বর্ণালঙ্কার ও মালামাল নিয়ে পালিয়ে যায়। ডুপ্লিকেট চাবি তৈরি করতে না পরেলে আলমারি বা শোকেসের ড্রয়ার ভেঙে মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।

সংবাদটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

More News Of This Category
©2011 - 2020 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | TekNafNews.com
Developed by WebArt IT